Wednesday, April 29, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ডিকোডিং বাংলা ভোট!‌ ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ দুঃশাসন মুক্ত হবে?‌ নেতাজি-বিবেকানন্দ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনী, নেত্যকালীর চায়ের দোকান?

RK NEWZ সাতসকালে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছলাম সেই দোকানে। নেত্যকালীকে অবশ্য সবাই ‘কালীদিদি’ বলেই ডাকে। বহুবছরের পুরনো দোকান।‌ আগে ওর কর্তা দোকান চালাত। কয়েক বছর হল ওর কর্তা হঠাৎ গত হবার পর কালীদিদিই এখন দোকানের দায়িত্ব নিয়েছে। অনেকেই সকালে বোটানিক্যাল গার্ডেনে হাঁটতে আসেন। সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য একটা আলাদা পাস দেওয়া হয়। আধার কার্ড দেখিয়ে সেই কার্ডটি আমার মতো অনেকেই করেছেন।‌ তাঁদের মধ্যে বিই কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক যেমন আছে তেমন কোলে মার্কেটের দোকানদার অথবা রামকৃষ্ণ শিক্ষালয়ের মাস্টার মশাই! অনেক রকমের মানুষ এখানে এসে জড়ো হন। এখন প্রত্যেকদিন কালীদিদির দোকানে জমজমাট ডিড়।‌ প্রতিদিন ভোট নিয়ে আলোচনা। মাঝেমাঝে মনে হয়, দিল্লির পার্লামেন্টের চেয়ে এ কিছু কম নয়। কালীদিদি সকলকে ভাঁড়ে চা দিতে দিতে অনেক সময় লোকসভার স্পিকারের মত বিতর্ক নিয়ন্ত্রণও করে। নানান রকমের টুকটাক মন্তব্য করে। কালে আলোচনার প্রধান থিম ছিল, নেতাজি আর বিবেকানন্দ। ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’ খোদ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে এসে বলেছেন, স্বামী বিবেকানন্দ একথা বলেছেন। যোগী আদিত্যনাথ আরেক গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী যোগী রাজা।

বক্তৃতা দিতে গিয়ে কেন একথা বললেন? তাই নিয়ে সকালে ‘চায় পে চর্চা’। দত্ত মেশোমশাই গরম চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, আহা! যোগী আদিত্যনাথের মত একজন দারুন জোরালো মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে সাত সকালে এত পিন্ডি চটকাচ্ছো কেন ভাই তোমরা? লোকটা না হয় ভুল বলেই ফেলেছে! সঙ্গে সঙ্গে তো শুধরে নিয়েছেন।‌ বারবার তো রিপিট শো হয়নি। পাশ‌ থেকে কেউ বোধহয় সংশোধনও করে দিয়েছে।‌ মানুষ মাত্রই ভুল হয়। এটা নিয়ে এত কথার কী আছে? মুখুজ্জে মেসোমশাই এমন কথা বললে কী হবে? আমাদের হারু কিন্তু এই বিতর্কে রণেভঙ্গ দিতে রাজি নয়।‌ হারুর বক্তব্য হচ্ছে, তোমরা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে করবে আর পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করতে আসবে? যদি নেতাজির কথাটা বিবেকানন্দ বলে দেন তাহলে নেতাজি কি বলবেন? ফুট কাটল মিত্তির। মিত্তির বলল, জানো না, এই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখনি? খুব চলছে। ভাইরাল। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’।

