RK NEWZ সবার হৃদয়ে রবীন্দরনাথ। চেতনাতে নজরুল। বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসঙ্গীত এক অনন্য সংযোজন। এক দিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ, অন্য দিকে মা কালীর বন্দনায় নিবেদিত অসংখ্য গান। নজরুলের সৃষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ধরা দিয়েছিল এক উদার মানবিক চেতনা। কথায় বলে, কলম তরোয়ালের থেকেও ধারালো। যে কলমে ভর করেই বর্ণমালা রূপান্তরিত হয় বিদ্রোহ, প্রেম, বেদনা কিংবা আরাধনার বার্তায়। আর বাংলা সাহিত্যে সেই কলমের কারিগরির মুন্সিয়ানা যিনি দেখিয়েছিলেন, তিনিই নজরুল। তাঁর কলম দিয়ে যেমন লেখা হয়েছে বিদ্রোহের বীরগাথা, প্রেমের আকুতি, ভালবাসার জয়গান। তেমনই নজরুলের লেখা শ্যামাসঙ্গীত স্থাপন করেছে অপার ভক্তি। ভেঙেছে সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজাল। বাংলা গানের ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামাসঙ্গীত এক অনন্য সংযোজন। এক দিকে ইসলাম ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ, অন্য দিকে মা কালীর বন্দনায় নিবেদিত অসংখ্য গান। নজরুলের সৃষ্টিতে ধর্মীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ধরা দিয়েছিল এক উদার মানবিক চেতনা। তাঁর শ্যামাসঙ্গীত তাই কেবল ভক্তিগীতি নয়, বাংলা সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যেরও উজ্জ্বল নিদর্শন।নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতের তাৎপর্য বুঝতে গেলে ফিরে দেখতে হয় বাংলার শাক্ত সঙ্গীতের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতকে সাধক কবি রামপ্রসাদ সেনের হাত ধরে শ্যামাসঙ্গীত পেয়েছিল স্বতন্ত্র পরিচিতি। পরবর্তী কালে কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন। বিশ শতকে নজরুল সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেন আধুনিক কাব্যভাবনা, সুরের বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব দার্শনিক উপলব্ধি। নজরুলের শৈশব কেটেছিল বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশে। লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে হিন্দু পুরাণ, পৌরাণিক কাহিনি ও লোকসঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। পরবর্তী কালে সেই অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। ‘বল রে জবা বল’ এবং ‘কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন’-এর মতো গানে দেবী কালীর এক অনন্য রূপ ফুটে উঠেছে। নজরুলের কল্পনায় কালো রং অন্ধকারের প্রতীক নয়; বরং তা আদি শক্তি, সৃষ্টি ও মহাজাগতিক রহস্যের প্রতিচ্ছবি। তাঁর গানে দেবী কখনও অসুরবিনাশিনী, কখনও স্নেহময়ী জননী। বিশ শতকের প্রথমার্ধে যখন বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক বিভাজনও মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন নজরুলের এই সঙ্গীতচর্চা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একজন মুসলিম কবির কলমে কালীসাধনার গান হয়ে উঠেছিল ধর্মীয় সহাবস্থানের এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি। নজরুলের শ্যামাসঙ্গীতের প্রকৃত মাহাত্ম্য এখানেই; তিনি দেখিয়েছিলেন, শিল্প ও সাধনার কোনও ধর্মীয় সীমানা নেই। তাঁর সৃষ্টিতে মা কালী শুধু ধর্মীয় আরাধনার প্রতীক নন, তিনি শক্তি, মাতৃত্ব ও অসীম সৃষ্টির প্রতিচ্ছবি। সময় পেরিয়েও তাই নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনায় অমলিন।





