সুইৎজ়ারল্যান্ড ০ (৪) কলম্বিয়া ০ (৩)
RK NEWZ কোয়ার্টার ফাইনালে লিয়োনেল মেসিদের প্রতিপক্ষ কারা হবে, তা জানতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা করতে হল ফুটবলপ্রেমীদের। কলম্বিয়া-সুইৎজ়ারল্যান্ডের রাউন্ড অফ ১৬-র ম্যাচের নিষ্পত্তি হল টাইব্রেকারে। ৪-৩ ব্যবধানে জিতল সুইৎজ়ারল্যান্ড। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গোল করতে পারেনি কোনও দলই। সুইৎজারল্যান্ড এবং কলম্বিয়া দু’দলই রক্ষণ আগলে আক্রমণে ওঠার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। আক্রমণ-প্রতি আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দু’দলই বেশ কিছু গোলের সুযোগ নষ্ট করেছে। স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতাই ম্যাচ টেনে নিয়ে গিয়েছে টাইব্রেকার পর্যন্ত। প্রায় সমানে সমানে লড়াই হলেও কলম্বিয়ার দাপট তুলনায় বেশি ছিল। প্রথম থেকেই আগ্রাসী মেজাজে ছিল লাতিন আমেরিকার দেশটি। ২০ মিনিটে গোলের ভাল সুযোগ পায় কলম্বিয়া। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি। সুইৎজ়ারল্যান্ডের রক্ষণকে সারাক্ষণ চাপে রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন কলম্বিয়ার ফুটবলারেরা। কিন্তু সেই অর্থে ভাঙতে পারেননি। ৪৩ মিনিটে সুইস বক্সে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে কলম্বিয়া। গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল পরিস্থিতি সামাল দেন। সুইৎজ়ারল্যান্ড কয়েক বার আক্রমণে উঠলেও গোল করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি প্রথমার্ধে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে কলম্বিয়া। দু’দলই নিজেদের মধ্যে পাস খেলে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে। সুযোগ বেশি তৈরি করেছে কলম্বিয়া। কিন্তু গোল করতে পারেনি। গোটা বিশ্বকাপেই কলম্বিয়াকে সমস্যায় ফেলেছে অ্যাটাকিং থার্ডের ব্য়র্থতা। রাউন্ড অফ ১৬-র ম্যাচেও তা ভোগাল। একাধিকবার কোবেলকে প্রায় একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হয়েছেন কলম্বিয়ার ফুটবলারেরা। ম্যাচ টাইব্রেকার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব সুইস রক্ষণের। কোবেলও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। দু’দলের স্ট্রাইকারদের ব্যর্থতা ফুটবলপ্রেমীদের বিরক্তি বাড়িয়েছে ১২০ মিনিট জুড়ে। অতিরিক্ত সময়ে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে ছিল কলম্বিয়া। সুইস রক্ষণকে ভালই কোণঠাসা করে ফেলেছিল। ৯৩ মিনিটে তাদের পেনাল্টির আবেদন খারিজ করে দেন রেফারি। ৯৯ মিনিটে লুকুমার হেড বারে লেগে ফিরে আসে। আবার ১০৪ মিনিটে দলের পতন রোখেন কলম্বিয়ার গোলরক্ষক ক্যামিলো ভার্গাস। বক্সের মধ্যে জটলা থেকে জোরাল শট নেন পরিবর্ত হিসাবে নামা আমদুনি। তৎপরতার সঙ্গে বাঁচিয়ে দেন ভার্গাস। ১১২ মিনিট গোলের আরও একটি সুযোগ নষ্ট করে কলম্বিয়া। টাইব্রেকারে কলম্বিয়া দ্বিতীয় এবং চতুর্থ শটে গোল করতে পারেনি। প্রথমে ব্যর্থ হন ডাভিনসন স্যাঞ্চেজ। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে গোল করতে পারেননি কৌচো হার্নান্দেজ়। সুইৎজ়ারল্যান্ডের পক্ষে তৃতীয় শটে গোল করতে পারেননি ম্যানুয়েল আকাঞ্জি।
লিওনেল মেসি নামক বটবৃক্ষ না থাকলে আজকের ম্যাচের সবচেয়ে বেশি প্রচারের আলো হয়তো তিনিই শুষে নিতে পারতেন। কিংবা শেষ মুহূর্তে মেসির আর্জেন্টিনা মহানাটকীয় কামব্যাকটা না করলে হয়তো দিনের শেষে ম্যাচের নায়ক হিসাবে লেখা থাকত মহম্মদ সালাহর নাম। অথবা, আর্জেন্টিনার জালে বল জড়িয়ে যাওয়ার পরও সেই গোল যদি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পরামর্শে বাতিল না হত-তাহলে…! ম্যাচটা মিশরের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকতে পারত-দিনের শেষে সেটা স্রেফ একটা আক্ষেপের ম্যাচ হয়ে রয়ে গেল। সৌজন্যে আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত কামব্যাক। এবং কোথাও গিয়ে রেফারির বদান্যতা। এদিন ম্যাচের শুরুর কয়েক মিনিট বাদ দিলে প্রথমার্ধটা একেবারে আদর্শ ফুটবল খেলেছে মিশর। আর্জেন্টিনা যে বারবার আক্রমণে যাবে সেটা জানাই ছিল। সেই আক্রমণ সামলে প্রতিআক্রমণে গোল তুলে নেওয়া, সেই ছকে প্রথমার্ধে এক্কেবারে সফল ছিলেন সালহারা। শুধু প্রথমার্ধ কেন, ম্যাচের প্রায় ৭০ মিনিট পর্যন্ত ওই ছক কাজে লেগেছে। ম্যাচের ১৫ মিনিটেই ইয়াসের ইব্রাহিমের দুর্দান্ত গোলে এগিয়ে যায় মিশর। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে অনবদ্য কাউন্টার অ্যাটাকের শুরুটা করেন হাসিম হাসান। দুই নীল-সাদা জার্সিকে ড্রিবল করে তিনি বল বাড়ান সালাহর উদ্দেশে। প্রবল গতিতে সালাহ সেই বল বক্সের ভিতরে অনবদ্য দক্ষতায় বাড়িয়ে দেন মোস্তফা জিকোর দিকে। তিনি অসহায় এমি মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন। গ্যালারিতে যে গুটিকয়েক মিশর সমর্থক ছিলেন, তাঁরা ততক্ষণে উল্লসিত। মিশর তখন জয়ের গন্ধ পেতে শুরু করেছে। কিন্তু সেই আনন্দ, সেই উচ্ছ্বাস কয়েক সেকেন্ডেই বিষাদে পর্যবসিত হল। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি দাবি করলেন, গোলের আগে আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করা হয়েছে। গোলের ঠিক আগে দেখা যায় মার্টিনেজের পায়ের ওপর পা তুলে দিয়েছেন মিশরের মারওয়ান আত্তিয়া। ভারের পরামর্শে গোল বাতিল করলেন রেফারি। মিশরের ২-০ গোলের লিড কমে দাঁড়াল ১-০ তে। যদিও ৯ মিনিট পরে ফের গোল করে মিশর ২-০ গোলে এগিয়ে যায়। কিন্তু শেষবেলায় মেসিদের আক্রমণের ঝাঁজে সেই লিড টেকেনি। হয়তো ৫৮ মিনিটের ওই গোল বাতিল না হলে অন্যরকম ফলাফল হতে পারত। মিশরের ফুটবল ইতিহাসে ওই গোল বাতিলের মুহূর্তটি কলঙ্কের মুহূর্ত বলেই পরিগণিত হবে। ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও শেষ কয়েক মিনিটের বাজে রক্ষণের জন্য অবিশ্বাস্য হার। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় মিশরের। সেই সঙ্গে সম্ভবত বিদায় নিলেন মহম্মদ সালাহ। একরাশ হতাশা আর চোখের জল নিয়ে মাঠ ছাড়লেন তিনি। অথচ আজ তাঁর নায়ক হওয়ার দিন ছিল। সব শিরোনামের আলো শুষে নেওয়ার দিন ছিল। যার পায়ের জাদুতে বিশ্বকাপে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখে ফ্যারাওয়ের দেশ সেই ৩৪ বছরের সুপারস্টারকে কি আর বিশ্বকাপে দেখা যাবে? সেটাই এখন সমগ্র মিশরীয় ফুটবলপ্রেমীদের প্রশ্ন।




