রাঁচীতে এক দিনের সিরিজ়ের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৭ রানে হারিয়ে দিল ভারত। দর্শকেরা যা দেখতে মাঠে এসেছিলেন, সেটাই পেয়ে গেলেন। বিরাট কোহলির শতরান, রোহিত শর্মার অর্ধশতরান! সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতের সাম্প্রতিক নজির খারাপ নয়। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে এক দিনের সিরিজ় হারলেও টি-টোয়েন্টি সিরিজ় জিতেছে ভারত। তার আগে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি, এশিয়া কাপ জিতেছে। লাল বলের জুজু কাটিয়ে সাদা বলে ফিরতেই আবার স্বমহিমায় দেখা গেল গোটা দলকে। হাসি ফিরল গুরু গৌতম গম্ভীরের মুখেও। প্রথমে ব্যাট করে ৩৪৯/৮ তুলেছিল ভারত। দক্ষিণ আফ্রিকা আটকে গেল৩৩২ রানে। আগ্রাসী অর্ধশতরান দেখা গেল রোহিতের ব্যাটে। এক রানের মাথায় ক্যাচ পড়েছে। তবু আগ্রাসনের রাস্তা থেকে সরেননি রোহিত। করবিন বশকে টানা দু’টি চার মেরেছেন। প্রেনেলান সুব্রায়েনকে পর পর দু’টি ছয় মেরেছেন। সবচেয়ে ভাল লেগেছে বিরাট কোহলির সঙ্গে তাঁর জুটি। দু’জনের বোঝাপড়া কতটা ভাল তা এই ম্যাচেও বোঝা গিয়েছে। সিডনির পর রাঁচীতেও দু’জনের জুটি ভারতকে শক্তিশালী করেছে। ২০তম ওভারে মার্কো জানসেনকে ছয় মেরে শাহিদ আফ্রিদির নজির ভেঙে দিয়েছেন। কোহলি প্রথম বলেই নান্দ্রে বার্গারের বল বাউন্ডারিতে পাঠালেন। তৃতীয় বলে এলবিডব্লিউয়ের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া সত্ত্বেও বেঁচে গেলেন। পরের কয়েক বলে খুচরো রান। তার পর বেরিয়ে এল তাঁর আগ্রাসী রূপ। রাঁচীতে এমনিতেই কোহলির নজির বেশ ভাল। অতীতে দু’টি শতরান ছিল। এ দিন তিন নম্বরটা যোগ হল। এত আগ্রাসী কোহলিকে শেষ কবে খেলতে দেখা গিয়েছে তা অনেকেই মনে করতে পারছেন না। শুধু আগ্রাসন নয়, কোহলির খেলায় ছিল নিয়ন্ত্রণ। আউট হওয়ার একটি সুযোগও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাকে দেননি। ১৩৫ রানের ইনিংসে আগাগোড়া নিখুঁত ক্রিকেট খেলেছেন। অর্ধশতরান এবং শতরান দু’টিই এসেছে বাউন্ডারি থেকে। ২৩-এর যশস্বী জয়সওয়ালের ১৮ বা ২৮-এর রুতুরাজের ৮ রান পাতে দেওয়ার মতো নয়।
রাঁচীর পিচে পাঁচটা থেকে শিশির পড়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে ৩৫০ রান তাড়া করা খুব একটা কঠিন ছিল না। তবে শুরুতেই দু’টি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় তারা। সেই চাপ এনে দেন হর্ষিত রানা। হর্ষিত যে দু’টি বলে রায়ান রিকেলটন (০) এবং কুইন্টন ডি কককে (০) আউট করলেন তার প্রশংসা করতেই হবে। বাঁ হাতি রিকেলটনের বিরুদ্ধে ‘ওভার দ্য উইকেট’ বল করতে এসেছিলেন হর্ষিত। প্রথম বলই ঢুকে আসে ভেতরে। সামনের পা এগিয়ে রিকেলটন রক্ষণ করতে চাইলেও লাভ হয়নি। ব্যাট-প্যাডের মাঝখান দিয়ে বল স্টাম্প ভেঙে দেয়। দু’বল পরেই আউট হন ডি কক। এ বার হর্ষিতের আউটসুইংয়ে পরাস্ত হন তিনি। কভারের দিকে মারতে চেয়েছিলেন। বল ব্যাট ছুঁয়ে রাহুলের গ্লাভসে জমা হয়। তবে হর্ষিতের সেরা উইকেট নিঃসন্দেহে ডেওয়াল্ড ব্রেভিসকে ফেরানো। বলের গতি কমিয়ে, বৈচিত্র এনে তাঁকে তুলে নেন হর্ষিত। আঙুল দেখিয়ে সাজঘরে ফেরার ইঙ্গিত করেন। মার্কো জানসেন ক্রিজে তাণ্ডব শুরু করে ক্রিকেটীয় শটে একের পর এক বল মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছিলেন। সাত ফুটের উপর লম্বা হওয়ায় এমনিতেই তাঁর বাড়তি সুবিধা রয়েছে। গুয়াহাটি টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৯৩ রান করে ভারতের হাত থেকে ম্যাচ কেড়ে নিয়েছিলেন জানসেন। পরে বল হাতেও নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। আচমকাই কুলদীপকে প্রথম বলেই চালিয়ে খেলতে গিয়ে আউট হলেন জানসেন (৭০)। দু’বল পরেই ফিরে যান ম্যাথু ব্রিৎজকে (৭২)। ওখানেই দক্ষিণ আফ্রিকার সব আশা শেষ হয়ে যায়।
