ওল্ড ট্রাফোর্ডের ড্রেসিং রুমের সিঁড়ি বেয়ে ধীর পায়ে নামা। এক-পা এক-পা করে। প্রথমে বাঁ পা সিঁড়ির ধাপে। ব্যাটটা বাঁ হাতে আলগোছে ধরা। ডান হাতে আঁকড়ে ধরে সিঁড়ির রেলিং। প্রতি পদক্ষেপে যন্ত্রণায় মুখের পেশি সংকোচন। সিঁড়ির শেষ ধাপ। ডান হাতের সহায়ক রেলিংটাও নেই। গুটি গুটি পায়ে বাউন্ডারির দড়ির দিকে। ততক্ষণে আউট হয়েও প্রায় এক মিনিট মাঠের মধ্যে অপেক্ষায় শার্দূল ঠাকুর। পরের যোদ্ধা মাঠে ঢোকার আগে শার্দূল ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন, আসল ‘শার্দূল’ ওই নেমে আসছে ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি বেয়ে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাউন্ডারির দড়ি টপকাতেই প্রস্থানোদ্যত শার্দূল ডান হাতের গ্লাভসটা খুলে তাঁর শিরস্ত্রাণ পরিহিত মাথায় হাত। যেন সারা ভারতবর্ষই মাথায় হাত রাখল আহত যোদ্ধার। অকালবৃষ্টির মতো ঝরে পড়ল শুভেচ্ছাবারি। নিচু হয়ে মাঠের মাটিকে প্রণাম করে গণ্ডি অতিক্রম করে এগোলেন। গ্যালারি এবং ক্রিকেটবিশ্ব বিস্ফারিত, বিমোহিত, বিমুগ্ধ। গোটা মাঠ দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। শব্দব্রহ্ম হেডফোনের ‘নয়েজ ক্যানসেলেশন’-এর লক্ষ্মণরেখা ভেদ করে পৌঁছে যাচ্ছে শব্দনিরোধক কাচঘেরা কমেন্ট্রি বক্সে বসে থাকা ধারাভাষ্যকারদের কানে। তাঁদের কণ্ঠে আকণ্ঠ বিস্ময়। ওল্ড ট্রাফোর্ডের গ্যালারি ওই সাতাশের যুবকের একাগ্র সমর্থক। সমর্থন দেশ, জাতি বা গোষ্ঠী কাঁটাতারে আবদ্ধ না। বীরত্ব কখনও ভূগোলের দাসত্ব করে না। দেশকাল নির্বিশেষে বীরের সামনে সকলে নতজানু, নতশির। অ্যাম্ফিথিয়েটারের ঠিক মাঝখানে অস্ত্র-হাতে দাঁড়ানো এক গ্ল্যাডিয়েটরের মতো লাগছিল ঋষভ পন্থকে। মুখে কষ্টের ছাপ। সিঁড়ি ভেঙে নামতে কষ্ট হচ্ছিল। রেলিং ধরে সাবধানে নামলেন সময় নিয়ে। অপেক্ষা করলেন শার্দূল ঠাকুর। ক্রিজে থেকে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একের পর এক সিঙ্গলস। মৃত্যুকে জয় করে স্বমহিমায় ফিরেছেন ক্রিকেট মাঠে। অসমসাহসী ঋষভ পন্থ আর চোট আঘাতে ভয় পান না? ক্রিজ কামড়ে পড়ে থাকে বিপক্ষের আগ্রাসী বোলিংয়ের পালটা চোখে চোখ রেখে জবাব ভারতীয় সহ অধিনায়কের। ভাঙা পায়ে ৫৫ মিনিট! ২৭ বলে ১৭ রান। গড়লেন নজিরও। হার না মানা লড়াইয়ে ছড়ালেন মুগ্ধতা। অনিল কুম্বলে ভাঙা চোয়াল নিয়ে খেলেছিলেন। ঋষভ পন্থ খেললেন ভাঙা পা নিয়ে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠে নামলেন পন্থ। ভাঙা পা নিয়েই নেমে পড়লেন ব্যাট করতে! বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল ক্রিকেট বিশ্ব। পন্থের সাহসি ইনিংসের কুর্ণিশ ক্রিকেট বিশ্বের। জল্পনা, আশঙ্কায় সাময়িক জল ঢেলে দিলেন ভারতীয় দলের সহ-অধিনায়ক। ডান পায়ের পাতায় আঘাত পেয়ে মাঠকর্মীদের গাড়িতে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল বুধবার। ১৯ ঘণ্টার ব্যবধানে সেই পায়েই হেঁটে মাঠে নামলেন পন্থ! মাঠে নামলেন গোটা স্টেডিয়ামকে দাঁড় করিয়ে। তাঁর জন্য দাঁড়িয়েছিলেন সদ্য আউট হওয়া শার্দূল ঠাকুরও।
অকুতোভয় পন্থ। ম্যাঞ্চেস্টারে পন্থ আবার ব্যাট করতে পারবেন, এতটা ভাবা যায়নি। যিনি দাঁড়াতেই পারছেন না, তিনি খেলবেন কী করে! ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও জানিয়ে দিয়েছিল, পন্থের পক্ষে ম্যাঞ্চেস্টারে উইকেট রক্ষা করা সম্ভব নয়। শুভমন গিলদের কি তবে ১০ জনে খেলতে হবে? সিরিজে পিছিয়ে থাকা দল অসম লড়াইয়ের মুখে? দলের জন্য। দেশের জন্য। প্রায় অসম হয়ে যাওয়া লড়াইয়ে জান ফেরালেন। চোট পাওয়ার আগে পর্যন্ত ৪৮ বল খেলে ৩৭ রান করেছিলেন পন্থ। এ দিন মধ্যাহ্নভোজের আগে ১৫ মিনিটে খেলেন ৭ বল। করেন ২ রান। বিরতির পর আরও ৪০ মিনিটে ২০ বল খেলে ১৫ রান করলেন। ভাঙা পা নিয়ে সব মিলিয়ে ৫৫ মিনিট ব্যাট করলেন। ২৭ বলে ১৭ রান করলেন। চার মারলেন। ছয়ও মারলেন। ভারতীয়দের মধ্যে টেস্টে সবচেয়ে বেশি ছয় মারার রেকর্ড গড়লেন। অর্ধশতরান করলেন! আর্চারের বলে বোল্ড হলেন বলের লাইন ‘মিস’ করে। ঠিক যে ভাবে আউট হয়েছিলেন লর্ডসে। সাজঘরে ফেরার সময় কোচ-সতীর্থেরা তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন উঠে দাঁড়িয়ে। কেনই বা জানাবেন না? প্রায় এক ঘণ্টা ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে অবিশ্বাস্য মুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছিলেন যে। ঠিক আগের দিন এই সময় নাগাদ তিনি মেডিক্যাল কার্টে, চোট এতটাই গুরুতর। সাপোর্ট স্টাফদের কাঁধে ভর দিয়েও ডান পা ফেলতে পারছিলেন না। মোজা খোলার পরে টিভি ক্যামেরায় যা ধরা পড়ল, ডান পায়ের পাতার বাইরের দিকে ফোলা। ছিটে ছিটে রক্তও। জুতো গলাতে গেলেও প্রাণান্তকর যন্ত্রণা। মেডিক্যাল কার্টে বসে থাকা মুখে যন্ত্রণা আর হতাশা মিলেমিশে একাকার। দ্রুত ক্রিকেটবিশ্বে খবর, ‘ঋষভ পন্থ রিটায়ার্ড হার্ট। ঋষভ পন্থ আহত অবসৃত’। চোটের জায়গায় স্ক্যান করানোর জন্য তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওল্ড ট্রাফোর্ডের মাঠে ঋষভ পন্থের ফিরে আসার অনিশ্চয়তা। ছ’সপ্তাহের মতো মাঠের বাইরে ঋষভ। ডান পায়ের পাতার হাড় ভেঙেছে। রিভার্স সুইপ মারতে গিয়েছিলেন। ডেলিভারিটা সামনে ভাঁজ-করা ডান পায়ের পাতার বাইরের দিকে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল। বুটের এমন একটা জায়গায়, যেখানে কোনও আলাদা বা অতিরিক্ত সুরক্ষা থাকে না। বিভ্রান্তি! সংশয়! ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই ছিটকে গেলেন বোধহয়! আহত ঋষভ পন্থের পরিবর্তে ধ্রুব জুরেল কিপিং করবেন। ঋষভ পন্থ হলেন আধুনিক ক্রিকেট মহাকাব্যের নায়ক। লেখকও। নিজের মহাকাব্য নিজেই রচনা করেন তিনি। ৩৭ রানে আহত হয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন। সেই অবস্থাতেই পরদিন আবার অস্ত্র-হাতে ময়দানে নেমে পড়তে হল। দলের প্রয়োজন। দেশের প্রয়োজন। যন্ত্রণা সহ্য করেও সটান দাঁড়িয়ে। উন্নতশির।
‘স্টুপিড-স্টুপিড-স্টুপিড’ এবং ‘সুপার্ব-সুপার্ব-সুপার্ব’ খ্যাত সুনীল গাভাসকার বলছেন নরি কন্ট্রাক্টর, বিজয় মার্চেন্ট, কপিল দেবের কথা। অভিভূত দীনেশ কার্তিক বলছিলেন, ‘‘আই অ্যাম অ্যাস্টাউন্ডেড দ্যাট হি ইজ আউট দেয়ার!’’ ক্রিস ব্রড বলছিলেন, ‘‘উই জাস্ট ডোন্ট নো হোয়াট্স কামিং!’’ মেল জোন্স বলছিলেন, ‘‘ব্যাটার্ড, ব্রুইসড। বাট স্টিল স্ট্যান্ডিং!’’ অতীতের ভারতীয় ক্রিকেটারদের নজির তুলে এনে তুলনামূলক বীরত্বের আলোচনা। পায়ের ছিঁড়ে-যাওয়া পেশি নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কপিলের পাঁচ উইকেট নেওয়ার কাহিনি। ২০০২ সালে অ্যান্টিগায় ভাঙা চোয়াল তার দিয়ে জুড়ে তার উপর ব্যান্ডেজ জড়িয়ে অনিল কুম্বলের বীরত্বের কথা। গ্রেম স্মিথ থেকে নাথান লায়নের চোট নিয়েও ক্রিকেটমাঠে লড়াইয়ের লোকগাথা। এ কী বীরত্ব! গাড়ি দুর্ঘটনার পরে বেঁচে উঠে শরীরের দুশোর বেশি সেলাই নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে আসা। মৃত্যুর চৌকাঠে পৌঁছে যাওয়া মানুষকে নিয়ে চার জন মিলে তুলে ধরে দাঁড় করাতে হত। একটা টুথব্রাশ হাতে তোলারও ক্ষমতা ছিল না। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা তো দূর অস্ত, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছেন। আইপিএলের ধকল। দেশের সহ-অধিনায়ক। ইংল্যান্ডের মাঠে সেঞ্চুরি করে শূন্যে সামারসল্ট! গ্ল্যাডিয়েটর?
খোঁড়াতে খোঁড়াতে সিঙ্গল্স। যন্ত্রনায় কাতর ঋষভ। তবুও কাতর নন। ক্রিকেট-ধুরন্ধর বেন স্টোক্স চোট-জর্জরিত ডান পা লক্ষ্য করে পর পর বল করছেন। নিঁখুত নিশানায় প্যাডে আছড়ে পড়ছে একের পর এক এক্সপ্রেস ডেলিভারি। ডান পা আড়াল করে করে খেলছেন ঋষভ। যিনি নিজের মহাকাব্য যিনি নিজেই লেখেন, তাঁকে থামানো যাবে কী করে? তাঁর কলম তো তাঁরই হাতে। ভাঙা পায়ে ওজন ট্রান্সফার না করে কার্যত বাঁ পায়ে ভর করে স্ট্রোক নিতে শুরু করলেন ঋষভ। জফ্রা আর্চারের স্লোয়ার শর্ট পিচ্ড ডেলিভারি উড়িয়ে দিলেন মিড উইকেটে, ডান পা-কে বাঁ পায়ের আড়ালে রেখে প্যাডের গোড়া থেকে ফ্লিক। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ। কষ্ট করে ড্রেসিংরুমের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় তাঁকে আগলে আকাশ দীপ। পিছনে আরও দু’-তিন জন সতীর্থ। যদি টাল সামলাতে না পারেন? যদি সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে পা ফস্কে যায়? যন্ত্রণা সহ্য করার সীমারেখা নেই ওঁর। স্টোক্সকেই কভার-মিড উইকেট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে ৫০ পেরোলেন ঋষভ। ব্যাট তোলার সময যন্ত্রণার অভিঘাতে মুখ বিকৃতি স্পষ্ট। মাইকেল আর্থারটন বলছেন, ‘‘দ্য মোস্ট রিমার্কেব্ল ফিফটি, ইন দ্য সারকামস্টেন্সেস।’’ তখন ব্যক্তিগত ৫৪ রান। জোফ্রা আর্চারের ডেলিভারিটা আহত ঋষভের স্টাম্প ছিটকে দিল। তারপরও ১৭ রান। রানের নিরিখে মূল্য কম। জীবনের নিরিখে অমূল্য! আবারও হয়তো দরকার হলে নির্ঘাত আবার ব্যাট হাতে নেমে পড়বেন ঋষভ পন্থ। কারণ, তিনি গ্ল্যাডিয়েটর। গ্ল্যাডিয়েটরদের পালালে চলে না। তারা যুদ্ধ করে। শত্রু নিকেশ করে। তার পরে রক্ত মুছে, ক্ষতস্থান সেলাই করে বিক্ষত দেহে বর্ম এঁটে, মাথায় শিরস্ত্রাণ চাপিয়ে আবার পরের লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়। গ্ল্যাডিয়েটর ঋষভ পন্থ, কখনও পালিয়ে যান না।
নিজের ‘জান’ একরকম কবুল করেই নামলেন পন্থ। দোতলার সাজঘর থেকে সিঁড়ি ভেঙে নামতে কষ্ট হচ্ছিল। রেলিং ধরে সাবধানে নামলেন সময় নিয়ে। অপেক্ষারত শার্দূল বাউন্ডারি লাইনে পন্থের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। সতীর্থের হাত এড়িয়ে যান পন্থ! মাঠ ছুঁয়ে প্রণাম করে বাউন্ডারি লাইনের ভিতরে পা রাখলেন। আবার সাজঘরের দিকে ঘুরে আকাশের দিকে তাকালেন। মেঘলা আকাশের মধ্যে সূর্যকে খুঁজলেন। নমস্কার সেরে এগিয়ে গেলেন পিচের দিকে। এই পুরো সময়টা উঠে দাঁড়িয়ে পন্থকে স্বাগত জানিয়েছেন দর্শকেরা। ক্রিকেটীয় ভদ্রতা দেখিয়ে অপেক্ষা করেছেন বেন স্টোকসেরাও। শার্দূল আউট হওয়ার পর থেকে পন্থের গার্ড নেওয়া পর্যন্ত ২ মিনিটের বেশি অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। চাইলে ‘টাইমড আউট’র আবেদন করতে পারতেন স্টোকস। করেননি। প্রতিপক্ষ পন্থের সাহসিকতাকে সম্মান জানিয়েছেন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটারেরা। সিঁড়ি ভাঙতে বেশ কষ্ট হচ্ছে পন্থের। ডান পায়ের উপর ভর দিতে পারছেন না। মধ্যাহ্নভোজের সময় সাজঘরে পন্থকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বেরিয়ে আসেন আকাশদীপ-সহ কয়েক জন ক্রিকেটার। এই অবস্থাতেও যে ব্যাট করা সম্ভব, তা সম্ভবত তিনিই ভেবেছিলেন। ভারতীয় দলের মেডিক্যাল স্টাফেরা তাঁকে তৈরি করে দিয়েছেন কাজ চালানোর মতো। কিছুটা কৃতিত্ব তাঁদেরও প্রাপ্য। সিঁড়ি ভাঙতে পন্থের যতটা সমস্যা হচ্ছে, সমান মাঠে হাঁটতে ততটা নয়। দৌড়োনোর মতো পরিস্থিতি নেই। ‘জগিং’ করে খুচরো রান নিয়েছেন। আলগা বলের জন্য অপেক্ষা করেছেন। ব্যাট করার সময় পায়ের নড়াচড়াতেও আড়ষ্টতা স্পষ্ট। ইংল্যান্ডকে বাড়তি সুবিধা দিলেন না পন্থ। আহত পন্থকে ২২ গজের লড়াইয়ে কোনও রকম দয়ামায়া করেননি স্টোকস। নাগাড়ে পন্থের ডান পায়ের জুতো লক্ষ্য করে ইয়র্কার দিয়েছেন। ইংল্যান্ড অধিনায়ক জানতেন, পন্থ দ্রুত পা সরাতে পারবেন না। ইংল্যান্ডের অন্য বোলারেরাও শরীর লক্ষ্য করে বল করেছেন। তবু লড়ে গিয়েছেন পন্থ। ২২ গজের এক প্রান্তে আউট হয়েছেন ওয়াশিংটন সুন্দর, অংশুল কম্বোজেরা। পন্থ অন্য প্রান্ত আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। পেশাদারিত্বের নিষ্ঠুরতাকে ঠেকিয়ে লড়াই করেছেন। পন্থের লড়াইয়ে শারীরিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকলেও আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল না। সাবলীল থাকার চেষ্টা করেছেন প্রতিটি বলে। বলের লাইনে গিয়ে খেলার চেষ্টা করেছেন। ভারতীয় সাজঘরে তাঁর এই লড়াই হয়তো অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ভারতীয় ক্রিকেটেও লোকগাথা হয়ে থাকতে পারে ভাঙা পা নিয়ে তাঁর লড়াই। এমন নজির আগে নেই, তা নয়। কুম্বলে ছাড়াও অনেকে আছেন। নরি কনট্রাক্টর ভাঙা পাঁজর নিয়ে খেলেছেন। দিলীপ দোশী পায়ের ভাঙা পাতা নিয়ে খেলেছেন। গুরুতর চোট নিয়ে খেলার নজির রয়েছে কপিল দেব, বিজয় মঞ্জরেকরেরও। প্রতিটি ঘটনা সতীর্থদের এবং পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রণিত করেছে। সেই তালিকায় উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকল পন্থেরও।
আইসিসির নিয়মের গেরো বলছে চোট পেয়ে কোনও ব্যাটার যদি ব্যাট করতে না পারেন তাহলে অন্য কাউকে পরিবর্ত ব্যাটার হিসাবে নামানো যাবে না, ব্যতিক্রম কনকাশন সাব। ম্যাঞ্চেস্টার টেস্টের প্রথম দিন রিভার সুইপ মারতে গিয়ে পায়ে চোট পেলেন ঋষভ পন্থ। দ্বিতীয় দিন শুরুর আগে জানা গেল, ইংল্যান্ড সিরিজ থেকেই ছিটকে গিয়েছেন। ছ’সপ্তাহ মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাঁকে। কিন্তু দেশের দরকারে তিনি সবটুকু উজাড় করে দিলেন। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রশ্ন, কেন এমন অমানুষিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা ক্রিকেটারকে মাঠে নামতে বাধ্য করা হবে? যদিও আইসিসি নিয়ম অনুযায়ী পন্থকে মাঠে নামার জন্য বাধ্য করা হয়নি। কিন্তু নিয়মের ফাঁড়ায় ১০ জন ব্যাটারকে নিয়ে গোটা টেস্টে খেলতে হত ভারতকে। এই ‘অসাম্য’ দূর করতেই বাধ্য হয়ে নেমেছেন পন্থ। ক্রিকেটভক্তদের একাংশের মতে, যদি উইকেটকিপার হিসাবে পরিবর্ত নামানো যায় তাহলে পরিবর্ত হিসাবে নামা উইকেটরক্ষককে ব্যাট করার অনুমতিও দেওয়া উচিত।প্রাক্তন ভারতীয় উইকেটকিপার পার্থিব প্যাটেল আবার মনে করেন, বর্তমানে যা নিয়ম রয়েছে সেটাই বজায় রাখা উচিত। তাঁর মতে, কনকাশন সাবের অপব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ ইতিমধ্যেই রয়েছে। খেলা চলাকালীন যদি কেউ চোট পায় তাহলে কিছু তো করার নেই। নিয়ম যেরকম রয়েছে সেরকমই থাকা উচিত। ২০১৭ থেকে উইকেটকিপারের পরিবর্ত নামানোর আইন এনেছে এমসিসি।
ভারতীয় টেস্ট সহ-অধিনায়ক তথা এলএসজি অধিনায়কের এমন সাহসী মনোভাবের তারিফ করেছেন গোয়েঙ্কা। আইপিএল চলাকালীন গোয়েঙ্কা এবং পন্থের ছবি এবং ভিডিও মাঝেমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। এমনকী নেটিজেনরা মালিক এবং অধিনায়কের অম্লমধুর সম্পর্কের নিয়ে মাঝেমাঝেই জল্পনা উসকে দিয়েছিলেন। অথচ দিল্লির বিরুদ্ধে একপ্রকার জেতা ম্যাচ যখন হেরে গিয়েছিল লখনউ, তখন পন্থ-সহ সকলকে ইতিবাচক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন গোয়েঙ্কা। আর এবার সাহসী পন্থকে নিয়ে গর্বিত এলএসজি মালিক। পন্থের দৃঢ়তার প্রশংসা করে এক্স হ্যান্ডেলে গোয়েঙ্কা লেখেন, ‘এটা শুধু প্রতিভা নয়। এটা চরিত্র। স্যালুট।’ আইপিএলের ‘তিক্ত অতীত’ ভুলে পন্থের লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন লখনউ সুপার জায়ান্টস মালিক সঞ্জীব গোয়েঙ্কা।
‘লগান’ সিনেমায় সাহেবদের বিরুদ্ধে পায়ের আঘাত পেয়েও ব্যাট হাতে লড়ে গিয়েছিল ‘ইসমাইল’। সেই ইংরেজদের বিরুদ্ধেই মরিয়া লড়াই করলেন আহত পন্থ। ওয়াশিংটন আউট হওয়ার পর ধরে খেলার সুযোগ ছিল না। চালিয়ে খেলে যতটা সম্ভব রান তুললেন। টেলএন্ডারদের আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। পন্থ হয়তো ব্যাট হাতে দলকে অনেকটা এগিয়ে দিতে পারলেন না। তবে শুভমনদের সাজঘর আত্মবিশ্বাসে ভরে দিলেন। সিরিজ়ে সমতা ফেরানোর জেদ বাড়িয়ে দিলেন। যে আত্মবিশ্বাস, জেদের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে দশম উইকেটে জসপ্রীত বুমরাহ-মহম্মদ সিরাজের জুটিতে। পন্থের ১৭ রান ভারতকে খুব বেশি স্বস্তি হয়তো দেবে না। তবে সাহস দেবে। পন্থ দেখিয়ে দিলেন এ ভাবেও লড়া যায়। এ ভাবেও পারা যায়। ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসা পন্থ আরও একবার প্রমাণ করলেন নিজেকে। প্রমাণ করলেন তিনি আসলে সাহসী। হার না মানা এক যোদ্ধা। চাপা লড়াইয়ের নাম পন্থ।




