Friday, April 24, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

প্রথম দফায় ভোটারস্রোত! নজির-ভাঙা ভোট পড়েছে রাজ্যে ক্ষমতার ‘পরিবর্তন’-এর পক্ষে? ৯২.৮৮ শতাংশ!‌ ২০১১ সাল এবং ২০২১ সালের ভোটদানের হারকে ছাপিয়ে গিয়েছে ২০২৬ সাল

RK NEWZ ২০১১ সাল এবং ২০২১ সালের ভোটদানের হারকে ছাপিয়ে গিয়েছে ২০২৬। এ রাজ্যে তো বটেই, বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে সারা দেশে এই পরিসংখ্যান বিরল। কেউ কেউ নজিরবিহীন বলেও দাবি করছেন। ৯৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ১৫২টি আসনে ভোটদানের হার। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এই হিসাবই প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। এ রাজ্যে তো বটেই, বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে সারা দেশে এই পরিসংখ্যান বিরল। কেউ কেউ ‘নজিরবিহীন’ বলেও দাবি করছেন। প্রথম দফার চূড়ান্ত হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি। ২০১১ সাল এবং ২০২১ সালের ভোটদানের হারকে ছাপিয়ে গিয়েছে ২০২৬ সাল। দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটদানের সর্বোচ্চ হার এটাই। এর জন্য কমিশনের তরফে রাজ্যের মানুষকে ‘স্যালুট’ করেছেন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম দফায় ভোট পড়েছে ৯২.৮৮ শতাংশ। ভোটদানের হার সবচেয়ে বেশি কোচবিহারে— ৯৬.০৪ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুরে ৯৫.৪৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। ৯৪ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে জলপাইগুড়ি, মালদহ, বীরভূম এবং উত্তর দিনাজপুরে। দার্জিলিং ও কালিম্পঙে ভোটের হার ৯০ শতাংশের নীচে। বাকি জেলাগুলিতেও ভোটের হার ৯০-এর গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে।

ভোটদানের এই নজিরবিহীন হারের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছে, সেখানে ৪০,৪৬, ৭৫৩ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। মোট ভোটারের সংখ্যা কমে গেলে এবং ভোটদানের সংখ্যা মোটামুটি একই থাকলে সহজ অঙ্কেই ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ভোটদানের সংখ্যাও এ বার বেড়ে গিয়েছে ২০২১ বা ২০২৪ সালের তুলনায়। তার কারণ কী? প্রথমত, ভোট না-দিলে তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে, এই আতঙ্কে অনেকে বুথমুখী হয়েছেন। দূরদূরান্ত থেকে কাজকর্ম, রুটিরুজি ফেলে ছুটে এসেছেন শুধু ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন বলে। তবে সেই ভোট কার পক্ষে বেশি গেল, শাসক না বিরোধী? সেটাই প্রশ্ন। এই বিপুল ভোট কি স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার পক্ষে পড়ল নাকি বাঙালি গরিমার পক্ষে? আগামী ৪ মে-র আগে তার হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। প্রথম দফার ভোটের পরে যুযুধান দু’পক্ষই দাবি করেছে, তারা ১২৫টি আসন পাচ্ছে প্রথম দফার ভোটেই। শাসকদল যেমন দাবি করেছে, এই বিপুল ভোট পড়েছে এসআইআর-বিরোধিতার কারণে। আবার বিরোধীপক্ষ দাবি করেছে, এই ভোট পড়েছে রাজ্যে ক্ষমতার ‘পরিবর্তন’-এর পক্ষে।

রাজ্যের ১৬টি জেলার যে ১৫২টি আসনে বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ হয়েছে, ২০২১ সালে সেই আসনগুলিতে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ৩.৭৮ কোটি। সে বার ৮৩.২ শতাংশ ভোট পড়েছিল। ভোট দিয়েছিলেন ৩.১৪ কোটি মানুষ। ২০২৬ সালে এসআইআর-এর পর প্রথম দফার আসনগুলিতে মোট ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩.৬০ কোটি। ভোট দিয়েছেন ৩.২৪ কোটির মতো। অর্থাৎ, মোট ভোটারের সংখ্যা কমেছে। বেড়েছে ভোটদাতার সংখ্যা। ভোটার হিসাবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে দলে দলে ভোট দিতে গিয়েছেন মানুষ। গত কয়েক দিন ধরেই হাওড়া, শিয়ালদহ স্টেশনে ভিন্‌ রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড়। সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলায় শুধু ভোট দেবেন বলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে ফিরেছেন। নাম কাটার আতঙ্ক কিন্তু শুধু পরিযায়ী শ্রমিকদের মতো দরিদ্র অংশে নয়, উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। সরকারি কর্তাব্যক্তিদের কাউকে কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘‘কোনও বার ভোট দিই না। এ বার দেব। না হলে শুনছি নাকি নাম বাদ চলে যাবে।’’

প্রচলিত ধারণা বলে, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও রয়েছে। তৃণমূলের অনেকে এই প্রসঙ্গে গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের দৃষ্টান্ত টানছেন। পশ্চিমবঙ্গে সে বারও অনেক ভোট পড়েছিল এবং ভোটের ফল রাজ্যে শাসকের পক্ষে গিয়েছিল। পাশাপাশিই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারের দৃষ্টান্ত দিয়ে তাঁরা দাবি করছেন, এসআইআর-এর পর ভোটের হার বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে বিহারেও ভোটের হার বেড়ে যাওয়ার পর ক্ষমতাসীন সরকারের ‘প্রত্যাবর্তন’ হয়েছে। বিরোধীদের তরফে অবশ্য ২০১১ সালের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এত দিন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোটদানের নজির ছিল ওই বছরেই। ভোট পড়েছিল ৮৪.৩৩ শতাংশ এবং সেই ভোটে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান হয়েছিল। পরিবর্তনের হাওয়ায় রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল।

