RK NEWZ বিগত কয়েক বছরে একাধিক ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছে টলিউডের অন্দরমহল। কখনও প্রাপ্য পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ, কখনও পরিচালক ও কলাকুশলীদের মধ্যে মতবিরোধ, আবার কখনও কাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কাউকে বয়কট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের টানাপড়েন, মতবিরোধ আর বয়কটের বিতর্ক পেরিয়ে এবার নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রস্তুতি টলিপাড়ায়। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথম টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়ায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে গিল্ড নির্বাচন। শনিবার, ৩১ অক্টোবর থেকে টেকনিশিয়ান স্টুডিওয় শুরু হয়েছে ২৩টি গিল্ডের ভোটগ্রহণ। দু’দিন ধরে চলবে এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া। বিভিন্ন গিল্ডের সভাপতি পদে নতুন মুখ বেছে নিতেই এই আয়োজন। গোটা প্রক্রিয়ার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উপদেষ্টা মিঠুন চক্রবর্তী। বিগত কয়েক বছরে একাধিক ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছে টলিউডের অন্দরমহল। কখনও প্রাপ্য পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ, কখনও পরিচালক ও কলাকুশলীদের মধ্যে মতবিরোধ, আবার কখনও কাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা কাউকে বয়কট করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে টলিপাড়ার সংগঠনগুলিতে নতুন করে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবি ক্রমশ জোরালো হয়েছিল। মাস দুয়েক আগেই মিঠুন চক্রবর্তী সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। তাঁর সেই উদ্যোগের পরেই শুরু হল ভোটের তোড়জোড়। নির্বাচন ঘিরে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য টেকনিশিয়ান স্টুডিও চত্বরে রাখা হয়েছে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা। শনিবার সকাল থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন মিঠুন। একটি চেয়ারে বসে গোটা ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার উপরে নজর রাখতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর আশা, এই নির্বাচনের পর টলিউডের কাজের পরিবেশে বদল আসবে। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মিঠুন বলেন, এতদিন ইন্ডাস্ট্রিতে একনায়কতন্ত্র চলছিল। অনেকেই কাজ করতে চাইছিলেন না। তবে ভোটের পর পরিস্থিতি বদলাবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। একইসঙ্গে নতুন করে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে পরিচালকদের উৎসাহ দিয়েছেন তিনি। মিঠুনের কথায়, রাজ্য সরকার ছবির জন্য ৩০ শতাংশ ভরতুকি দিচ্ছে। তাই পরিচালকদের আরও বেশি করে ছবি তৈরিতে এগিয়ে আসা উচিত। এই নির্বাচনকে ঘিরে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিনেতা তথা বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের বক্তব্য, আগে এসএমএসের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা ছিল। এবার অবশ্য শ্রম কমিশনের নিয়ম মেনেই নির্বাচন হচ্ছে। দু’দিনের এই ভোটপর্ব শেষে কোন গিল্ডের দায়িত্ব কার হাতে যায়, তা নিয়েই এখন টলিপাড়ার নজর। দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও অস্থিরতার পর নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশে পরিবর্তন আসার অপেক্ষা।
টলিউডের কর্মপরিবেশে বদল আনতে বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের। প্রযোজক, শিল্পী এবং কলাকুশলীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা ও মতবিরোধের জেরে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা কাটাতে এবার নির্দিষ্ট নিয়মকানুন বেঁধে দিল রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দফতর। কাজের সময়, পারিশ্রমিক, নিরাপত্তা এবং পেশাগত অধিকার—বিনোদন জগতের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে নতুন নীতিনির্দেশিকা। চলচ্চিত্র থেকে মেগা সিরিয়াল, ওটিটি কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলার পাশাপাশি অন্য ভাষার সমস্ত শুটিংয়ের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। নতুন নির্দেশিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাজের সুযোগের ক্ষেত্রে কোনও সংগঠনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। গিল্ড, ফেডারেশন কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনও সংগঠনের সদস্যপদ বা কার্ড না থাকলেও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজে যুক্ত হতে পারবেন শিল্পী ও টেকনিশিয়ানরা। অর্থাৎ, সংগঠনের সদস্য না হওয়ার কারণে কাউকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে একটি শুটিংয়ের জন্য কতজন কর্মী প্রয়োজন, তা ঠিক করার দায়িত্বও থাকবে প্রযোজকের হাতে। প্রকল্পের বাজেট এবং কাজের প্রয়োজন বুঝে কর্মী নিয়োগ করতে পারবেন তিনি। অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের জন্য কোনও সংগঠন চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না। পারিশ্রমিক নিয়ে বিবাদকে কেন্দ্র করে এতদিন ইন্ডাস্ট্রিতে যে ধরনের বয়কট বা কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে, তা নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে সরকার। কোনও অর্থনৈতিক বিবাদে জড়িত থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ঢালাওভাবে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া কিংবা গোটা বিনোদন জগতে তাঁর কাজের পথ বন্ধ করে দেওয়ার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। ব্যক্তিগত বিবাদকে কেন্দ্র করে পেশাগতভাবে কাউকে কোণঠাসা করার প্রবণতা বন্ধ করাই এই নির্দেশের অন্যতম লক্ষ্য। কাজের সময় এবং ওভারটাইমের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সিনেমা ও ওটিটি প্রযোজনার ক্ষেত্রে ১০ ঘণ্টার শিফটের সঙ্গে সর্বাধিক চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের সুযোগ রাখা হয়েছে। আবার আট ঘণ্টার শিফট হলে সর্বাধিক ছয় ঘণ্টা ওভারটাইম করা যাবে। মেগা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার শিফটের পাশাপাশি সর্বাধিক চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের নিয়ম প্রস্তাব করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে কাজ করাতে হলে প্রতি ঘণ্টার জন্য স্বাভাবিক মজুরির দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম দিতে হবে প্রযোজককে। শুধু তাই নয়, পরপর দুটি শুটিং শিফটের মাঝে কর্মীদের অন্তত ছয় ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিশ্রাম নিশ্চিত করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কাজের শর্তাবলি নিয়ে যাতে পরবর্তী সময়ে কোনও জটিলতা তৈরি না হয়, সে জন্য শুটিং শুরুর আগেই লিখিত চুক্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চুক্তিতে কাজের ধরন, পারিশ্রমিকের পরিমাণ এবং টাকা মেটানোর সময়সীমা উল্লেখ থাকতে হবে। পাশাপাশি শ্রম দফতরের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম টাকা দেওয়া যাবে না কোনও কর্মীকে। শুটিংয়ের পরিবেশ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে নয়া নির্দেশিকায়। বিশেষ করে রাতের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে মহিলা কর্মীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পরিষ্কার শৌচাগার, বিশ্রামের জায়গা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার বন্দোবস্ত রাখার কথাও বলা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে হেনস্থা, অপমানজনক আচরণ কিংবা বুলিংয়ের মতো অভিযোগ সামলাতে প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থাকে নির্দিষ্ট নিয়মাবলি তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। শিল্পী ও কলাকুশলীদের নথিভুক্তকরণ এবং কাজের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে একটি ডিজিটাল পোর্টাল চালুর পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব সৌমিত্র মোহনের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকায় এই পোর্টালের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বিনোদন জগতের কর্মীদের নামের তালিকা, অনলাইনে সদস্যপদ সংক্রান্ত ব্যবস্থা এবং শুটিংয়ের অনুমতি পাওয়ার সুবিধা থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এর পাশাপাশি শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে রাজ্য। বিনোদন জগতের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে কাজের পরিবেশ, পারিশ্রমিক এবং পেশাগত অধিকার নিয়ে টলিউডে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, নতুন নির্দেশিকার মাধ্যমে তার সমাধানের পথ খুঁজছে সরকার।





