RK NEWZ বিরোধী জোটের ‘দিল্লি চলো’ অভিযান। যোগ দিতে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে কংগ্রেস নেতার উদাত্ত আহ্বান। ককরোচ জনতা পার্টির সংসদ অভিযানে পুলিশের দমন পীড়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সম্ভবত লোকসভার বিরোধী দলনেতা দেশবাসীকে অভয় দিচ্ছেন, ‘ভয় পাবেন না। দেশ ও সংবিধান বাঁচাতে রামলীলায় আসুন।’ ‘ভোটচুরি’র অভিযোগ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকায় প্রশ্ন তুলে তাঁর অপসারণের দাবি ঘিরে ফের উত্তপ্ত হতে চলেছে রাজধানী দিল্লি। রবি সকালেই মেগা কর্মসূচিতে বিরোধী ‘ইন্ডি’ জোট। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রামলীলা ময়দানে জমায়েত হয়ে প্রতিবাদ। ইতিমধ্যে দিল্লি রওনা হয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিরোধী দলের নেতানেত্রীই নন, থাকতে পারেন নবগঠিত ককরোচ জনতা পার্টি, ছাত্র সংগঠন আইসার প্রতিনিধিরাও। এছাড়া কেন্দ্র বিরোধী সমাজের বিশিষ্টজন ও সাধারণ মানুষেরও জমায়েত করার কথা রামলীলায়। সবমিলিয়ে লাখখানেক মানুষ জড়ো হওয়ার স্থানে ভিড় উপচে পড়ার আশঙ্কা। আর তাই নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা নিল দিল্লি পুলিশ। কার্যত ‘চক্রব্যুহে’ পরিণত হয়েছে দিল্লির রামলীলা ময়দান। শনিবার সেখানে পরিদর্শন করেছেন দিল্লি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারা। দিল্লির রামলীলা ময়দান মোটামোটি লাখ খানেক মানুষের জমায়েতের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু ইন্ডি জোটের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে সমাবেশে ১০ থেকে ১২ লক্ষ মানুষ জড়ো হতে চলেছেন বলে অনুমান দিল্লি পুলিশের। সেইসঙ্গে প্রচুর যানবাহন আসার সম্ভাবনা। থাকবেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদবরা। এছাড়া আইসার সর্বভারতীয় সভানেত্রী নেহা বোরা, ‘ককরোচ’দের তরফে অভিজিৎ দীপকেরাও থাকার কথা। সবমিলিয়ে বিরোধী কর্মসূচি ঘিরে রবিবার, ১ নভেম্বর বিশাল ভিড় ও যানজট হতে চলেছে দিল্লিতে। দিনের একটা বড় সময়ে রাস্তাঘাট স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। তা অনুমান করেই আগাম ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। বিশেষত জোর দেওয়া হচ্ছে যান নিয়ন্ত্রণে। নিরাপত্তার জন্যও থাকছে বিশেষ ব্যবস্থা। ১৪ টি জোনে সর্বক্ষণ কড়া নজরদারির জন্য মোট ২০০ এআই ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে বলে খবর। তার মাধ্যমেই চলবে নজরদারি। দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, রবিবার সকাল থেকে পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে নেতাজি সুভাষ মার্গ টি-পয়েন্ট, রাজঘাট, দিল্লি গেট, আইটিও এ-পয়েন্ট, আজমেরি গেট রেড লাইট, রঞ্জিত সিং ফ্লাইওভার, ঝান্ডেওয়ালান গোলচত্বর, তুর্কমান গেট এবং মিরদার্ড চক-সহ মধ্য দিল্লির মূল চৌরাস্তা ও মোড়গুলিতে ট্রাফিক ঘুরিয়ে দেওয়া হবে। বাহাদুর শাহ জাফর মার্গ, রাজঘাট-জেএলএন মার্গ, ডিবিজি রোড এবং মিন্টো রোডেও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দিল্লি পুলিশের বার্তা, যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে, নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় যাত্রীদের গাইড করতে এবং রামলীলা ময়দানের চারপাশে যানজট মোকাবিলায় সেন্ট্রাল রেঞ্জ জুড়ে অতিরিক্ত ট্রাফিক কর্মী মোতায়েন করা হচ্ছে। শুধু রাহুল গান্ধী নন, কংগ্রেসের প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় এমনকী গলির নেতাও রামলীলার সমাবেশ সফল করতে সমাজমাধ্যমে আহ্বান জানিয়ে ভিডিও পোস্ট করেছেন। সব রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি, এআইসিসি’র সদস্য, দলের মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়কদের ভিডিও পার্টির সর্বভারতীয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে সহ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে আপলোড করা হয়েছে। নরেন্দ্র মোদীর জমানায় কংগ্রেসের কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমাজমাধ্যমে দলকে এত সক্রিয় দেখা যায়নি। এমনকী ২০২২-এ রাহুল গান্ধীর দেড়শ দিন ব্যাপী ভারত জোড়ো অভিযানেও নয়। কংগ্রেস যাকে বলে কোমর বেঁধে নেমেছে ১ নভেম্বরের সমাবেশ সফল করতে। বিরোধী জোটের নামে সভা ডাকা হলেও রামলীলার সমাবেশ ইতিমধ্যেই কংগ্রেসের কর্মসূচি হিসেবে পরিচিতি পেয়ে গেছে। দিল্লির ব্যবসায়ীদের শত অনুরোধ সত্ত্বেও হাত-শিবিরের নেতারা ১ নভেম্বরের কর্মসূচি বহাল রেখেছেন। রাহুল গান্ধীকে রাজি করাতে ব্যবসায়ী সমিতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্য নেতাদের দ্বারস্থ হয়েছেন। যদিও তাতে সিদ্ধান্ত বদলের সম্ভাবনা কম। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির অভিযোগ এতদিন বাম দলগুলির বিরুদ্ধেই মূলত সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমবঙ্গ, কেরলে একটা সময় ক্ষমতাসীন সিপিএমও বনধ, ধর্মঘট এবং সমাবেশ ডেকে শিল্প বাণিজ্য মহলের নিন্দার মুখে পড়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত বদল করেনি বামেরা। সিদ্ধান্তে অনড় থাকল কংগ্রেসও।

রবিবারের সমাবেশে ১০ লাখ মানুষের জমায়েতের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস। খোলা ময়দানের সমাবেশে মাথা গুণে উপস্থিতির অংক নির্ধারণের কোনও সুযোগ নেই। ভিড় ময়দান ছাপিয়ে গেলেই সমাবেশ সফল বলে ধরে নেওয়া হয়। রামলীলার সমাবেশে কংগ্রেসের ১০ লক্ষ মানুষের উপস্থিতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং তা নিয়ে লাগাতার প্রচারের পিছনে অন্য অঙ্ক রয়েছে। দিল্লি সহ উত্তর ভারত এমনকী পশ্চিমবঙ্গ বাদে পূর্ব ভারতের বাকি কোথাও কোন জনসভায় ১০ লক্ষ লোকের উপস্থিতির রেকর্ড নেই। রাজনীতির নানা সন্ধিক্ষণে যে সমাবেশটির প্রসঙ্গ ঘুরেফিরে আসে সেটি হল ১৯৭৪ সালের ৫ জুন পাটনার গান্ধী ময়দানের জনসভা। ইন্দিরা গান্ধীর ‘স্বৈরাচারী’ শাসনের অবসান চেয়ে সম্পূর্ণ ক্রান্তি বা পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন বিহারের সমাজবাদী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ। সেই ভারতে যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের দশ ভাগের একভাগও ছিল না। তবু পাটনার সেই সমাবেশ ঘিরে গান্ধী ময়দান হয়ে উঠেছিল ‘মিনি ভারত’। যদিও তৎকালীন সংবাদপত্রের হিসাব অনুযায়ী ভিড় হয়েছিল লাখ পাঁচেক মানুষের। উদ্যোক্তারা আরও বেশি ভিড়ের দাবি করলেও ১০ লাখ মানুষের সমাগমের দাবি আয়োজকেরা করেননি। সেই সমাবেশের রাজনৈতিক গুরুত্ব ইতিহাস হয়ে আছে। রাজনীতি বিশ্লেষকেরা অনেকেই মনে করেন, গান্ধী ময়দানের সেই সমাবেশ থেকে ইন্দিরা গান্ধীর জমানার অবসানের সূচনা হয়েছিল। ১৯৭৫ এর ২৫ জুন বিকালে দিল্লির রামলীলা ময়দানে সেই জয়প্রকাশ নারায়ণ কংগ্রেস সরকারের পতন নিশ্চিত করতে আর একটি সমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। সেই সভায় লক্ষাধিক মানুষের ভিড় হয়েছিল বলে উদ্যোক্তারা দাবি করেছিলেন। ঘটনাচক্রে সেদিনই রাত বারোটার পর দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা। ইন্দিরা সেই সিদ্ধান্তই ১৯৭৭-এর মার্চে লোকসভা ভোটে কংগ্রেসের নির্মম পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। জরুরি অবস্থা জারি এবং রাষ্ট্রীয় দমন পীড়নের জবাব দিয়েছিল দেশবাসী। আশ্চর্যের হল ক্ষমতা হারানোর এক বছরের মাথায় কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশে প্রধান বক্তা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার সভা ঘিরে মহানগরী একপ্রকার অচল হয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতাদের ৮০-৯০ ভাগ তখন ইন্দিরার থেকে শত হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলছিলেন। কিন্তু ব্রিগেড তাতে ফাঁকা থাকেনি। বরং বিরোধী নেত্রী ইন্দিরাকে দেখতেই কলকাতার সবচেয়ে বড় ময়দানটি কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল বলে জানা যায়। যদিও সমাবেশে লোকসমাগম নিয়ে কংগ্রেস নেতারা আগাম কোন দাবি করেননি। ভিড় দেখে বিস্মিত হাত শিবিরের নেতারা সভা শেষে দাবি করেছিলেন, প্রায় পাঁচ লাখ লোকের সমাগম হয় এবং