Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বিশ্বর‍্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ বনাম ১৩৮ নম্বরের অসম লড়াই!‌ গুরপ্রীতের জোড়া ভুলে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৪ গোল হজম করল ভারত

ভারত ০
ব্রাজ়িল ৪ (লিনো ২, এস্তেভাও, পেদ্রো)

RK NEWZ ৫০ হাজারের যুবভারতী। ডেভিড বনাম গোলিয়াথ। যুগে যুগে অসম দ্বৈরথের কাহিনি। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ভারত বনাম ব্রাজিল ম্যাচ তার অন্যথা নয়। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, বর্তমানে বিশ্বর‍্যাঙ্কিংয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ব্রাজিল। অন্যদিকে ভারত টিমটিম করছে ১৩৮ নম্বরে। যুবভারতী দেখল, ভারতীয় দলও লড়তে পারে। প্রতিপক্ষ যেই হোক না কেন, ব্লু টাইগার্স চোখে চোখ রেখে পালটা দিতে পারে। হেরে গেলেও রায়ান উইলিয়ামস, বিজয় ভার্গিজ, অভিষেক সিংহদের খেলা মন জয় করেছে। ব্রাজিলের অধিনায়ক মার্কুইনহোসর মুখে উঠে এসেছিল তাঁর নাম। খোদ ব্রাজিলের নেতা বলছিলেন, দেশের হয়ে ৯০তম ম্যাচ খেলতে নামা কতটা গর্বের। সেই কথাগুলি গুরপ্রীত সিংহ সঁধুর কানে হয়তো ঢোকেনি। না হলে ব্রাজ়িলের মতো বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিরুদ্ধে ও রকম দু’টি গোল খান। যে গোল কলকাতা ময়দানের তৃতীয় ডিভিশনে খেলা কোনও গোলকিপারও বাঁচিয়ে দেবেন, সে রকমই দু’টি গোল হজম করলেন গুরপ্রীত। ওই দুই ভুলেই শেষ হয়ে গেল ভারতের স্বপ্ন। দু’টি গোল না হলে প্রথমার্ধে গোলশূন্য অবস্থায় সাজঘরে ফিরত দুই দল। ভারতের কাছে তা নৈতিক জয়ের যে কোনও অংশে কম হত না। শেষ পর্যন্ত শনিবার যুবভারতীতে ব্রাজিলের কাছে তিন গোল হজম করল ভারত। অতীতে কত ম্যাচে যে নিজের দোষে গুরপ্রীত গোল খেয়েছেন তা গুণে শেষ করা যাবে না। ক’দিন আগে পানামা ম্যাচেও তাঁর ভুলে গোল হয়েছিল। নিজেদের বক্সের কাছে খেলা হওয়া সত্ত্বেও গোললাইন ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ওমর ভ্যালেন্সিয়া দূরপাল্লার শটে গোল করেন। এ দিন খেলা শুরু হওয়ার আগে গুরপ্রীত বারদুয়েক দেখা গিয়েছে গ্লাভস দিয়ে চোখ মুছতে। হয়তো প্রতিপক্ষ, পরিবেশের কথা ভেবে কিছুটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। তা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু মাঠে ন্যূনতম লড়াই তো করতে হবে। এই রকম ম্যাচেও যদি তিনি নিজেকে মেলে ধরতে না পারেন তা হলে কবে করবেন?

