RK NEWZ ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের করিডরে বসে যে পোস্টাল ব্যালট পৃথকীকরণের কাজ চলছিল, সেই বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলিকে আগেই ই-মেল করে জানানো হয়। বৃহস্পতিবার রাতে সাংবাদিক বৈঠক করে তৃণমূলের অভিযোগ নিয়ে এমনটাই জানাল নির্বাচন কমিশন। তাদের তরফে আরও জানানো হয়, স্ট্রংরুমে বিদ্যুৎ সংযোগ রাখা যায় না। আইন মেনে তাই টর্চ নিয়ে কাজ চলছিল। এখনও সেই কাজ চলছে। সাখাওয়াত মেমোরিয়ালের গণনাকেন্দ্রের স্ট্রংরুমে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়ে ভুল করেননি, জানান রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজকুমার অগ্রবাল। তৃণমূলের অভিযোগ, ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রের স্ট্রংরুমের ভিতরে ‘সন্দেহজনক গতিবিধি’ লক্ষ্য করা গিয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, সেখানে নিয়ম না-মেনে পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত কাজ করা হয়েছে। তা-ই নিয়েই উত্তর কলকাতার জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) স্মিতা পাণ্ডে জানান, ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের ইভিএম রয়েছে। বুধবার ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোটগ্রহণের পরে ইভিএমগুলি স্ট্রংরুমে সিল করা রয়েছে। স্ট্রংরুমগুলি সিল এবং বন্ধ রয়েছে। ভিতরে সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে, তার ফুটেজ বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, বিধিবদ্ধ ভাবে পোস্টাল ব্যালট পৃথকীকরণ করতে হয়। ভোটকর্মীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেন। দ্বিতীয় দফার ভোটে সরকারি কর্মচারীরা ট্রেনিং সেন্টারে ভোট দিয়েছেন। সেই পোস্টাল ব্যালটগুলি জমা করে রেখে দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের তরফে স্মিতা আরও জানান, ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে সাতটি ইভিএমের স্ট্রংরুম রয়েছে এবং একটি পোস্টাল ব্যালটের স্ট্রংরুম রয়েছে। বৃহস্পতিবার সারা রাজ্য জুড়েই বিধানসভা অনুযায়ী পোস্টাল ব্যালট পৃথকীকরণের কাজ চলছে। অন্য বিধানসভার পোস্টাল ব্যালট তাঁদের দেওয়া হবে এবং তাঁদের সাতটি বিধানসভার পোস্টাল ব্যালট তাঁরা নিয়ে নেবেন। তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসারেরা করিডরের মধ্যে বসেই পৃথকীকরণের কাজ করছিলেন। টর্চ লাইট নিয়ে এখনও সেই কাজ চলছে। (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টায় সব রাজনৈতিক দলকে ইমেইল করে জানানো হয়েছে, বিকেল ৪টে থেকে ওই কাজ শুরু হবে। রিটার্নিং অফিসারদের আমরা বলেছিলাম প্রার্থী এবং তাঁদের এজেন্টকে এই বিষয়টি জানাতে। তাই জানানো হয়নি এই অভিযোগ মিথ্যা।’’ মনোজ বলেন, ‘‘নিয়ম অনুযায়ী ওই স্ট্রংরুমে যে সাতটি আসনের ইভিএম রয়েছে, শুধু সেখানকার প্রার্থী এবং তাঁদের এজেন্টরাই যেতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরের প্রার্থী। তিনি উত্তর কলকাতার ওই সাতটি আসনের কোনওটিতেই প্রার্থী নন। দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুরে যেখানে স্ট্রংরুম, সেখানে তিনি যেতে পারেন। ওখানে গিয়েছেন উনি। এখানে গন্ডগোলের কোনও সুযোগ নেই। আগামী কাল থেকে গণনা কেন্দ্রগুলিতে যাচ্ছি। সব জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের জন্য একটি প্রোটোকল তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের সার্টিফিকেট দিতে হবে যে, কমিশনের আইন ও নিয়ম মেনে গণনা কেন্দ্রগুলিতে বন্দোবস্ত করা হয়েছে। প্রয়োজনে গণনাকেন্দ্রে ১৬৩ ধারা জারি করা হবে। স্ট্রংরুমে যথেষ্ট নিরাপত্তা রয়েছে। যা হচ্ছে সেটা দুর্ভাগ্যজনক। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ভোটগণনা হয়েছিল ৯০টি কেন্দ্রে। ২০২১ সালের নির্বাচনে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১০৮। এ বার দু’দফায় কমে হল ৭৭। ১০৮ থেকে কমিয়ে ৮৭ করা হয়েছিল দু’সপ্তাহ আগে। এ বার রাজ্যে ভোটগণনা কেন্দ্রের সংখ্যা আরও কমিয়ে দিল নির্বাচন কমিশন! বৃহস্পতিবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, ২৯৪টি বিধানসভা আসনের ভোট গোনা হবে ৭৭টি কেন্দ্রে। কোন জেলায় কোথায় কোথায় গণনা চলবে, তার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। জেলা ধরে ধরে গণনাকেন্দ্রের ঠিকানাও জানিয়ে দিয়েছে কমিশন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে ভোটগণনা হয়েছিল ৯০টি