RK NEWZ বহুচর্চিত প্রীতি ম্যাচ তাঁর চোখে সোজাসুজি ‘সার্কাস’। বোর্ডের কোষাগার কার্যত ফাঁকা। গত বাজেটেই ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি। সেখানে স্রেফ একটা প্রীতি ম্যাচ খেলতে ব্রাজিলকে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকা! প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের স্পষ্ট দাবি, দেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কথা না ভেবে স্রেফ চমক দিতেই এই বিপুল আয়োজন করেছে এআইএফএফ। এর পিছনে কোনও যুক্তিই নেই। যুবভারতীতে ব্রাজিল ম্যাচ অতীত। ফলাফল ০-৪। আর এই হারের ঘোর কাটার আগে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে তীব্র আক্রমণ করলেন বাইচুং ভুটিয়া ভাঁড়ারে টান, তবু ৬০ কোটির দেখনদারি। এই বিপুল খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন এআইএফএফ-এর এগজিকিউটিভ কমিটির সদস্যের তীক্ষ্ণ মন্তব্য, ‘একজন ফ্যান বা ফুটবলার হিসেবে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলাটা স্বপ্নের। আমিও ফুটবলার হিসেবে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে খেলতে পছন্দ করতাম। কিন্তু ফেডারেশনের কাজ কি শুধু একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দেওয়া? নাকি দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল উন্নয়ন? স্পনসরের অভাবে আইএসএল ও আই-লিগের ক্লাবগুলো ধুঁকছে। আর সেখানে বোর্ড ব্রাজিলকে এত টাকা দিয়ে আনছে! এটা পুরোপুরি যুক্তিহীন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ভারত ১৩৮ নম্বরে। ব্রাজিল সেখানে ৬। এই চরম অসম লড়াইয়ের চাইতে ভারতের আসিয়ান কাপে খেলা অনেক বেশি জরুরি ছিল। সেখানে প্রতিপক্ষ ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া। প্রায় সমকক্ষ দল। খেললে আখেরে লাভ হত ভারতীয় ফুটবলেরই। আসিয়ান কাপ ছেড়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। প্রথমে আসিয়ান কাপ ও ব্রাজিল ফ্রেন্ডলির জন্য আলাদা দল গড়ার কথা ভেবেছিল এআইএফএফ। পরে টুর্নামেন্ট থেকেই নাম তুলে নেয় তারা। বাইচুংয়ের তোপ, ‘আসিয়ান কাপের মতো টুর্নামেন্ট ছাড়াটা ঘোর অন্যায়। অন্তত তিনটে দারুণ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ পেত ছেলেরা। তা না করে রাশিরাশি টাকা ঢেলে একটা ফ্রেন্ডলি খেলা হল। এর কোনও মানেই হয় না। শুধুমাত্র একটা ম্যাচ না খেলে ব্রাজিলের ফুটবল-মস্তিষ্ককে কাজে লাগানো উচিত ছিল। জাপান কী করেছিল? ওরা ব্রাজিলের সঙ্গে হাত মেলায়। জিকোর মতো কিংবদন্তি ওদের জাতীয় দলকে দীর্ঘ সময় কোচিং করান। ব্রাজিলের ফুটবলীয় জ্ঞান ও সৃজনশীলতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিল জাপান। আমাদেরও সেই পথে হাঁটা উচিত। একজন দিশাহীন সভাপতি থাকলে গোটা ব্যবস্থাটাই সার্কাসে পরিণত হয়। ভারতীয় ফুটবলে এখন সেটাই চলছে। আমাদের র্যাঙ্কিং ১০০ থেকে ১৪০-এর কাছাকাছি নেমে গেল। এশিয়ান কাপেও ভারত যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ পায়নি।’ জাপানের মডেল ও দিশাহীন বোর্ড উদাহরণ হিসেবে জাপানের জে-লিগের শুরুর দিকের কথা তুলেবাইচুংর দাবি, উন্নয়নের রূপরেখা ঠিক কেমন হওয়া উচিত? ব্রাজিল-ম্যাচে একপেশে ঝাপটে উড়ে গিয়ে বাস্তবটা ঠিকই টের পেয়েছে খালিদ জামিলের দল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৩৮ বনাম ৬। তফাতটা আসমান-জমিন। যুবভারতীতে ৪-০ স্কোরলাইনে হার ভারতের কাছে হয়তো বেশ ‘সম্মানজনক’। এবার বাইচুংয়ের মন্তব্যের পর ভারতীয় ফুটবল মহলে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠল।
কীভাবে দেখছে ভিনিসিয়াসদের দেশ ব্রাজিলের মিডিয়া?
