রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সমাবেশে ভিড় কত হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই। দশ লক্ষ মানুষ সত্যিই হাজির হয়েছিলেন কি না সে নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, সারা দেশ থেকে এক বিরাট অংশের মানুষ যে, নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে দিল্লি পৌঁছেছিলেন, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। উপস্থিতির নিরিখে বিচার করতে গেলে সমাবেশ অবশ্যই সফল। কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই সমাবেশ অন্য একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল। বহুদিন পর একটি প্রকৃত অর্থে বৃহৎ সর্বভারতীয় সমাবেশের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সর্বভারতীয় বাম নেতৃত্বকে দেখা গেছে। এ রাজ্যেও কি তাহলে এরপর বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস ও বাম দলগুলিকে একসঙ্গে লড়তে দেখা যাবে? পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার অব্যবহিত পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাম দলগুলির কাছে আবেদন রেখেছিলেন একত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার। সেই আবেদনে বাম দলগুলি মোটেই সাড়া দেয়নি। এবার কী হবে? রামলীলা ময়দানের সমাবেশে আক্রমণের কেন্দ্রে ছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। শাসক দলের হয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছেন জ্ঞানেশ— বিরোধীদের এই অভিযোগের মুখে সাম্প্রতিক অতীতে জ্ঞানেশকে যে মাঝে মাঝেই বেশ নড়বড়ে দেখিয়েছে, এ নিয়ে সন্দেহ নেই। এর কারণ নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত যে-সমস্ত তথ্য ইতিমধ্যেই জনপরিসরে এসে পৌঁছেছে, তাতে দেশের একটি বিরাট অংশের মানুষের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই বিচার বিভাগ ছাড় দেওয়ার পরেও ষোলো লক্ষ ভোটারের নাম কাটার জন্য কলকাতা নির্বাচন কমিশনের অফিসের কোন অফিসারেরা আপিল করেছেন তা জানা যাচ্ছে না। জ্ঞানেশ আর পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন আধিকারিক তথা বর্তমান মুখ্য সচিব মনোজ আগরওয়াল ইতিমধ্যেই ঘাড় থেকে দায় নামিয়েছেন। দায় নামিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিশেষ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করা সুব্রত গুপ্ত এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কমিশনের মুখ্য আধিকারিক নীলম মীনা । সন্দেহ নেই যে, বিষয়টি রহস্যময়। এই ধরনের রহস্যের কারণেই নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিরোধীদের সুযোগ করে দিচ্ছে ভোটচুরির অভিযোগ করার। যেমন রামলীলা ময়দানেও তাঁর নিজের আগের অবস্থানে অনড় থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বক্তৃতায় বলেছেন, “আমরা হারিনি, আমাদের হারানো হয়েছে। ভোট লুট করেছে বিজেপি, দেশের গণতন্ত্রকে হরণ করেছে।” অভিযোগ করেছেন যে, এসআইআর-এর খাঁড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। কটাক্ষের সুরে তিনি এ-ও বলেছেন যে, এসআইআর-এর প্রকৃত অর্থ হল, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিলিফ টু আ পলিটিক্যাল পার্টি লাইক বিজেপি’। প্রশ্ন হল, রামলীলা ময়দান থেকে এই রাজ্যের নির্বাচনের ফল নিয়ে মমতা যা বলেছেন, তা কি পশ্চিমবঙ্গের বামদলগুলি মেনে নেবে? তারা কি মেনে নেবে যে, এ-রাজ্যে বিজেপি মানুষের ভোটে নয় নির্বাচন কমিশনের দয়ায় ক্ষমতায় এসেছে?