কেন্দ্রে। ২০২১ সালের নির্বাচনে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১০৮। কিন্তু গত ১৭ এপ্রিল কমিশনের তরফে তা কমিয়ে ৮৭ করা হয়। এ বার তা আরও কমিয়ে ৭৭ করা হয়েছে। ভোটগণনার প্রাকমুহূর্তে গণনাকেন্দ্র পুনর্বিন্যাসের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। রাজ্যের সিইও মনোজ অগ্রবাল বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, প্রয়োজনে গণনাকেন্দ্রের সংখ্যা ৭৭-এর চেয়েও কমতে পারে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছি। তার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’ আলিপুরদুয়ারে ১, বাঁকুড়ায় ৩, বীরভূমে ৩, কোচবিহারে ৫, দক্ষিণ দিনাজপুরে ২, দার্জিলিঙে ৩, হুগলিতে ৫, হাওড়ায় ৪, জলপাইগুড়িতে ২, ঝাড়গ্রামে ১, কালিম্পঙে ১, কলকাতায় ৫ (উত্তরে ১, দক্ষিণে ৪), মালদহে ২, মুর্শিদাবাদে ৫, নদিয়ায় ৪, উত্তর ২৪ পরগনায় ৭, পশ্চিম বর্ধমানে ২, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৩, পূর্ব বর্ধমানে ৪, পূর্ব মেদিনীপুরে ৪, পুরুলিয়ায় ৩, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৬ এবং উত্তর দিনাজপুর জেলায় ২টি গণনাকেন্দ্র থাকবে। কলকাতার ১১টি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট গোনা হবে পাঁচটি কেন্দ্রে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে বাবা সাহেব অম্বেডকর এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয়, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম, শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল, ডায়মন্ড হারবার রোডের সেন্ট থমাস বয়েজ় স্কুলে ভোটগণনা হবে সোমবার। রাজ্যে সবচেয়ে বেশি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনায়। সেখানকার ৩৩টি আসনের ভোট গোনা হবে আটটি কেন্দ্র থেকে। তার মধ্যে রয়েছে বারাসত গভর্নমেন্ট কলেজ অ্যান্ড হাইস্কুল, বসিরহাট হাই স্কুল, বসিরহাট পলিটেকনিক কলেজ, বিধাননগর কলেজ, বনগাঁর দীনবন্ধু মহাবিদ্যালয়, পানিহাটির গুরুনানক কলেজ ক্যাম্পাস এবং ব্যারাকপুরের রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ৩১টি আসনের ভোট গোনা হবে ৬টি কেন্দ্রে। যাদবপুরের এপিসি রায় পলিটেকনিক কলেজ, ক্যানিংয়ের বঙ্কিম সর্দার কলেজ, ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, আলিপুরের বিহারিলাল কলেজ, হেস্টিংস হাউস কমপ্লেক্স এবং কাকদ্বীপের সুন্দরবন মহাবিদ্যালয়। আলিপুরদুয়ারের পাঁচটি আসনের গণনা হবে আলিপুরদুয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে। জলপাইগুড়ির সাতটি আসনের গণনা দু’টি কেন্দ্রে হবে— উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস এবং পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়। কালিম্পঙের একটি আসনের গণনা হবে স্কটিশ উইনিভার্সিটিস মিশন ইনস্টিটিউশন। ঝাড়গ্রামের চারটি আসনের গণনা হবে রানি ইন্দিরা দেবী সরকারি স্কুলে।
বাংলার মন বোঝা নয়কো সোজা! পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার কার?
এক্সিট পোল নিয়ে উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতি। কে জিতবে, কে হারবে তা নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। অধিকাংশ এক্সিট পোলই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপির। তবে খানিকটা এগিয়ে গেরুয়া শিবির। আবার দু-একটি এক্সিট পোলে ইঙ্গিত দিচ্ছে তৃণমূলের প্রত্যাবর্তনেরও। তাৎপর্যপূর্ণভাবে সি ভোটার, টুডে’জ চাণক্য এবং অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়ার মতো তথাকথিত গ্রহণযোগ্য এবং নামী সমীক্ষক সংস্থা বুধবার নিজেদের সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশই করেনি। বৃহস্পতিবার কিছু কিছু সংস্থা নিজেদের রিপোর্ট প্রকাশ করবে। কিন্তু অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া নিজেদের সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশই করবে না। আসলে বাংলার ক্ষেত্রে এক্সিট পোল কাজটা বরাবরই বেশ কঠিন। এখানকার রাজনীতি সচেতন মানুষ সচরাচর কোনও সমীক্ষক সংস্থাকে সঠিক তথ্য দেন না। তাছাড়া বাংলার মহিলা ভোটাররা নির্বাচনের ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নেন। যে তথ্য অনেক সময় বুথ ফেরত সমীক্ষায় ধরা পড়ে না। সম্ভবত সেকারণেই সেই ২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে এক্সিট পোলের ফলাফল অন্তত বাংলার ক্ষেত্রে অন্তত মেলেনি। তাই প্রদীপ গুপ্তারা হয়তো সেকারণেই এবার ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। স্বাভাবিকভাবেই অন্য সমীক্ষক সংস্থাগুলির সমীক্ষা এবার আরও বড় প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল।
ভোটের দিন নজিরবিহীনভাবে সাতসকালে বাসভবন থেকে বেরিয়ে বুথে বুথে ঘুরেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোট পর্ব মিটতেই ভিডিও বার্তায় তিনি জানালেন, নিজেই পাহারা দেবেন ইভিএম। এমনকী গণনার দিন প্রার্থী হিসেবে থাকবেন গণনাকেন্দ্রে। তিনি একা নন, দলের সমস্ত প্রার্থীদের কাউন্টিং সেন্টারে থাকার নির্দেশ দিলেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, স্ট্রং রুম থেকে গণনাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার সময়ও ইভিএম বদল করা হতে পারে। গণনার সময় কারচুপির সম্ভাবনা প্রবল বলেও দাবি তাঁর। কর্মী ও রাজ্যবাসীর জন্য ভিডিওবার্তা প্রকাশ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি জানান, তৃণমূলই সরকার গড়বে, কারও চিন্তার কোনও কারণ নেই। তবে বিজেপি যে গণনায় কারচুপির চেষ্টা করবে, তা নিয়ে মোটের উপর নিশ্চিত তৃণমূল সুপ্রিমো। তাই প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ইভিএম পাহারা দিতে হবে। আমার এলাকায় পাহারা দেব আমি। ২৯৪ আসনের প্রার্থীরা নিজে পাহারা দিন। রাত জেগে থাকুন। আমি যদি পারি, আপনারাও পারবেন। কারণ, গণনাকেন্দ্রে ইভিএম নিয়ে যাওয়ার সময় তা বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, তিনি নিজে প্রার্থী হিসেবে গণনাকেন্দ্রে থাকবেন। তাঁদের নির্দেশ, সকল প্রার্থী থেকে গণনাকেন্দ্রে থাকেন। অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া যেন একমুহূর্তের জন্যও কেউ না সরেন। মমতার কথায়, “যদি উঠতেই হয়, এমন কাউকে রেখে যাবেন যিনি টাকায় বিক্রি হবে না।” তিনি আরও স্পষ্ট করে বললেন, “আমি যতক্ষণ সাংবাদিক বৈঠক করে না বলব, ততক্ষণ কেউ গণনার টেবিল ছাড়বেন না।” পাশাপাশি কর্মীদের শান্ত ও সংযত থাকার জন্য অনুরোধও করেছেন দলনেত্রী। নিশানা করেছেন বিজেপি ও কমিশনকে।
সোমবার সকাল ৮টায় গণনা শুরু, বেলা ১২টার মধ্যেই স্পষ্ট হবে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার কার হাতে তুলে দিলেন রাজ্যবাসী। দুই দফায় দেওয়া মানুষের রায় এখন স্ট্রংরুমে বন্দি। আগামী সোমবার সেই ভোট গোনার কাজ হবে। ভোট গোনার জন্য আলাদা ভাবে গণনাকক্ষ তৈরি করা হবে। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছে স্ট্রংরুম। পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের রায় যন্ত্রবন্দি হয়ে গিয়েছে। অপেক্ষা শুধু সেই রায় ঘোষণার। কার ভাগ্যে কত ভোট জুটল, কোন দল জিতছে, কারা বসতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গের মসনদে— তা সবই স্পষ্ট হবে ভোটগণনার পরেই। তবে গণনা সমাপ্ত হওয়ার আগেই একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়ে যায়। আগামী ৪ মে, সোমবার যন্ত্রবন্দি মানুষের রায় গোনার কাজ শুরু হবে সকাল ৮টা থেকে। কখনও-সখনও কোনও কেন্দ্রের গণনা শেষ হতে রাতও পেরিয়ে যায়। গণনার শুরুতেই পোস্টাল ব্যালট গোনা হয়। তার পরে শুরু হয় ইভিএমের ভোটগণনা। গণনা শুরুর চার ঘণ্টার মধ্যে অর্থাৎ, দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটের ফলের প্রাথমিক ধারণা আসতে শুরু করে। অর্থাৎ ওই সময়ের মধ্যেই কয়েক রাউন্ডের গণনা শেষ হয়। ফলে কারা জিতছেন, কারা হারছেন— তার ইঙ্গিত মোটের উপর স্পষ্ট হতে শুরু করে। তবে ব্যতিক্রমও থাকে। কোনও কোনও কেন্দ্রের লড়াই চলে হাড্ডাহাড্ডি। সাধারণত দুই প্রার্থীর মধ্যে এই লড়াই চলে। কখনও এক জন এগিয়ে থাকেন, পরের রাউন্ডেই এগিয়ে যান অন্য জন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে লড়াইয়ে থাকে দুইয়ের বেশি প্রার্থীও। পশ্চিমবঙ্গে দু’দফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৩ এপ্রিল। ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা। দু’দফায় দেওয়া মানুষের রায় এখন স্ট্রংরুমে বন্দি। আগামী সোমবার সেই ভোট গোনার কাজ হবে। ভোটারেরা নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন ইভিএমে। ইভিএমের দু’টি অংশ। এক, ব্যালট ইউনিট। দুই, কন্ট্রোল ইউনিট। সব বুথেই ইভিএম মেশিনের পাশে ছিল একটি ভিভিপ্যাট মেশিন। ভোটারেরা ইভিএমে বোতাম টিপে নিজের মত জানান। তবে তিনি যেখানে ভোট দিলেন, সেই প্রার্থীর নামেই ভোটটি সংরক্ষিত হল কি না, তা ভোটারেরা দেখতে পান ভিভিপ্যাট মেশিনে। ভোটদানের পর ইভিএম মেশনগুলিকে বুথে উপস্থিত সকল বুথ এজেন্টের সামনে ‘সিল’ করে দেওয়া হয়। তার পরে সেগুলিকে নিয়ে যাওয়া হয় স্ট্রংরুমে। গণনার দিনের আগে পর্যন্ত স্ট্রংরুমে কড়া পাহারার মধ্যে থাকে ইভিএম মেশিনগুলি। গণনার দিন নির্বাচন কমিশনের আধিকারিক ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ওই ‘সিল’ খোলা হয়। ইভিএম মেশিনে সংরক্ষিত ভোটগুলিকে গোনার কাজ করেন আধিকারিকেরা।
স্ট্রংরুমে ইভিএমগুলি থাকে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্বে। ২৪ ঘণ্টাই স্ট্রংরুমগুলির পাহারায় থাকে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আগে স্ট্রংরুমগুলির নিরাপত্তায় ২০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। ওই সংখ্যা আর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্ট্রংরুম পাহারা দেওয়ার জন্য ন্যূনতম ২৪ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। স্ট্রংরুমগুলিতে সর্ব ক্ষণ সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হয়। কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ, স্ট্রংরুমের বাইরের এলাকায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। স্ট্রংরুমে থাকবে একটি মাত্র প্রবেশপথ। ওই ঘরের দরজায় রয়েছে ‘ডবল লক সিস্টেম’। কে, কখন স্ট্রং রুমে ঢুকছেন, কখন বার হচ্ছেন, সবটাই লিখে রাখতে হচ্ছে লগবুকে। দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক সেই কাজ করছেন অহরহ। স্ট্রংরুমের পাশাপাশি ভোট গোনার জন্য আলাদা ভাবে গণনাকক্ষ তৈরি করা হবে। সেটিও সুরক্ষিত থাকবে। প্রতিটি কক্ষের জন্য আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ থাকবে, সেটাই নিয়ম। গণনাকক্ষ যদি বড় হয়, তবে সেটিকে নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে ভাগ করে দেওয়া হয়। কোনও ভাবেই এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে সরাসরি যাওয়া যাবে না। ইভিএম আনা-নেওয়ার জন্য আলাদা নিরাপদ পথ রাখতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
গণনাকক্ষে সকলের প্রবেশের অনুমতি নেই। গণনাকক্ষের মধ্যে থাকতে পারবেন রিটার্নিং অফিসার, সহকারি রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ, টেকনিক্যাল স্টাফ, কাউন্টিং সুপারভাইজ়ার, কমিশনের অনুমোদিত ব্যক্তি ও অবজ়ার্ভার, দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী, প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্ট। গণনাকেন্দ্রে থাকছে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গণনাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ মিটার এলাকায় কোনও যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানকার নিরাপত্তায় থাকছে রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশ এবং গণনাকক্ষের মধ্যেকার অংশ থাকবে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর দখলে। তল্লাশির পরেই ভিতরে যাওয়ার অনুমতি মিলবে। মোবাইল, অস্ত্র ইত্যাদি জমা রাখতে হবে। গণনাকক্ষের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কেন্দ্রীয় বাহিনী। গণনাকেন্দ্রে যাঁদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে, তাঁদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) থাকে। এ বার সেই পরিচয়পত্রের সঙ্গে থাকবে কিউআর কোড। ওই কোড স্ক্যান করেই যাচাই করা হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেওয়া অনুমতিপত্র। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র করতে গণনাকেন্দ্রে ঢোকার মুখে এক বার আইডি কার্ড পরীক্ষা করা হবে। গণনাকক্ষে যাওয়ার পথে আবার এক বার আইডি কার্ড যাচাই করবেন নিরাপত্তাকর্মীরা। শেষ বার গণনাকক্ষে ঢোকার মুখে পরীক্ষা হবে। সেখানেই আইডি কার্ডে থাকা কিউআর কোড স্ক্যান করতে হবে। ইভিএম বা ব্যালটের ছবি তোলা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ। রিটার্নিং অফিসার, পর্যবেক্ষক ছাড়া গণনাকক্ষে কারও মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতি নেই। পুরো গণনাপ্রক্রিয়ার ভিডিয়োগ্রাফি বাধ্যতামূলক। ভিডিয়োগ্রাফি করা হবে স্ট্রংরুম খোলা, ইভিএম আনা, ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণার। এই সব ভিডিয়ো নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে— স্পষ্ট নির্দেশ কমিশনের।
স্ট্রংরুম থেকে ইভিএম আনা হয় গণনাকক্ষে। তার পরে সিল এবং ট্যাগ ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। গণনা-টেবিলে প্রার্থী বা তাঁর এজেন্টদের সামনে তা খোলা হয়। সাধারণত একটি গণনাকেন্দ্রে ১৪টি টেবিল থাকে। প্রত্যেক বার ১৪টি টেবিলে গণনা সম্পন্ন হলে এক রাউন্ড হয়। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে একটি ‘রেজাল্ট’ বোতাম থাকে। সেই বোতাম টিপলেই জানা যায় ভোটসংখ্যা। মোট কত ভোট পড়েছে, কোন প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন, তা নির্দিষ্ট ফর্মে লেখা হয়। তার পরে প্রতিটি রাউন্ডের ফল ঘোষণা করা হয়। গণনা শেষে নির্দিষ্ট বুথের ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হয়। মিলিয়ে দেখা হয় কন্ট্রোল ইউনিটের সঙ্গে। গণনার হিসাব রাখার জন্য মূলত দু’টি ফর্ম ব্যবহার করা হয়। ফর্ম ১৭সি এবং ফর্ম ২০। ফর্ম ১৭সি-র প্রথম অংশ পূরণ করেন প্রিসাইডিং অফিসার। সেই অংশে থাকে— মোট কত জন ভোট দিয়েছেন, কত ভোট ইভিএমে রেকর্ড হয়েছে— গণনার সময় এটি ব্যবহার হয়। দ্বিতীয় অংশ পূরণ করেন গণনা পর্যবেক্ষক। এই অংশে থাকে নোটায় কত ভোট পড়েছে, প্রতিটি প্রার্থী কত ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় অংশের ফলাফল প্রথম অংশের মোট ভোটের সঙ্গে মিলতেই হবে। যদি দুই হিসাব না মেলে তবে গণনায় বা অন্য কোনও গরমিল হয়েছে বলে ধরা হয়।
ফর্ম ২০ হল ভোট গণনার চূড়ান্ত ফলাফলের ‘শিট’। এখানে পুরো কেন্দ্রে প্রতিটি প্রার্থী মোট কত ভোট পেয়েছেন— সব একসঙ্গে লেখা থাকে। এখান থেকে জানা যায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্র অনুযায়ী ভোটের হিসাব, প্রতিটি প্রার্থীর মোট ভোট, নোটা ভোট এবং মোট ভোটের সংখ্যা। প্রতিটি গণনা টেবিল থেকে ফর্ম ১৭সি-র দ্বিতীয় অংশ নেওয়া হয়। সেখানকার তথ্য যোগ করে বানানো হয় ফর্ম ২০। প্রতিটি বুথের ফল লেখা হয় ফর্ম ২০-তে। সেই ফল ঘোষণা করা হয়। কাউন্টিং এজেন্ট বা প্রার্থী সেটা লিখে রাখতে পারেন।পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বুথফেরত সমীক্ষার অধিকাংশেই এগিয়ে বিজেপি। কোনও কোনও সমীক্ষায় আবার তৃণমূল এগিয়ে রয়েছে। তবে সর্বত্রই বিজেপি এবং তৃণমূলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় ‘চাণক্য টুডে’ তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। সেই সমীক্ষার ইঙ্গিত, এ বারে ভোটে বড় ব্যবধানে জয় পেতে পারে বিজেপি। ‘চাণক্য টুডে’র অনুমান, পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি বিধানসভার মধ্যে কমবেশি ১৯২টি আসন পেতে চলেছে বিজেপি। আর তৃণমূলের ঝুলিতে যেতে পারে ১০০টি আসন। ২টি আসন পেতে পারে অন্যান্যরা। ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক নির্বাচনী জনমত সমীক্ষা মেলে না। তবে মিলে যাওয়ার কিছু উদাহরণও রয়েছে।
মমতা জিতলে সেটাও তো একটা অঘটনই! তুঘলকি সিদ্ধান্তে আবার হিতে বিপরীত না হয়ে যায়!
‘আপনারা কারা? না, না শুধু ‘লেবার’ বা ‘শ্রমিক’ বললে তো হবে না। পরিযায়ী, অতিথি নাকি…?’ কখনও কখনও এমন বেয়াড়া প্রশ্ন ছিটকে এলেও দয়া করে অবাক হবেন না। জানেনই তো, দেশ, দশ, নেতা-মন্ত্রী, সরকার সকলেই আপনাদের নিয়ে সর্বক্ষণ ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে পড়েন। আর পড়েন বলেই তো ভোটের ঠিক আগে আগে আপনাদের কাছে ফোন যায়। যেমনটা গিয়েছিল এ বারেও, ‘শুধু ভোটটা দিয়ে যা বাবা। চাইলে যাতায়াত ভাড়াও দিয়ে দেবো। সব্বাই গুছিয়ে চলে আয়। মাথায় রাখবি, এ বারের ভোটটা কিন্তু অন্য ভোটের চেয়ে বিলকুল আলাদা।’ কখনও কখনও প্রশাসন কিংবা নির্বাচন কমিশন গণতান্ত্রিক উৎসবে শামিল হতে আপনাদের আমন্ত্রণ জানায়, ‘আসুন, আসুন শ্রমিকভাই, ভোট দিয়ে যান।’ টুং-টাং আওয়াজ তুলে মোবাইলে ঢুকতে থাকে এসএমএস, হোয়াটসঅ্যাপ। আপনারা ভয় পান কিংবা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ভেবে আনন্দ পান। তারপরে লোটাকম্বল গোছগাছ করে বাড়ির পথে রওনা দেন। যেমনটা দিয়েছেন এ বারেও। কিন্তু দিনকয়েকের জন্য বাড়ি ফিরেও কি শান্তিতে দু’দণ্ড থাকতে পারছেন? সকালে লাল, দুপুরে গেরুয়া আর বিকেলে সবুজ কড়া নাড়ছে বাড়ির দরজায়। সব দলের একটাই আবদার, ‘ভোটটা কিন্তু আমাদেরই দিও। আর তোমাকে নতুন করে কী বলব, তুমি তো আমাদেরই ছেলে।’ কী, নিজেকে বেশ ‘কেউকেটা’ মনে হচ্ছে? চোখের পাতা যখন লেগে আসছিল, তখনও সকলেই ভেবেছিলেন, ট্রেন তো বন্ধ। কিন্তু মালগাড়ি যে চলছে, সে কথা কারও মাথায় আসেনি। কাকভোরে ১৬ জন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ক্ষুধার্ত শ্রমিকের উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল একটা খালি মালগাড়ি। আড়মোড়া ভেঙে সূর্য তখনও ধাতস্থ হয়নি। ইঞ্জিনের গর্জন আর চাকার ঘড়ঘড়ানিতে ঢাকা পড়ে গেল গোঙানি, কান্না, হাহাকার। জীবন ও মৃত্যুর মতো সমান্তরাল ভাবে বয়ে চলা রেললাইনের পাথরের উপরে পড়ে ছিল রুটির টুকরো, ছেঁড়া চটি, গামছা, দাঁতন, সস্তার মাস্ক আর ছিন্নভিন্ন দেহ।
কাজ বন্ধ। জমানো টাকা শেষ। পেটে দানাপানি নেই। মাথার উপরে চৈত্রের রোদ। পা আর চলতে চাইছিল না। তবুও আপনারা হেঁটেছেন। হেঁটেই চলেছেন। সেই জীবন-মরণের সীমানা পেরোতে পেরোতে আপনাদের চোখে ভেসেছে গাঁয়ের বাড়ি, কাঁঠাল গাছের মিঠে ছায়া, টলটলে পুকুর আর গরম ভাত। দু’বেলা সেই নিশ্চিত ভাত আর সংসারে একটু গতি আনতেই তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন আপনি, আপনারা। গ্রামে কাজ নেই। থাকলেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক নেই। এ দিকে খরচের বহর ক্রমেই বেড়ে চলে। সে সব সামাল দেওয়া কি মুখের কথা! যেখানে পারিশ্রমিক বেশি সেখানেই শ্রমিকেরা যাবেন। এটাই সহজ সত্যি। সেই কারণেই অভাবের সংসারে প্রায়ই শুনতে হয়, ‘আর কত দিন এ ভাবে চলবে? এ বার অন্তত বাইরে কোথাও কাজের চেষ্টা করো।’ বাইরে বলতে অন্য রাজ্যে। ফলে ভিড় বাড়তে থাকে ট্রেনে। কেরল, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান— গন্তব্যের নামগুলো শুধু বদলে যায়।
ভিন্রাজ্যে কষ্ট আছে। কিন্তু টাকাও আছে। গাঁয়ের থেকে বেশি মজুরি। ওভারটাইম করলে আরও। বাড়ি থেকে ফোন যায়। ফোনের ও-প্রান্ত থেকে আপনারা আশ্বাস দেন, ‘কিচ্ছু ভেবো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ সেই আশ্বাসে আপনার স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়ে টিউশন নিতে যায়। শৌচাগারের ছাদ পোক্ত হয়। উদ্ধার হয় গিন্নির বন্ধক রাখা গয়না। বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে জমতে থাকে ইট। পাকা হয় বোনের বিয়ে। বৃদ্ধা বাবা-মায়ের জন্য কেনা হয় ওষুধ। বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থাকা আপনারা বিপদে পড়লে সবার আগে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন আপনাদের বাবা-মা-পরিবার। তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে ফোন করেন, ‘টাকা-পয়সার দরকার নেই। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আয়। তোর জন্য চিন্তায় মরে যাচ্ছি।’ কিন্তু ‘ফিরব’ বললেই কি ফেরা যায়? তখন তো ভোট থাকে না। আপনাদের কথাও কারও মনে থাকে না। রাষ্ট্রও ব্যস্ত হয়ে পড়ে তার অজস্র জরুরি কাজ নিয়ে। আর তাই তো বারাণসী থেকে ক্যানিংয়ের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করেন কোনও শ্রমিক। বলেন, ‘মা কাঁদছে ঘরে। বারবার ফোন করছে। তাই আর থাকতে পারিনি ওখানে। টানা পাঁচ দিন হাঁটছি।’ আপনারা হাঁটেন। আপনারা কাজ করেন। আপনাদের ঘামে ভেজা অর্থেই চাঙ্গা হয় স্থানীয় অর্থনীতি। প্রত্যন্ত গ্রামেও মাথা তুলে দাঁড়ায় বস্ত্র, হার্ডওয়্যার ও আরও কত নতুন নতুন দোকান। পুজো ও ইদের সময়ে শুধু পরিবারই নয়, অপেক্ষায় থাকে আপনার এলাকার বাজারও। সেই পরবের মুখে বাজার কেমন, জানতে চাইলে উত্তর আসে, ‘কেরল-পার্টি সবে ফিরতে শুরু করেছে। ওরা ফিরলেই বাজার পুরোপুরি জমে যাবে।’ তখন আপনাদের খুব কদর। কিন্তু, আপনারা জড়িত থাকুন বা না থাকুন, কিছু একটা অঘটন ঘটলেই শুরু হয় অনর্থ। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পরে পরেই মালদহ, মুর্শিদাবাদের বহু শ্রমিককেই ট্রেনে যাতায়াত করার সময়ে শুনতে হয়েছে, ‘ওই যে, চলল সব! বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সাধারণ শ্রমিক। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সব এক একটা পাক্কা জঙ্গি!’ করোনার সময়েও যেমন অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ভিন্ রাজ্য থেকে আপনাদের মতো যাঁরা আসছেন তাঁরা সকলেই মূর্তিমান করোনা ভাইরাস! এ সব মন্তব্য, ধরে নেওয়ার জন্য কোনও পরীক্ষা, রিপোর্ট, তথ্য, পরিসংখ্যানের দরকার হয় না। স্রেফ দাগিয়ে দিতে পারলেই হলো! কোথাও কোথাও তো মজুত করে রাখা হয়েছিল জীবাণুনাশক রাসায়নিকও। গ্রামে শ্রমিকরা ঢুকতেই তাঁদের শরীরে স্প্রে করে দেওয়া হয় সেই জীবাণুনাশক স্প্রে। বারবার আকারে, ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, করোনার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাহক আসলে ওই শ্রমিকরাই! ওঁরা এলাকায় ঢুকলেন মানেই সব শেষ! এক বারও কেউ ভাবেননি এমন সঙ্কটের দিনে পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন যে কেউ। সেখানে হরিপদ কেরানি, আমলাপুত্র ও নজিমুদ্দিন সকলেই এক। অথচ, প্রকট বৈষম্যকে সাক্ষী রেখেই করোনা ও করুণা বদলে ফেলেছিল তাদের নিজস্ব গতি কিংবা ভাবনাপথ!
হুজুগে আমজনতার কথা বাদ দিন, প্রশাসন কিংবা সরকারও কি আপনাদের কোনও তথ্য বা পরিসংখ্যান রাখে? শ্রম আইন মেনে কতটাই বা আপনাদের স্বার্থ দেখা হয়? শুধু কখনও প্রাকৃতিক বিপর্যয় কিংবা বড় কোনও অঘটন ঘটে গেলে হইহই শুরু হয়। নিরাপত্তা, সুরক্ষা, বিমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশাসন ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মৃত্যু কিংবা জখম হলে ক্ষতিপূরণ মেলে। শুরু হয় অনুদানের রাজনীতি। কখনও কখনও পাশে থাকার বার্তা দিতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে গাজরের মতো সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় যৎসামান্য ভাতা।
আবার প্রহসনও কিছু কম হয় না। ২০১৯-এ কাশ্মীরের আপেল বাগানে কাজ করতে গিয়ে সন্ত্রাসবাদীদের গুলিতে মৃত্যু হয় বাংলার পাঁচ শ্রমিকের। ওই পাঁচ জনই ছিলেন মুর্শিদাবাদের বাহালনগরের বাসিন্দা। ওই ঘটনার পরে সাগরদিঘি ব্লক প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এলাকাতেই আপেল চাষ হবে! তা হলে ওই এলাকার শ্রমিকদের আর কাশ্মীরে যাওয়ার দরকার হবে না। বলাই বাহুল্য, সেই জ্ঞানবৃক্ষের ফল এখনও পুষ্ট হয়নি। ওই এলাকার বহু শ্রমিকের গন্তব্য আজও সেই কাশ্মীরই! করোনাকালে কেরল সরকারের তরফে আপনাদের নামের আগে ‘পরিযায়ী’ শব্দটির বদলে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘অতিথি’। এ বঙ্গে অবশ্য এখনও আপনাদের পরিচয় পরিযায়ীই। শীতে বাংলার আনাচকানাচে ভিড় করে পরিযায়ী পাখির দল। আর আপনারা বছরভর ছুটতে থাকেন ভিন্রাজ্যে। ভোটটা মিটলেই ফের যেমন ছুটবেন। কিন্তু সসম্মানে সুদিন কবে আসবে? উঁহু, ভুলেও কখনও রাষ্ট্রকে এ প্রশ্নটা করবেন না!
আচ্ছা, বছর ছয়েক আগের সেই করোনার কথা মনে আছে তো? আপনার মতো লক্ষ লক্ষ শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন ভিন্রাজ্যে। ভিডিয়ো কলে ঘুরেফিরে শোনা গিয়েছিল একটাই আর্তি— ‘খেতে পাচ্ছি না। ত্রাণ পাচ্ছি না। প্রশাসন আমাদের ফোন ধরছে না। নেতারা আমাদের সাহায্য করছেন না। আমাদের বাঁচান।’ সত্যি করে বলুন তো, তখন রাজনীতির ক’জন দাদা-দিদি আপনাদের পাল্টা ফোন করে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সহযোগিতার হাত? আপনাদের মতোই নিরুপায় হয়ে মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদের জলনা থেকে ২০ জন শ্রমিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। চড়া রোদে কষ্ট হবে বলে যাত্রা শুরু করেছিলেন সন্ধেয়। হাঁটা শুরু হয়েছিল বাসরাস্তা ধরে। কিন্তু নাকা-ঝামেলা এড়াতে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন রেললাইন। টানা ৪০ কিলোমিটার হাঁটার পরে শরীর আর চলছিল না। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল বলে এক শ্রমিক পিছিয়ে পড়েছিলেন। ১৬ জন শুয়ে পড়েছিলেন বদনাপুর ও কারমাডের মাঝামাঝি এলাকার রেললাইনেই। আর তিন জন ছিলেন রেললাইন থেকে একটু দূরে।
সকালে চার ঘণ্টার এই ছোটাছুটির পরে অবশ্য এলাকার তৃণমূল কর্মীরা একেবারে চাঙ্গা হয়ে যান। ততক্ষণে শুভেন্দু যে সব জায়গায় যাচ্ছেন, সেই সব জায়গাতে শুরু হয়েছে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ। শুভেন্দুর কনভয় নানা এলাকায় ঢুকতেই শোনা যাচ্ছে তৃণমূল বাহিনীর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। দিনের শেষে নিজের ডেরা থেকে বেরিয়ে ভোট দিতে যান মমতা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভোট দিয়ে বেরিয়ে দু আঙুল তুলে ‘ভিকট্রি সাইন’ দেখান। তারপর আরও এক দফায় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গড়বে তৃণমূল।’ যদিও দিনভর মমতার এই তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। সিপিএম প্রার্থী শ্রীজীব বিশ্বাসের কথায়, ‘অঘটন ঘটার মতো ভোট তো হয়নি। আমি জানি না আপনারা কোন অঘটনের কথা ভাবছেন, তবে আমাদের কাছে মমতা জিতলে সেটাও তো একটা অঘটনই।’ মমতা যখন অসীমের ফ্ল্যাটে রয়েছেন, নীচে তখন ধুন্ধুমার কাণ্ড। কারণ ঠিক তাঁর ফ্ল্যাটের নীচেই তখন উপস্থিত শুভেন্দু অধিকারী। এলাকা ঘিরে ফেলেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কিন্তু শুভেন্দু এলাকা ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মমতা বেরিয়ে আসেন। অসীমকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে একাধিক এলাকা চষে ফেলতে শুরু করেন। তারপর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ১১টা বাজতে না বাজতেই নিজের বাড়িতে ঢুকে পড়েন তৃণমূল নেত্রী। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলে যান, ‘তোমরা এবার তোমাদের মতো কাজ করো।’ সকাল সাড়ে ৭টা বাজার আগেই নিজের কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পাড়া চেতলায় ছুটে যান মমতা। সেখানে খানিকক্ষণ কাটানোর পরে নিজেই মোবাইল বের করে সাংবাদিকদের দেখান কী ভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁর এলাকায় ‘সন্ত্রাস’ চালাচ্ছে। একটা সময়ে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলতেও শোনা যায়। পরে অবশ্য সে বিষয়ে তেমন আর মুখ খোলেননি তিনি। চেতলা থেকে বেরিয়ে কলকাতা পুরসভার ৭০ নম্বর ওয়ার্ডেও যান মমতা। সেখানে দলীয় কাউন্সিলার অসীম বসুর বাড়ি এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে সময় কাটান মুখ্যমন্ত্রী। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে গভীর আলোচনা করতে দেখা যায় তাঁকে। অসীমের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁর বাড়িতে এসে হুমকি দিয়েছে। তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনকে শাসিয়ে গিয়েছে বাহিনী। মমতাও সেই অভিযোগ করতে থাকেন সমানে। ২০২১–এ শুভেন্দু-গড় নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এবার সেই শুভেন্দু অধিকারীই বিজেপির হয়ে ভবানীপুরে তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী। সে বার নন্দীগ্রামেও মমতাকে সকাল থেকে এমন ভাবে ভোট করাতে দেখেননি কেউ। দুপুরের পরে নন্দীগ্রামের বয়ালে একটি ভোটকেন্দ্রে যান মমতা। সেখানেই কয়েক ঘণ্টা বসে থাকেন। অভিযোগ ছিল, বিজেপি ওই বুথে ভোট লুঠ করছে। তারপর ফের নন্দীগ্রামে নিজের অস্থায়ী ঠিকানায় ঢুকে পড়েন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু এবার লড়াই তো তাঁর নিজের পাড়ায়, মহল্লায়। তারপরেও মমতা কেন এত তৎপর? প্রশ্নটা ছিল ভবানীপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে, এমনকী কর্মীদের মধ্যেও। ভবানীপুরের এখনও ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে ‘সার’-এর সময়ে হওয়া তৃণমূলের ভোট রক্ষা কেন্দ্রগুলি। কিন্তু এ দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত গড় রক্ষার মতো করেই প্রথমার্ধে ঘুরলেন পুরো এলাকা। আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কড়া অভিযোগ জানিয়ে আরও যেন চাগিয়ে দিলেন নিজের বাহিনীকে। যদিও বেলা ১২টার আগেই সেই তৎপরতায় পড়ল দাঁড়ি। মমতা যেন তখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। গাড়ি ঘুরিয়ে সেই যে ঢুকলেন নিজের বাড়ি, তারপর ফের বেরোলেন বিকেল চারটে নাগাদ—ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনে নিজের ভোট দেওয়ার জন্য। তাঁর দাবি, তিনি খবরগুলো পাচ্ছিলেন ভোটের আগের দিন রাত থেকেই। তাই ভোট শুরু না হতেই নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করলেন সকাল থেকে। কখনও বুথে বুথে ঘুরলেন, কখনও ঠায় বসে থাকলেন বুথ ক্যাম্পে, কখনও আবার চরকির মতো পাক খেলেন এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, কেবলই ভোট কেমন হচ্ছে তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে। তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বহু বিশেষজ্ঞই জানাচ্ছেন, বৃহস্পতিবার ভোটের দিন তাঁর এমন রণং দেহি চেহারা গত তিন দশকে দেখা যায়নি। রীতি মেনে দুপুর-বিকেলের দিকে একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দেওয়াটাই দস্তুর ছিল মমতার। কিন্তু এ বার সেই ছক নিজেই ভাঙলেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার অভিযোগ, ‘বুধবার রাত থেকে আমাদের কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কাউন্সিলার থেকে নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। মারধর করেছে। রক্তাক্ত করেছে। এত টেররিজ়ম চলছে। এ ভাবে কি ভোট হয়?’