আপাতত যে কয়েকটি রিপোর্ট সামনে এসেছে, সেখানে পরিস্থিতি বেশ সিরিয়াস! দুর্বল ভারতের বিরুদ্ধে চার গোল দিয়েও অ্যান্সেলোত্তির ছেলেদের রেহাই নেই। মিডিয়ায় রীতিমতো তুলোধোনা হতে হচ্ছে সেলেকাওদের। সংবাদমাধ্যমের চোখে এই জয় নেহাত ‘ঘুমন্ত’, ‘জড়ভরত’ এবং ‘প্রাণহীন’! প্রখ্যাত ব্রাজিলীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইউওএল’-এর তোপ, ‘আরও একবার চূড়ান্ত হতাশ করল দল। ১৩৮ নম্বরে থাকা দুর্বল ভারতের বিরুদ্ধে ৪-০ জয় নেহাতই রুটিনমাফিক।’ তাদের মতে, এত দুর্বল প্রতিপক্ষ পেয়েও মাঠে কার্যত ঘুমোচ্ছিল ব্রাজিল। বাঁ-প্রান্তে ভিনিসিয়াস জুনিয়র প্রচুর ফাঁকা জায়গা পেয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত ব্যর্থ। শুধু ভুলভাল পাস আর খাপছাড়া খেলা। একইভাবে ‘টেরা’ নিউজের কটাক্ষ, ‘ক্যানারিনহোদের ইতিহাসে অন্যতম দুর্বল প্রতিপক্ষ এই ভারত। তবু জয় মন ভরাতে পারল না।’ আরেক প্রথম সারির দৈনিক ‘ও গ্লোবো’ ম্যাচটাকে নিছক ‘অনুশীলন ম্যাচ’ আখ্যা দিয়েছে। তাদের দাবি, বলের দখল থাকলেও আক্রমণে চূড়ান্ত অনীহা ছিল সেলেকাওদের। প্রাক্তন ব্রাজিলীয় মিডফিল্ডার ফেলিপে মেলোর কথাতেও তীব্র শ্লেষ। স্পোর্টটিভি-তে তাঁর সাফ বক্তব্য, ‘ব্রাজিল শুধু পিছনের দিকে হাঁটছে। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় নরওয়ের কাছে হারের পর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দুটো ফ্রেন্ডলি (১-১ এবং ৪-২) জঘন্য খেলেছিল। এবার ৪ গোল দিলেও কুৎসিত খেলল।’ কলকাতার ভ্যাপসা গরম আর আর্দ্রতাকে অজুহাত হিসেবে মানতে নারাজ মেলো। তাঁর নিদান, ‘খারাপ খেলতেই পারো, কিন্তু মানসিকতায় তো জোর থাকবে! দলের সেই তাগিদটাই নেই। পরিবর্ত হিসেবে নেমে মার্টিনেলি আর জোড়া গোল করা স্যামুয়েল লিনো কিছুটা ঘাম ঝরাল। লিনো বেশি সময় পেলে আরও গোল করত।’ তোপের মুখে ব্রাজিলীয় ফুটবল সংস্থাও। ফুটবল পোর্টাল ট্রাইভেলা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে ফেডারেশনের বোধবুদ্ধি নিয়ে। তাদের সাংবাদিক কার্লোস ভিনিসিয়াস আমোরিমের কলমে তীব্র খোঁচা, ‘স্টেডিয়াম ভর্তি হয়নি। টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া। ভারতের মতো দেশে ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলার মানে তখনই থাকে, যখন সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে টিকিট থাকে। ফাঁকা গ্যালারিতে খেলার জন্য এই সফরের মানে কী?’দেশের একাধিক রাজ্যে দশকের পর দশক ব্রাজিলের কোনও ম্যাচ হয়নি। ঘরের দর্শকদের বঞ্চিত করে এশিয়া সফরে এসে পকেট ভরানোর এই নীতিকে একহাত নিয়েছে ট্রাইভেলা। বিশ্বকাপের পর সিবিএফ সভাপতি প্রতিশ্রুতি দেন, সাধারণ মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছবে ব্রাজিলীয় দল। আপাতত সেই প্রতিশ্রুতি নিছকই ফাঁকা আওয়াজ বলে কটাক্ষ সংবাদমাধ্যমের। যুবভারতীর মাঠে ৪ গোলের দাপট দেখালেও, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৩৮ বনাম ৬। তফাতটা আসমান-জমিন।ভারতের বিরুদ্ধে এই ম্যাচে ঘুমপাড়ানি ফুটবলের কারণে দেশের মাটিতে নিজেদের মিডিয়ার ক্ষুরধার ড্রিবলে কার্যত কুপোকাত অ্যান্সেলোত্তির ব্রাজিল।



