ম্যাচের মাঝেই গ্যালারিতে বাঙালি-বিদ্বেষের বিরুদ্ধে টিফো নামিয়ে প্রতিবাদ মোহনবাগান সমর্থকদের। আইএসএলের লিগ-শিল্ড এবং কাপ দু’টিই জিতেছিল মোহনবাগান। নতুন মরসুমের প্রথম ম্যাচেও একই ছন্দে সবুজ-মেরুন। জেমি ম্যাকলারেন এবং টম অলড্রেডের গোলে কেরল ব্লাস্টার্সকে ২-০ গোলে হারাল। শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল মোহনবাগানের। তবে নিজেদের অর্ধেই বেশির ভাগ সময়ে খেলছিল তারা। ৬ মিনিটের মাথায় দিমিত্রি পেত্রাতোস গোল লক্ষ্য করে শট নিলেও তা প্রতিহত হয়। মোহনবাগান চেষ্টা করছিল গোটা মাঠ ব্যবহার করে খেলার। বল এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পাঠিয়ে ম্যাচের দখল নেওয়ার চেষ্টা করছিল। মোহনবাগানের দাপট এতটাই ছিল যে কেরল টানা পাঁচটি পাসও খেলতে পারছিল না। বাঁ দিক থেকে বার বার কেরলকে বিপদে ফেলছিলেন রবসন। পেত্রাতোস খেলছিলেন মাঝমাঠে। তিনি বলের জোগান দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ৩২ মিনিটে বক্সের কাছাকাছি ফ্রিকিক পেয়েছিল মোহনবাগান। তবে লিস্টন কোলাসোর বাঁকানো শট সোজাসুজি কেরল গোলকিপার শচীনের হাতে যায়। কয়েক মিনিট পরেই এগিয়ে যায় মোহনবাগান। ডান দিক থেকে উঠে গিয়ে বক্সের মাঝে পাস দিয়েছিলেন পেত্রাতোস। পাস ঠিকঠাক হয়নি। কোনও মতে সেই বল ধরে চকিতে ঘুরে গিয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে গোল করেন ম্যাকলারেন। দুই অস্ট্রেলীয় ফুটবলারের বোঝাপড়া এগিয়ে দেয় মোহনবাগানকে। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই শুভাশিস বসুকে তুলে অমেয় রানাওয়াড়েকে নামান সের্জিয়ো লোবেরা। কেরলও দু’টি পরিবর্তন করে। ৫৩ মিনিটে আবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল মোহনবাগান। পেত্রাতোসের শট প্রতিহত হলেও বল আসে অমেয়র কাছে। কিন্তু ভাল করে শটই নিতে পারেননি তিনি। গোলের কাছাকাছি চলে গিয়েও ব্যর্থ হন লিস্টন। মোহনবাগানের দাপট বজায় ছিল প্রথমার্ধের মতোই। তবু গোল আসছিল না। দ্বিতীয় গোলের জন্য অপেক্ষা করতে হল সংযুক্তি সময় পর্যন্ত। রবসন চোট পেয়ে বেরিয়ে যান। একটি ফ্রিকিক পায় মোহনবাগান। অনিরুদ্ধ থাপার নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন টম। বিভিন্ন রাজ্যে যে ভাবে দিন দিন বাঙালি-বিদ্বেষ বেড়ে চলেছে এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন মোহনবাগান সমর্থকেরা। একটি টিফোয় লেখা ছিল, ‘বাঙালি ভারতকে দিয়েছে সম্মান, শিখিয়েছে মৈত্রী, নেতৃত্ব। আজ বাংলা বললে সে ‘বাংলাদেশি’: ধর্ম সংকটে জাতীয়তা’। টিফোয় ছিল সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজি নজরুল ইসলাম, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শিবদাস ভাদুড়ি এবং লিয়েন্ডার পেজের ছবি। ২ গোলে জিতে ৩ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ল মোহনবাগান। আরও বেশি গোলে জিততে পারত তারা। স্ট্রাইকারদের সুযোগ নষ্ট চিন্তায় রাখবে লোবেরাকে।
জেমি ম্যাকলারেন, টম অলড্রেডের গোলে জয় দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ লিগের অভিযান শুরু সবুজ-মেরুনের। যা নিয়ে খুশি মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বোস এবং সভাপতি দেবাশিস দত্ত। আগামী বছর কলকাতা লিগে ঘরের মাঠে খেলবে মোহনবাগান, সেই সুখবরও দিলেন কর্তারা। সৃঞ্জয়ের কথায়, “দল ভালো খেলেছে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল ফুটবলাররা দারুণ গতিশীল ফুটবল উপহার দিয়েছে। প্রথম ম্যাচে জেতাটা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন পর ফুটবল হল। অনুশীলন ম্যাচ খেলা আর লিগের ম্যাচ খেলা তো এক নয়। আমরা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। যেভাবে দল খেলছে, তাতে আশা তো করাই যায়।” বাগানের অন্দরমহলে ফুরফুরে পরিবেশটাকেও মাঠে দেখা গিয়েছে শনিবার। সবুজ-মেরুনের ‘প্রাণভোমরা’ দিমিত্রি পেত্রাতোসের উপর ভরসা রেখেছিলেন কোচ। তাঁকে মাঠেও দেখা গেল আরও বেশি পরিণত, আরও বেশি চনমনে। “খুব ভালো খেলেছে দিমি। অনেক রোগা হয়েছে। প্রচণ্ড পরিশ্রম করে খেলছে।” বলে দিলেন সবুজ-মেরুন সচিব। তবে কেরালা প্রতি-আক্রমণ নির্ভর ফুটবল খেলছিল যখন, সেই সময় কিঞ্চিত চাপে পড়ে গিয়েছিল দল, সে কথা স্বীকার করলেন। তবে কর্নারগুলো বক্সে প্লেয়ারদের হেডের কাছে গিয়েছে বলে খুশি তিনি। দেবাশিস দত্ত বলেন, “মোহনবাগান জিতেছে। এর জন্য খুবই আনন্দিত। তবে এত দিন পর ফুটবলটা যে আজ মাঠে গড়াল, সেটাই সবথেকে আনন্দ দিয়েছে। ফুটবলকে মাঠে ফিরিয়ে আনায় যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের ধন্যবাদ। আশা করি আইএসএল খুব ভালোভাবে হবে। মোহনবাগানও চ্যাম্পিয়ন হবে।” তিনি মনে করেন এদিনের ম্যাচের মাধ্যমে ভারতীয় ফুটবল অক্সিজেন পেল। “ফুটবল যখন শুরু হল তখন অক্সিজেন পেল। তবে আমার মনে হয়, পরে যে টেন্ডারটা আসবে তা আগামী ১৫-২০ বছরের জন্য হবে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটা সিঙ্গেল লেগের লিগ। এর মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে আমাদের পাশে থেকেছেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানাব। তাঁর জন্যই আমরা নিখরচায় যুবভারতীতে খেলছি। মোহনবাগানই একমাত্র ক্লাব, যারা প্লেয়ারদের টাকা কাটেনি। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর সহায়তা আমাদের জন্য বড় সাপোর্ট। আরও একটা কথা বলার আছে। হকিকে অ্যাস্ট্রো টার্ফে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। এর জন্য সামনের বছর কলকাতা লিগে ঘরের মাঠেই ফ্ল্যাড লাইটে খেলব। ময়দানে ফুটবল ফিরছে। যা সম্ভবপর হল অ্যাস্ট্রো টার্ফে হকি ফেরায়।”