রামলীলা ময়দানের সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেছেন যে, শুধু ভোট বা গণতন্ত্র নয়, বাংলার মানুষের চাকরি, সম্মান এবং সাংবিধানিক অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দাবিকেও কি পশ্চিমবঙ্গের বামদলগুলি সমর্থন করবে? এই দাবিকে সমর্থন করলে তো মেনে নিতে হয় যে, তৃণমূল শাসনে এ-রাজ্যে গণতন্ত্র ছিল, ভোটচুরি হয়নি এবং বাংলার শিক্ষকরা চাকরিও হারাননি! প্রশ্ন ওঠে, রাজ্য নেতৃত্ব মেনে না নিলেও মমতার এই দাবিগুলিকে কি জোটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বামদলগুলির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব মেনে নেবেন? এই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই বিজেপি তুলতে শুরু করেছে যে, গত ১৫ বছরে বিশেষত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে ক্রমশ পিছনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া মমতার সঙ্গে কীভাবে বামদলগুলি এক জোটে সামিল হতে পারে? এই ধরনের প্রশ্ন যত বেশি করে উঠবে ততই মমতা সম্পর্কে এ-রাজ্যে এবং সর্বভারতীয় রাজনৈতিক পরিসরে বামদলগুলির অবস্থানের সাযুজ্য রয়েছে কি না সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই প্রশ্নটির উত্তর গুরুত্বপূর্ণ কারণ, রামলীলা ময়দানের সমাবেশে ‘ইন্ডিয়া’র সবচেয়ে বড় সঙ্গী জাতীয় কংগ্রেস যে মমতাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে তা বোঝাই গেছে। মঞ্চে সনিয়া গান্ধীর একেবারে পাশে বসেছিলেন তিনি। সমাবেশে এসেছিলেন রাহুল গান্ধীর গাড়িতে চড়ে। কাজেই জোটের প্রধান শরিক এবং প্রধান নেতারা একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রভূত গুরুত্ব দেবেন এবং সেটি বামদলগুলির সর্বভারতীয় নেতৃত্ব মেনেও নেবেন আবার অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে বামদলগুলি মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সমালোচনা করবে, এমনটি হতে থাকলে এ রাজ্যে বাম দলগুলির এবং সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে জোটেরও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর বামেরা এর আগে জোটে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দিয়েছিল, এবারও সেটিই দিতে পারে। বলতেই পারে যে, রাজ্য রাজনীতি এবং সর্বভারতীয় রাজনীতির ক্ষেত্র দু’টি সম্পূর্ণ পৃথক। দুই ক্ষেত্রের বাস্তবতা ও চাহিদাও পৃথক। এই যুক্তি খুব একটা ধোপে টিকবে না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে কিন্তু বামেদের তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থান সাধারণ মানুষ খুব একটা ভালোভাবে নেননি। আগেরবারের পরিস্থিতির সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির আরও একটি মূলগত তফাৎ আছে। রাজ্যে নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে জোটের নানা কর্মসূচিতে মমতার চেয়ে বেশি উপস্থিত থাকতেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার আর সেটি হবে না। বিরোধী জোট যতই মমতাকে গুরুত্ব দিতে থাকবে ততই এই রাজ্যের বামেদের মমতা-বিরোধিতা হাস্যকর হয়ে উঠবে। যুক্তির খাতিরে বলা যেতেই পারে যে, দীর্ঘদিন ধরে কেরলে কংগ্রেস এবং বামদলগুলি লড়াই করলেও, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে সবদলই একই জোটের শরিক। মনে রাখা প্রয়োজন যে, কেরল কংগ্রেসের কোনও মুখ কিন্তু কখনওই জোটে ততখানি গুরুত্ব পাবেন না যতখানি গুরুত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাচ্ছেন এবং পাবেন।
‘ইন্ডিয়া’র সাফল্যলাভের সম্ভাবনা সম্পর্কে এমনিতেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই সন্দিহান। আসন ভাগাভাগির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের জোটের বড়োদাদা সুলভ আচরণ, অতীতে জোটের শরিক দলের হঠাৎ জোট শরিক পাল্টে নেওয়া এবং সর্বোপরি ইতিবাচক কর্মসূচি বা কমন মিনিমাম প্রোগ্রামকে সামনে না এনে কেবলমাত্র ‘বিজেপি হটাও, মোদি হটাও’ স্লোগানের ভিত্তিতে এই জোট কতখানি সফল হবে সে প্রশ্ন অনেকেই তুলতে শুরু করেছেন। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে একইভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে বামেদের অবস্থানটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য, নিওলিবারাল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই যে মমতাকে জোটে প্রয়োজন এই কথাটি সর্বভারতীয় ক্ষেত্রের মতো রাজ্যস্তরেও বাম দলগুলিকে বলতে হবে। তা না হলে বাম দলগুলির বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠবেই। মোদ্দা কথাটি হল, জোটে মমতা আসলে বামদলগুলির জন্য গলার কাঁটা হয়ে উঠেছেন। বিজেপি এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সমদূরত্বের নীতি গ্রহণ করে বামদলগুলি একসময় রাজনৈতিক হারাকিরি করেছিল। মমতা এবং তার তৃণমূলের সম্পর্কে স্পষ্ট অবস্থান না-নিলে এবারও বাম দলগুলি সেই একই ভুলই করবে।





