‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। পাঁচালির গানটি গেয়েছেন ইমন চক্রবর্তী। মমতার সরকার দেড় দশকে কী কাজ করেছে তার খতিয়ানপাঁচালি প্রচারে বক্স বাজিয়ে পড়ায় পড়ায় ঘুরছে তৃণমূলের মহিলা বাহিনী। চাটাই পেতে এক জায়গায় গোল করে মহিলাদের বসিয়ে বসে পাঁচালি শোনানো হচ্ছে। যেখানে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’। সেই প্রচার ঠিকঠাক হচ্ছে কি না, তার তদারকি করছে আইপ্যাকের টিম। তৃণমূলের মতো সমান্তরাল বাহিনী নামিয়েছে পরামর্শদাতা সংস্থাও। গ্রামাঞ্চলে গ্রাম পঞ্চায়েত ভিত্তিক প্রচারে নজরদারি। মাথার উপর পাকা ছাদ। বাড়ির দোড়গোড়ায় পাকা রাস্তা। এই দু’টি পরিষেবামূলক বিষয়কে ভোটের আগে মানুষের সামনে তুলে ধরতে তিনটি কর্মসূচিকে সময় বেঁধে বাস্তবায়িত করায় মনোনিবেশ করেছে নবান্ন। যে প্রক্রিয়ায় পুরোদস্তুর জুড়ে রয়েছে শাসক তৃণমূলের সংগঠন এবং পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের ‘সক্রিয়’ ভূমিকাও। ফেব্রুয়ারির মাসের মধ্যেই যাতে মানুষ বিষয়গুলি দেখতে পান, সে ব্যাপারেও নবান্ন থেকে বার্তা গিয়েছে জেলা প্রশাসনগুলিতে। মাঝে যাবতীয় চুরি, জেলখাটার বিষয়গুলো ঢাকা দিতে প্রভূত উদ্যোগ রাজ্য সরকারের।
তৃণমূলের সর্বোচ্চ স্তরের নেতৃত্ব বিশ্বাস করেন রাস্তা, পানীয় জল, আলো সাধারণ মানুষের মৌলিক চাহিদা। তার পরে বাকি সব কিছু। সেই সূত্রেই মাথার উপর পাকা ছাদ আর দোরগোড়ায় রাস্তা নির্মাণকে ভোটের আগে তুলে ধরতে ময়দানে নেমে পড়েছে সব জেলা প্রশাসন। শাসকদলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘এই পথেই গত লোকসভা ভোটে বিজেপির মেরুকরণকে ভোঁতা করা গিয়েছিল।’’ এ বারও তা যাবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য নানা মহলে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, লোকসভা ভোটের পরবর্তী সময়ে পরিপার্শ্ব বদলেছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকেও আলোড়িত করছে। আরজি কর পর্বে ক্ষোভের গণবিস্ফোরণ দেখেছিল রাজ্য। তা সত্ত্বেও পুরনো পথেই নতুন ভোটের দিকে যেতে চাইছে তৃণমূল। আগের দফায় ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে ১২ লক্ষ পরিবারকে অর্থ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। বিধানসভা ভোটের আগে আরও ১৬ লক্ষ পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে আবাসের প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। এখনও তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। তবে জানুয়ারি মাসেই আবাসের প্রথম কিস্তির অর্থ উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পৌঁছে যাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, দু’দফা মিলিয়ে ২৮ লক্ষ পরিবার পাকা বাড়ি তৈরির টাকা পাচ্ছে। ১২ লক্ষ পরিবার দুই কিস্তিই পেয়ে গিয়েছে। ১৬ লক্ষ পরিবার ভোটের আগে পেতে চলেছে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা।
শাসকদলের বক্তব্য, অর্থনৈতিক ভাবে প্রান্তিক অংশের যে ২৮ লক্ষ পরিবার মাথায় পাকা ছাদ পাচ্ছে বা পেয়েছে, তার প্রভাব ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হবে। গড়ে প্রতিটি পরিবারে চার জন করে থাকলে সার্বিক ভাবে সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে সওয়া ১ কোটি। সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন যুক্তিও রয়েছে। পঞ্চায়েত দফতরের এক আমলার বক্তব্য, প্রতি পরিবারের সকলেই ভোটার হবেন তা নয়। সংখ্যাটা ১ কোটির নীচে থাকবে। বাড়ির পাশাপাশি দোরগোড়ায় ঝকঝকে রাস্তা যাতে সাধারণ মানুষ চাক্ষুষ করতে পারেন, তার জন্যেও জোড়া কর্মসূচি চালাচ্ছে নবান্ন। ‘আমাদের পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্পে বুথপিছু ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে রাজ্য সরকার। যে প্রকল্পে একেবারে পাড়ার রাস্তা, সৌরবাতি, ছোট সেতু নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, বড় রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ‘পথশ্রী-৪’ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পে সারা রাজ্যে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু। তিনটি কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রশাসনে যেমন ‘তৎপরতা’ রয়েছে, তেমন স্থানীয় স্তরে জনপ্রতিনিধিদেরও ‘সতর্ক ও সক্রিয়’ থাকার বার্তা দিয়েছে তৃণমূল। সন্দেহ নেই, পঞ্চায়েত এবং পুরসভা স্তরে ষোলো আনার মধ্যে চোদ্দো আনা জনপ্রতিনিধিই তৃণমূলের। যা সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে নবান্নের ভরসা। সমান্তরাল ভাবে রাজনৈতিক প্রচারও চালাচ্ছে শাসকদল। যার মূল অভিমুখ, কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ দেওয়া বন্ধ করলেও রাজ্য সরকার থেমে নেই। সরকার নিজের কোষাগার থেকে অর্থ দিয়ে এই কাজ করছে। তৃণমূলের কথায়, ‘মোদী নিচ্ছে, দিদি দিচ্ছে’। গত চার-পাঁচ বছর ধরে যে যে কেন্দ্রীয় প্রকল্পে রাজ্যের বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ গোটা তৃণমূল সরব, তার মধ্যে অন্যতম আবাস যোজনা এবং গ্রামসড়ক যোজনা।
এদিকে, I PAC কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি তল্লাশি। দিল্লির একটি আর্থিক প্রতারণা মামলায় ইডি তল্লাশিতে আসে। তল্লাশির মাঝেই প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছে যান সিপি মনোজ ভর্মা, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তল্লাশির মাঝেই মমতা। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন সবুজ ফাইল হাতে। বেরিয়ে এসে বিস্ফোরক মমতা। অভিযোগ, অমিত শাহ তাঁর দলের স্ট্র্যাটেজি, প্রার্থী তালিকা, প্ল্যানিংয়ের হার্ড ডিস্ক হাতিয়ে নিতেই তল্লাশি চালিয়েছে। মমতার এই বক্তব্য নিয়ে বিস্ফোরক রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। একদিকে যখন মমতা প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে পৌঁছে যাচ্ছেন গডরেজ ওয়াটার সাইডে আইপ্যাকের অফিসে, তখন বিস্ফোরক শুভেন্দু। তাঁর দাবি, ইডির উচিত আইন মেনে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই এবার পদক্ষেপ করা। শুভেন্দু বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় সংস্থার কাজে এর আগেও হস্তক্ষেপ করেছে। ২০২১ সালে তিনি নিজাম প্যালেসে ধরনা দিয়েছিলেন। ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্রদের গ্রেফতারির প্রতিবাদে। এর আগে যখন সারদা মামলায় রাজীব কুমারের বাড়িতে তল্লাশি চালান কেন্দ্রীয় আধিকারিকরা, তিনি সিপিকে নিয়ে ধরনায় বসেছিলেন কলকাতায়। ধর্মতলায় ধরনায় বসেন।” এই কথা প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনের কাজ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাজে হস্তক্ষেপ ও তদন্তে বাধা দান। একজন মুখ্যমন্ত্রী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীই নন, তিনি একজন প্রশাসনিক প্রধান। ইডি নিশ্চয়ই ক্ষমতাবলে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে বলে আমার মনে হয়েছে। আইনের মধ্যে থেকেই ব্যবস্থা নেবেন।” শুভেন্দুর কথায়, “আমি মুখ্যমন্ত্রী ও সিপির যাওয়াটাকে মনে করি অসাংবিধানিক, অনৈতিক। তদন্তে সরাসরি বাধাদান।”
এদিকে, মমতার লাউডন স্ট্রিটে যাওয়ার প্রসঙ্গে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘ওঁর এই কাজ অনৈতিক।’’ পাশাপাশিই শুভেন্দু বলেন, তিনি তদন্ত এভং ইডি-র তল্লাশি নিয়ে কোনও মন্তব্য করবেন না। তাঁর কথায়, ‘‘আমি তদন্তের বিষয়ে ঢুকছি না। তবে মুখ্যমন্ত্রী এর আগেও সাংবিধানিক সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন এবং তদন্তে বাধা দিয়েছেন। ২০২১ সালে তিনি ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্রের গ্রেফতারির বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের নিজাম প্যালেসের দফতরে ধর্না দিয়েছিলেন। রাজীব কুমারের বাড়িতে যখন সিবিআই তল্লাশি চালিয়েছিল, তখনও তিনি পুলিশ কমিশনারকে নিয়ে ধর্না দিয়েছিলেন।” আইপ্যাকের কাছে কেন তৃণমূলের নথিপত্র থাকবে, সেই প্রশ্নও তোলেন শুভেন্দু। আরজি কর পর্বে ক্ষোভের গণবিস্ফোরণ দেখেছিল রাজ্য! ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ‘শাখ দিয়ে মাছ ঢাকতে’ চাইছেন? এমনটাই প্রশ্ন রাজনৈতিক মহল ও জনসাধারনের!