এসআইআর কথা
এ বার ভোটের প্রচারে তৃণমূল এবং বিজেপি— উভয়েরই অন্যতম ‘হাতিয়ার’ এসআইআর। বিজেপির দাবি, ভোটার তালিকার এই ‘শুদ্ধিকরণ’ অবৈধ ভোটারদের মুছে দেবে। স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এই ছাঁকনির প্রয়োজন ছিল। আবার, এসআইআর-এর কারণে সাধারণ মানুষের হয়রানিকে হাতিয়ার করে ঢালাও বিজেপি-বিরোধী প্রচার চালাচ্ছে তৃণমূল। তাদের একাংশের মূল্যায়ন, রাজ্যে যাঁরা আছেন, তাঁরা তো বটেই, ভিন্‌ রাজ্য থেকে গাঁটের কড়ি খরচ করে নাম কাটার ভয়ে যাঁরা ভোট দিতে আসতে বাধ্য হলেন, তাঁরাও বিজেপির বিরুদ্ধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এ ভাবে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর আসলে বিজেপির কবর খুঁড়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের কেউ কেউ। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। বিজেপির যুক্তি, দূরদূরান্ত থেকে রাজ্যে ফিরে মানুষ ভোট দিচ্ছেন পরিবর্তন সুনিশ্চিত করার জন্যই। যাতে কাজের অভাবে আর তাঁদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র যেতে না-হয়। কোথাও কোথাও পরিযায়ী শ্রমিকদের ভয় দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এই সমস্ত ভোট আদৌ তৃণমূলের বিরুদ্ধে যাবে কি না, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের ভোট বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে কি না, সে ক্ষেত্রে কার লাভ এবং কার ক্ষতি, তা নিয়েও কৌতূহল রয়েছে।

রাজ্যে প্রথম দফার ভোটকে মোটের উপর শান্তিপূর্ণই বলা যায়। অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ভোটের অতীত ইতিহাসের নিরিখে। সকাল থেকে বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া বড়সড় অশান্তির খবর আসেনি। সিপিএম বনাম তৃণমূল সংঘর্ষে মুর্শিদাবাদের ডোমকল দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছে। সকালে সেখানে সিপিএম সমর্থকদের ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার এবং আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। দাবি, একটি বুথে বিজেপির পোলিং এজেন্টকে বসতে বাধা দেওয়া হলে শুভেন্দু নিজে ধাওয়া করে দুষ্কৃতীদের তাড়ান। তার পরে তাঁর উপর হামলা হয়। তৃণমূলের হামলায় অগ্নিমিত্রার গাড়ির পিছন দিকের কাচ ভেঙে গিয়েছে বলে অভিযোগ। ওই ঘটনায় হিরাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছে বিজেপি। ভোটগ্রহণ পর্বের প্রায় শেষ দিকে বীরভূমের খয়রাশোলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে ভোটারদের একাংশ বচসায় জড়িয়ে পড়েন। একটি বুথে ইভিএম-এ গোলমালের কারণে দীর্ঘ ক্ষণ ভোটগ্রহণ থমকে ছিল। বিরক্ত ভোটারেরা এক পর্যায়ে বাহিনীর দিকে তেড়ে যান। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি। কয়েক জন জওয়ান সেখানে আহত হয়েছেন। এ ছাড়া, নওদায় বুথ পরিদর্শনে গিয়ে বাধা পান আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেইউপি) প্রধান হুমায়ুন কবীর। অভিযোগ, তাঁর কনভয়ের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। দফায় দফায় পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। নির্বাচন কমিশন এই ঘটনায় রিপোর্ট তলব করেছে। সাগরদিঘির তৃণমূল প্রার্থী বাইরন বিশ্বাস ভোটই দিতে পারেননি। অভিযোগ, তিনি ভোট দিতে গেলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা বাধা দেন। শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাঁকে। কমিশনের বক্তব্য, নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ভোট দিতে বুথে পৌঁছেছিলেন বাইরন। তাই তাঁকে ভোটদানের অনুমতি দেওয়া হয়নি। কমিশন এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বাইরন।

প্রথম দফার ভোটগ্রহণ শেষে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজকুমার অগ্রবাল জানান, ভোটারেরা সর্বত্র নির্ভয়ে ভোট দিয়েছেন। মোটের উপর ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ। এর জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মনোজ। তাঁর কথায়, ‘‘ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনও গন্ডগোলের অভিযোগ নেই। সর্বত্র সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ছিল। আগে ওই সমস্ত কেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যেও অশান্তি হত। বুথের বাইরে কয়েকটি অশান্তির অভিযোগ এসেছে। তবে কোথাও কোনও মৃত্যুর খবর নেই।’’ বৃহস্পতিবার ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মনোজ। আগাম গ্রেফতার হয়েছেন ৫৭০ জন। কোনও বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। পুনর্নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও রিপোর্ট এখনও আসেনি। প্রিসাইডিং অফিসার এবং রিটার্নিং অফিসারের কাছ থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করে তার ভিত্তিতে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। মনোজ জানিয়েছেন, প্রথম দফায় ছোটখাটো যে সমস্ত অশান্তির ঘটনা ঘটেছে, দ্বিতীয় দফায় যাতে তা না-হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। সত্যিই ভোটারেরা সর্বত্র নির্ভয়ে ভোট দিয়েছেন। মোটের উপর ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles