RK NEWZ পা ধোয়ানো নিয়ে তরজা, হাতে মাছ নিয়ে মিছিল আর দাড়ি কামানোর আবদার! ২০২৬-এর ভোটে নাগরিক ইস্যু কি তবে হারিয়ে গেল ভাইরাল রিলের ভিড়ে? এক প্রৌঢ় দাড়ি কামাচ্ছেন। নির্বাচনী প্রার্থী প্রচারে বেরিয়েছেন। তিনি ঘরে ঘরে যাচ্ছেন। হঠাৎ পথিমধ্যে সেই প্রৌঢ়কে দাড়ি কামাতে দেখে প্রার্থী বললেন, জেঠু, আমি আপনার দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছি। আপনি কেন কষ্ট করবেন। না। এ দৃশ্য কোন কল্পিত ফ্যান্টাসি নয়। সত্য ঘটনা অবলম্বনেই এই রচনা। ২০২৬ সালের ভোটরঙ্গ এ বঙ্গে। ভাবা যায়? হ্যাঁ, ভাবা যাচ্ছে। কোন এক প্রজ্ঞাবান মহাপুরুষ বলেছিলেন, রণে ও প্রেমে কোনও কিছুই অন্যায় নয়। প্রতিপক্ষের কেউ কেউ ছিছি করে উঠলেন টিভি চ্যানেলের সান্ধ্য আলোচনায়। এ তো আসলে রাজনৈতিক প্রতারণা। ভোটের সময় এহেন শিশুসুলভ আচরণ দেখে কী সেই প্রৌঢ় বা গ্রামবাসীর একবারও মনে হল না, এ আসলে ভোটারের প্রতি দায়বদ্ধতা নয়। এ হল রাজনৈতিক তঞ্চকতা? ২০২৬-এর ভোট তো আধুনিক সময়ের ভোট। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম মেধার দাপট ভোট কৌশলে, ভোট প্রচারে।
এখন তো মনে হয়, মার্কিনমুলুক বা পাশ্চাত্যের দুনিয়ার মত জেলায় জেলায় জনসভার প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়েছে। বরং শাসক ও বিরোধী দলের প্রধান নেতারা প্রত্যক্ষ বিতর্কে অংশ নিন এবং সেরকম বিতর্ক ডাকার সময় এসেছে এ দেশেও। আর্গুমেন্টটেটিভ ভোটার। দুপক্ষের কথা শুনবে। তর্কবিতর্ক হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি কাকে ভোট দেবেন। কিন্তু সে তো আজও হল না। বরং দেখা যাচ্ছে, সাবেকি প্রচার সামন্ত যুগের প্রচার স্টাইল আজও চলেছে। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে? এ হলো, সেই ভারতবর্ষের মুদির দোকান যেন আজকের বাংলা।
কাট- সেকেন্ড শট। ঘটনাস্থল ব্যারাকপুর। হাঁটছেন প্রার্থী। ডাকসাইটে চলচ্চিত্রকার রাজ চক্রবর্তী। তাঁকে রাস্তায় থামিয়ে, কেউ তাঁর পা ধুয়ে দিচ্ছেন। তিনি এক বৃদ্ধা রমণী। দেখে মনে হয় গরিব মানুষ। রাজ তো হতবাক। সে ছবি মোবাইলে কেউ তুলে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে। ব্যস! রাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী এ সুযোগ ছাড়লেন না। বিজেপির প্রার্থী কৌস্তুভ বাগচী। তিনি পৌঁছে গেলেন, কোন এক দলিত রমণীর গৃহে। তিনি সেই দলিত নারীর পা ধুয়ে দিলেন জল দিয়ে। বৃদ্ধাকে প্রণাম করলেন। বললেন, তুমি ‘ভারতমাতা’। হে জগদম্বে।
সত্যিই তো অত্যন্ত প্রতীকী শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। তারপর বিজেপির প্রার্থী অভিযোগের তর্জনী তুলে রাজ চক্রবর্তীর উদ্যেশ্যে বললেন, ওই লোকটিকে দেখুন! কীরকমভাবে এক মহিলার কাছ থেকে প্রণাম নিলেন। যিনি ওঁর থেকে বয়সে বড়। বৃদ্ধা পা ধুয়ে দিলেন। কোন প্রতিবাদ করলেন না। এটাই হচ্ছে তৃণমূলের সংস্কৃতি। আর দেখুন আমরা বিজেপি কীরকম ভাবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। এখন তো হল, ভিজুয়ালের যুগ। তারপর ওই ভিডিও রিল হল। ইউটিউবে ছড়াছড়ি। একেই বলে ভাইরাল হয়ে যাওয়া খবর। নির্বাচনী বিনোদন বটে। এবার আবার ক্যামেরার সামনে আত্মপ্রকাশ করলেন, রাজ চক্রবর্তী। তিনি বললেন, কী আশ্চর্য! তিলকে তার করা হচ্ছে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ এক মহিলা এসে আমার পা ধুয়ে দিতে উদ্যত হলেন। আমি কিছু বোঝার আগেই তিনি পায়ে জল ঠেলে দিয়েছেন। আমি বাধা দেব কি! তিনি প্রণাম করলেন। প্রণাম নিতে বাধ্য হলাম।
তারপর? তারপর সেই বৃদ্ধা আমাকে আদর করলেন। তিনি আমাকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। আমি বৃদ্ধাকে প্রণাম করলাম। সে সবের কেউ ভিডিও ফুটেজ তুলল না। শুধু এই অংশটা তুলে কে বা কারা অন্যায়ভাবে আমার বিরুদ্ধে প্রচার চালালো? একেই বলে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। এই হল বিজেপির রাজনীতি। একটা নন ইস্যুকে বিজেপি ইস্যু করে রাস্তায় নেমেছে। আসলে ওদের কোন বলার মত ইস্যু নেই। তাই বিজেপি এসব করছে। ভাবছি, এটা যদি ভোটরঙ্গ না হয় তবে ভোটরঙ্গ কোনটা? চার দশক ধরে ভোট দেখছি। অতীতেও নানান রকম ভোট প্রচারের রঙ্গ দেখেছি। তবে এখন যেসব কাণ্ডকারখানা হচ্ছে, তার ধরনটা কিন্তু অনেকটাই বদলে গেছে। আমি হাওড়ার শিবপুরের বাসিন্দা ছিলাম। এখনও হাওড়া শহরেই বাস করি। তাই আমি নিজের জেলার কথা বলি। অতীতে যখন ভোট হতো, ‘৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ও দেখেছি, আবার বিধানসভা নির্বাচনের সময় দেখেছি, পুর সমস্যাও কিন্তু ভোটের ইস্যু হত। বিশেষ করে বিধানসভা নির্বাচনে দেখেছি হাওড়ায় প্রচুর জঞ্জাল নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মিছিল করছে সিপিএমের বিরুদ্ধে শুধু এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে, হাওড়া ব্রিটিশদের ‘কুলি টাউন’ ছিল । সেই ‘কুলি টাউন’ কীভাবে থেকে গেল জঞ্জাল নগরী থেকে জঞ্জাল কেন বের হচ্ছে না? এমনকি জলের সংকটে পুরসভায় জলের বালতি নিয়ে পুরসভার কাউন্সিলরা মিছিল করে মেয়রকে ঘেরাও করেছিল।
এখনও হাওড়ায় জঞ্জাল সমস্যা একইভাবে বহাল। পানীয় জলের সংকট এখনও আছে। কদিন আগেই উত্তর হাওড়ায় জঞ্জালের স্তূপ পাহাড়ের আকার ধারণ করেছে। সেখানে সমস্ত শহরের জঞ্জাল নিয়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে সেই জঞ্জাল যায় কলকাতার ধাপায়। কিন্তু পাথরের মত হয়ে যাওয়া সেই জঞ্জাল ভেঙে পড়ে যায়। কার্যত সেই এলাকায় একটা সাংঘাতিক বিপদ ঘনিয়ে আসে। এলাকার বস্তিবাসীরা সেখান থেকে পালাতে বাধ্য হয়। নোংরা নর্দমার জল, জঞ্জাল সব মিলেমিশে নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেয়। জলের পাইপ ভেঙে যায় এবং পাইপের মধ্যে সেই জঞ্জাল ঢুকে যায়। এবারে যখন বিধানসভা নির্বাচন হচ্ছে, কেউ এই প্রচার করছে না যে, কেন সাতবছর ধরে হাওড়া পুরসভার ভোট হয়নি? এখানে না আছে কোন জাতীয় ইস্যু? না আছে কোন পুরসভার ইস্যু? এ এক বিচিত্র বিধানসভা নির্বাচন। এখানে ‘জয় শ্রীরাম’, ‘জয় মা কালী’কে নিয়ে বিতর্ক এখনও চলছে। নববর্ষের দিন তৃণমূল কংগ্রেস তাসা পার্টি নিয়ে আর ডিজে লাগিয়ে তার সঙ্গে আবার ঢাকঢোল, সে এক বিচিত্রানুষ্ঠান। এইভাবে নববর্ষ উদযাপন হল।
অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের নিয়ে আলাদা মিছিল হল। সেখানেও একটা ম্যাটাডোরে ডিজে সহযোগে সাজোরে সঙ্গীত বাজিয়ে নাচের ব্যবস্থা হয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সেই ম্যাটাডোরের ডিজেল মিছিল গেল।
বিজেপিও কম যায় না। বিজেপি কাউন্টার করার জন্য গৈরিক পতাকা হাতে নিয়ে বিজেপি নববর্ষ পালনের জন্যে উৎসাহী হয়ে পড়ল। বিজেপিও যে কতবড় বাঙালিপ্রেমী সেটা বোঝানোর জন্য রীতিমতো বঙ্গ সংস্কৃতির ধ্বজা তুলে মিছিল করতে লাগল। এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাতে বাজাতে বিজেপির মিছিলও দেখলাম এই হাওড়া শহরেই। কাজেই ভোটরঙ্গ এক বিচিত্র আকার ধারণ করেছে। এই ভোটে এসআইআর যদি খুব বড় ইস্যু হয় তবে তা নিয়ে চলছে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিবাদ। কিন্তু বিধানসভার কেন্দ্রগুলোতে গেলে সেখানে কিন্তু মনে হচ্ছে, সেই দিল্লি বনাম বাংলার যুদ্ধ নিয়ে যত না প্রচার তার চেয়ে বেশি প্রচার চলছে মাছ নিয়ে। হাতে দুটো কাতলা মাছ নিয়ে বিজেপি প্রার্থী মিছিলে বেরিয়েছেন তৃণমূলকে কাউন্টার করার জন্য। কেননা তৃণমূলের নেতা অরূপ বিশ্বাস বড় বড় কাতলা মাছ নিয়ে সেও মিছিল করছে কলকাতা শহরে। এখন ববি হাকিমের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী, সেও বিরাট মাছ নিয়ে আসরে নেমেছে। সুতরাং এবারের ভোটের রঙ্গে মৎস্যপুরাণও কিছু কম যাচ্ছে না। অসহায় বঙ্গবাসী! কোনটা যে আসলে মানুষের ইস্যু সেটা বোঝা দায়। মানুষের ইস্যু বোধহয় হারিয়ে গেছে ভোটরঙ্গের এক নতুন বিনোদনে।