মানুষ মূলত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে দেখতেই দূর-দূরান্ত থেকে কলকাতায় ছুটে এসেছিলেন। ১৯৭৮-এর ১৮ মার্চ ব্রিগেডে কংগ্রেসের সেই সভাটি ইতিহাস হয়ে আছে। ১৯৭৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে রামলীলা ময়দানেই মোরারজি দেশাই, অটল বিহারী বাজপেয়ীদের উপস্থিতিতে জনতা পার্টি তৈরির সমাবেশ ভিড় ছিল উল্লেখ করার মতো। বহু বছর পর ২০১১-তে আন্না হাজারের ডাকে দুর্নীতি বিরোধী সমাবেশেও রামলীলা ময়দান উপচে পড়েছিল। কংগ্রেসই প্রথম দিল্লির ওই ময়দানে দশ লাখ লোকের সমাবেশের ডাক দিয়েছে। বাস্তবে দিল্লির ওই ময়দানে ঠাসাঠাসি ভিড়েও কত মানুষের সমাগম সম্ভব? পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য বড়জোর হাজার ৫০ মানুষ সেখানে গাদাগাদি করে দাঁড়াতে পারে। যদিও রবিবারের সমাবেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে মিন্টো রোড থেকে জমায়েত রামলীলা ময়দান পর্যন্ত যাবে। অর্থাৎ রাস্তার ভিড়টাকেও কংগ্রেস হিসাবের মধ্যে রাখছে। রাহুল গান্ধী বলেছেন এটা কোন দল বা জোটের সভা নয়। ভারতের সংবিধান এবং ভোটাধিকার রক্ষার আগ্রহী মানুষ রামলীলা ময়দানে জড়ো হবেন। যদিও এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, রবিবারের সমাবেশ সফল করতে দলগতভাবে কংগ্রেস মরিয়া। শেষ পর্যন্ত রামলীলার সমাবেশের ভিড় গোটা দেশের আলোচ্য হয়ে উঠবে কিনা সে জন্য আরও প্রায় কুড়ি-একুশ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। ইতিমধ্যে কংগ্রেস একটি বিষয়ে সফল। দিল্লির সমাবেশকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে কংগ্রেস সাংগঠনিকভাবে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাৎপর্যপূর্ণ হল কয়েক মাস আগেও কংগ্রেসের যিনি ‘মোদী ভক্ত’ বলে নিন্দিত ছিলেন সেই তিরুবনন্তপুরমের সাংসদ শশী তারুরও সমাজমাধ্যমে গুচ্ছ রিলস পোস্ট করে রবিবারের সমাবেশ সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন। রাহুল গান্ধীর সুরে তিনিও বলেছেন এই সমাবেশ সংবিধান এবং ভোটাধিকার রক্ষার লক্ষ্যে আয়োজিত। আসলে বহুদিন পর কোনও একটি ইস্যুতে শুধু কংগ্রেস দলগতভাবে অভিন্ন অবস্থান নিতে পেরেছে তাই নয়, ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অধিকাংশ শরিক মনে করছে মোদী সরকারকে বিপাকে ফেলতে এসআইআর এবং কোটি কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনায় চেয়ে জোরালো ইস্যু আর কিছু হতে পারে না। ফলে এই ইস্যুতেই সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই শুরু করতে হবে। বস্তুত এই কারণেই দল হিসাবে কংগ্রেস এবং ব্যক্তি রাহুল গান্ধীর কৃতিত্ব অনেক বেশি। রাহুল বিগত তিন-চার বছর ধরে বলে আসছিলেন মোদী সরকারের নির্বাচনী সাফল্যের পিছনে আছে ভোট চুরি। রাহুল কর্নাটক এবং মহারাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন তাঁর অভিযোগ সত্যি। লোকসভার বিরোধী দলনেতাই প্রথম এই অভিযোগও করেন, বিজেপির নির্দেশে রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচন কমিশন সরকার বিরোধী ভোটারদের নাম কেটে দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর সংক্রান্ত মামলায় এ পর্যন্ত যতটা অগ্রগতি হয়েছে তাতে এটা স্পষ্ট যে বিরোধীদের অভিযোগ ভিত্তিহীন নয়। কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করছে শেষ পর্যন্ত যা করার বিরোধী শিবিরকেই করতে হবে। আদালত নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর কোন অবস্থান নেবে এমনটা দল মনে করছে না। বস্তুত এমন নজিরও নেই। হাত শিবিরের নেতারা সেই কারণেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে জনসমক্ষে অভিশংসন বা ইমপিচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই সঙ্গে চলমান আন্দোলনে কংগ্রেসের বাইরে থাকা মানুষকেও দল পাশে চাইছে। উদ্দেশ্য মোদী হটাও অভিযান এবং বিরোধী শিবিরের নির্ণায়ক শক্তি থাকা। এই দুই ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতেই রবিবারে রামলীলা সমাবেশকে কংগ্রেস ‘প্রেস্টিজ ফাইট’ হিসাবে তুলে ধরে সফল করতে মরিয়া।





