তিন বছর তিন মাস আঠারো দিন পর অবশেষে মুক্তি পেলেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। জেল থেকে ফিরেই নিজের বিধানসভা কেন্দ্র বেহালা পশ্চিমের বাসিন্দাদের উদ্দেশে খোলা চিঠি লিখলেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়৷ শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে নাম জড়িয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সির হাতে গ্রেফতার হতে হয়েছিল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীকে৷ জেলমুক্তির পর নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দাদের চিঠি লিখে পার্থ জানতে চাইলেন, চাকরির বিনিময়ে কার থেকে টাকা নিয়েছেন তিনি৷ তাঁর নাম করে কেউ চাকরির বিনিময়ে টাকা চেয়ে থাকলেও সেই নাম জানানোর জন্য আর্জি জানিয়েছেন বেহালা পশ্চিমের বিধায়ক৷ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা এই খোলা চিঠি এ দিন থেকেই লিফলেট আকারে বেহালা পশ্চিম বিধানসভা এলাকায় বিলি শুরু হয়েছে৷ ২০০১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত বেহালা পশ্চিমেরই বিধায়ক ছিলেন পার্থ৷ লিফলেট আকারে লেখা সেই খোলা চিঠিতে বিধায়ক হিসেবে তিনি নিজের কেন্দ্রের জন্য কী কী কাজ করেছেন, তার খতিয়ানও তুলে ধরেছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়৷ চিঠির দ্বিতীয় ভাগে পার্থ অভিযোগ করেছেন, মিথ্যে অপবাদ দিয়েই তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি৷ পার্থ লিখেছেন, ‘২০২২ সালের ২২ জুলাই আমি কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে কারারুদ্ধ হই৷ রাষ্ট্রীয় সংস্থায় উচ্চপদে চাকরির সুনাম যা সততা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে অর্জন করেছি এবং আমার পারিবারিক সংস্কৃতি যা আমাকে সংস্কৃতবান মানুষ এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে, আজ মিথ্যে অপবাদে তা ভূলণ্ঠিত৷’ পার্থ এই খোলা চিঠিতে আরও লিখেছেন, তিনি বিধায়ক থাকাকালীন তাঁর বিধানসভা এলাকার অনেকেরই চাকরি হয়েছে৷ কিন্তু তা কোনও অর্থের বিনিময়ে হয়নি৷ পার্থ লিখেছেন, ‘আজ আমি সোজাসাপ্টা জিজ্ঞেস করছি, চাকরির বিনিময়ে আমি কার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছি? আসুন, যথাসাধ্য প্রমাণ নিয়ে কে চাকরির জন্য অর্থ দিয়েছেন আমার হাতে? কারা আমার নাম করে টাকা নিয়েছেন, এমন কেউ যদি থাকে তাদের নাম আমাকে জানান৷ আমি উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবই৷ আমার সততার ছবিকে যারা মসীলিপ্ত করার চেষ্টা করেছেন তাদের ছেড়ে দেওয়া সামাজিক অপরাধ৷’ চিঠিতে পার্থ আবেদন জানিয়েছেন, বেহালায় ডায়মন্ড হারবার রোডে তাঁর জনসংযোগ দফতর জনবাক্সে প্রমাণসহ যেন টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা জমা দেন বেহালা পশ্চিমের বাসিন্দারা৷ পার্থর আর্জি, ‘আমার সুদীর্ঘ কর্মজীবন, পরিষদীয় জীবনে কেউ আমার সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি৷ আপনারা আমার উপরে আস্থা রেখে পাঁচ পাঁচবার বিধানসভায় জিতিয়েছেন৷ আপনাদের কাছে আমি দায়বদ্ধ৷ গণদেবতা এর উত্তর খুঁজুন, আমার ছবি মসীলিপ্ত হওয়া থেকে উদ্ধার করুন৷’ চিঠির শেষ দিকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেছেন পার্থ৷ তিনি লিখেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আগেও ছিলাম, এখনও আছি৷ তবে উত্তর চাই-ই চাই৷’
