চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম ভারতের হয়ে মাঠে নামার সুযোগ পান কুলদীপ। খারাপ বল করেননি তিনি। ৩ ওভারে ১৪ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন। যদিও ফিল্ডিং খুব একটা ভাল করতে পারেননি। চার বাঁচানোর ক্ষেত্রেও তাঁর শ্লথগতি দেখা যাচ্ছিল। ক্যাচ ফস্কানোয় আরও রেগে যান হার্দিক ও সূর্য। মাঠেই কুলদীপকে বকুনি দেন। পাকিস্তানের ইনিংসের ১৮তম ওভারে বল করছিলেন হার্দিক। পাকিস্তানের তখন ৯ উইকেট পড়ে গিয়েছে। প্রথম বলেই শাহিন শাহ আফ্রিদির দস্তানায় বল লাগে। কিন্তু উইকেটরক্ষক ঈশান কিশন বল ধরতে পারেননি। পরের বলে আবার বড় শট মারার চেষ্টা করেন আফ্রিদি। লং অনে ছিলেন কুলদীপ। তিনি ক্যাচ ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু বল তাঁর তালুতে লেগে ছিটকে বাউন্ডারির বাইরে চলে যায়। ক্যাচ তো ধরতেই পারেননি কুলদীপ, উল্টে ছয় রান দেন। পর পর দু’বলে ক্যাচ পড়ায় মেজাজ হারান হার্দিক। তিনি হাতের ইশারায় ঈশান ও কুলদীপকে দেখিয়ে কিছু একটা বলেন। বোঝা যাচ্ছিল, ক্যাচ ফস্কানোর জন্য দুই সতীর্থের উপরেই রাগ দেখান হার্দিক। সেই ওভারের শেষ বলে অবশ্য উসমান তারিককে আউট করে খেলা শেষ করে দেন। খেলা শেষে যখন ক্রিকেটারেরা নিজেদের মধ্যে হাত মেলাচ্ছেন, তখনই দেখা যায়, কুলদীপের হাত ধরে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু একটা বলছেন হার্দিক। বোঝা যাচ্ছিল, ক্যাচ ফস্কানোর জন্য বকুনি দিচ্ছিলেন। কুলদীপ চুপ করে শুনছিলেন। তখনই সেখানে দৌড়ে যান রিঙ্কু সিংহ। তিনি গিয়ে হার্দিককে সরিয়ে আনেন। সূর্যকুমার কুলদীপকে দেখে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু একটা বলেন। ক্যাচ ফস্কানোয় খুশি নন। কুলদীপের ক্যাচ বিশেষ কঠিন ছিল না। একটু সপ্রতিভ হলেই ধরতে পারতেন তিনি। কিন্তু পারেননি। এই ম্যাচে তার কোনও প্রভাব পড়েনি। হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে এই রকম ক্যাচ ফস্কালে তার প্রভাব দলের উপর পড়তে পারে। সেটাই হয়তো সতীর্থকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন হার্দিক ও সূর্য।
ভারত যে ম্যাচে সুপার এইট নিশ্চিত করল, সেই ম্যাচেই নিজেদের উপর চাপ বাড়িয়ে ফেলল পাকিস্তান। ভারতের কাছে হেরে পয়েন্ট তালিকায় তিন নম্বরে নেমে গিয়েছে। ফলে সুপার এইটে ওঠার ক্ষেত্রে চাপ বেড়েছে সলমন আলি আঘাদের। সলমন, বাবরদের সামনে একটিই অঙ্ক রয়েছে। বুধবার নামিবিয়াকে হারাতেই হবে তাঁদের। নইলে ২০২৪ সালের পর ২০২৬ সালেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হবে পাকিস্তানকে। গ্রুপ এ-র শীর্ষে রয়েছে ভারত। তিন ম্যাচে তিন জয়ের ফলে তাদের পয়েন্ট ৬। ইতিমধ্যেই নক আউটে উঠে গিয়েছে সূর্যকুমার যাদবেরা। পরের ম্যাচের ফলের উপর কিছু নির্ভর করছে না। দ্বিতীয় স্থানে আমেরিকা। চার ম্যাচের মধ্যে দু’টি জিতেছে তারা। হেরেছে দু’টি। ৪ পয়েন্ট আমেরিকার। নেট রানরেট +০.৭৮৭। তিন নম্বরে থাকা পাকিস্তানের পয়েন্ট ৩ ম্যাচে ৪। তারা দু’টি ম্যাচ জিতেছে, একটি হেরেছে। পাকিস্তানের নেট রানরেট -০.৪০৩। চার নম্বরে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। তিন ম্যাচে তাদের পয়েন্ট ২। তারা একটি ম্যাচ জিতেছে ও দু’টি হেরেছে। নেদারল্যান্ডসের নেট রানরেট -১.৩৫২। গ্রুপের শেষ রয়েছে নামিবিয়া। তিন ম্যাচে তিনটিই হেরেছে তারা। ইতিমধ্যেই সুপার এইটের লড়াই থেকে বিদায় নিয়েছে। আমেরিকা তাদের চারটি ম্যাচ খেলে ফেলেছে। বাকিদের একটি করে ম্যাচ বাকি। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি নেদারল্যান্ডস। পাকিস্তান খেলবে নামিবিয়ার বিরুদ্ধে। ভারত হারুক বা জিতুক, তাদের কোনও সমস্যা হবে না। কিন্তু পাকিস্তানকে জিততেই হবে। নামিবিয়াকে শেষ ম্যাচে হারালে সরাসরি সুপার এইটে উঠবে। যদি পাকিস্তান নামিবিয়ার কাছে হেরে যায়, তা হলে তাদের ও আমেরিকার পয়েন্ট সমান হবে। আমেরিকার রানরেট পাকিস্তানের থেকে অনেকটাই বেশি। ফলে পাকিস্তান হারলে তাদের বদলে আমেরিকা উঠবে সুপার এইটে। পাশাপাশি যদি নেদারল্যান্ডস ভারতকে হারাতে পারে, তা হলে তাদেরও পয়েন্ট হবে ৪। সে ক্ষেত্রে তিন দলের পয়েন্ট সমান হবে। তবে নেট রানরেটের বিচারে সে ক্ষেত্রেও আমেরিকার সুপার এইটে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে করমর্দন নিয়ে দু’দলের প্রাক্তন ক্রিকেটারেরা কিন্তু বার বার দু’দেশের বোর্ডের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মতে, খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা উচিত নয়। খেলাকে খেলার মতো থাকতে দেওয়া উচিত। করমর্দন না হওয়ায় পাকিস্তানের অনেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকেও দায়ী করেছেন। কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় ভারত। সেটা খেলার মধ্যেই দেখা গেল। ম্যাচে করমর্দন দেখা যাবে কি না, সেই প্রশ্নের জবাবে আগের দিন পাকিস্তানের অধিনায়ক সলমন বলেছিলেন, “কী করবে সেটা ওরা ঠিক করুক।” সূর্য এই প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “এখনও ২৪ ঘণ্টা সময় আছে। খাওয়া-দাওয়া করুন। দেখতে পাবেন কী হবে।” ভারতীয় বোর্ডের প্রাক্তন সচিব জয় শাহ এখন আইসিসির চেয়ারম্যান হলেও ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর কথার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। অনেকে বলেন, নেপথ্যে থেকে তিনিই সব সিদ্ধান্ত নেন। রবিবার যখন ভারত-পাক ম্যাচ চলছে তখনই পাকিস্তান বোর্ডের চেয়ারম্যান নকভির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা জয় শাহের। সেই কারণেই অনেকে ভেবেছিলেন, হয়তো এই ম্যাচে হাত মেলাতে দেখা যাবে দু’দলের ক্রিকেটারদের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ম্যাচের আগে যে ছবি দেখা গেল, তাতে প্রশ্ন উঠছে। সত্যিই কি ক্রিকেটারেরা হাত মেলাতে চাইছেন না? নাকি বোর্ডের চাপে সেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা? কলম্বোর প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর আগে দু’দলের ক্রিকেটারের অনুশীলন করছিলেন। সেই সময়ই এই ছবি দেখা যায়। সাধারণত, মাঠের দু’দিকে দু’দলের ক্রিকেটারেরা অনুশীলন করেন। ফলে তাঁদের মধ্যে দূরত্ব থাকে। কিন্তু অনুশীলনের সময় দেখা গেল, বেশ কাছাকাছি রয়েছেন দু’দলের কয়েক জন ক্রিকেটার। পাকিস্তানের সাহিবজ়াদা ফারহান যখন ব্যাট করছিলেন, তখন তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বরুণ চক্রবর্তীকে। পরে আরও একটি ছবি দেখা যায়। ভারতের রিঙ্কু ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর কাছেই দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের ফাহিম। দু’জনের মুখেই হাসি। দেখে মনে হচ্ছে, হাসি-ঠাট্টা করছেন তাঁরা। এক বারও দেখে মনে হয়নি, ক্রিকেটারদের মধ্যে কোনও সমস্যা রয়েছে। ছবিগুলি সামনে আসার পরেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি বোর্ডের চাপেই কি হাত মেলাচ্ছেন না দু’দলের ক্রিকেটারেরা? কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা ও তার পরে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পর থেকে ভারত-পাক সম্পর্ক উত্তপ্ত। সেই উত্তাপ ছড়িয়েছে ক্রিকেট মাঠেও। গত বছর এশিয়া কাপে তিন বার ভারত ও পাকিস্তান মুখোমুখি হয়। তিন বারই করমর্দন হয়নি। ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর ও অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব স্পষ্ট করে দেন, দেশের মানুষের পাশে তাঁরা রয়েছেন। খেলতে হচ্ছে বলে খেলছেন। বাড়তি কিছু তাঁরা দেখাবেন না। এমনকি, এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানকে হারানোর পর পাক বোর্ডের প্রধান তথা এশীয় ক্রিকেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মহসিন নকভির কাছ থেকে ট্রফি নিতেও চাননি তাঁরা। এশিয়া কাপের ট্রফি এখনও ভারত পায়নি। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আরও এক দফা নাটক হয়। পাকিস্তান সরকার জানিয়ে দেয়, তারা বিশ্বকাপে খেললেও ভারতের বিরুদ্ধে খেলবে না। আট দিন ধরে সেই নাটক চলে। পরে অবশ্য আইসিসি, সম্প্রচারকারী সংস্থা ও বেশ কিছু ক্রিকেট বোর্ডের চাপে পিছু হটে পাকিস্তান। খেলতে রাজি হয়।