দীর্ঘ দিন পর দেশের মাটিতে এক দিনের ম্যাচ। সেই পরীক্ষায় লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করলেন বিরাট কোহলি। ১২০ বলে ১৩৫ রান করলেন ১১টি চার এবং ৭টি ছয়ের সাহায্যে একটু কম নম্বর পেলেও সসম্মানে উত্তীর্ণ রোহিত শর্মা। তিনি ৫১ বলে ৫৭ রান করলেন। মারলেন ৫টি চার এবং ৩টি ছয়। ধোনির ঘরের মাঠে এল ৮৩ নম্বর সেঞ্চুরি, ফের বিরাট হয়ে উঠলেন কোহলি। ক্রিকেট রোম্যান্সের নতুন এক অধ্যায় তিনি। ক্রিকেট যদি ধর্ম হয়, তিনি তাহলে তার সাক্ষাৎ সাধক। তিনি বিরাট কোহলি। ঘাম-রক্তের জাতীয় দলের ‘হেডস্যর’ গৌতম গম্ভীরই চান না বিরাট কোহলি খেলুন। কিন্তু সেই বিরাট কোহলিই ভুল প্রমাণ করেন তাঁর নিন্দুকদের। গৌতম গম্ভীরকে বাধ্য করলেন ভাবতে। কোহলি এখনও বিরাট ছায়া বিস্তার করতে পারেন দেশের ক্রিকেটে। মহেন্দ্র সিং ধোনির ঘরের মাঠে কোহলি খেললেন আরও একটা বিরাট ইনিংস। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরির পরে ফের শতরান হাঁকালেন। প্রোটিয়া ব্রিগেডের বিরুদ্ধে বাউন্ডারি মেরে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছন। ওয়ানডে ফরম্যাটে ৫২ নম্বর শতরান হয়ে গেল কোহলির। একটি ফরম্যাটে সর্বাধিক। শতরানের পরে বিরাট লাফে ফুটে বেরোচ্ছিল আগের ঔদ্ধত্য।
কোহলির মতো ক্রিকেটারদের জন্যই হয়তো বলা হয়, ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।
টুথ পিকের মতো ব্যাট নড়াচড়া করছিলেন। দেহের ভারসাম্য দুর্দান্ত। ছক্কা মেরে হাফ সেঞ্চুরি করলেন। যশস্বী জয়সওয়াল শুরুতেই ফিরে যাওয়ার পরে রোহিত শর্মাকে সঙ্গে নিয়ে ১৩৬ রান জুড়লেন। আপার কাটে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরিয়নের শচীন তেণ্ডুলকরকে ফেরালেন। রোহিত শর্মার সঙ্গে সেই পুরো জুটি দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংকে অত্যন্ত সাধারণ পর্যায়ে নামিয়ে আনলেন। কেরিয়ারের এই পড়ন্ত বেলাতেও তিনি দেশের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড। দক্ষিণ আফ্রিকার এই বোলারদের সামলাতেই ইডেন-গুয়াহাটিতে ভারতীয় ব্যাটারদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলার জোগাড়। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই ‘বুড়ো ঘোড়া’ দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিলেন প্রোটিয়া ব্রিগেডের কাছে। রোহিত শর্মা ৫৭ রান করে থেমে গেলেন। বিরাট কোহলি সেঞ্চুরি করলেন। ৮৩ নম্বর সেঞ্চুরি। ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য কোহলির নাম থাকছে? ২৮০ দিন পর কোহলির শতরান। রোহিতই বা কম যান কিসে! শেষ বার সিডনিতে ম্যাচ জেতানো শতরান করেছিলেন। এ বার দেশের মাটিতে ওপেন করতে নেমে সেখান থেকেই শুরু করলেন। আগ্রাসী ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে শুরু থেকেই চাপে ফেলে দিলেন। যশস্বী জয়সওয়াল ফিরে যাওয়ার পর যোগ দিলেন কোহলি। দু’জনের জুটি ফিরিয়ে দিল সেই পুরনো দিন, যখন রোহিত এবং কোহলি মাঠে নামলেই একটা আলোড়ন তৈরি হত। এখন তাঁদের দেখার জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হয়। তাই কেরিয়ারের শেষ বেলায় দুই ক্রিকেটারের ইনিংস হয়তো এটাও বোঝাল, ভাল জিনিস কমই ভাল। প্রশ্নটা এখন রোহিত, কোহলির ফর্ম নিয়ে নয়। গুরু গৌতম গম্ভীর এবং নির্বাচক অজিত আগরকরকে নিয়ে। প্রথম ম্যাচের আগেই শোনা যাচ্ছিল, সিরিজ় শেষে দু’জনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ‘বৈঠক’ করা হবে। রবিবারের ইনিংস প্রমাণ করে দিল, এই বৈঠক না হলেও চলে। গোটা সিরিজ়ে আর কিছু না করলেও দুই ক্রিকেটারের বিশ্বকাপে খেলা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কথা নয়। অভিজ্ঞতার একটা দাম তো রয়েছে। গম্ভীর, আগরকরেরা যদি সেটাও পাত্তা না দিতে চান, তা হলে আদৌ ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির কথা তাঁরা ভাবছেন কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।




