শিল্পীদের পরিচয়ে আর কোনও রাজনৈতিক ছাপ পড়বে না, এটাই হবে আগামী দিনের টলিউড বললেন শর্বরী। দীর্ঘ অপেক্ষা। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই। অনেক বছর টলিউড তাঁকে কাজ দেয়নি। অভিনেত্রী শর্বরী মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের মতো ‘হেভিওয়েট’ কেন্দ্রের জয়ী বিজেপি প্রার্থী। ৯ মে বাংলার আনুষ্ঠানিক শাসনভার এবং শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। স্বাভাবিক ভাবেই দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না শর্বরী। শিল্পীদের পরিচয় ইদানীং যেন ‘রাজনৈতিক’ হয়ে গিয়েছিল। বিনোদনদুনিয়ায় কারা ‘তৃণমূল’? তাঁরা কাজ পাবেন! এরকম পরিস্থতি তৈরি হয়েছিল টলিউডে। যে কারণে শর্বরীও দীর্ঘ দিন অভিনয়ের ডাক পাননি। অভিনেত্রী-রাজনীতিবিদ সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, “শিল্পী যে রাজনীতির ঊর্ধ্বে, সেই ব্যাপারটাই যেন অনেক দিন ধরে হারিয়ে গিয়েছিল। শিল্পীকে প্রশ্ন করা হত, ‘আপনি কি তৃণমূল’?” শর্ববীর আশ্বাস, এই বিষয়টি তিনি দায়িত্ব নিয়ে মুছবেন। তার জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করবেন। রাজনীতিবিদ-অভিনেত্রীর দাবি, “শিল্পীর পরিচয়, তিনি একজন শিল্পী। টেলিভিশন, সিনেমা, নাটক, যাত্রা— যে মাধ্যমেরই হোন। তিনি যে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হতেই পারেন। আগামী দিনে তাঁর সেই মতাদর্শ কখনও তাঁর পরিচয় হয়ে উঠবে না।” শর্বরীর আরও আশ্বাস, প্রত্যেক শিল্পী এবং কলাকুশলী আগামী দিনে যাতে কাজ পান, সে দিকটাও দেখবেন তিনি। নিত্য লড়াই অবশ্য শর্বরীর অনেক বছরের সঙ্গী। বলেছেন, “আমার লড়াই সার্থক করেছে আমার দল। ধন্যবাদ আমায় ভরসা এবং বিশ্বাস করার জন্য। কৃতজ্ঞ, আমায় সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আমায় ঘিরে যে ১২ জন সারাক্ষণ ছিলেন, তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম সার্থক।” একই সঙ্গে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন যাদবপুরবাসীকে। তাঁর কথায়, “ওঁরা আমার উপরে, দলের উপরে আস্থা এবং বিশ্বাস রেখেছেন বলেই এই জয়।” এ-ও স্বীকার করেছেন, ধৈর্য বা প্রতীক্ষা সব সময়েই সার্থকতার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। সফল হতে গেলে ধৈর্য ধরতেই হবে। অভিনেত্রী শর্বরী টলিউডকে রাজনীতিমুক্ত করার স্বপ্ন দেখছেন। বিজেপির জয়ী প্রার্থী যাদবপুরবাসীকে কী উপহার দেবেন? সদ্য বিজয়ী প্রার্থী শর্বরী বলেছেন, “আমার মা-বাবা নেই। যাদবপুর কেন্দ্র ঘুরে দেখেছি, এলাকা বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে! সন্তানরা তাঁদের বর্ষীয়ান অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে চাইছেন না। আমি মা-বাবাদের আর পরিবারহারা হয়ে থাকতে দেব না।” একই সঙ্গে তিনি স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল, বাজার, নিকাশি এবং পানীয় জলের উন্নতি ঘটানোরও আশ্বাস দিয়েছেন। শর্বরীর কথায়, “আজ আশ্বাস দিয়ে দু’বছর পরে কাজ শুরু করব, এরকম নয়। আমি জিতে ফেরার পর থেকেই কাজ শুরু করে দিয়েছি।”
গত ২০ বছর ধরে প্রযোজকদের উপরে নানা বাধা, নানা বিধি। সেই বাধানিষেধ উঠতে চলেছে। ইমপা অফিসে দাঁড়িয়ে এই বার্তা দিয়েছেন প্রযোজক বিভাগের চেয়ারম্যান ঋতব্রত ভট্টাচাৰ্য। তিনি ঘোষণা করেছেন, “প্রযোজকদের উপরে আর কোনও বাধা থাকছে না। আগামী দিনে প্রযোজকেরা স্বাধীন ভাবে ছবি বানাতে পারবেন। নিজেদের পছন্দমতো ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবেন।” এত দিন ফেডারেশনের ঠিক করে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সংখ্যক কলাকুশলী নিতে বাধ্য ছিলেন প্রযোজক। অনেক সময় পছন্দের পরিচালক, অভিনেতাদেরও নাকি নিতে পারতেন না তাঁরা। ঋতব্রতের আশ্বাস, এই বিধিনিষেধও উঠে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, বাংলা বিনোদনদুনিয়ার প্রযোজকদের দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ, বাজেট কম থাকলেও তাঁদের প্রয়োজনের বেশি কলাকুশলীকে নিতে বাধ্য করা হত। এতে অনেকেই ছবি বানানো থেকে পিছিয়ে এসেছেন। অনেকে গোপনে কমসংখ্যক কলাকুশলী নিয়ে শুট করেছেন। শুটিংয়ের এই পদ্ধতিই ‘গুপি শুট’ বলে পরিচিত ইন্ডাস্ট্রিতে। প্রযোজকদের এই চাওয়া অনেক দিনের। ইমপা-র প্রযোজক বিভাগ এত পরে কেন এই ধরনের ঘোষণা করল? প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। ঋতব্রত বলেন, “সংগঠনও প্রযোজকদের পক্ষেই ছিল। কেন বলা যাচ্ছিল না, সে কথাও সবাই জানেন। এখন সময় এসেছে বলার।” তাঁর মতে, এতে বেশি উপকৃত হবেন স্বাধীন পরিচালকেরা। ফিরদৌসল ইমপা-র অন্যতম প্রযোজক সদস্য। তিনি কী বলছেন? প্রযোজক জানিয়েছেন, তিনি কলকাতার বাইরে। ফলে সবিস্তার কিছুই জানেন না। তার পরেও তাঁর বক্তব্য, “এরকম সত্যিই যদি কিছু হয়, তা হলে খুশি হব। কারণ, মন খুলে কাজ করতে চান সবাই। স্বাধীনতা পেলে কাজ ভাল হবে।”
একই কথা অশোক ধনুকারও। তিনি বলেছেন, “এটাই হওয়ার ছিল। যদিও লিখিত এখনও কিছু পাইনি আমরা। ২০১৮-য় এই দাবি জানিয়ে আমিই প্রথম আদালতে মামলা করি। সে দিন পাশে কাউকে পাইনি।” একই সুর ‘দি অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস’-এর পরিচালক জয়ব্রতের। ছবিমুক্তি ঘটাতে গিয়ে অনেক খারাপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সে কথা তুলে জয়ব্রত বললেন, “ছবিমুক্তির আগে আমাকে জানানো হয়েছিল, ফেডারেশনের নিয়ম মেনে ছবি বানাতে পারলে তবেই যেন পরিচালনায় আসি। কথাটা শুনে খুবই ভয় পেয়েছিলাম।” এখন আশার আলো দেখছেন তিনি। ছবি পরিচালনাও করবেন বলে জানিয়েছেন। ২০২৪ থেকে পরিচালক-ফেডারেশন কাজিয়া তুঙ্গে। ২০২৫-এ যে মহিলা পরিচালক একাই ফেডারেশনের ‘একুশে আইন’-এর বিরুদ্ধে হাই কোর্টে গিয়েছিলেন, তিনি বিদুলা ভট্টাচার্য। তিনি কতটা খুশি? বিদুলার সাফ জবাব, “বরাবর বলেছি, ফেডারেশনের অন্যায় নিয়ম মানি না। আমি আমার শর্তে কাজ করব। কেউ আটকাতে পারবেন না। সেটাই করে চলেছি। যা ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা বাস্তব হলে সত্যিই যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে।” ঋতব্রতের ঘোষণাকে নৈতিক জয় বলে মনে করছেন হলমালিক এবং পরিবেশক শতদীপ সাহা। তাঁর কথায়, “মাত্র দু’দিনের প্রতিবাদে এই পদক্ষেপ। আরও আগে এই প্রতিবাদ হলে বাংলা বিনোদনদুনিয়া আরও আগেই দুর্নীতিমুক্ত হত।”





