‘অলিম্পিকে যেতে হলে জুডো ছাড়তে হবে’! পাঁচ পাঁচটি জাতীয় পদকজয়ীকে এমনটাই নিদান খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার। দিনের পর দিন মানসীক হেনস্থা স্কুল ছাত্রীকে। হাওড়ার তারাসুন্দরী বালিকা বিদ্যাভবনের ঘটনা। অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতি। আত্মপ্রচারে ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে বারবার। এছাড়াও কান পাতলে নিলম্বিত(suspended) হওয়ার ঘটনার কথাও শোনা যাচ্ছে। এবার এক জাতীয় পদকজয়ীকে হেনস্থার অভিযোগ উঠল তারাসুন্দরী স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে। অভিযোগ তুলে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেন জাতীয় পদকজয়ী ইশিকা মাজির বাবা ও মা। বাবা শুভঙ্কর মাজি ও মা বৈশাখী মাজিকেও চুড়ান্ত হেনস্থা করা হয় স্কুলে বলেও অভিযোগ। ভুলবশত ফোন রয়ে গিয়েছিল ব্যাগে। আচমকা ম্যাসেজ টোন বেজে উঠতেই বিপত্তি। আটকে রাখা হয় ফোন। পাঁচ পাঁচটি জাতীয় পদকজয়ীর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ফোন আটকে রেখে দেন টানা পাঁচ দিন। অথচ, সেই ফোনেই সমস্ত অনুশীলনের ধরন গচ্ছিত। পদক জয়ের সমস্থ ফর্মূলাই সেই ফোনেই। আত্মপ্রচারে নিজেকে নিয়োজিত রাখা প্রধান শিক্ষিকা বুঝতেই চেষ্টা করেননি বা করতে সচেষ্ট হননি আজকের সমাজে পড়াশোনার পাশাপাশি একজন ক্রীড়াবিদের গুরুত্ব। বুঝলে হয়তো নিজের স্কুলেই এই কৃতি ছাত্রীকে স্থান করে দিতেন। তারাসুন্দরীর প্রধান শিক্ষিকার এ হেন আচার আচরণে হতাশ ক্রীড়ামহল।

এবার আসা যাক কৃতি মেয়ের কথায়। দস্যি মেয়ে। আবার ধন্যি মেয়েও। হার মানিয়ে দিত জয়া ভাদুড়ির সেই ‘ধন্যি মেয়ে’র সিনেমাকেও। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু হত দস্যিপোনা। মেয়েকে ঠান্ডা করতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই বাবা মা ছোটেন চিকিৎসকের কাছে। মেয়েকে কীভাবে ঠান্ডা করা যায়। ডাক্তারের পরামর্শে খেলাধুলায় নিয়োজিত করা। বাড়ির আশেপাশে ফুটবল ক্রিকেটের সেরকম চল ছিল না। হাতের কাছে থাকা স্থানীয় ‘জুডো’ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেই শুরু জুডোর পাঠ। বিস্ময়কর পথ্য। মেয়ে ধীরে ধীরে ঠান্ডা। চার চারটি জাতীয় পদকজয়ী জুডোকা হাওড়ার চতুর্দশী ইশিকা। এখনও ও ছোটোই। তবে দস্যিপোনা আর নেই। তবে লক্ষ্য রয়েছে অনেক। আন্তর্জার্তিক জুডোয় পা রাখতে মরিয়া লড়াইয়ে মেতে উঠেছে। মেয়ের লড়াইয়ে সামিল বাবাও।

কালের অমোঘ নিয়মে বাবা শুভঙ্কর মাজি আজ টোটোচালক। মেয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে নিজের স্বপ্নকে তছনছ করে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। সকাল থেকে ঘাম-রক্ত এক করে টোটো নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শহরতলীর এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। সারাদিন সহ্য করতে হয় ভর্ৎসনা, তাছিল্য আর অসম কুরুচিকর বাক্যবান। অথচ এই অসহায় ‘বাবা’র একসময়ে পেশা ছিল ফটোগ্রাফি। খুব ভালো ভিডিও ফটোগ্রাফার ও ভিডিও এডিটর হওয়ার সত্ত্বেও চালাতে হচ্ছে টোটো। করোনা গ্রাস করেছে শুভঙ্কর স্বপ্ন। ভিডিও এডিটিংএ একসময়ে নামডাক ছিলো প্রচুর। কিছু সুবিধাবাদী স্বার্থাম্বেষী মানুষের ভিড়ে আজ তা রসাতলে। সোজা কথায়, খাটিয়ে পারিশ্রমিক দেয় না কিছু ফটোগ্রাফির ফোড়ের দল। তাই তো মেয়েকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে টোটো। নীতিপরায়ণ শুভঙ্করের কথায়, ‘সারাদিন যেটুকু খাটবো সেটুকুর টাকাই আমার কাছে চলে আসবে। আর চেষ্টা করবো সৎ পথে রোজগার করার, কারুর কাছে হাত পাতবো না।’ ধন্যি মেয়ের মা’র কথা না বললে বড্ড ভুল হয়ে যাবে। সংসার সামলে, দেশের নানান প্রান্তে একাই মেয়েকে নিয়ে দৌড়ে যান মা বৈশাখী। বাবা সুদীপের পক্ষে মেয়ের জন্য খরচ জোগাতে হিমসিম অবস্থা। রয়েছে শারিরীক প্রতিবন্ধকতাও। সম্প্রতি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার থেকে উঠেও রোজ সকাল হলেই বেরিয় পড়তে হয় টোটো নিয়ে। অর্থের সন্ধানে। রুজির সন্ধানে। মেয়ের লক্ষ্য থমকে যাওয়া রুখতে। পরিস্থিতিকে মেনে নিয়ে থামতে নারাজ দশ্যি মেয়ের বাবাও।

শহরতলি হাওড়ার মেয়ে আপাতত অনুশীলনে ব্যস্ত স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়ার ন্যাশানাল সেন্টার অব এক্সলেন্স অর্থাৎ এনসিওই ভুপালে। সাই-এর হেড কোচদের তত্বাবধানে চলছে অনুশীলন। বাবা-মার চোখের জল মুছতে মরিয়া প্রচেষ্টা। খামতি নেই অনুশীলনে। বাড়িতে দু-তিন দিনের জন্য ফিরলেও স্থানীয় জুডো শিক্ষা কেন্দ্রে সকালে অনুশীলনে অনুপস্থিতির বালাই নেই। ঝুলিতে চার চারটি জাতীয় পদক। বাংলার জুডোকাদের মধ্যে র্যাঙ্কিংএ এক নম্বরে ইশিকা মাজি। প্রতিপক্ষকে এক গেমে ধরাশায়ী করতে তুমুল দশ্যিপোনায় একটুও কার্পণ্য করে না। স্কুল গেমস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া জুডোয় ব্রোঞ্জ জেতে এই ছোট্ট জুডোকা। সাব জুনিয়র ন্যাশানাল জুডো চ্যাম্পিয়ানশিপে রূপো ও ব্রোঞ্জ জয়ী চতুদর্শী মেয়ে। খেলো ইন্ডিয়ার মতো জাতীয় জুডোতেও রূপো ও ব্রোঞ্জ জয়ী ইশিকার লক্ষ্য এশিয়ান ইউথ গেমস। সিলেকশনে অনেকটাই সামনের সারিতেই রয়েছে। সাইতে কঠোর অনুশীলনে ব্যস্ত মেয়ে। তবে সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বাবার ইচ্ছা হয় একবারটি মেয়েকে দেখতে। দিনের শেষে ভিডিও কলেই আশ মেটান ইশিকার বাবা-মা। চোখে মুখে এক রাশ স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন কি কখনও ভাঙা সম্ভব কারুর পক্ষে? তারাসুন্দরী প্রধান শিক্ষিকা মোনালিসা মাইতি যতই চেষ্টা করুন না কেন, সব বাধা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বাবা মা-র চোখের জল মুছতে মরিয়া দস্যি মেয়ে ঈশিকা।
লেখা ও ছবি অঙ্কিত শ্রীবাস্তব




