‘বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলেবেলা, বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা—’ কণ্ঠে নেই আবেগ, চোখে নেই জল, কিন্তু জীবনের যুদ্ধে প্রতিটি মুহূর্তে বাবারা লড়ছেন পরিবারের জন্য, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। ট্রেনে, বাসে ভিড় ঠেলে কেউ ছুটে যান অফিসে, কেউ রোদ-বৃষ্টি-ধুলো মেখে সন্তান সন্ততিদের মুখে তুলে দেন অন্ন। জীবনের বোঝা বয়ে চলেন নীরবে, যেন ক্লান্তি নামক শব্দটা তাঁদের অভিধানে নেই। ঘাম ঝরিয়ে সংসারের চাকা ঘোরানো ও সবাইকে ভালো রাখাই তাঁদের উদ্দেশ্য। এমনই যোদ্ধাদের নাম ‘বাবা’। এ বার কালীপুজোয় বাবাদের জীবনযুদ্ধের এই হার না মানা অদম্য গপ্পোই শোনাচ্ছে আমতার সোনামুইয়ের জলার পুজো। আমতা-১ ব্লকের সোনামুই জলার পুজো কমিটির কালীপুজো ১৯ তম বর্ষ পদার্পণ করল। তাদের এ বারের ভাবনা ‘বাবাদেরও গপ্পো হোক’। কোনও প্রথিতযশা শিল্পী নয়, সংগঠনের সদস্যরা নিজেরাই রাত জেগে, ভাবনার সফল বাস্তবায়ন করছেন। মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে মূলত সুতো, উল, চট দিয়ে। মণ্ডপে ক্যানভাস, পেন্টিং ব্যবহার করা হয়েছে। থাকবে প্রজেক্টর ও আলোর কারুকার্য। মূল আকর্ষণ: লাইভ মডেল, এক বাবা কী ভাবে তাঁর সন্তান ও পরিবারের জন্য লড়াই করেন, তাঁর সংগ্রামটা লাইভ মডেলের মাধ্যমে পুজোর ক’টা দিন মন্ডপে বিকেল থেকে রাত অব্ধি তুলে ধরা হবে।
দুর্গাপুজোয় মানুষ কলকাতামুখী হলেও কালীপুজোয় ডেস্টিনেশন হয় বারাসত। সেই ট্র্যাডিশনের কিছুটা বদল হয়েছে গত কয়েকবছরে। বারাসতের পাশাপাশি নৈহাটির কালীপুজোও পাল্লা দিয়ে ভালো থিমের পুজোর আয়োজন করছে। এ বছরেও তার অন্যথা হচ্ছে না। তুলে ধরা হলো নৈহাটির বেশ কিছু নামী কালীপুজোর থিম-সহ বিস্তারিত। ৪০ তম বর্ষে পানপুর বালকবৃন্দ মণ্ডপ তৈরি করছে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরকে। সৈকত শহরে জগন্নাথ দেবের মন্দির তৈরি হওয়ার পর থেকেই এই মন্দিরের আদলে একাধিক দুর্গাপুজোর মণ্ডপ তৈরি হয়েছে। এ বার কালীপুজোতেও দিঘার জগন্নাথ মন্দির দেখতে পাবেন নৈহাটির মানুষ। শিশুদের কথা মাথায় রেখে এ বার নারকেল বাগান অধিবাসীবৃন্দের থিম ‘দ্য জাঙ্গল বুক’। রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর কালজয়ী সৃষ্টি ‘দ্য জাঙ্গল বুক’-এর গল্পকে নিয়ে এই থিম শিশুদের পাশাপাশি সকল দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। ৭৫ তম বর্ষে ভারতমাতা সেবা সমিতি দিচ্ছে পরিবেশবান্ধব বার্তা। থিমের নাম ‘রূপান্তর’। ফেলে দেওয়া জিনিসের পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন রূপের সন্ধান দেওয়ার বার্তা দেওয়া হবে এই ক্লাবের মণ্ডপে। নৈহাটি অগ্রগামী সঙ্ঘ মহাপীঠ-এর থিম তারাপীঠ মহাশ্মশান। যেখানে দর্শকরা দেখতে পাবেন জ্যান্ত তারা মা-কে। তারাপীঠ মহাশ্মশানের পরিবেশ গড়ে তোলা হবে গোটা মণ্ডপ জুড়ে। এ বার এই ক্লাবের কালীপুজোর ৭০তম বর্ষ। মক্কেশ্বর ঘাট সর্বজনীন শ্রীশ্রী শ্যামা পুজোয় পুজো এ বার শতবর্ষে পড়ছে। এ বার তাদের থিম ‘খেয়া ঘাটের মাঝি’। অটল বিহারী রোড সুব্রত স্মৃতি সঙ্ঘে বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের জীবনযাত্রা নিয়ে দুর্গাপুজোতেও একাধিক পুজো মণ্ডপ নানা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সেই প্রচলন থাকছে কালী পুজোতেও। অটল বিহারী রোড সুব্রত স্মৃতি সংঘ-এর ভাবনা ‘বাঙালিয়ানা’। এর বাইরেও আরও একাধিক থিম আকৃষ্ট করতে পারে দর্শনার্থীদের। সেই তালিকায় রয়েছে গোপাল স্মৃতি সঙ্ঘ-এর ভাবনা, ‘চাই না মাগো উমা হতে’। ৬৫ তম বর্ষে লোহাঘাট পার্ক অ্যাসোসিয়েশন রাজস্থানের আঙ্গিকে ফুটিয়ে তুলছে কৃষ্ণ প্রেম। নিউ স্টার ক্লাব-এর সপ্তম বর্ষের পুজোয় দর্শক পাবে ‘পায়ে হেঁটে দেখা থাইল্যান্ড’-এর অভিজ্ঞতা। আরবিসি রোড নব যুবক সঙ্ঘ গড়ে তুলছে ‘মিশরের পিরামিড’। INTTUC হকার্স ইউনিয়ন-এর পুজোয় দেখা যাবে কেরালার বিষ্ণু মন্দিরের প্রতিরূপ। নৈহাটির প্রাচীনতম পুজোগুলির মধ্যে ঐতিহ্য, আবহের বিচারে এই পুজোর তালিকা আপনাদের সামনে তুলে ধরা হলো। তবে, এগুলি ছাড়াও নৈহাটিতে আরও একাধিক প্রসিদ্ধ মণ্ডপ রয়েছে। একাধিক পুজো রয়েছে যেগুলি এই তালিকায় স্থান পায়নি। এই সময় অনলাইনে এই পুজোগুলিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এমন কোনও বিষয় নেই। উত্তর শহরতলিতে থিম ভাবনা সহ বিগ বাজেটের কালী পুজোয় বরাবরই শিরোনামে থাকে বারাসত। তার পরেই কালীপুজোয় নামডাক নৈহাটি শহরের। যার মাত্রা কয়েকশো গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন বড়মা। কালীপুজো উপলক্ষে চারটে দিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় নৈহাটিতে। ফলে বড়মার পাশাপাশি বিগ বাজেটের পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে শুরু হয়েছে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার পালা।
নৈহাটি নিউ স্টার ক্লাবের পুজোর থিম ‘চলতে চলতে ষাটে, থাইল্যান্ডে পায়ে হেঁটে’। পুজোর কর্ণধার নৈহাটির তৃণমূল বিধায়ক সনৎ দে নিজে। তাঁর কথায়, ‘থাইল্যান্ডের ড্রাগন উৎসব উপলক্ষে সমুদ্রের উপর জাহাজগুলিকে যেভাবে সাজানো হয় সে ভাবেই তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। ড্রাগন মূর্তিধারী জাহাজের উপরেই মূল মণ্ডপ থাকছে। ভিতরে প্লাইয়ের নিখুঁত কাজ দেখে মনে হবে সাদা পাথরে মোড়া কোনও প্রাসাদ।’ বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে চাকদহের শিল্পীর তৈরি নিউ স্টারের কালী মা এবার সাজছেন ৬০ কেজি সোনার গয়নায়। পুলিশ এবং বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী থাকবেন মণ্ডপ জুড়ে। অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত পুজোর উদ্বোধন করবেন। নৈহাটি রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়নের পুজোর মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে কেরালার বিখ্যাত বিষ্ণু মন্দিরের আদলে। প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতার মণ্ডপে শায়িত নারায়ণ মূর্তি। ভেতরের দেওয়ালজুড়ে রয়েছে অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি ও অপূর্ব স্থাপত্য। উদ্যোক্তা বিষ্ণু অধিকারী বলেন, ‘প্রায় ৫০ জন শিল্পী গত এক মাস ধরে মণ্ডপ তৈরি করছেন।’ ৭ নম্বর বিজয়নগর কাঠগোলা পুজো কমিটির ৭৫ বছরে থিম ‘যক্ষ রাজার প্রহরী’। রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী গৌরাঙ্গ কুইলার ভাবনায় তৈরি গোটা মণ্ডপটাই গ্লোবের আদলে। সম্পূর্ণ লোহার স্ট্রাকচারের উপরে তৈরি মণ্ডপের মূল প্রবেশদ্বারে থাকছে একজন প্রহরী। তার উপরে জগতের পাহারাদার হিসেবে দেখা যাবে ব্রহ্মা-বিষ্ণু এবং মহেশ্বর। দি লোহাঘাট পার্ক অ্যাসোসিয়েশনের থিম ‘রাজস্থানের ছোঁয়ায় কৃষ্ণ প্রেম’। রাজস্থানি ঘরানায় তৈরি মণ্ডপে কৃষ্ণের প্রেম তুলে ধরা হচ্ছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার চিত্রও রয়েছে। মূল মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করলে রাজস্থানের আদলে ঘরবাড়ি, উট, ডান্ডিয়া খেলার ছবি। পুজো কমিটির সম্পাদক দীপ্তেন্দু ভট্টাচার্য বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব সামগ্রী দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করা হচ্ছে।’ গোপাল স্মৃতি সঙ্ঘের থিম ‘চাই না হতে উমা’। নারী নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে নারী রূপে জন্ম না নেওয়ার করুণ আকুতির চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। একটি মেয়ের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা, ঘরের অন্দরসজ্জা থেকে ড্রেসিং রুমের সাজগোজ, খাটে শুয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে তোলার স্বপ্ন এবং অন্যদিকে সেই মেয়েই বড় হয়ে বাড়ির বাইরে পা রাখলে একদল উন্মত্তের হাতে তার লাঞ্ছনা এবং ধর্ষণের করুণ কাহিনি ফুটিয়ে তুলছেন শিল্পীরা। নৈহাটি রেল মাঠ দিশারির থিম ভাবনা ‘শিবশক্তির আরাধনায় কাল্পনিক আলোর শো’। প্রায় ৮০ ফুট উচ্চতার এই পুজো মণ্ডপ চার হাজার এলইডি লাইট দিয়ে তৈরি হচ্ছে। মূল মণ্ডপে ঢুকলেই দেখা যাবে বিশাল আকার একটি শিবের মূর্তি।





