RK NEWZ খোঁজ মিলল ৭৪ বছর পর। হারানো সেই বিমান। আটলান্টিকের অতলে তলিয়ে যায় আস্ত বিমান! ১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল। আমেরিকার ঘড়িতে বেলা তখন ১২টা বেজে ১১ মিনিট। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট দ্বীপ পুয়ের্তো রিকোর স্যান জুয়ান ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছিল বিমান। আমেরিকান সংস্থা প্যান আমেরিকান এয়ারওয়েজের (প্যান অ্যাম) ডগলাস ডিসি-৪ ফ্লাইট ৫২৬এ ওড়ার ন’মিনিটের মাথায় ভেঙে পড়ে। মাঝ আকাশে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আছড়ে পড়ে আটলান্টিক মহাসাগরের জলে। ৭৪ বছর পর আচমকা সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মিলল সমুদ্রের গর্ভে! কার্যত অসম্ভবকে সম্ভব করলে তুললেন ডিসকভারি চ্যানেলের ‘এক্সপেডিশন আননোন’ সিরিজের সদস্যেরা। অতলান্তিক মহাসাগরের নীচে অন্তত ২০০০ ফুট গভীরে বিমানের ধ্বংসাবশেষটি পাওয়া গিয়েছে। ১৯৫২ সালের পর থেকে একাধিক বার ওই ধ্বংসাবশেষের খোঁজে অভিযান চলেছিল। কিন্তু আগে কখনও তার অস্তিত্বের ইঙ্গিতও পাননি সমুদ্র বিশেষজ্ঞেরা। সাম্প্রতিক উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হয় উচ্চ রেজ়লিউশন সোনার প্রযুক্তি। সমুদ্রের গভীরে পাঠানো হয়েছিল স্বয়ংক্রিয় ড্রোন। তাতেই সাফল্য আসে। ‘ডিপ সি ভিশন’ সংস্থাও এই উদ্ধারকাজে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। ডিসকভারি চ্যানেলের তরফে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূল থেকে কিছুটা দূরে অতলান্তিকের সমুদ্রতলে পাওয়া গিয়েছে প্যান অ্যামের হারানো বিমানটিকে।
সমুদ্রের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় কেন ভেঙে পড়েছিল মার্কিন বিমান? অভিযোগ, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণে ত্রুটি ছিল। তাই ওড়ার কিছু ক্ষণের মধ্যেই তিন নম্বর ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। মাটি থেকে বিমানের উচ্চতা তখন ছিল ৩৫০ ফুট মাত্র। পাইলট বিমানটিকে আবার পুয়ের্তো রিকোয় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝ আকাশে অভিমুখ পরিবর্তন করে ৫৫০ ফুট পর্যন্ত উঠেছিল ওই বিমান। কিন্তু তখনই বন্ধ হয়ে যায় চার নম্বর ইঞ্জিন। এর পর আর বিমানটি ভেসে থাকতে পারেনি। দ্রুত তার উচ্চতা কমে আসে। প্যান অ্যামের বিমানটি চালাচ্ছিলেন ক্যাপ্টেন জন সি বার্ন। অভিজ্ঞ পাইলট হওয়ায় তৎক্ষণাৎ তিনি জলের উপর বিমান অবতরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। বিমানে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণাও করে দেওয়া হয়। খবর চলে যায় আমেরিকার উপকূলরক্ষী বাহিনীর কাছে। ক্যাপ্টেন জানান, ইসলা গ্রান্দে বিমানবন্দর থেকে সাত মাইল উত্তর-উত্তর পশ্চিমে সমুদ্রের উপর বিমান অবতরণ করবে। তার পর যাত্রীদের উদ্ধার করা হবে। বেলা ঠিক ১২টা ২০ মিনিটে জলের উপর নেমেছিল প্যান অ্যাম ৫২৬এ। তত ক্ষণে বিমানটি দু’টুকরো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত যাত্রীরা সকলে নিরাপদ ছিলেন। বিমানের ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে বাঁচার চেষ্টা করছিলেন তাঁরা। তবে জীবন মরণের লড়াই বেশি ক্ষণ চলেনি। উপকূলরক্ষী বাহিনী পৌঁছোলেও অনেকেই অতলান্তিকের উত্তাল ঢেউ এবং হিমশীতল জলের মাঝে লাইফবোটে ওঠার ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না। ফলে তাঁদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবের দিকে আঙুল তোলেন অনেকে। প্যান অ্যামের এই দুর্ঘটনার পর থেকেই সমুদ্রের উপর দিয়ে যাওয়া সমস্ত বিমানের যাত্রীদের নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিয়মে একাধিক সংস্কার করা হয়েছিল প্যান অ্যাম দুর্ঘটনার পর। উড়ানের আগে নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশাবলি যাত্রীদের জানানো, জরুরি পরিস্থিতিতে কী কী করণীয়, তা দেখিয়ে দেওয়ার মতো নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়। তদন্তে জানা গিয়েছিল, দীর্ঘদিন ওই বিমানের ইঞ্জিনগুলির রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। কিছু যন্ত্রাংশে ত্রুটি ছিল, উড়ানের আগে যা যাচাই করে নেওয়াও হয়নি। পাইলট অভিজ্ঞ হলেও তাঁর কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। একটি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বিমানটিকে আরও উপরে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তার ফলে অন্য ইঞ্জিনের উপর চাপ পড়ে। প্যান অ্যাম দুর্ঘটনায় বেঁচে গিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন বার্ন। নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত যান্ত্রিক গোলযোগ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকেই এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করেন তদন্তকারীরা।
তবে দুর্ঘটনার পর বিমানের ধ্বংসাবশেষটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কৌতূহলের শেষ ছিল না। নানা ভাবে তল্লাশি চালিয়েও আটলান্টিকে তার কোনও চিহ্ন এত দিন খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালে এই ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের চেষ্টা হয়েছিল শেষ বার। তবে তা ব্যর্থ হয়। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অবশেষে সেই ধ্বংসাবশেষের খোঁজ মিলেছে। সমুদ্রের নীচে উদ্ধারকারীরা ওই ধ্বংসাবশেষের অন্তত সাড়ে তিন লক্ষ ছবি তুলেছেন। তবে দুর্ঘটনায় মৃত যাত্রীদের কারও দেহাবশেষ উদ্ধারের কোনও পরিকল্পনা আপাতত নেই। প্যান অ্যামের বিমানটিতে মোট ৬৪ জন যাত্রী ছিলেন। এ ছাড়া ছিলেন পাইলট-সহ পাঁচ জন বিমানকর্মী। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, সে দিনের বিপর্যয় থেকে ১২ জন যাত্রী-সহ মোট ১৭ জনকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। বাকিদের সলিল সমাধি হয় অতলান্তিকের গর্ভেই। এত দিন পর সেই বিমানের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়ে খুশি উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা। আমেরিকার ‘এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এই উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ওই সংস্থার প্রেসিডেন্ট রাস ম্যাথিউসের কথায়, ‘‘এই আবিষ্কারে আমরা যেমন বিস্মিত, তেমনই উচ্ছ্বসিত। এত বছর আগে এই জায়গায় যা ঘটেছিল, তা বিনম্র ভাবে স্মরণ করছি।’’



