Wednesday, May 13, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

অরূপের হার, স্বরূপে ‘বিশ্বাস’ হারাল টলিপাড়া? স্বস্তি, চাপা দুশ্চিন্তা? বিজেপি আসায় ফেডারেশনের খবরদারি বন্ধ, সিনেমা শিল্পের উন্নতি হলে সেটা স্বস্তির : পরমব্রত

RK NEWZ কেউ দু’বছর নিষিদ্ধ, সরকারি অনুষ্ঠানে ১২ বছর ডাক পাননি! নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা শিল্পীদের? বদল আসুক ফেডারেশনের সভাপতিত্বেও। পরিচালক, প্রযোজকেরা চাইছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, না কি ইন্ডাস্ট্রির কাউকে পদে দেখতে চাইছেন তাঁরা? এ পাড়াতেও পালাবদল চাই। এ আবার বলতে হবে? টলিপাড়ায় প্রশ্ন পড়লেই নানা কোণ থেকে একই উত্তর। রাজনৈতিক পালাবদলের পথ ধরে এ বার বদল আসুক ফেডারেশনের নেতৃত্বেও। টালিগঞ্জ কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসের ভাই, ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের কথা ছাড়া একটি কুর্সিও এ দিক-ও দিক হয় না বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। এমনই রেওয়াজ ছিল। অন্তত সে কথাই টলিপাড়ার বাতাসে উড়ত। তবে ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর বিদায়ের দিন গুনছিল অনেকেই। এ বার রাজ্য নির্বাচনের ফলে পালাবদলের ঘোষণা হতেই বিশ্বাস ভাইদের বিদায় যে স্বস্তি আনতে পারে, তা নিয়ে অকপট বহু অভিনেতা, পরিচালক, প্রযোজক। পরিচালক সুদেষ্ণা রায়। ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় গত দেড় বছরেরও বেশি সময় কাজ নেই তাঁর। বদল এলে খুশি হবেন? সুদেষ্ণা বলেন, “সবটাই সময়ের উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।” তার পরেই তাঁর সাফ জবাব, “ব্যক্তিগত মতামত জানাতে গিয়ে গত দেড় বছর ধরে কাজ নেই। তাই এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করব না। তা হলে হয়তো সারা জীবনের মতো কাজ হারাতে হবে।” সুদেষ্ণা তাই নীরবে সব দেখতে চান বদলের পরে কী ঘটে। ফেডারেশনের কোপে পড়েই কাজ ছিল না পরিচালক-অভিনেতা অয়ন সেনগুপ্তের। বাধ্য হয়ে রাস্তায় খাবারের দোকান দিতে হয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক পালাবদলে তিনি কতটা খুশি? প্রশ্ন রাখতেই তিনি জানান, অন্যায় বেশি দিন স্থায়ী হয় না। ভোটের ফলাফল তার প্রমাণ। যাঁর প্রভাবে কাজ হারিয়েছিলেন, সেই ফেডারেশন সভাপতি যদি দায়িত্বে আর না থাকেন, তা হলে? অয়নের কথায়, “সেটা সময় বলবে। সংগঠনের নির্বাচন সেই সিদ্ধান্ত নেবে। তার থেকেও বড় কথা, সব ক‘টি গিল্ডের সদস্যরা এই বিষয়ে মতামত জানাবেন। তবেই কোনও পদক্ষেপ করা সম্ভব।” তবে অয়ন চান, ইন্ডাস্ট্রির কাজ জানা কেউ এই পদে আসুন। ভালবেসে, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করুন। সবাই যেন কাজ পান। “আগের মতো দম ফেলার ফুরসত যেন না পাই আমরা”, চাহিদা তাঁর। আর কিছু দিন অপেক্ষা করলে হয়তো প্রকাশ্যে ‘ক্ষমা’ চাইতে হত না তাঁকে। ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধাচারণ করায় ‘শাস্তি’ পেতে হয়েছিল তাঁকে। ছোটপর্দার পরিচালক সৃজিত রায় কি আর একটু ধৈর্য ধরলে ভাল করতেন? আপাতত সৃজিতের পরিচালনায় ‘পরিণীতা’ ধারাবাহিক যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাঁর কথায়, “তখন পরিস্থিতি অন্য ছিল। আমার ক্ষমা চাওয়ার উপরে অনেকে নির্ভর করে ছিলেন। অনেকের অন্ন-সংস্থান আটকে ছিল। তাই বৃহত্ত স্বার্থে যদি ক্ষমা চাইতেই হয়, তাতে কোনও আক্ষেপ নেই।” ইন্ডাস্ট্রি রাজনীতিমুক্ত হোক, এটা মন থেকে চাইছেন। সৃজিত বললেন, “ইন্ডাস্ট্রির এমন কেউ এই দায়িত্ব নিন, যিনি কাজের মর্ম বোঝেন। মন থেকে সকলের মঙ্গল চান। তবেই ইন্ডাস্ট্রির মঙ্গল।” অভিনেত্রী পায়েল সরকার কারও নাম নিতে চান না। কিন্তু টলিউড থেকে ‘ব্যান’ সংস্কৃতি উঠে যাক, মন থেকে চাইছেন। তিনি বিজেপি-তে যোগ দিয়েছিলেন বেশ কিছু বছর আগে। ইন্ডাস্ট্রির সংগঠনের সভাপতি কি তা হলে ‘রাজনৈতিক’ কেউ হওয়াই ভাল? পায়েলের কথায়, “যিনি ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝবেন, ইন্ডাস্ট্রির মানুষগুলোকে বুঝবেন, এমন কাউকে চাইছি। তিনি প্রচুর কাজ নিয়ে আসবেন, এমন স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখি, সংগঠনের শীর্ষে বসে থাকা মানুষটির হাত ধরে সবাই কাজ পাবেন। কাউকে বসে থাকতে হবে না। বাংলা বিনোদনদুনিয়া আবার তার হারানো কৌলিন্য ফিরে পাবে।” প্রায় একই কথা অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্রেরও। তিনি সদ্য বিজেপি ছেড়ে শাসকদলে যোগ দিয়েছিলেন। রূপাঞ্জনা বলেন, “নন্দনে আবার যাতে সবাই শো পান, সেটা চাই। কাজের নির্দিষ্ট সময় থাকুক। নির্দিষ্ট সময়ে পারিশ্রমিক পান শিল্পী এবং কলাকুশলীরা। প্রযোজক তাঁর লগ্নির টাকা ফেরত পান আগের মতো। আর ব্যবসায়িক স্বার্থে রিমেক ছবি তৈরি হোক আবার, আপাতত এগুলো পেলেই খুশি।” তাঁর মতে, আইন জানা লোকেদের যোগ্য পদে বসানো উচিত। এত দিন ফেডারেশনের নিয়মের ধাক্কায় নাকি নাভিশ্বাস দশা ছিল প্রযোজকদের। রাজনৈতিক পালাবদল যদি ফেডারেশনেও বদল আনে, ‘গুপি শুটিং’ বন্ধ হবে? জবাবে সোচ্চার তিন প্রযোজক অশোক ধনুকা, রানা সরকার, পীযূষ সাহা। তিন জনেই একবাক্যে সায় দিয়ে জানাচ্ছেন, এত দিন অরূপ এবং স্বরূপের দাপটে, তাঁদের নিয়মকানুনের ধাক্কায় কাজ ছবি বানানো দায় হয়ে উঠেছিল। অথচ আমরা বাংলা বিনোদনদুনিয়ার স্বার্থেই লগ্নি করি।” তাঁদের মতে, অবিলম্বে ফেডারেশন সভাপতির পদে বদল কাম্য। কাকে এই পদে দেখতে চান তাঁরা? পায়েল বা সৃজিতের মতোই অশোক ধনুকাও ইন্ডাস্ট্রির কাউকে এই পদে দেখতে চাইছেন। যিনি প্রযোজকদের সমস্যা বুঝবেন। শিল্পীদের প্রতি সমব্যথী হবেন। কাজ বুঝবেন। রানার অবশ্য এ বিষয়ে বাছবিচার নেই। তিনি বলেছেন, “রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক, যিনিই আসুন না কেন, তিনি যেন ইন্ডাস্ট্রিকে বোঝেন। আমাদের কাজ জানা লোক চাই।” শুধুই অভিনেতা বা কলাকুশলী, প্রযোজকেরা নয়, এই বদল চাইছে ইন্ডাস্ট্রির অধিকাংশ গিল্ড। ম্যানেজার গিল্ড এবং ভেন্ডার গিল্ডের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তাঁদের কথায়, “বদল চাই। এ আবার বলতে হবে? অবশ্যই বদল চাইছি। চাইছি, কাজের লোক আসুন। এই বদল শীঘ্রই আসছে।” যাঁর উপস্থিতি নিয়ে এত আলোচনা, নানা মহলের এত মত, তিনি কী বলছেন? স্বরূপ বলেন, “পরিস্থিতি পুরোটাই নির্ভর করছে গিল্ডের সদস্যদের উপরে, যা আলোচনাসাপেক্ষ। টেকনিশিয়ানরা যা চাইছেন, সেটা জানাবেন।” বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা চলছে ফেডারেশন এবং সমস্ত গিল্ডের প্রতিনিধি সদস্যদের। শীঘ্রই বৈঠকে বসবেন সকলে। স্বরূপ এ-ও জানান, ফেডারেশন বরাবর কলাকুশলীদের পক্ষে। তার জন্য অনেক কটূক্তি শুনেছেন তিনি। আগামী দিনে কী ভাবে কাজকর্ম চলবে, সেটাই দেখার অপেক্ষায় ফেডারেশন। সভাপতির কথায়, “বরাবর কলাকুশলীদের নিয়ে কাজ করার কথা বলেছি। তার জন্য অনেকের হয়তো আমার কথা খারাপ লেগেছে। কেউ যদি কলাকুশলী কম নিয়ে বা না নিয়ে কাজ করতে চান, তখন বিষয়টি দেখা যাবে।” নতুন ফেডারেশন গঠিত হলে সংগঠন কি ‘গুপি শুটিং’ বন্ধ করতে পারবে?

কারও অভিযোগ ছিল, তিনি স্বজনপোষণের শিকার। কেউ আবার প্রতিবাদ করে হারিয়েছেন একাধিক কাজ। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে তাঁদের কী প্রত্যাশা? বাংলায় দেড় দশক পরে পালাবদল। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্র জগতের কোন তারকার মতামত কোন পক্ষে, সেই দিকে নজর মানুষের। বাংলার সঙ্গীতজগতে সেই শিল্পীরাই বা কী বলছেন, যাঁদের হাত থেকে পর পর অনুষ্ঠান হাতছাড়া হয়েছে? আরজি করের নির্যাতিতার জন্য পথে নেমেছিলেন গায়িকা লগ্নজিতা চক্রবর্তী। প্রকাশ্যে ঘটনার নিন্দা করেছিলেন। তা ছাড়াও নিজের রাজনৈতিক মতামত বিভিন্ন জায়গায় স্পষ্ট বলেছেন। শোনা যায়, আরজি করের গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনার প্রতিবাদ করায় তাঁর হাতছাড়া হয়েছিল একাধিক কাজ। ডাক পাচ্ছিলেন না সরকারি অনুষ্ঠানেও। এ বার কি তিনি স্বস্তিতে? লগ্নজিতার স্পষ্ট বক্তব্য, “এক জন শিল্পীর কাছে তাঁর সর্ববৃহৎ পরিচয়, তাঁর শিল্প। আমার ক্ষেত্রে সেটা আমার গান। আমি চাই, এই সরকারের আমলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সুদৃঢ় হোক এবং শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত হোক।” লগ্নজিতা জানান, সাংবাদিক বৈঠক ডেকে তাঁকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। এ বার তাঁর আশা, আরজি করের মতো মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কখনও না ঘটে। এমন ঘটনার প্রতিবাদ করলেও যেন আর হয়রানির শিকার না হতে হয়। গায়িকার কথায়, “আরজি করের ঘটনার পরে সাংবাদিক বৈঠক করে আমার অনুষ্ঠান এবং আমাকে বাতিল করা হয়েছিল দীর্ঘ দু’বছরের জন্য। সেই নিষেধাজ্ঞা আজ পর্যন্ত রয়েছে। এ শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, স্পষ্টতই প্রতিহিংসামূলক ছিল।” তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে কিছুটা ইতিবাচক ভাবতে চাইছেন লগ্নজিতা। তাঁর কথায়, “এই সরকারের আমলে শিল্পীরা আর কোনও ভাবেই প্রতিহিংসার শিকার হবেন না এবং স্বাধীন ভাবে তাঁদের শিল্পচর্চা করতে পারবেন, এই আশা করি।” বছরের পর বছর ধরে সরকারি অনুষ্ঠানে ডাক পাননি। জানান গায়িকা ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ৪ মে ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি। “ফলাফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। এ বার যেন যোগ্যতা অনুযায়ী সকলে কাজ পায়”, বলেন ঋদ্ধি। করোনা অতিমারীর সময়ে বিজেপির ‘কালচারাল সেল’-এ যোগ দিয়েছিলেন ঋদ্ধি। কিন্তু সেখান থেকেও বেরিয়ে এসেছিলেন। তবে গায়িকা জানান, তিনি তার আগে থেকেই সরকারি অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার ডাক পাননি। তাঁর কথায়, “গত ১২-১৩ বছর ধরে আমি ডাক পাই না। মুখ্যমন্ত্রী তো সকলের, কোনও নির্দিষ্ট দলের নয়। সেখানে যদি স্বজনপোষণ হয় এবং নির্দিষ্ট ‘লবি’র কাছে সব ক্ষমতা চলে যায়, তা হলে তো সমস্যার। আমাদের মতো শিল্পীদের ধরে ধরে বাদ দেওয়া হয়েছিল।” যোগ্যতা অনুযায়ী কেউ কাজ পাননি। অভিযোগ ঋদ্ধির। গায়িকার প্রশ্ন, “কেন রং, দল, এগুলি দেখে কাজ দেওয়া হবে? যোগ্যতাই তো মাপকাঠি। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও চাটুকারদের রবীন্দ্রসদনে গাইতে দেখেছি। অথচ, আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। ২৭ বছর ধরে আমি সঙ্গীতজগতে। সারা বিশ্ব জুড়ে আমার ছাত্রছাত্রী। এটা কি আমার প্রাপ্য?” রাজ্যে বিজেপির ক্ষমতায় আসা নিয়ে আশাবাদী ঋদ্ধি। নিজেকে এই দলেরই এক জন বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, “একটা সুস্থ সমাজ, সংস্কৃতি যেন বজায় থাকে। আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে। আমাদের রুজিরুটি তো এটাই। দেশ-বিদেশে গানের কাজ না থাকলে হয়তো আত্মহত্যা করতে হত। আমার মতো অনেকেই এমন আছেন, যাঁদের কাঁধে সংসারের দায়িত্ব রয়েছে। আমি সমাজমাধ্যমে বলতে পারিনি, চাটুকারিতা করতে পারিনি। পাল্টিও খেতে পারিনি। যাঁরা জিতে নির্দিষ্ট আসনে বসবেন, তাঁরাও যেন সঠিক কাজটাই করেন। তৃণমূলের জমানার মতো বলব না, আগে যাঁরা কাজ পেয়েছেন তাঁরা যেন আর কাজ না পান। কিন্তু এটুকু চাই, সকলে যেন সমান ভাবে কাজ পায় এ বার থেকে।” আরজি করের ঘটনার প্রতিবাদ করে টানা তিন মাস কাজহারা ছিলেন সিধু তথা ব্যান্ড ক্যাকটাসও। প্রভাব পড়েছিল কাজের জগতে। তবে ২০২৫-এ অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। কিন্তু সঙ্গীতজগতের বেশ কিছু খামতি নিয়ে তিনিও কথা বলেছেন। সিধু প্রথমেই বলেন, “একটা পরিবর্তনের দরকার ছিল। শিল্পী হিসাবে নয়, সেটা এক জন নাগরিক হিসাবে মনে হয়েছে। ১৫ বছর একটি দলকে দেখলাম। খুব যে মুগ্ধ হয়েছি তা নয়, বরং নালিশ জমেছে। যারা এসেছে তাদের বিরাট সমর্থক, তা নয়। কিন্তু তাও আশা রয়েছে।” বাংলা সঙ্গীত জগকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি গত কয়েক বছরে। বিশেষ করে ছবির বাইরের গান থেকে গিয়েছে পিছনের সারিতে। মনে করেন সিধু। তাই তাঁর প্রত্যাশা, “শিল্প ও সংস্কৃতির দিকটি আরও একটু সংগঠিত হোক এবং রাজনীতি মুক্ত হোক। রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ হলেই কোনও শিল্পী উঁচু মানের হয়ে গেলেন, আর যাঁরা সেটা করলেন না, তাঁরা নিম্নশ্রেণির হয়ে থেকে গেলেন— এটা যেন না হয়।” আশায় বুক বেঁধেছেন শিল্পীরা। স্বজনপোষণ ছাড়া কাজের পথ মসৃণ হবে এবং স্বাধীন ভাবে মতামত প্রকাশ করা যাবে, এই প্রত্যাশা প্রত্যেকের।

