‘ডক্টর অফ ব্যাট্স’। ব্যাটের চিকিৎসক। ব্যাট নিয়ে সমস্যা। সমাধানে অজিত কুমার শর্মা। আন্দ্রে রাসেল, সুনীল নারাইনেরা ছুটে যান ব্যাটের ডাক্তারের কাছে। বাগুইআটির অজিত কুমার শর্মা। ভবিষ্যতে রাজনীতিতে আসারও ইচ্ছা। বাগুইআটির হাতিয়াড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মিনিট সাতেক হেঁটে গেলে একটি ছোট গলির শেষ প্রান্তে নিতান্তই সাধারণ একটি দোকান। ছোট একটা সাইনবোর্ড। ক্রিকেট তারকাদের ছবির মাঝে বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘ডক্টর অফ ব্যাট্স’, অর্থাৎ ব্যাটের চিকিৎসক। ব্যাটের আবার চিকিৎসকও হয়! নিজেকে এই নামেই ডাকতে ভালবাসেন দোকানের মালিক অজিত কুমার শর্মা। ব্যাটের ডাক্তারের কথায়, “শরীর অথবা মনের চিকিৎসক হলে ব্যাটেরই বা চিকিৎসক হবে না কেন? ক্রিকেট খেলতে গেলে ব্যাট নিয়ে নানা রকম সমস্যা। সারানোর জন্য কাউকে তো দরকার।” কেকেআর কলকাতায় হোম হোটেলে রমনদীপ সিংয়ের ডাক। ব্যাট সারাতে।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ব্যাটারদের খেলা। এমনটাই অভিযোগ দীর্ঘ দিন। ব্যাটারেরা নিজের মনের মতো ব্যাট নিয়ে মাঠে নামতেন। ধুমধাড়াক্কা পিটিয়ে সাজঘরে। এ বার ভারতীয় বোর্ড ব্যাটের মাপ নিয়ে কড়া হয়েছে। যেমন খুশি ব্যাট ব্যবহারে বাধার কারণেই চাহিদা ডাক্তার অজিতের। কেকেআরের প্রায় প্রত্যেক ক্রিকেটারের কাছেই আক্ষরিক অর্থে তিনি ‘গো-টু ম্যান’। আন্দ্রে রাসেল, সুনীল নারাইন, বেঙ্কটেশ আয়ার, রিঙ্কু সিং, রমনদীপ সিং। সমস্যায় পড়লেই ফোন আসবে অজিতের কাছে। হায়দরাবাদের অভিষেক শর্মা, ঈশান কিশন, বেঙ্গালুরুর ফিল সল্ট। প্রত্যেকের কাছেই ডাক্তারবাবু জনপ্রিয়। অভিষেক, সল্টরা ব্যাটের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন। নারাইন, রাসেল সবচেয়ে দামী ব্যাট ব্যবহার করেন। অনুমান, ব্যাটের দাম দেড় লক্ষ টাকা। রমনদীপের ব্যাটের দাম ৭৫ হাজার টাকা।
২০২৩ সালে কেকেআরের তৎকালীন ক্রিকেটার মনদীপ সিংহ নিজের কয়েকটি ব্যাট সারাই করার জন্য লোক খুঁজছিলেন। কেকেআরের এক নেট বোলার অজিতের সন্ধান দেন। সমাজমাধ্যমে মনদীপের সঙ্গে কথা হয় অজিতের। মনদীপ কাজ দেখে খুশি হন। ধীরে ধীরে কেকেআরের বাকি ক্রিকেটারদের থেকেও ব্যাট সারাই করার প্রস্তাব। কেকেআরের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্রিকেটারই কোনও না কোনও সময় তাঁর থেকে ব্যাট সারাই করিয়েছেন। ব্যাটের সমস্যা, অজিত সারিয়ে তুলবেন। দৈর্ঘ্য কমানো, ওজন কমানো, ফাটল মেরামত। নাগেরবাজারে অজিতের দ্বিতীয় দোকান।
ব্যাট সারাই করার জন্য কোনও প্রথাগত শিক্ষা নেননি অজিত। ব্যাটের চিকিৎসক হওয়ার কথাও ভাবেননি। ক্রিকেটের প্রতি প্রেম ছোটবেলা থেকেই। গোয়াবাগানে ক্রিকেট শিখতেন। স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ারও। লকডাউনের আগে সল্টলেকে এক বার অনুশীলনে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে ব্যাট নেটে আটকে যায়। কাঁধে বড় চোট পান। ব্যাট বা বল কিছুই করতে পারছিলেন না। বেশ কয়েক দিন ও ভাবে বসে থাকার পর শচীন নামে এক বন্ধু পরামর্শ দেন ব্যাট সারাই করার। প্রথমে অজিত রাজি হননি। হোমগার্ডের চুক্তিভিত্তিক চাকরিও পেয়েছিলেন অজিত। ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে ভেবে সেই চাকরি ছাড়েন। বাবা-কাকারা ৩০-৪০ বছর ধরে কাঠের কাজে রত। আসবাবপত্র তৈরি করেন। প্রাথমিক ধারণা ছিলই। স্থানীয় আরও কিছু কাঠমিস্ত্রিকে দেখে কাজ শেখা। ‘ব্যাটের চিকিৎসক’ অজিত বলেন, “আগে আমার দোকানের নাম ছিল কলকাতা ব্যাট রিপেয়ারিং সেন্টার। হাতিয়াড়ার দোকানে ওখানকার এক চিকিৎসক রোজই দেখতেন আমি একটা ব্যাট নিয়ে কারিকুরি করছি। জিজ্ঞাসা করেন, কী করছি আমি। তাঁকে জানাই, আমি ব্যাট সারাই করছি। উনি উৎসাহ দিয়ে হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমি মানুষের ডাক্তার, তুই ব্যাটের ডাক্তার’। কথাটা মনে ধরে। তখনই দোকানের নাম বদলে ‘ডক্টর অফ ব্যাট্স’ দিই। এখন ওই নামেই সবার কাছে পরিচিত।”
কেকেআরের প্রায় সব ক্রিকেটারের সঙ্গে অজিতের ভাল বন্ধুত্ব। অজিত চুপচাপ নিজের কাজটুকু নিয়েই থাকতে চান। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রতি বিশেষ আগ্রহ নেই অজিতের। টেস্ট খেলার ভক্ত। বললেন, “লাল বলের ক্রিকেটের আলাদা একটা মাধুর্য রয়েছে। ওটা কোনও ভাবেই ভোলা যাবে না। রাজনীতির প্রতি একটু টান রয়েছে। বিশ্বাস করি, আমার মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা রয়েছে। হয়তো ৪০-৪৫ বছর বয়স যখন হবে, তখন পুরোপুরি রাজনীতিতে চলে যেতে পারি। নেতা হওয়ার একটা ইচ্ছা আমার মধ্যে রয়েছে। আপাতত এই ব্যবসাটা থাকবেই। ভবিষ্যতে অন্য কোনও ব্যবসাও করতে পারি। আজ থেকে ১০ বছর পরে অন্য কোনও ব্যবসায় সফল হতে পারি। এখন থেকেই আগাম কিছু ভাবিনি।”
আগামী দিনে ব্যাট তৈরি করারও ইচ্ছা রয়েছে অজিতের। কাজটা এতটা সহজ নয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা। ভাল মানের কাঠ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অজিতের কথায়, “ভাল ব্যাট উইলো কাঠ থেকে তৈরি হয়। এখানে কেউ উইলো কাঠ সাপ্লাই করতে রাজি নয়। অনেক সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের হয়তো কিছু সমস্যা রয়েছে। চেষ্টা করছি সেই সমস্যা মেটাতে। কারণ এখানে ব্যাট তৈরি করলে তার দামও কম হবে। ভাল মানের ব্যাট কিনতে গেলে অনেক দাম পড়ে যায়। সেই সামর্থ্য সবার থাকে না। তবে এখনই এটা নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নই।” কলকাতা ছাড়াও ব্যাট সারাই করার প্রস্তাব আসে বিহার, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশ রাজ্য থেকেও। ‘পিক অ্যান্ড ড্রপ’ পরিষেবাও রয়েছে দোকানে। অর্থাৎ বাড়ি থেকে ব্যাট নিয়ে এসে সারাই করে আবার বাড়িতেই ফেরত দিয়ে আসা হবে। যত দূরেই থাকুন না কেন। অজিতের কথায়, “এখন একটা সাধারণ ব্যাটের দাম মোটামুটি ১০-১৫ হাজার টাকা। তার মেয়াদ দেড়-দু’বছরের বেশি নয়। তার পরেই ফেলে দিতে হয়। কিন্তু দু’-তিন হাজার টাকা খরচ করে ব্যাট সারাই করে নিলে আরও এক বছর চালানো যায়। লোকে সেটাই পছন্দ করছেন।” কেকেআরের ক্রিকেটার লাভনিত সিসোদিয়ার ব্যাট। নীচ থেকে আড়াআড়ি ভাবে ফেটে গিয়েছে। ব্যাটের বিভিন্ন জায়গাও ভেঙে গিয়েছে। সারাই করার পর সেই ব্যাট একেবারে নতুনের মতো।




