মদ্যপানে লিভারের ক্ষতি। মস্তিষ্কেরও ক্ষতি? আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি এমআইটি ও মাস জেনারেল ব্রিগহ্যাম-এর গবেষণায় দাবি, প্রতি দিন আকণ্ঠ মদ্যপান করলে শুধু যে ফ্যাটি লিভারের রোগ হবে, এ ধারণা ভুল। অ্যালকোহল মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণ হতে হতে ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়ে। অ্যালকোহল যে ব্রেন স্ট্রোকেরও কারণ, এ সম্পর্কিত সমীক্ষা চালিয়েছেন ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকেরাও। তাঁদের সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘নিউরোলজি’ মেডিক্যাল জার্নালে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ১৬০০ জনের মতো রোগীকে নিয়ে পরীক্ষাটি করা হয়। প্রত্যেকেরই মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাঁদের যে রোগটি ধরা পড়ে, তার নাম চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ইনট্রাসেরিব্রাল হেমারেজ’, যাকে চিকিৎসকেরা সহজ করে বলেন ‘ব্রেন ব্লিড’। মস্তিষ্কের রক্তনালি ও রক্তজালিকা ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাত হতে শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন হতে থাকলে, ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। চিকিৎসকেরা দেখেন, ১৬০০ জন রোগীর মধ্যে অন্তত ৭০ শতাংশই অতিরিক্ত মদ্যপান করেন এবং সে কারণেই তাঁদের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ২০০৩ থেকে ২০১৯ সাল অবধি সমীক্ষাটি চালানো হয় ও তাতে নিশ্চিত করেই দাবি করা হয় যে, অ্যালকোহলই মস্তিষ্কের ক্ষতির অন্যতম বড় কারণ। নিয়মিত মদ্যপান করলে রক্তচাপ ও রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বাড়তে পারে৷ ওজন বাড়ে৷ বাড়ে ডায়াবিটিসের আশঙ্কা৷ মদ্যপান হার্টরেট এলোমেলো করে দিতে পারে৷ হঠাৎ খুব বেশি মদ্যপান করলে আশঙ্কা বাড়ে হৃদ্রোগের৷ এ সবের পাশাপাশি রক্তে জমা বর্জ্য মস্তিষ্কের প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে। চাপ পড়ে রক্তবাহী নালিতে। ফলে রক্তনালি ছিঁড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। গবেষকেরা দেখেছেন, দিনে চার পেগ বা তারও বেশি মদ্যপান করেন যাঁরা, তাঁদের রক্তচাপের আচমকা হেরফের ঘটে। অতিরিক্ত রক্তচাপের কারণে রক্তে অনুচক্রিকা বা প্লেটলেটের পরিমাণ কমতে থাকে। যে কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা আর বন্ধ হয় না। তখন বিপদ ঘটে যায়। কিছু ক্ষেত্রে এমনও দেখা গিয়েছে, দিনের পর দিন অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে ‘সিভিয়ার ব্রেন হেমারেজ’ হয়েছে। মদ্যপানের কোনও নিরাপদ মাত্রা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র হিসেবে মদ্যপান যাঁরা নিয়মিত করেন, তাঁরা পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করতে পারেন। হু-র নির্দেশিকায় বলা হয়েছে সপ্তাহে ২১ ইউনিটের বেশি মদ্যপান ক্ষতিকারক। এক ইউনিট মানে হল ২৫ মিলিলিটার। পুরুষদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ২১ ইউনিটের কম ও মহিলাদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ১৪ ইউনিটের কম। অন্তঃসত্ত্বাদের জন্য একেবারেই নয়। তবে হু এ-ও জানিয়েছে, মদ্যপান সব দিক থেকেই ক্ষতিকারক। কাজেই হিসেব মেপেও যদি রোজ খেতে থাকেন, তা হলে হার্ট, লিভার ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হবেই। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং হার্ট দুর্বল হয়, তা হলে রোজ মদ্যপান বিপজ্জনক।
বয়সকালে অ্যালঝাইমার্সে স্মৃতি চলে যাচ্ছে অনেকের। কমবয়সিরাও এই তালিকায়। অ্যালঝাইমার্স ধরা পড়লে চিকিৎসকেরা স্পষ্টই বলে দেন যে, নিরাময়ের কোনও উপায় নেই। রোগটিকে ধরেবেঁধে রাখতে শুধু কিছু থেরাপি করা যায় মাত্র। অ্যালঝাইমার্স শুধু যে ভুলে যাওয়ার রোগ, তা তো নয়! এতে রোগীর স্বভাব, ব্যক্তিত্বেও বদল আসে। এই বদলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চিকিৎসা রয়েছে, শুধু রোগ নিরাময়ের উপায় এখনও অধরা। এই নিয়ে গবেষণাও চলছে। আমেরিকার গবেষকেরা তাঁদের এক গবেষণায় দাবি করেছেন, নতুন ওষুধ নয়, বরং পুরনো কিছু ওষুধে অ্যালঝাইমার্সের নিরাময় সম্ভব হতে পারে। সে ওষুধ দু’টি আবার ক্যানসারের চিকিৎসায় বহু বছর ধরে ব্যবহৃত। আমেরিকার অ্যালঝাইমার্স রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের গবেষকেরা রোগটির চিকিৎসাপদ্ধতি খুঁজতে গিয়ে দু’টি ওষুধকে চিহ্নিত করেন— লেট্রোজ়োল এবং ইরিনোটিক্যান। এর মধ্যে লেট্রোজ়োল ওষুধটির ব্যবহার হয় স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় এবং ইরিনোটিক্যান ওষুধটির প্রয়োগ করা হয় ফুসফুস ও কোলন ক্যানসারের চিকিৎসায়। ওষুধ দু’টি আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদন পেয়েছে। গবেষকেরা এই দু’টি ওষুধ ইঁদুরদের খাইয়ে দেখেছেন, তাদের উপর খুব ভাল কাজ করছে। স্মৃতিলোপ পেয়ে যাওয়া ইঁদুরদের মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে বদল ঘটছে। মস্তিষ্কের জিনের বিন্যাসেও বদল এসেছে। অ্যালঝাইমার্স রোগটিতে মস্তিষ্কে জিনের বিন্যাসে বদল আসে। এই বদলকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া এক প্রকার অসম্ভব কাজ। তাই এর চিকিৎসাপদ্ধতিও জটিল। গবেষকেরা দেখেছেন, বিটা-অ্যামাইলয়েড নামক এক প্রকার প্রোটিন মস্তিষ্কে অধিক মাত্রায় জমতে জমতে ‘প্লাক’ তৈরি করে। এই অ্যামাইলয়েড প্লাকের কারণে স্নায়ুতে জট পাকিয়ে যায়। ফলে স্নায়ু থেকে সঙ্কেত আদানপ্রদানে বাধা আসে। এতে মস্তিষ্কের কোষগুলিরও ক্ষয় হতে থাকে। তাতেই স্মৃতির পাতা ধূসর হয়ে যায়। অ্যালঝাইমার্স রোগের বিকাশে বিশেষ কিছু জিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে রোগটি হয় এবং এর নির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা নেই। তবে কিছু জিনের পরিবর্তন রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করতে পারে। দেখা গিয়েছে, ‘এপিওই’ নামের একটি জিন এই রোগের জন্য অনেকাংশে দায়ী। জিনটিতে বদল ঘটলে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকর্মই এলেমেলো হয়ে যায়। তখন নানা স্নায়বিক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সান ফ্রান্সিসকোর ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া ও গ্ল্যাডস্টোন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা অ্যালঝাইমার্স প্রতিরোধে লেট্রোজ়োল এবং ইরিনোটিক্যান ওষুধ দু’টির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য তৈরি ওষুধ দু’টি মস্তিষ্কের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ঠিক যে যে কারণে জিনের রাসায়নিক বদল ঘটতে পারে বা মস্তিষ্কে প্রোটিন জমার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেই কারণগুলিকে ঘটতে বাধা দেবে ওই দুই ওষুধ। যদিও মানুষের উপর ওষুধ দু’টির পরীক্ষা এখনও পুরোদমে শুরু হয়নি। সেটি হলে আরও বিস্তারিত ভাবে জানা যাবে।