তিন বছর তিন মাস আঠারো দিন পর অবশেষে মুক্তি পেলেন প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর জামিনের খবরে নতুন করে চর্চায় উঠেছে শান্তিনিকেতনের সেই বহুল আলোচিত বাড়ি ‘অপা’। নামের মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে বিতর্ক। অর্পিতা ও পার্থ, দুই নামের সংমিশ্রণেই গড়ে উঠেছিল এই বাড়ির পরিচিতি। একসময় কৌতূহলী মানুষে ভরে থাকত ফুলডাঙার এই এলাকাটি। কিন্তু ২০২২ সালের জুলাই মাসে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় পার্থবাবুর গ্রেপ্তারের পর থেকেই নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে ‘অপা’। এই তিন বছরে বাড়িটি যেমন নিস্তব্ধ ছিল, তেমনই নিস্তব্ধ থেকেছেন ওই বাড়ির পরিচারক দম্পতি – ঝর্ণা ও নিখিল দাস। ২০২২ সালের আগস্টে ইডি অভিযানের পর যখন অর্পিতা মুখোপাধ্যায় ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘিরে সারা রাজ্যে তোলপাড়, তখনই এক সংবাদে ধরা পড়েছিল তাদের জীবনযুদ্ধের কাহিনি। মালিক জেলে, সংসারে অভাব, অথচ দায়িত্বে একটুও ফাঁক রাখেননি তাঁরা। প্রতিদিন বাড়ির আলো জ্বেলে রাখা, বাগান পরিষ্কার, ঘরের ধুলো মুছে রাখা- যেন বাড়িটা ফেলে রাখা মনে না হয়। তাঁদের কথায়, “মালিকরা দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, তাই না আসা পর্যন্ত ছেড়ে যাইনি।” আর সেই অটল সততাই যেন এখন সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘অপা’র। তবে তিন বছরের এই দীর্ঘ সময় সহজ ছিল না। আক্ষেপ ও অভিমানের সুরে ঝর্ণা জানান, “তিন বছরে কেউ খোঁজ নেয়নি। লাইটের কানেকশন কেটে দিয়েছিল, খেতে পাচ্ছি কী না কেউ দেখেনি। কিন্তু আমরা ভেবেছি, এটা দাদাবাবুর বাড়ি, যতদিন বাঁচি ততদিন পাহারা দেব।” গাছ থেকে পড়ে গিয়ে নিখিলের কোমরে যন্ত্রণা, কাজের অক্ষমতা আজও রয়ে গিয়েছে। তারপরও দিনমজুরিতে যে সামান্য আয়, তাতেই কোনওরকমে সংসার চলে। ২০২২ সালের আগস্টে তাঁরা বলেছিলেন, “প্রয়োজনে আধপেটা খেয়েও থাকব, এই বাড়ি ছেড়ে যাব না।” তিন বছর পরও সেই কথা যেন আজও সত্যি। দাদাবাবু জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, এই খবর পাওয়া মাত্রই ঝর্ণার চোখে জল। কণ্ঠে আবেগ মিশে বলে ওঠেন, “দাদাবাবু জামিন পেয়েছেন শুনে খুব আনন্দ লাগছে। তিন বছর আমরা যে কীভাবে কাটিয়েছি, একমাত্র ঈশ্বর জানেন। আশা করি, এবার হয়তো আমাদের সুদিন ফিরবে।” ‘অপা’ বাড়ি এখনও আগের মতোই নিস্তব্ধ, তবে নিস্তব্ধতার মধ্যে যেন একরাশ আশার আলো। ভেতরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাইরের বাগান সাজানো – সব কিছুই ঠিকঠাক রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, পরিচারক দম্পতির এই নিষ্ঠা ও সততা সত্যিই বিস্ময়কর। কেউ আসেনি, কেউ দেখেনি, তবু দায়িত্ববোধে টিকে থেকেছেন তাঁরা। তিন বছর আগে যাঁদের ভিড়ে মুখ দেখা যাচ্ছিল না, আজ সেখানে কেবল বাতাসের হালকা শব্দ। অথচ সেই শূন্যতার মধ্যেই বেঁচে আছে এক বিশ্বস্ত দম্পতির অটল বিশ্বাস- “দাদাবাবু একদিন ফিরবেন।” পার্থবাবুর জামিন এখন শুধু এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের মোড় নয়, বরং শান্তিনিকেতনের এই ‘অপা’ বাড়ির ইতিহাসে যেন এক মানবিক অধ্যায়ের পুনর্জাগরণ। কারণ, তিন বছর অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন ঝর্ণা ও নিখিল – সততার সেই আলোই আজ ‘অপা’কে জীবন্ত রেখেছে।