বিজেপির মতাদর্শের তিনি বিরোধী। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এই হার অপ্রত্যাশিত ছিল না তাঁর কাছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে টলিউড নিয়ে কোন আশার কথা শোনালেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়? বরাবরই শাসক-বিরোধী মত প্রকাশ করে এসেছেন তিনি। তা সে রাজ্যের হোক কিংবা কেন্দ্রের। কিন্তু গত এক বছর ধরে অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যেন ‘বদল’ দেখতে পাচ্ছিলেন অনেকে। টলিপাড়ায় এমন গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন পরমব্রত। যদিও তেমন কিছুই হয়নি। তবে ভোটপ্রচারের একেবারে শেষের দিকে তৃণমূল প্রার্থীদের হয়ে হয়ে হুডখোলা গাড়িতে চেপে প্রচার করেছেন পরমব্রত। কখনও আবার তৃণমূলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিজেপিকে ভোট না দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন। কিন্তু এমন পালাবদল যে হবে, তা ভাবতে পারেননি অভিনেতা। শাসক দলের এমন পরাজয়ের পর তাঁর কি আর আস্থা রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে? এমন একটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতই ছিলেন অভিনেতা। এই নির্বাচন যে খুব কঠিন একটি নির্বাচন হতে চলেছে এটা জানা ছিল। এমনই মত অভিনেতার। তিনি বলেন, ‘‘একটা সরকার যখন ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী একটা হাওয়া তৈরি হয়। এই সরকারের যেমন বেশ কিছু ভাল কাজ, ভালো প্রকল্প ছিল, ঠিক তেমনই তাদের এক শ্রেণীর কর্মীদের ঔদ্ধত্য, কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি, মানুষের জীবনে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা, একই সঙ্গে চুরি-দুর্নীতি— এ গুলো তো অস্বীকার করা যায় না। কিছু বিধায়কের জুলুমবাজি মানুষের কাছে মমতা বন্দোপাধ্যায়র ভাল কাজকে গৌণ করে দিয়েছে।’ এটা তৃণমূলের অতি বড় সমর্থকও স্বীকার করবেন। সেখানে আমি তো তৃণমূল পার্টির সদস্যও নই, কর্মীও নই।’’ পরমের আরও বক্তব্য, ‘‘আসলে মানুষের মধ্যে একটা রাগ ছিল। সেই রাগটা থাকা স্বাভাবিক। আসলে তৃণমূলের কিছু নেতামন্ত্রী এই সব জুলুম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাল কাজকে ছাপিয়ে গিয়েছে।’’ অভিনেতা একই সঙ্গে এও মনে করেন, হারের যে অভিঘাত এতটা হবে সেটা তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। তৃণমূল সরকারের এই সব খারাপ দিক সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন তাদের হয়ে প্রচারে নামলেন? অভিনেতার যুক্তি, ‘‘আমি আর্দশগত ভাবে বিজেপির উল্টোদিকের মানুষ। আমি এসআইআর প্রক্রিয়াটি যেভাবে হয়েছে ,সেটি সমালোচনা করার মতো বলেই প্রথম থেকে মনে হয়েছে। এবং প্রক্রিয়াটা বেশ গোলমেলে। আমার মনে হয়েছে, এই প্রক্রিয়াটার বিরুদ্ধে কথা বলা দরকার। প্রথমে বেশ কয়েক লক্ষ ভোটারের নাম বাতিল হয়। পরে যে ভাবে ৩৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়ল সেটা আমার কাছে অসাংবিধানিক মনে হয়েছে। আর একটা গণতন্ত্রে একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শের বিরোধিতা করার অধিকারও আমার আছে। সেই সময় এই অন্যায়গুলোক প্রতিবাদ করার রাস্তা হিসেবে তৃণমূলকেই দেখতে পেয়েছি। কারণ বামেরা কোথাও নেই, কংগ্রেসের তো অস্তিত্বই নেই।’’ অভিনেতা জানতেন, নির্বাচনের আগে থেকে তাঁকে নিয়ে বিস্তর জল্পনা হয়েছে। তিনি হয়তো তৃণমূলের প্রার্থী হতে পারেন। পরমব্রতের কথায়, ‘‘আমার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল ও আছে। সেই কারণেই উনি জানতেন, আমি এসআইআর-এর বিরোধী। তাই শেষের দিকে কয়েকটা নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়েছিলাম।’’ এর পাশাপাশি পরমব্রত শোনালেন, ‘‘আমি বিজেপির দর্শনের বিরোধী হলেও বিজেপির কিছু জিনিসের বিরোধী নই। সেটা হল, তাদের পার্টির মজ্জায় রয়েছে , ব্যবসা, উন্নয়ন ও শিল্প। সেই উন্নয়ন যদি পশ্চিমবঙ্গে হয়, তা হলে আমি ব্যক্তিগত ভাবে খুশি হব। সে ক্ষেত্রে দল-রং কিছুই দেখব না।’’ শিল্প ও উন্নয়নের প্রশ্নে তিনি যেমন নতুন সরকারকে নিয়ে আশাবাদী, তেমনই চলচ্চিত্র শিল্প নিয়েও আশা রয়েছে নতুন সরকারের উপর। একই সঙ্গে টলিউডের ক্ষেত্রে তৃণমূলের সব চেয়ে ‘বড় ভুল’ প্রসঙ্গে পরমব্রত বলেন, ‘‘তৃণমূল আসলে চলচ্চিত্র শিল্প়টা এমন কিছু লোকের হাতে তুলে দিলেন ,যিনি কোনও ভাবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। বছরের পর বছর এক ধরনের ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করেছিলেন, যার বিরুদ্ধে গত বছর একটা লড়াইয়ে নেমেছিলাম আমরা। প্রথম থেকেই এই লড়াইয়ে প্রথম সারিতে ছিলাম আমি। কিন্তু আমার উপরে আমার কোম্পানির অনেক দায়িত্ব থাকে। যখন আমার এবং আমাদের সব কাজ ‘নিষিদ্ধ’ করে দেওয়া হয়, তখন একটা সময়ের পরে অব্যাহতি চাইতেই হয় আমাকে। সেই লড়াইকে রাজনৈতিক রং লাগানো হয়। এবং এ ক্ষেত্রে কেউই আমাদের উপকারে আসতে পারেননি।’’ একটা সময় সমাজমাধ্যমে এসে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে হয় অভিনেতা প্রযোজক, পরিচালক পরমব্রতকে। পালাবদলের পর, মঙ্গলবার অভিনেতা জানান, ফেডারেশন সংক্রান্ত ঘটনা ও ক্ষমা চাওয়ায় তাঁর ভাবমূর্তিতে একটা আঘাত এসেছে সেটা তিনি জানেন। পরমব্রতের কথায়, ‘‘আমার তখন আর কোনও উপায় ছিলো না। এবং আরও অনেকের মতই আমাকে অপমান হজম করতে হয়েছে। ফেডারেশনের কাজকর্মে যে উনিশ-বিশ হয়েছে সেটা জায়গায় গিয়েছে সেটা যখন তৃণমূল নেতৃত্ব যতদিনে বুঝতে পেরেছেন, তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।’’ একই সঙ্গে পরমব্রত বলেন, ‘‘নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে হাজারও রাজনৈতিক কাঁটাছেড়া হতে পারে, কিন্তু ভোটের এই ফলে যদি সিনেমা শিল্প এবং ফেডারেশন রাজনৈতিক খবরদারি মুক্ত হয় তাহলে সেটা স্বস্তিদায়ক হবে সবার জন্যে। এটা হওয়ার দরকার ছিল।’’ সেইসঙ্গে পরমব্রত আরও এক বার বলেন, ‘‘মানুষ যখন পরিবর্তন করে তখন কিছু আশা নিয়েই করে। তাই ওই ‘ব্যান কালচার’ ও ‘থ্রেট কালচার’— এগুলো আগামী সরকার এখনই করবে না বলেই প্রত্যাশা করি। তারা যদি এর সমাধান করতে পারে অবশ্যই তাদের প্রশংসা করব। এবং যেটা উল্লেখযোগ্য শিল্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিনেমার কোনও লোক থাকা দরকার, যিনি হাতে কলমে কাজ টা করেছেন এবং জানেন।’’ দেড় দশক আগে এক ‘পালাবদলের কান্ডারি’ সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’! এখনও কি তাঁর উপর আস্থা রয়েছে অভিনেতার? পরমব্রতের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় ৪৫ বছর রাজনীতি করছেন। অনেক কিছু দেখেছেন, অনেকে ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছেন। ওঁর প্রতি আমার ব্যক্তিগত সম্মান নিশ্চয় থাকবে। উনি লড়াকু মানুষ। নিশ্চয় নিজের মতো করে রাজনীতিতে নিজের জায়গা রাখতে পারবেন।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles