অবশেষে বন্দিত্ব ঘুচছে পার্থের! নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় জামিন ৩ বছর ৩ মাস ১৮ দিন পরে, বাড়ির পথে মঙ্গলেই। অবশেষে মুক্তি। নিয়োগ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জেলবন্দি। জেনেই গিয়েছেন বেহালা পশ্চিম বিধানসভায় তাঁর অনুগামীরা। পার্থ মুক্তি পাবেন জেনেও কিন্তু অদ্ভুত ভাবে ‘ঘুমিয়ে আছে’ তাঁর পাড়া। নাকতলার খানপুর রোডে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কোনও আগ্রহ নেই। পাড়ার যুবক-যুবতীরা তো বটেই, মধ্যবয়স্করাও কিছুতেই কথা বলতে চাইছেন না পার্থ-প্রসঙ্গে। নিয়োগ মামলায় ২০২২ সালের ২৩ জুলাই কলকাতার নাকতলার এই বাড়ি বিজয়কেতন থেকেই পার্থকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পার্থর পিতা বিজয় চট্টোপাধ্যায়ের নামানুসারে রাখা হয়েছে নাকতলার বাসভবন বিজয়কেতনের নাম। গত কয়েক বছরে পার্থের বাড়ি ‘বিজয়কেতন’কে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করে রেখেছে যেন। বাড়ির উল্টো দিকে এখনও জ্বলজ্বল করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পার্থের ছবি সম্বলিত স্থায়ী শেড। অনেকের বসার জায়গা থাকলেও ফাঁকা। পার্থ মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই চরম ব্যস্ত পার্থের জন্য অপেক্ষারত মানুষের লম্বা লাইন ছিল। গত তিন বছরে সেই ভিড় যেন উবে গিয়েছে কপূর্রের মতো। ইএম বাইপাসের হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পার্থ। পার্থের বাড়ির নিস্তব্ধতা! পার্থের এই বাড়ির একাকিত্ব প্রগাঢ়। গত তিন বছরের বেশি সময় এই বাড়ির ধারে কাছে আসেননি শাসকদলের কোনও নেতা। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে দল ছয় বছরের জন্য নিলম্বিত করায় এখন পার্থ দলের কাছে ‘অচ্ছুৎ’। কিন্তু তা সত্ত্বেও, নাকতলা তৃণমূলের বেহালা পশ্চিমের এক তৃণমূল কাউন্সিলর পার্থকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘মহা আয়োজন’ করেছেন। পার্থের হাত ধরেই কলকাতার দুর্গাপুজোয় নাম করেছিল নাকতলা উদয়ন সঙ্ঘ। এক সময় পার্থ কারও সঙ্গে দেখা করার সময় পেত না। আজ অনেকেরই পার্থের সঙ্গে দেখা করার সময় নেই। কিন্তু পার্থের যা গিয়েছে, তা আর ফিরে আসার নয়।
শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারী। সিবিআইয়ের সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ। তাই সুপ্রিম কোর্টের আদেশানুসারে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির জামিনে আরও কোনও বাধা রইল না। অবশেষে জেল থেকে মুক্তি পাবেন পার্থ। তাঁর সঙ্গেই মুক্তি পেতে চলেছেন এসএসসির প্রাক্তন চেয়ারম্যান সুবীরেশ ভট্টাচার্য। শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারী সংক্রান্ত ইডির মামলায় গত জানুয়ারি মাসেই জামিন পেয়েছিলেন পার্থ। এ বার সিবিআইয়ের মামলায় জামিন পেলেন। সুপ্রিম কোর্টের কয়েক মাস আগেই বলে দিয়েছিল, সিবিআইয়ের মামলায় বিচারপর্ব শুরু হলেই পার্থ, সুবীরেশ এবং এসএসসি-র উপদেষ্টা শান্তিপ্রসাদ সিংহের শর্তাধীন জামিন মঞ্জুর করা যাবে। ১৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে চূড়ান্ত জামিন মঞ্জুর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরেই মামলার চার্জ গঠন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেন আলিপুর সিবিআই বিশেষ আদালত। আট জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে সিদ্ধান্ত হয়। সিবিআই সাক্ষীদের নাম প্রস্তাব করে। সেই অনুয়ায়ী, সোমবার অষ্টম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। গত দু’মাস ধরে এই সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব চলছিল। সাক্ষী ছিলেন এসএসসির প্রোগ্রাম অফিসার তপোজ্যোতি বসু। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী বর্তমানে ইএম বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সূত্রের খবর, ভার্চুয়াল মাধ্যমে তিনি শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন। জামিনের শর্ত হিসেবে, পার্থকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে, পাসপোর্ট জমা রাখতে হবে, কোনওভাবেই এলাকা ছাড়তে পারবেন না। এছাড়াও ৯০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। ইডি মামলায় পার্থের জামিন মঞ্জুর করে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় যে সমস্ত নীচুতলার কর্মী, আধিকারিকরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ, তাঁরা বেশিরভাগই জামিন পেয়েছেন। এক ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন এ ভাবে জেলে রাখা সম্ভব নয়। একই কারণে ইডির মামলায় জামিন পেয়েছিলেন পার্থ চ্যাটার্জি। ফলে সিবিআই মামলায় পার্থও জামিন পেতে পারেন। শর্ত সাপেক্ষে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এমএম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি এনকে সিংয়ের বেঞ্চ তাঁর জামিন মঞ্জুর করেন। ২০২২ সালের ২২ জুলাই দক্ষিণ কলকাতার নাকতলায় পার্থ চ্যাটার্জির বাড়িতে রাতভর তল্লাশি চালায় ইডি আধিকারিকরা। এরপর ২৩ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর সিবিআই পার্থকে শ্যোন অ্যারেস্ট করে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে জেলবন্দি রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী। এর আগে একাধিকবার জামিনের আবেদন জানিয়েছিলেন। পরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় যে, শর্তসাপেক্ষে জামিন পেতে পারেন পার্থ। অবশেষে জামিন পেলেন তিনি। বাড়ি ফিরবেন পার্থ।
