শীতে টাটকা মটরশুঁটির পাওয়া যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই মটরশুঁটি দিয়ে নানা সুস্বাদু রান্না শুরু হয়। কিন্তু মটরশুঁটি ছাড়ানোর পর তার খোসাগুলি আমরা প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় ভেবে আবর্জনায় ফেলে দিই। খুব কম মানুষই জানেন, এই মটরশুঁটির খোসাই ঘরের গাছের জন্য দারুণ প্রাকৃতিক সার হিসাবে কাজ করে। আসলে মটরশুঁটির খোসায় এমন বহু পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে প্রাকৃতিকভাবে নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম ও ফাইবার থাকে, যা গাছের শিকড়কে মজবুত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রান্নাঘরের বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে দামি রাসায়নিক সারের খরচও অনেকটাই কমানো সম্ভব। বর্তমানে ছাদ ও বারান্দায় গার্ডেনিংয়ের চল দ্রুত বেড়েছে। অনেকেই টবে ফুল, সবজি এবং অন্যান্য গাছ লাগাচ্ছেন। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, গাছ ঠিকমতো বাড়ছে না বা শুকিয়ে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হল মাটিতে পুষ্টির অভাব। এই পরিস্থিতিতে মটরশুঁটির খোসা দিয়ে তৈরি তরল সার গাছের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে। মটরশুঁটির খোসা থেকে সার বানানো খুবই সহজ এবং এর জন্য আলাদা কোনও বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। প্রথমে খোসাগুলি ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিতে হবে। তারপর সেগুলি মিক্সারে দিয়ে তিন গুণ জল যোগ করে ভাল করে ব্লেন্ড করে নিতে হবে। তারপর মিশ্রণটি একটি ছাঁকনির সাহায্যে ছেঁকে নিতে হবে, যাতে মোটা অংশগুলি আলাদা হয়ে যায়। ছেঁকে নেওয়া এই জলটাই আসল টনিক। স্প্রে বোতল বা মগের সাহায্যে টবের মাটিতে এটি ঢেলে দিতে পারেন। প্রতিদিন অল্প অল্প করে ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং গাছ প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে থাকে। কয়েক দিনের মধ্যেই পাতাগুলি আরও সবুজ দেখাতে শুরু করে এবং নতুন কুঁড়ি বেরোতে থাকে। পরিবেশবিদরাও রান্নাঘরের বর্জ্যকে সার হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেন। এতে একদিকে যেমন বাড়ির ভেজা আবর্জনা কমে, তেমনই পরিবেশের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। উপরন্ত এই পদ্ধতি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক হওয়ায় মাটি বা গাছের কোনও ক্ষতি হয় না। মটরশুঁটির খোসা ফেলনা নয়, বরং ঘরের বাগানের জন্য এক সহজলভ্য ও কার্যকর প্রাকৃতিক সার। রান্নাঘরের এই ছোট্ট বর্জ্যকে কাজে লাগালে যেমন গাছের স্বাস্থ্য ভাল থাকে, তেমনই কমে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা। পরিবেশবান্ধব এই অভ্যাস একদিকে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে, অন্যদিকে ঘরোয়া বাগানচর্চাকে আরও সুন্দর করে তোলে।
‘ঘরোয়া ঔষধালয়’। সামান্য সর্দি-কাশি বা ছোটখাটো শারীরিক সমস্যায় চিকিৎসকের কাছে ছোটার আগে, একবার ছাদের টবের দিকে তাকালেই মিলতে পারে সমাধান। রইল এমনই পাঁচটি ভেষজ উদ্ভিদের সন্ধান, যা সামান্য যত্নেই আপনার ছাদ বাগানকে ঔষধি গুণে ভরিয়ে তুলবে। বারান্দা হোক বা ছাদ, কিংবা বাড়ির বাগান, অথবা এক ফালি জানালা, সবুজের ছোঁয়া থাকলে যেমন দেখতে ভাল লাগে, তেমনই চোখের আরাম। অনেকেই বাহারি গাছ দিয়ে বারান্দা, ছাদ সাজান। কিন্তু শীত আসতে না আসতেই গাছপালা শুকিয়ে যাচ্ছে? শত যত্নের পরেও সাধের গাছ বাঁচাতে পারছেন না? তাহলে এই সহজ উপায়গুলো মাথায় রাখুন। এইভাবে যত্ন নিলে শীতেও বাগান সবুজ হয়েই থাকবে।
শীতকালে গাছের যত্ন নিতে সবার প্রথমে যেটা করতে পারেন মোটা করে ভেজা খড় বা পাতার আস্তরণ ছড়িয়ে দিন গাছের গোড়ায়। এতে মাটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে না, আর্দ্রতা বজায় থাকবে। আপনি যদি পাহাড়ি এলাকায় থাকেন, বরফপাতের সম্ভাবনা থাকলেও তা গাছকে রক্ষা করবে। নমনীয় গাছের বদলে জে গাছ রুক্ষতা সইতে পারে এমন গাছ লাগান শীতকালে। মনে রাখবেন, যত যাই করুন, সব গাছ কিন্তু ঠান্ডা সহ্য করতে পারে না। তাই ঠান্ডা সহ্য করে এমন গাছ, যেমন পালং শাক, ভয়লা, গাজর, ইত্যাদি চাষ করতে পারেন। শীতকালীন ফুলের গাছ যেমন গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, ইত্যাদি লাগাতে পারেন। বাড়ির যেখানে সূর্যের আলো পড়ে সেখানে গাছগুলো রাখার চেষ্টা করুন। উত্তর দিকে কোনও গাছ রাখা থাকলে, তাদের এনে বাড়ির দক্ষিণ দিকে রাখুন যাতে উত্তুরে হাওয়া না লাগে। যতটা পারেন গাছের গায়ে সূর্যের তাপ, আলো লাগার ব্যবস্থা করুন। প্রয়োজন পড়লে গাছের ডালপালা সামান্য ছেঁটে দিতে দ্বিধাবোধ করবেন না। এতে উপকার বই উপকার হবে না। বুঝে গাছে জল দিন। একগাদা জল দেবেন না, এতে যেমন গাছের শিকড় পচে যেতে পারে, তেমনই অল্প জল দিলেও এই শীতের মরশুমে হবে না। জল দেওয়ার আগে মাটিতে হাত দিয়ে দেখুন। যদি ভেজা লাগে তাহলে জল দেবেন না। যদি দেখেন শুকিয়ে গিয়েছে, তবে অবশ্যই ভাল করে জল দিন। জৈব সার দিতে ভুলবেন না এই সময় গাছকে। এতে গাছের বৃদ্ধি হয়। মরে যাওয়ার হাত থেকে আটকায়। এছাড়া যদি মনে করেন একজন মালি বা গাছ বিক্রেতাকে দিয়ে এই সময় দুই সপ্তাহে একবার করে অন্তত গাছের পরিচর্যা করিয়ে নিন। সহজ জিনিসগুলো মনে রেখে গাছের যত্ন নিলে শীতকালেও আপনার বাগান, জানাল, ছাদ সবুজ হয়ে থাকবে। প্রাণের গাছ শুকিয়ে যাবে না।
১। তুলসী
বাঙালি বাড়িতে তুলসীর মহিমা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটি শুধু আধ্যাত্মিক কারণেই পূজনীয় নয়, এর ভেষজ গুণের তালিকাও দীর্ঘ। সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা বা জ্বরের প্রকোপ কমাতে তুলসী পাতার রস অব্যর্থ। প্রতিদিন সকালে কয়েকটি তুলসী পাতা চিবিয়ে খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়। টবে এই গাছ লাগানো অত্যন্ত সহজ। রোজকার সামান্য যত্ন আর পর্যাপ্ত সূর্যালোকেই এই গাছ তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে।
২। ঘৃতকুমারী (অ্যালো ভেরা)
ত্বক ও চুলের যত্নে এই ‘জাদুকরী’ গাছের কোনও বিকল্প নেই। ঘৃতকুমারীর পাতার ভেতরের স্বচ্ছ শাঁস বা জেল সরাসরি ত্বকে লাগালে রোদে পোড়া ভাব, ব্রণ বা ফুসকুড়ির সমস্যা কমে। চুল পড়া রোধ করতে এবং চুলের গোড়া মজবুত করতেও এর জুড়ি মেলা ভার। এ ছাড়া, এর রস হজমশক্তি উন্নত করতে এবং শরীরকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এই গাছ লাগানোর জন্য বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয় না। অল্প জলেই এর প্রয়োজন মেটে, তবে খেয়াল রাখতে হবে টবে যেন জল জমে না থাকে।
৩। থানকুনি
প্রাচীন আয়ুর্বেদের এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই থানকুনি পাতা। পেটের সমস্যা, বিশেষত আমাশয় নিরাময়ে এর কার্যকারিতা বহু পরীক্ষিত। স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতেও এই পাতা অত্যন্ত উপকারী। শরীরের কোথাও কেটে বা ছড়ে গেলে থানকুনি পাতা বেটে লাগালে ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায়। ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে মাটি এই গাছের জন্য উপযুক্ত। অল্প ছায়াযুক্ত জায়গাতেও এই লতানে গাছ খুব ভালোভাবে বেড়ে ওঠে।
৪। পুদিনা
পুদিনার সতেজ গন্ধ মনকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য যথেষ্ট। হজমের গন্ডগোল, গ্যাস-অম্বল বা বমি ভাব কাটাতে পুদিনা পাতার রস সঞ্জীবনীর মতো কাজ করে। এটি মুখের দুর্গন্ধ দূর করতেও দারুণ কার্যকর। গরমের দিনে পুদিনার শরবত শরীর ও মনকে শীতল রাখে। এই গাছ খুব দ্রুত ছড়ায়, তাই একটি মাঝারি আকারের টবই এর জন্য যথেষ্ট। নিয়মিত জল দেওয়া ছাড়া এর জন্য বিশেষ কোনও পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।
৫। লেমনগ্রাস
আধুনিক জীবনযাত্রায় লেমনগ্রাসের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। এর সুগন্ধ যেমন রান্নার স্বাদ বাড়ায়, তেমনই এর ভেষজ গুণও অনেক। লেমনগ্রাস দিয়ে তৈরি চা সর্দি-কাশি ও জ্বর কমাতে সাহায্য করে। এটি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতেও কার্যকর। এ ছাড়া, এর তীব্র গন্ধ মশার মতো পোকামাকড়কে দূরে রাখতে সাহায্য করে। একটি বড় টবে অনায়াসেই লেমন গ্রাস চাষ করা যায়। সামান্য পরিশ্রমেই আপনার ছাদ বা বারান্দা হয়ে উঠতে পারে এক টুকরো সবুজ স্বর্গ।