হাসির রোল উঠল। কালীদিদিও কালো মাড়ি বের করে জোরে জোরে হাসতে লাগল।‌ কী বুঝে হাসল, সেটা আমরা সবাই বুঝলাম না।‌ এইটা বুঝলাম, ভোটের রঙ্গ‌ যেমন জমেছে, তেমন জমেছে আমাদের তর্ক-বিতর্ক।
আসলে একে তো এপ্রিল মাসেই এত গরম। তার মধ্যে এবারে ভোট তো নয়, মনে হচ্ছে যেন‌ একটা যুদ্ধ হচ্ছে। হিন্দিতে যাকে বলে ‘আড়পাড়কা লড়াই’।‌ একজন চকলেট বোম ছুড়লে আরেকজন ছুড়ছে রকেট।‌ কিন্তু এত কথা বলার দরকার কী? আসলে আমি জানি বা না জানি আমাকে জানাতেই হবে।‌ আর সেই কারণেই, যে যা পারছে তাই বলছে।‌ নেত্যকালী এখনও চায়ের দাম বাড়ায়নি।‌ গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। গ্যাস পেতে খুব কষ্ট।‌ দেশের প্রধানমন্ত্রী আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুনছিলাম, মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ-টাক্রমণ করবেন‌ না।‌ এখন‌ তো ভোটৈর দুদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে একদম সরাসরি আক্রমণ।‌ তাতে কিন্তু আমাদের মুখুজ্জেবাবুর গোসা হয়ে গেল। তিনি বললেন, না না, এরপর তো এখানে থাকাই যাবে না। এই আলোচনাকে তোমরা এই লেভেলে নিয়ে এসেছো। কেউ একজন পাশ থেকে বলল, আচ্ছা, হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও তো নানা রকমের কথা এখানে এসে বলছেন।‌ দুর্গা বিষ্ণু নিয়ে কী সব যেন! আর তো কারও আসা বাকি রইল না। ট্রাম্প আর পুতিন শুধু এখনও পর্যন্ত আসেননি। ট্রাম্প আর পুতিন তো চলে এলে হয়। তাহলে তো আর কেউ বাকি থাকে না।‌

নেত্যকালীদিদির এই চায়ের দোকান এই এলাকায় একটা ব্র্যান্ড।‌ কালীদিদি নিজে খুব একটা কথা বলেন না। কিন্তু সকলের কথা শোনেন, আর মাঝেমাঝে ফোড়ন কাটেন। এই চায়ের দোকানটাই ওর জীবন। বয়ামে রাখা আছে অনেক রকমের বিস্কুট। বাপুজি কেক ইত্যাদি। দু-একটা কুকুরও সকালবেলা মাঝেমাঝে এসে কালীদিদির দিকে তাকিয়ে থাকে। কালীদিদি ওদের বিস্কুট দেয়, তবে তার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। দিনে তিনবার ওরা আসে।‌ রাস্তার নেড়ি কুত্তা। একদিন আমি বিস্কুট কিনে ওদের দিতে গেছিলাম। কালীদিদি রে রে করে উঠলেন। বললেন, না না যখন তখন ওদের বিস্কুট দেবেন না। ওদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে। সবাই মিলে বিস্কুট দিতে শুরু করলে, এই জায়গা থেকে ওরা নড়বে না, তাতে আমার খদ্দেরদের অসুবিধা হবে। এইরকম অনেককিছু কালীদিদি বলেন আমরা শুনি!

যাইহোক দোকানের সামনে বেঞ্চি পাতা। একজন বিহারী পুলিশকর্মী এসেছে। মাঝেমাঝে পুলিশকর্মীটি আসে। হাওড়ার শিবপুর পুলিশ লাইনে থাকে। সকালবেলায় হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে। হয়তো কোনও কাজও থাকে। নাম জানি না। পুলিশের কনস্টেবলটি ঘোরতর বিজেপি।‌ আজ সাতসকালে এসে রাজনাথ সিংকে ‘কোট’ করে বলছে, বিজেপি সরকারকে একবার বাংলায় এনে দেখুন। তৃণমূলের গুন্ডারা হয় জেলে যাবে না তো উপরে যাবে। আমি বললাম, তুমি তো বিজেপি নেতাদের মতোই কথা বলছো। সেই ছেলেটি বলল, হ্যাঁ, নানুরে রাজনাথ সিং রোড শো করতে গিয়ে এই কথাগুলো বলেছেন। এখন সেই কথাগুলোই তো আমরা বলছি। আসলে হয় জেলে না হয় উপরে চলে যেতে হবে। এবারের ভোট বুথে বুথের নিরাপত্তার সব দায়িত্ব কেন্দ্রীয় বাহিনীর। আমাদের হাতে শুধু ভোটার লাইন যেটি আমরা দেখব। পুলিশকে আর কোনও দায়িত্ব নির্বাচন কমিশন দিচ্ছে না।‌ ভোটকেন্দ্রের একশো মিটারের মধ্যে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কেন্দ্রের পুলিশের হাতে।‌ আমাদের হাতে নেই।‌ কোন তথ্য ঠিক, আর কোন তথ্য ভুল সেসব জানিনা। শুধু নিত্যকালীর চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে চা খেতে খেতে ওদের কথা শুনছি।

আমি বললাম, তোমরা এলে তাহলে বুলডোজার চলবে? পুলিশকর্মীটি খুশি হল। বলল, একদম। যেমন যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশে‌ করছেন ঠিক তেমনি হবে। ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ দুঃশাসন মুক্ত হবে। একটা জিনিস বুঝতে পারছি, এবার ভোটে বিজেপির সমর্থকরা অনেক বেশি সবাক।‌ এই চায়ের দোকানে আগে এরকম ভাবে কথা বিজেপি সমর্থকরা প্রকাশ্যে বলতেন না, তাও এত তৃণমূল সমর্থক মানুষজনের সামনে। তৃণমূল সমর্থকরা এই আক্রমণে চুপ করে থাকছেন। শিবপুর বিই কলেজের বেশকিছু অধ্যাপক তাঁরা আসলে সিপিএম করতেন।‌ সিপিএমের প্রার্থী এই দক্ষিণ হাওড়া কেন্দ্রে আছেন।‌ এই অধ্যাপকরা কাদের ভোট দেবেন তার আমি জানি না। একসময় তাঁরা সিপিএমকেই ভোট দিতেন।‌ এখন সিপিএমের সভায় মানুষজন কম হয়। তাই সিপিএম মোড়ে মোড়ে মাইক লাগিয়ে দিয়ে পথসভা করে বাজারের মধ্যে। তাতে আসতে যেতে, দোকান করতে মানুষ বক্তৃতা শোনে। কিন্তু গতবারে শুনেছিলাম, আগে ‘রাম’ তারপরে ‘বাম’। এবার কিন্তু সিপিএম সমর্থক অধ্যাপকেরা সেসব কথা বলছেন না। তবে অনেকটাই চুপ করে থাকছেন। তবে কালীদিদির চায়ের আড্ডায় আজ সবচেয়ে বড় স্টেটমেন্ট দিয়েছেন আমাদের গণেশদা। গণেশদা সরকারি কর্মচারী। সল্টলেকে বিকাশ ভবনে রোজ যেতে হয়। এখনও কয়েকবছর চাকরি আছে।

দিদির প্রকল্পের সব পরিষেবাই তিনি গ্রহণ করেন। গণেশদার স্ত্রী লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা নেন। স্বাস্থ্যসাথী কার্ডে ক’দিন আগে পিজি হাসপাতালে গণেশদা কিডনির অপারেশন করেছেন।‌ ডাক্তার এখন রোজ হাঁটতে বলেছেন। খুব নিরীহ মানুষ গণেশদা।‌ কিন্তু বোমাবাজি নিয়ে গপ্পো করতে ভালবাসেন। সেই গণেশদা বললেন, ভোটে হিংসা বরদাস্ত করা হবে না। জিরো টলারেন্স। আরে বাবা!!ভোটের দিন যদি বোমাবাজিই না হল, গোটা রাজ্যে খান কয়েক লাশই যদি না পড়ল, কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে চু-কিৎ-কিৎ খেলা হল না। নিদেন পক্ষে হুমকি- ধামকি, গুলি তাহলে ভোট কী হল? তাহলে সাংবাদিকরাই বা কী করবে? গণেশদার কথা শুনে সবাই জোরে হেসে উঠলেন।‌ তবে রেগে গেলেন মুখার্জীদা।‌ তিনি বললেন, তাহলে ভোটকে আর উৎসব বলবে কেন? মানুষের অধিকার নিয়ে যে উৎসব, সেই উৎসব নিয়ে এই হাল হবে, এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। বরং ভোটের সময়, একসময় যেমন মণিপুর মিজোরামে যুবকেরা গিটার বাজত, গান গাইত। সেরকম গান গাইতে গাইতে, ঢাকঢোল বাজাতে বাজাতে ভোট হলে কত ভাল হত। এখানে‌ কেন এইভাবে ভোট? আসলে পশ্চিমবঙ্গে যে বর্গফুটের আয়তন, সেই অনুপাতে মানুষের সংখ্যা বেশি।‌ এবার অবশ্য এসআইআরে ভোটার অনেক বাদ যাওয়ায় ভোটের লাইনে কি ভিড় একটু কম কম মনে হবে?
সবই অজানা। আপাতত এবারের ভোট যেন একটা ম্যাজিক বাস্তবতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles