RK NEWZ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মন্দিরের এক কিলোমিটারের মধ্যে আর মদের দোকান চলবে না বলে জানালেন তিনি। পাশাপাশি মহিলাদের জন্য মাসিক আর্থিক সাহায্য, পাঁচ টাকায় মাছ-ভাত এবং পৃথক আয়ুষ দফতর গঠনের ঘোষণা করেছেন এদিন। কল্যাণীতে প্রশাসনিক বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্কুল, কলেজ ও মন্দিরের এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনও মদের দোকানকে অনুমতি দেওয়া হবে না। এই সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর করা হবে।’ প্রশাসনের একাংশের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানের আশপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই পদক্ষেপ। সবচেয়ে বড় ঘোষণাগুলির মধ্যে রয়েছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ২৭ মে থেকেই নবান্ন থেকে এই প্রকল্পের আবেদনপত্র বিলি শুরু হবে। প্রকল্পের আওতায় যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, লক্ষ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। কল্যাণীতে প্রশাসনিক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম কাল থেকেই দেওয়া হবে। সমস্ত ভারতীয় নাগরিক এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।” এ ছাড়াও রাজ্যজুড়ে ভর্তুকিযুক্ত ক্যান্টিন চালুর কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় ৪০০টি বিশেষ ক্যান্টিন তৈরি করা হবে। সেখানে মাত্র পাঁচ টাকায় মাছ-ভাত মিলবে। সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে খাবারের ব্যবস্থা করতেই এই উদ্যোগ। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য দফতরের আওতা থেকে আলাদা করে একটি পৃথক আয়ুষ দফতর গঠন করা হবে। আয়ুর্বেদ, যোগ, ইউনানি, সিদ্ধ ও হোমিওপ্যাথি সংক্রান্ত পরিষেবাগুলিকে আরও বিস্তৃত করতে এই পদক্ষেপ। মঙ্গলবার কল্যাণীতে নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলার উন্নয়নমূলক কাজ পর্যালোচনা করতে প্রশাসনিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী। উপস্থিত ছিলেন একাধিক সাংসদ ও বিধায়করা। এসেছিলেন তৃণমূলের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও ছয় বিধায়কও। সম্প্রতি বারাসত সাংগঠনিক জেলার সভাপতির পদ ছাড়ার পর কাকলির এই বৈঠকে উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করেছে। দেগঙ্গা, স্বরূপনগর ও হাড়োয়ার বিধায়কেরাও এদিন বৈঠকে অংশ নেন। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, তিন জেলার সমস্ত সাংসদ ও বিধায়কদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বৈঠকে মূলত বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বাস্তবায়ন, তৃণমূল স্তরে উন্নয়নমূলক কাজের অগ্রগতি এবং চলতি প্রকল্পগুলির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক পরিষেবা আরও দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দক্ষিণ কলকাতার বাসভবন ‘শান্তিনিকেতন’-এ পুরসভার তরফে বুলডোজার-নোটিস পাঠানোকে কেন্দ্র করে এমনতেই শোরগোল। এই আবহে মঙ্গলবার সত্যি সত্যিই তাঁর বাড়ির সামনে একটি বুলডোজার এসে দাঁড়ানোয় চরম উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তবে কি এবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হবে? যদিও শেষ পর্যন্ত তেমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। সম্পূর্ণ অন্য একটি সরকারি কাজের দরুন ওই এলাকায় বুলডোজারটি এসেছিল বলে জানা গিয়েছে। হরিশ মুখার্জি রোডের ওপর অবস্থিত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেই প্রাসাদোপম বহুতল ‘শান্তিনিকেতন’। এই বাড়িতেই সপরিবারে বসবাস করেন তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতা। পুরসভা সূত্রে খবর, ওই বহুতলটি নির্মাণের ক্ষেত্রে মূল নকশার বাইরে গিয়ে বেশ কিছু অংশ ‘প্ল্যান-বহির্ভূত’ বা বেআইনিভাবে তৈরি করা হয়েছে। আর সেই কারণেই পুরসভার তরফ থেকে এই নোটিস পাঠানো হয়। নোটিসে স্পষ্ট জানানো হয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে উদ্যোগী হয়ে ওই বেআইনি অংশটি ভেঙে না ফেললে, পুরসভাই বুলডোজার দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেবে।
নিজের বাড়ি ভাঙার এই নোটিস পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিষেক। তাঁর সাফ কথা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই বিজেপি এই ধরণের নোংরা রাজনীতি করছে। এই টানাপড়েনের মাঝেই মঙ্গলবার আচমকা তাঁর বাড়ির সামনে পুরসভার বুলডোজার দেখে পথচলতি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীরা হকচকিয়ে যান। পুরসভা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি ভাঙার জন্য নয়, বরং হরিশ মুখার্জি রোডকে যানজটমুক্ত করার একটি রুটিন কাজের জন্যই এদিন এলাকায় বুলডোজার নিয়ে আসা হয়েছিল। পুরসভার আধিকারিকরা জানিয়েছেন, ওই রাস্তার উল্টো দিকের ফুটপাথের পুরনো পেভার ব্লক বদলানোর কাজ চলছে। রাস্তা থেকে সেই পুরনো ইট ও কংক্রিটের চাঙর তুলতেই পুরসভার ওই বুলডোজারটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। ফলে বাড়ি ভাঙার জল্পনায় সাময়িকভাবে জল পড়েছে। এরই মধ্যে সোমবার অভিষেকের এই বাসভবনে একদল পুলিশ আধিকারিকের আকস্মিক আগমন ঘিরে নতুন করে রহস্য দানা বাঁধে। জানা গিয়েছে, যে পুলিশ দলটি এদিন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে ঢোকে, তাদের সকলের পরনে নিয়মিত খাকি পোশাক ছিল না। কয়েক জন আধিকারিককে সাধারণ পোশাকে দেখা যায়, আবার কয়েক জনের পরনে ছিল কলকাতা পুলিশের চেনা সাদা উর্দি। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় তাঁদের সঙ্গে একটি বড় মাপের এলইডি মনিটর নিয়ে যেতে দেখা যায়।
এর আগেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুলিশের একটি দল গিয়েছিল। সে বার তাঁর বাড়ি থেকে বেশ কিছু স্ক্যানার যন্ত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে জানা যায়, ওই স্ক্যানারগুলি আসলে সরকারি সম্পত্তি ছিল এবং নিয়ম মেনেই সেগুলি ফিরিয়ে নেওয়া হয়। মূলত নিরাপত্তার কারণেই একসময় পুলিশ প্রশাসনের তরফে ওই স্ক্যানার যন্ত্রগুলি সেখানে বসানো হয়েছিল। তবে পর পর দু’দিন পুলিশি তৎপরতা এবং তার পরেই বাড়ির সামনে বুলডোজারের উপস্থিতিতে হরিশ মুখার্জি রোডের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পারদ যে এক ধাক্কায় অনেকটাই চড়ে গিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।
তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দিন থেকেই রাজধর্ম পালনে কোনও খামতি রাখতে চাননি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কোনও জাঁকজমক বা দ্রুত মন্ত্রিসভার বহর না বাড়িয়ে, তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন মানুষের আস্থা অর্জনে। নির্বাচনের আগে দেওয়া ইস্তাহারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলি দ্রুত কার্যকর করাই ছিল তাঁর প্রাথমিক লক্ষ্য। ক্ষমতায় এসেই প্রথম দুই সপ্তাহে— ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ চালুর সরকারি প্রক্রিয়া শুরু করা, ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনা রূপায়ণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা, ভিবি রাম জি তথা একশ দিনের কাজ শুরু করা এবং সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছ নিয়োগের বিষয়ে স্পষ্ট দিশানির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তা ছাড়া দুর্নীতি দমন এবং রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে প্রথম দিন থেকেই কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক স্তরে এই জরুরি বার্তা ও নীতিগত সিদ্ধান্তগুলি স্পষ্ট করার পরই এবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের চূড়ান্ত ধাপে হাত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সম্ভাব্য তালিকায় কারা? মাল্টি-ফ্যাক্টর সমীকরণে নবান্ন
বিজেপির শীর্ষ সূত্রের দাবি, নতুন মন্ত্রীদের সম্ভাব্য তালিকায় রাজ্য বিজেপির একাধিক পরিচিত ও হেভিওয়েট মুখ থাকা একপ্রকার নিশ্চিত। যাঁদের নাম এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে, তাঁরা হলেন—তাপস রায়, স্বপন দাশগুপ্ত, শঙ্কর ঘোষ এবং শারদ্বত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
তবে এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নামের পরিচিতি নয়, বরং তিনটি মূল সমীকরণকে মাথায় রাখছে পদ্ম শিবির:
১. আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব: উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, জঙ্গলমহল থেকে রাঢ়বঙ্গ—প্রতিটি প্রান্তের ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
২. যোগ্যতা ও শিক্ষাগত মান: প্রশাসনিক কাজ সামলানোর মতো দক্ষতা বিচার।
৩. জাত-পাতের সমীকরণ: বাংলার সামাজিক ও জাতিগত সমীকরণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
৪টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ শুভেন্দুর হাতে
বর্তমানে যে ৫ জন মন্ত্রী রয়েছেন, তাঁদের সাময়িকভাবে দুটি করে দফতরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে নতুন মন্ত্রীরা আসার পর এই দায়িত্বের বোঝা কিছুটা হালকা হবে। চূড়ান্ত রদবদলের পর পুরোনো ৫ মন্ত্রীর হাতে কেবলমাত্র একটি করে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দফতর রাখা হতে পারে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিজের হাতে থাকবে স্বরাষ্ট্র দফতরসহ মোট ৪টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব।
২০৮ বিধায়কের চাপ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাবই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
বিজেপির এক রাজ্য নেতার কথায়, রাজ্যে ২০৮ জন বিধায়ক জয়ী হওয়ায় স্বভাবতই অনেকের মনেই মন্ত্রী হওয়ার উচ্চাশা বা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া অনেক জেলাতেই দেখা যাচ্ছে, একাধিক বিধায়কের রাজনৈতিক সিনিয়রিটি বা যোগ্যতা প্রায় সমপর্যায়ের। ফলে কাকে মন্ত্রী করা হবে আর কাকে বাদ দেওয়া হবে—তা বেছে নেওয়া ছিল এক মস্ত বড় পরীক্ষা।
এর সঙ্গে আরও একটি বড় ব্যবহারিক সমস্যা ছিল ‘প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা’। বিজেপির নতুন বিধায়কদের একটি বড় অংশেরই অতীতে পঞ্চায়েত বা পুরসভাতেও সদস্য হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা নেই। তাই একবার মন্ত্রিসভা গঠিত হয়ে যাওয়ার পর যাতে কোনও ধরণের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক জটিলতা না তৈরি হয়, তার জন্য নিখুঁত স্ক্রিনিং করতে এই বাড়তি সময়টুকু নিলেন শুভেন্দু অধিকারী-শমীক ভট্টাচার্যরা।
রাজ্য বিজেপির ওই নেতার স্পষ্ট বক্তব্য, মন্ত্রিসভার নির্দিষ্ট আসন সংখ্যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই কিছু মানুষ শেষমেশ হয়তো বঞ্চিত হবেন, কারও একটু আধটু অভিমানও হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, বাংলায় বিজেপির সংগঠনকে আরও মজবুত করতে এবং সরকারের বাইরেও বড় দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। তাই একটু সবুর করলে দলের জন্য লড়াই করা কাউকেই শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হবে না।