জেলমুক্তি হতে চলেছে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের। সোমবার বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারক পার্থকে জেলমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পর আদালতের নথি মুখ্য বিচারবিভাগীয় আধিকারিকের কাছে পৌঁছোবে। নথি পৌঁছোবে প্রেসিডেন্সি জেল কর্তৃপক্ষের কাছেও। তার পর জেলমুক্ত হতে আর কোনও বাধা থাকার কথা নয় রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর। শারীরিক নানা সমস্যায় কাবু পার্থ বেশ কয়েক মাস ধরেই বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাই জেলমুক্তির বিষয়টি জানানো হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেও। সোমবার হাসপাতাল থেকেই ভার্চুয়াল মাধ্যমে আদালতের শুনানিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। জেলমুক্তির নির্দেশ শুনে হাসতেও দেখা যায় তাঁকে। তবে জেলমুক্তির প্রক্রিয়া মিটতে মিটতে মঙ্গলবার হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৩ বছর ৩ মাস ১৮ দিন পর মঙ্গলবারই নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেন পার্থ। পায়ের সমস্যায় ভুগছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী। জেলমুক্ত হওয়ার পর বাড়িতে কী ভাবে তাঁর চিকিৎসা চলবে, তা নিয়েও ভাবনাচিন্তা চলছে। নিয়োগ মামলায় ২০২২ সালের ২৩ জুলাই কলকাতার নাকতলার বাড়ি থেকে পার্থকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট কয়েক মাস আগেই বলে দিয়েছিল যে, সিবিআইয়ের মামলায় বিচারপর্ব শুরু হলেই পার্থ, এসএসসির তৎকালীন চেয়ারম্যান সুবীরেশ ভট্টাচার্য ও উপদেষ্টা শান্তিপ্রসাদ সিংহের শর্তাধীন জামিন মঞ্জুর করা যাবে। ১৪ নভেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করে চূড়ান্ত জামিন মঞ্জুর করার নির্দেশও দেয় শীর্ষ আদালত। মামলার চার্জ গঠন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু করেন আলিপুর সিবিআই বিশেষ আদালতের বিচারক। প্রথম দফায় আট জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে বলে নিম্ন আদালতে সিদ্ধান্ত হয়। সিবিআইয়ের তরফে আট জন সাক্ষীর নাম প্রস্তাব করা হয়। সোমবার অষ্টম সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। ২০২২ সালের জুলাই মাসে স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতির মামলায় পার্থকে প্রথম গ্রেফতার করেছিল ইডি। সেই থেকে তিনি জেলে। কখনও কখনও চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে। এর আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইডির মামলায় তাঁকে জামিন দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত সিবিআইয়ের মামলা থেকেও তিনি জামিন পেয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশে শিক্ষক নিয়োগের মামলায় আলিপুরের বিশেষ সিবিআই আদালত সাত হাজার টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে পার্থের জামিন মঞ্জুর করে। শুধুমাত্র এসএসসির গ্রুপ সির মামলায় পার্থের চূড়ান্ত জামিন মঞ্জুর হয়নি এত দিন। মামলাতেও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়ায় জেলমুক্তির ক্ষেত্রে আর বাধা রইল না পার্থের। পার্থ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ অর্পিতা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দু’টি ফ্ল্যাট থেকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা নগদ উদ্ধার করেছিল ইডি। সোনাদানা, বাড়ি মিলিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। এর পর গ্রুপ সি, গ্রুপ ডি-সহ একাধিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নাম জড়ায় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর। ইডির পর তাঁকে সিবিআই-ও গ্রেফতার করে। গঠন করা হয় চার্জশিট। পার্থ-ঘনিষ্ঠ অর্পিতা ইতিমধ্যে জামিন পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু পার্থ জেলবন্দিই ছিলেন। বার বার জামিন চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। দেখিয়েছেন শারীরিক অসুস্থতার কারণও। প্রাথমিকে নিয়োগ মামলায় পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গত ২৭ ডিসেম্বর চার্জশিট জমা দিয়েছিল সিবিআই। তাতে পার্থ ছাড়াও অয়ন শীল, সন্তু গঙ্গোপাধ্যায়দের নাম রয়েছে। এই মামলায় রাজসাক্ষী হয়েছিলেন পার্থের জামাই কল্যাণময় ভট্টাচার্য। রাজসাক্ষী হওয়ার পর অভিযুক্তদের তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগ মামলায় অনেকেই জামিন পেয়ে গিয়েছেন। কেন পার্থকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না, আদালতে বার বার সে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর আইনজীবীরা। এই সংক্রান্ত আবেদনের বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের যুক্তি ছিল, পার্থ নিয়োগ দুর্নীতির ‘মূল মাথা’। মন্ত্রিত্ব হারালেও তিনি প্রভাবশালী। জেল থেকে বেরোলে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।




