ধর্মেন্দ্র ভেন্টিলেশনে। কিন্তু পরিবারের তরফে কিছু জানানো হয়নি। বয়স ৮৯ বছর। সোম বিকেলের দিকে হঠাৎই খবর আসে, ধর্মেন্দ্রের স্বাস্থ্যের ক্রমশ অবনতি হচ্ছে, এবং সেই কারণেই নাকি ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে তাঁকে। এর পরেই অভিনেতাকে দেখতে হাসপাতালে পৌঁছোন স্ত্রী হেমা মালিনী। তার পর থেকেই উদ্বেগে অনুরাগীরা। তবে খবর মেলে, ভেন্টিলেশনের তথ্য ভুয়ো। অভিনেতার স্বাস্থ্যের খবর দেন ছেলে সানি দেওলের সহকারী। প্রতিক্রিয়া জানান হেমাও। জন্মদিনের আগে এই খবর মেনে নিতে পারছে না নায়কের অনুরাগীরা। যদিও শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছিল, অভিনেতাকে নিয়ে উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। আগামী মাসের ৮ তারিখে ৯০ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল অভিনেতার। জন্মদিনের আগে ঘন ঘন হাসপাতালে ভর্তি হতেই তাঁকে নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিল অনুরাগীরা। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ধর্মেন্দ্র। মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে তাঁর। জানা গিয়েছে ভেন্টিলেশনে রয়েছেন পাঞ্জাবের মানসপুত্র। সোমবার, ১০ নভেম্বর রাতে সলমন খান থেকে শুরু করে শাহরুখ খান, আরিয়ান খান এক এক করে হাসপাতালে আসেন বর্ষীয়ান অভিনেতাকে দেখতে। অন্যদিকে তাঁর বাড়ির সামনে বসানো হয় ব্যারিকেড। এরপরই রটতে থাকে তাঁর মৃত্যুর ভুয়ো খবর। রাত পোহাতে, আরও একবার সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। মঙ্গলবার সকাল সকাল ফের রটে যায় ধর্মেন্দ্রর মৃত্যুর খবর। আর বারংবার এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিনেতার বাড়ির লোকজন। হেমা মালিনী এদিন ক্ষোভ উগরে এক্স অর্থাৎ যা আগে টুইটার নামে পরিচিত ছিল সেখানে লেখেন, ‘যেটা ঘটছে যে ক্ষমার অযোগ্য। সংবাদমাধ্যম কীভাবে এভাবে ভুয়ো খবর ছড়াতে পারে তাও এমন একজনকে নিয়ে যিনি চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন? এটা অত্যন্ত অসম্মানজনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কাজ। পরিবারকে সম্মান দিন। আমাদের প্রাইভেসি দিন।’
শারীরিক অবস্থার নাকি অবনতি ধর্মেন্দ্রের। পরিবারের পাশাপাশি বলিউডের একাধিক তারকা মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে পৌঁছোন। মঙ্গলবার ভোরে অভিনেতার মৃত্যুর খবর রটে যায়। যদিও পরিবারের তরফে এই খবর ভুয়ো বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন কেমন আছেন ধর্মেন্দ্র? জানালেন বড় ছেলে সানি দেওলের সহকারী। মঙ্গলবার সকালেই ঈশা দেওল সমাজমাধ্যমে বার্তা দেন, পরিবারের অনুমতি ব্যতীত তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়ে তৃতীয় ব্যক্তি যেন হস্তক্ষেপ না করেন। একই রকম ক্ষোভ প্রকাশ করেন হেমা মালিনীও। ধর্মেন্দ্রের প্রয়াণের খবর পরিবেশনে আহত অভিনেতার স্ত্রী, তিনি এই ধরনের খবরে তীব্র ভৎর্সনা জানান। মঙ্গলবার সকালে ফের সানি দেওলের টিমের তরফেও বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়, ধর্মেন্দ্র চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনের জন্য অনুরাগীদের প্রার্থনা করার অনুরোধ জানানো হয়। অন্য দিকে, তারকার দীর্ঘায়ু কামনা করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যেই অনুরাগীরা পুজোপাঠ শুরু করেছেন। ব্রিচ ক্যান্ডি হাসাপতালের বাইরে নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের যুগনায়ক ধর্মেন্দ্র। ছ’দশকের রাজত্বে তিনশোরও বেশি ছবি অভিনেতার। পাঞ্জাবের মানসপুত্রের প্রয়াণে শেষ হল এক সোনালি যুগ। কিংবদন্তি তারকার জন্ম ১৯৩৫ সালের ৮ ডিসেম্বর, পঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার নসরালি গ্রামে। এক সাধারণ পরিবারের ছেলে থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়ের নায়ক। ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি ছিল গভীর ভালবাসা। কলেজে পড়াকালীন জয় করেন ফিল্মফেয়ার ট্যালেন্ট হান্ট, আর সেই জয়ই তাঁকে নিয়ে আসে মুম্বই। শুরু হয় সাফল্যের যাত্রা। ১৯৬০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিল ভি তেরা হম ভি তেরে’ -র মাধ্যমে বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেন ধর্মেন্দ্র। তারপর একে একে ‘ফুল অউর পাত্থরট (১৯৬৬), ‘অনুপমা’, ‘বন্দিনী’, ‘আয়ে দিন বাহার কে’, ‘সীতা অউর গীতা’, ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘শোলে’, ‘দোস্ত’, ‘জুগনু’ একের পর এক ছবিতে তিনি যেন নিজের প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। ধর্মেন্দ্রর সুদর্শন চেহারাই যেন তাঁকে কয়েক যোজন এগিয়ে রেখেছিল তাঁর সমসাময়িকদের থেকে। বিশেষ করে ‘শোলে ’ ছবির বীরু চরিত্র তাঁকে অমর করে রেখেছে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে। অনায়াস হাসি থেকে প্রেমাতুর চাউনি আর নায়কোচিত সংলা তাঁকে গোটা এক প্রজন্মের কাছে ‘হিরো’ করে তোলে। অ্যাকশন হিরো হিসেবে ধর্মেন্দ্র ছিলেনও তুলনাহীন। কিন্তু রোমান্টিক চরিত্রেও তাঁর অভিনয় দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছিল। ‘চুপকে চুপকে’ বা ‘গুড্ডি’র মতো ছবিতে শুধু নায়ক থেকে অভিনেতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন অবলীলায়। বাস্তব জীবনেও তিনি বেঁচে ছিলেন নায়কের মতোই। সাধারণ মানুষের কথা থেকে কৃষকের দুঃখ। সবই ছিল ছুঁয়ে যেত তাঁর অন্তর। অভিনেতা থেকে নেতা হয়ে জনসেবার ইচ্ছাপূরণ করতে আসেন রাজনীতির আঙিনায়। ২০০৪ সালে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টির হয়ে রাজস্থানের বিকানের থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতি, খ্যাতি, সাফল্য। কোনও কিছুই তাঁর বিনয়ী স্বভাবকে বদলাতে পারেনি।
ছবির মতোই ধর্মেন্দ্র ব্যক্তিগত জীবনেও ছিল ঘটনার ঘনঘটা। সেখানে প্রেমের আনাগোনা অবিরত। ১৯৫৪ সালে স্ত্রী প্রকাশ কউরের সঙ্গে প্রথমে সংসার সাজিয়েছিলেন নায়ক। তাঁদের দুই পুত্র। সানি দেওল এবং ববি দেওল, বাবার মতোই বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু সেই সংসারেও চিড় ধরে এক সময়। পরবর্তীতে তিনি বলিউডের ‘ড্রিম গার্ল’, বয়সে ১২ বছরের হেমা মালিনীর প্রেমে পড়েন নায়ক। ধর্ম পরিবর্তন করে ১৯৮০ সালে তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যা। ঈশা দেওল এবং অহানা দেওল। হাজারও বিতর্ক পেরিয়ে দুই স্ত্রীর প্রতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন অভিনেতা। সমালোচনা-কটাক্ষকে তুড়িতে উড়িয়েছেন। ছয় থেকে নয়ের দশক পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। কর্মজীবনের শুরুর দিকে তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সুদর্শন পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হত। এবং তিনি বলিউডে পরিচিত ছিলেন ‘হি-ম্যান’ নামে। আদ্যোপান্ত ‘মশালাদার’ বাণিজ্যিক ছবিকে তিনি এমন সহজাত দক্ষতায় সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে, মানুষ তাঁর অভিনয়ে খুঁজে পেত নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। শহর হোক বা গ্রাম, ধনী হোক বা সাধারণ মানুষ, ধর্মেন্দ্র ছিলেন সকলের আপনজন। সেই সময় রিকশার পিছনের পোস্টার থেকে শুরু করে অষ্টাদশীর বইয়ের পাতার ফাঁকেও জায়গা ছিল তাঁরই ছবির। যেন ধর্মেন্দ্র শুধু পর্দার নায়ক নন, সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা এক আবেগ, এক মুগ্ধতা। দীর্ঘ অভিনয় জীবনে লক্ষ লক্ষ মানুষের মন যেমন জয় করেছেন, তেমনই পুরস্কার পেয়েছেন অগণিত। ১৯৯১ সালে ‘ঘায়েল’-এর সুবাদে আসে জাতীয় পুরস্কার। ২০২১ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের জন্য। ২০১২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণ সম্মানে সম্মানিত করে। নব্বইয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে ধর্মেন্দ্র শরীর নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও ভক্তরা তাঁর মনের সজীবতায় মুগ্ধ ছিলেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নায়ক থেকে পরিণত হয়েছেন চরিত্রাভিনেতা। সেখানেও নিজস্ব ছাপ রেখে গিয়েছেন অচিরে। প্রতিটি চরিত্রেই তিনি যেন নতুন করে জন্ম নিয়েছেন, প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের শিল্পীর বয়স হয় না, শুধু রূপ বদলায়। ‘প্যায়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’, ‘লাইফ ইন আ মেট্রো’, ‘আপনে’, ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কহানি’-র মতো ছবিগুলি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।