শুরুতে ভিনিসিয়াসের একটি শট গুরপ্রীত বাঁচানোর পরেই গোটা স্টেডিয়াম চিৎকার করে তারিফ করেছিল। যে কোনও ফুটবলারের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার কথা। গুরপ্রীতের হল উল্টো। মনে হচ্ছিল তাঁর কোমরে ব্যথা রয়েছে। বল ধরার জন্য নিচু হতে পারছিলেন না। তবু ডিফেন্ডারদের দক্ষতার কারণে তাঁকে বিশেষ পরীক্ষায় পড়তে হয়নি। ২৮ মিনিটের মাথায় বক্সের ডান দিকে বল পেয়েছিলেন এস্তেভাও। আশেপাশে ডিফেন্ডার না থাকায় তিনি গুছিয়ে নিয়ে বাঁ পায়ে জোরালো শট মারেন। গোটা গোল ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও বল এসেছিল গুরপ্রীতের আয়ত্তের মধ্যেই। শুধুমাত্র শটে জোর ছিল। গুরপ্রীত সেটাই ধরতে পারলেন না। বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ফিস্ট করে অনায়াসে সেই বল বার করে দেওয়া যেত। গুরপ্রীতের হাতের নীচে লেগে বল চলে গেল গোলে।

দ্বিতীয় ভুল ৪২ মিনিটে। এ বার সুযোগ তৈরি করেন এস্তেভাওই। বক্সের মধ্যে পেদ্রোকে দুরন্ত পাস বাড়িয়েছিলেন তিনি। শট নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময়ও ছিল তাঁর কাছে। পেদ্রোর শটের সময় স্রেফ পা বাড়িয়ে বল আটকাতে যান গুরপ্রীত। ডান হাতের গ্লাভসে লেগে বল জালে জড়িয়ে যায়। দু’মিনিট পরে তাঁর ভুলে তৃতীয় গোলটি খেতে পারত ভারত। ভিনিসিয়াস শট মেরেছিলেন। বল গুরপ্রীতের গায়ে লেগে গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। পিছন থেকে দৌড়ে আসছিলেন দানিলো। গুরপ্রীত নিজে নড়লেন না। উল্টে আপুইয়াকে নির্দেশ দিলেন বল ক্লিয়ার করে দেওয়ার। আপুইয়া কোনও মতে সেই বল বাইরে না পাঠালে আরও একটি গোল হত। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে গুরপ্রীতের দায়সারা মানসিকতা প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, কেন তাঁকে প্রতিটি ম্যাচে খেলানো হবে? কেন কোচ বদলালেও গুরপ্রীত বার বার তেকাঠির নীচে থেকে যান? এই দলে বিশাল কাইথের মতো দেশের অন্যতম সেরা গোলকিপারকে নেওয়াই হয়নি। প্রভসুখন গিলকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল বেঞ্চে। বিরতির পর কিছুটা মুখরক্ষার তাগিদেই গুরপ্রীতকে তুলে নিয়ে তাঁকে নামান কোচ খালিদ জামিল। যদিও অনেক আগেই সেই কাজ করা উচিত ছিল।
এই ধরনের কয়েকটা ঘটনা বাদ দিলে ভারতের লড়াই মোটেও খারাপ হয়নি। বরং র‌্যাঙ্কিংয়ে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকা একটা দেশের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হয়ে লড়াই করেছেন রায়ান, মনবীর, অভিষেকরা। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি যে ভারতকে হালকা ভাবে নেননি সেটা বোঝা গিয়েছিল প্রথম একাদশ দেখেই। ভিনিসিয়াস, মার্কুইনহোসদের প্রথম একাদশে রেখেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন বিশ্বকাপে খেলা দানিলো, ডগলাস সান্তোসেরাও। প্রথম দিকে ভিনিসিয়াসের ওই আক্রমণ ছাড়া ব্রাজ়িলকে বিপজ্জনক লাগেনি। বরং ভারত মরিয়া হয়ে রক্ষণ করছিল। শুধু তাই নয়, সুযোগ পেলে প্রতি আক্রমণেও উঠছিল। কিন্তু ভাল মানের স্ট্রাইকার না থাকলে এই ব্রাজ়িল রক্ষণকে টপকে গোল করা মুশকিল। সেটাই গোটা ম্যাচে বার বার বোঝা গিয়েছে।

ভিনিসিয়াস খেলছিলেন বাঁ দিক থেকে। শুরু থেকেই সে দিক দিয়ে ব্রাজিল আক্রমণ করছিল। তবু যে তিনি গোল করতে পারেননি বা সে ভাবে বিপজ্জনক হতে পারেননি, তার কৃতিত্ব প্রাপ্য অভিষেকের। ভিনিসিয়াসকে সর্ব ক্ষণ কড়া নজরে রেখেছিলেন তিনি। ব্রাজিলীয় তারকা ড্রিবল করে বেশ কয়েক বার বেরনোর চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন। অভিষেক বোকা বনলেও হাল ছাড়েনি। তাড়া করে গিয়েছেন।
বিরতির পরেই ব্রাজ়িল দলকে আমূল বদলে দেন আনচেলোত্তি। তুলে নেন ভিনিসিয়াস-সহ একাধিক প্রথম সারির ফুটবলারকে। গিমারায়েস, ডগলাস লুইজ়, স্যামুয়েল লিনোদের নামালেন। সেই লিনোই দু’টি গোল করলেন। সেই দু’টিও ভারতের রক্ষণ এবং গোলকিপারের ভুলে। ৫৮ মিনিটের মাথায় বিজয়ের পা থেকে বল কেড়ে নিয়েছিল ব্রাজিল। দূর থেকে জোরালো শটে গোল করেন লিনো। ৬৪ মিনিটে ভাল একটি সুযোগ পেয়েছিলেন রায়ান। মার্কারের নাগাল এড়িয়ে ব্রাজিলের বক্সে ঢুকে পড়েছিলেন রায়ান। তবে তাঁর শট বাঁচিয়ে দেন গোলকিপার মাউরো। তিন মিনিট পরেই মনবীরকে পাস বাড়িয়ে ব্রাজিলের বক্সের ডান দিকে দৌড়ে গিয়েছিলেন রায়ান। মনবীর বল করে তুলে দেন রায়ানের উদ্দেশে। চলতি বলে ভারতের স্ট্রাইকার শট নিতে গেলেও সফল হননি। বল গড়িয়ে গড়িয়ে পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
এর পরে ব্রাজিল এবং ভারত দুই দলই বেশ কয়েক বার আক্রমণ করেছে। কেউই সফল হয়নি। ব্রাজিল চতুর্থ গোলটি করে সংযুক্তি সময়ের শেষ মিনিটে। লিনোর শট প্রভসুখনের শরীরের তলা দিয়ে গোলে ঢুকে যায়। চার গোল খেলেও এই ফলাফল ভারতীয় দলকে পরের ম্যাচের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। আগামী ৬ অক্টোবর ভারতের সামনে উরুগুয়ে।

কোচ খালিদ জামিলকে নিয়ে ফুটবলমহলে রয়েছে নানা সমালোচনা। তাঁর অধীনে ভারতীয় দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সও মোটেই আশাপ্রদ নয়। কিন্তু পানামা আর ব্রাজিল ম্যাচে তিনি যেভাবে স্ট্র্যাটেজি সাজিয়েছেন, তার উপর ভিত্তি করেই ভারতীয় ফুটবলাররা মাঠে ঝলমল করলেন। বিশ্বকাপ খেলে আসা দলকেও দেখিয়ে দিলেন, শুধু ক্রিকেট নয়, ভারতে ফুটবলটাও হয়। ভারতে খেলতে আসার আগে ব্রাজিল হেডস্যর কার্লো আন্সেলোত্তি খানিক তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ভারতে তো ফুটবল সংস্কৃতিই নেই, ওরা অন্য় খেলায় ভালো। কিন্তু যুবভারতী ছেড়ে বেরনোর আগে তিনি নিশ্চয় মনে রাখবেন, ফুটবল ‘সংস্কৃতি’ না থাকলেও একঝাঁক ফুটবলার ভারতের আছে যারা দেশের জার্সিতে ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াই চালিয়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles