“ম্যাইনে সব লেকে আয়া”। ফাইলের সঙ্গে তিনি হার্ড ডিস্কও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করে নথি ছিনতাই! আইপ্যাক দফতরে মমতার অভিযান নিয়ে হাই কোর্টে মামলা করল ইডি। সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করে তল্লাশির মধ্যেই নথি ছিনতাই করা হয়েছে। আইপ্যাক দফতরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযান নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হল ইডি। মামলা দায়ের করতে চেয়ে হাই কোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা। অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা। রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের দফতরে বৃহস্পতিবার সকালে হানা দেয় ইডি। তল্লাশি চলে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতেও। ইডির তল্লাশির মধ্যেই প্রতীকের বাড়িতে পৌঁছে যান খোদ মমতা। সেখান থেকে বেরিয়ে সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরেও যান। হাতে ফাইল এবং ল্যাপটপ নিয়ে তাঁকে বেরোতে দেখা যায়। মমতা সংবাদমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করেন, তাঁর দলের রাজনৈতিক কৌশল ছিনতাই করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানের নেপথ্যে বিজেপিকে দায়ী করেন তিনি। দাবি করেন, ইডির অভিযান অগণতান্ত্রিক এবং অন্যায়। মমতার এই অভিযোগের মাঝে ইডির একটি বক্তব্য কেন্দ্রীয় সংস্থার বিভিন্ন সূত্র মারফত সংবাদমাধ্যমে পৌঁছোয়। তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই পশ্চিমবঙ্গের ছ’টি এবং দিল্লির চারটি জায়গ সহ মোট ১০টি জায়গায় বেআইনি কয়লা পাচার মামলায় তল্লাশি চলছে। কিন্তু সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করে দু’টি জায়গা থেকে নথি ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর হাই কোর্টে যায় কেন্দ্রীয় সংস্থা।

ইডির আধিকারিকেরা যখন আইপ্যাক দফতর এবং প্রতীকের বাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন, তখনই মমতা প্রবেশ করেন এবং ফাইল, ল্যাপটপ নিয়ে নিজের গাড়িতে তুলে রাখেন। প্রশ্ন হল, ইডি আধিকারিকেরা কি তাঁকে বাধা দেননি? তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আদৌ যোগাযোগ করেছিলেন? কারণ এটা স্পষ্ট যে, মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত অনেক পরে নেওয়া হয়েছে। ইডি সমাজমাধ্যমে একটি বিবৃতি জারি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘ইডির সদর দফতরের ইউনিট আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনে বেআইনি কয়লা পাচার মামলায় ১০টি জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছে। অনুপ মাজি কয়লা পাচারের সিন্ডিকেট চালাতেন এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে চুরি করে বেআইনি ভাবে কয়লা বাইরে পাঠাতেন। শান্তিপূর্ণ ভাবেই তল্লাশি অভিযান চলছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রশাসনের আধিকারিক এবং পুলিশ কর্তাদের নিয়ে সেখানে চলে আসেন এবং জোর করে নথি, ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ নিয়ে চলে যান।’’

ইডি আরও জানিয়েছে, তাদের তল্লাশি অভিযান তথ্যপ্রমাণভিত্তিক এবং কোনও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এর মাধ্যমে নিশানা করা হয়নি। কোনও পার্টি অফিসে তল্লাশি চালানো হয়নি। এই তল্লাশির সঙ্গে কোনও নির্বাচনের সম্পর্ক নেই। সাধারণ আর্থিক তছরুপ মামলার বিরুদ্ধে এই অভিযান ছিল। আইন মেনে তল্লাশি চলছে। মমতা বিকেল ৪টে ২২ মিনিট নাগাদ সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতর থেকে বেরিয়ে যান। তার কিছু ক্ষণ আগেই প্রতীক দফতরে ঢুকেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে মমতা বেরিয়ে যান। মমতার গাড়িতে একাধিক ফাইল, নথি তোলা হয়। প্রায় চার ঘণ্টার বেশি সময় আইপ্যাক দফতরে ছিলেন মমতা। বিকেল ৩টের পর প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল ইডি। আইপ্যাক দফতরে ইডি হানার প্রতিবাদে শহর জুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তৃণমূল।

সল্টলেক সেক্টর ফাইভের এক হোটেলে তখন বৈঠক চলছে রাজ্য বিজেপির। বৈঠকের নেতৃত্বে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডা। ঠিক সেই সময়েই আচমকা হোটেলে হাজির মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য। আইপিএস সুমিত কুমার। তিনি রাজ্য পুলিশের ডিআইজি (নিরাপত্তা) পদে রয়েছেন। নড্ডার বৈঠকস্থলে হঠাৎ এই আগমনে কেন? জানতে চাইলে উত্তর এল, “একজনকে খুঁজতে এসেছিলাম!” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েই হোটেল থেকে বেরিয়ে যান তিনি, যা কৌতূহল নিবৃত্ত করার বদলে আরও বাড়িয়ে দিল। নড্ডার বৈঠকস্থলে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর কোনও সদস্যের এমন আকস্মিক আগমন যে কোনও দিনেই কৌতূহল বৃদ্ধি করার জন্য যথেষ্ট। বৃহস্পতিবার তো তা আরও বেশি করে। কারণ, বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং তাঁর সল্টলেকের দফতরে তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। আইপ্যাক বর্তমানে তৃণমূল এবং রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা। ইডি হানার খবর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা স্বয়ং পৌঁছে যান দু’জায়গাতেই। প্রথমে প্রতীকের বাড়িতে। পরে সেক্টর ফাইভের দফতরে। মমতা জানান, তিনি সেখানেই অপেক্ষা করবেন। যখন আইপ্যাক দফতরে মুখ্যমন্ত্রী অপেক্ষা করছেন, ঠিক সেই সময়েই নড্ডার হোটেলে আচমকা হাজির হন তাঁর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আইপিএস। সল্টলেকে আইপ্যাক-এর দফতর যে বহুতলে, সেখান থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে নড্ডাদের বৈঠকস্থল। বৃহস্পতিবার সকালেই সাংগঠনিক কর্মসূচিতে ঝটিকা সফরে কলকাতায় এসেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। দুপুরে সল্টলেক সেক্টর ফাইভের ওই হোটেলে নড্ডাদের বৈঠক চলছিল। বৈঠকে নড্ডার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। বিভিন্ন জেলা সভাপতি এবং সাংগঠনিক বিভাগের আহ্বায়কেরাও ছিলেন। ঠিক সেই সময়েই হোটেল চত্বরে হাজির হন ডিআইজি নিরাপত্তা। এমন একটি দিনে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় যুক্ত থাকা পুলিশকর্তাকে ওই হোটেল চত্বরে দেখামাত্রই কৌতূহল দানা বাঁধতে শুরু করে। হোটেলের যে সম্মেলনকক্ষে নড্ডাদের বৈঠক চলছিল, সেই দিকের করিডরের কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনি। তাঁকে নড্ডাদের বৈঠকস্থলের দিকে এগোতে দেখেই সংবাদমাধ্যম ছুটে যায়। ঠিক সেই সময়েই পিছন ঘুরে উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। যে পথে হোটেল চত্বরে প্রবেশ করেছিলেন, সেই পথ দিয়েই আবার বেরিয়ে যান। কেউ কেউ অনুমান করছেন, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা দেখেই হোটেল চত্বর থেকে বেরিয়ে যান। হোটেল চত্বর থেকে বেরিয়ে গাড়ি আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্তা। সেখানেই সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে জানতে চান, ওই হোটেলে কেন এসেছেন। প্রশ্নের উত্তরে আইপিএস কর্তা বলেন, “একজনকে খুঁজতে এসেছিলাম।” এটুকু বলেই গাড়িতে উঠে চলে যান তিনি। ডিআইজি (নিরাপত্তা) সুমিতের হোটেল চত্বরে যাওয়ার কথা তত ক্ষণ চাউর হয়ে যায়। কৌতূহলী হয়ে ওঠেন বিজেপির নেতা-কর্মীরাও। বিজেপির যে নেতারা তখন বৈঠককক্ষের বাইরে ছিলেন, তাঁরাও খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। বিজেপির যে প্রথম সারির নেতা-মন্ত্রীরা বৈঠককক্ষের ভিতরে রয়েছেন, তাঁদের আপ্তসহায়কেরাও চলে আসেন বাইরে। তাঁরাও খোঁজখবর নিতে থাকেন। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। আইপিএস কর্তার এই আচমকা আগমন এবং প্রস্থানের বিষয়ে খবর যায় নড্ডার বৈঠককক্ষের ভিতরেও।




