RK NEWZ ব্যা-রে-টো.... ব্যা-রে-টো...। তাঁকে নিয়ে আজও একই উচ্ছ্বাস। পুজো প্যান্ডেল হোক কিংবা ময়দান। তিনি হোসে র্যামিরেজ ব্যারেটো। নামটার উৎপত্তি ব্রাজিলে। কলকাতায় সবুজ তোতা। ব্রাজিল, ভারত এবং কলকাতা, এই তিনটি শব্দের সঙ্গেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাঁর জন্ম ব্রাজিলে, কর্ম ভারতে এবং এখন বেশির ভাগ সময় থাকেন কলকাতায়। কলকাতার মানুষের সঙ্গেই মিশে যান সহজ সরলভাবেই। হাওড়ার ঠাকুর রামকৃষ্ণ লেন ভাই ভাই সংঘের শ্যামাপুজোর উদ্বোধনের ফাঁকে সবুজ তোতার সঙ্গেই আড্ডায় আর কে নিউজ -এর ক্রীড়া সম্পাদক রাজকুমার মণ্ডল।

ব্যারেটোর জন্ম ব্রাজিলের এক ছোট শহর বাহঝেতে। সে দেশে জন্মানো প্রায় সব ছেলেমেয়েই ফুটবল খেলেন। ব্যারেটোর বাড়ির পরিবেশও ছিল তেমনই। যে পাড়ায় বড় হয়েছেন, সেখানে সমবয়সি বহু ছেলেমেয়ে ছিল। সবাই মিলে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা, দৌড়োনো ছিল নিত্য দিনের সঙ্গী। ছোট থেকেই পায়ে ছিল ফুটবল। অনেক সময় খেলতেন প্লাস্টিকের বলেও। কোনও ক্লাবে প্রশিক্ষণ নয়, বন্ধুদের সঙ্গে খেলেই নিজেকে তৈরি করছিলেন ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত। এর পরেই বদলে যায় জীবন। খেলার জন্য বাড়ি থেকে চলে আসেন ব্রাজিলের অন্যতম বড় শহর পোর্তো অ্যালেগ্রেতে। সেই শহরের ফুটবল ক্লাব গ্রেমিয়োতে শুরু করেন অনুশীলন। সে ক্লাবের ছাত্র ছিলেন রোনাল্ডিনহোও। ব্যারেটোর থেকে চার বছরের ছোট ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার। ব্যারেটো বললেন, “গ্রেমিয়োতে আমি তখন পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করেছি। ২০-২১ বছর বয়স আমার। সেই সময় ১৬ বছরের রোনাল্ডিনহোও পেশাদার দলের ফুটবলার। ও আলাদা রকমের প্রতিভাবান ফুটবলার ছিল। অত কম বয়সেই বড়দের সঙ্গে খেলত।” শুধু রোনাল্ডিনহো নন, আরও এক বিশ্বজয়ীকে কাছ থেকে দেখেছেন ব্যারেটো। তিনি ব্রাজিলের রোনাল্ডো। তাঁর বিরুদ্ধে খেলেছেন ব্যারেটো। ক্লাব পর্যায়ের এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছিল। ফিফার ক্রমতালিকায় কয়েক যোজন এগিয়ে থাকা ব্রাজিলের সঙ্গে খেলে আদৌ কোনও লাভ হল ভারতীয় ফুটবলের? ব্যারেটো বললেন, “ফিফা ফ্রেন্ডলিতে ক্রমতালিকায় পিছিয়ে থাকা দলের বিরুদ্ধে খেললে বেশি টাকা পাওয়া যায়। ব্রাজিল যদি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফ্রেন্ডলি খেলে তা হলে যা টাকা পাবে, তার চেয়ে অনেক বেশি পাবে ভারতের বিরুদ্ধে খেললে। সেই সঙ্গে একসঙ্গে অনেক ফুটবলারকে দেখেও নিতে পারেন কোচেরা। ভারতও দেখতে পারবে এই বড় দলগুলি কী ভাবে নিজেদের প্রস্তুত করে।’’ গ্রেমিয়োতে খেলার সময়ই সুযোগ আসে জাপানে খেলার। সেখান থেকে আবার ফিরেছিলেন নিজের দেশে। খুঁজছিলেন দেশের বাইরে খেলার সুযোগ। এমন একটা সময় পেয়েছিলেন মোহনবাগানের ডাক। সবুজ-মেরুন জার্সিতে ব্যারেটোর কীর্তি সকলেরই জানা। আজও তিনি মোহনবাগান অন্ত প্রাণ। খেলা ছাড়ার এত বছর পরেও সমর্থকদের ভালবাসা পেয়ে আপ্লুত। যেমনটা দীপাবলীর আগের সন্ধ্যায় হাওড়ার এক পুজো উদ্বোধনে এসেও অনুভব করলেন। ব্যারেটো নিজেও জানেন তাঁকে সমর্থকেরা কী নামে ডাকে? ব্যারেটো হেসেই বললেন, “হ্যাঁ, সবুজ তোতা। মোহনবাগান সমর্থকদের মতো ভালবাসা আমি কখনও কোনও দলে পাইনি। খেলা ছাড়ার এত দিন পরেও আমাকে মনে রেখেছেন তাঁরা। এখনও যেখানে যাই, ভালবাসা পাই।” ভারতে এসে প্রথম দিকে ইংরেজি বুঝতেন না ব্যারেটো। অনুশীলন শেষে মাঠের ধারে একা একা বসে বাইবেল পড়তেন। ধীরে ধীরে ইংরেজি শেখেন। এখন বলতেও পারেন। কলকাতায় থাকা ব্যারেটোর অন্যতম পছন্দের খাবার বিরিয়ানি। ব্যারেটোর কথায়, “বিরিয়ানি সব সময় তৈরি করা থাকত, গেলেই পেয়ে যেতাম। সেখান থেকেই বিরিয়ানি খাওয়া শুরু। খুবই সুস্বাদু। এখন ইচ্ছা করলেই বিরিয়ানি খেতে পারি।” বাঙালি বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে মটন কষাও খান মন ভরে। কথা বলার ফাঁকে হাজারও সেলফির আব্দার। কাউকে নিরাশ করলেন না ভারতে খেলা ব্রাজিলিয় তারকা ফুটবলার। হাওড়ার ঠাকুর রামকৃষ্ণ লেনের চারাবাগান হরিসভা মন্দিরে বসে নাচ উপভোগও করলেন। ভারতীয় ফুটবল ক্রমশ নিম্নগামী। বেশ হতাশার সুরে ব্যারেটো বললেন, “ভারতের ফুটবল ধীরে ধীরে নিচের দিকেই নেমে যাচ্ছে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনও প্রচেষ্টাই দেখা যাচ্ছে না। গ্রাসরুট লেভেল থেকেই ভাবতে হবে। সেই চিন্তাভাবনা কারুর মাথায় নেই। আদৌ এই প্রজন্মের মানুষ ভারতীয় ফুটবলের শ্রীবৃদ্ধি দেখতে পাবেন কিনা, তার কোনও নিশ্চয়তাই নেই।” ভারতেই ফুটবল কোচিং নিয়ে আপাতত ভাবছেন তিনি। তবে ফুটবল নিয়েই থাকতে চান। সেই কারণেই মন দিয়েছেন কোচিংয়ে। এটিকে-র সহকারী কোচ হিসেবে ট্রফি জিতেছেন। আগামী দিনে কোচিং নিয়ে থাকতে চান ‘সবুজ তোতা’।

৬০ বছরে পদার্পণ করা হাওড়ার ঠাকুর রামকৃষ্ণ লেন ভাই ভাই সংঘের শ্যামাপুজোর উদ্বোধনে বরাহনগর রামকৃষ্ণ মঠের মহারাজ সর্বপ্রেমানন্দজি ও ব্রাজিলীয় তারকা ব্যারেটো উপস্থিত ছিলেন। ঢাকিদের ভাইফোঁটা ও ভোগ বিতরণনের অনুষ্ঠানও শ্যামাপুজের অঙ্গ বলে জানালেন সংঘ সম্পাদক কার্ত্তিক মণ্ডল।





