Thursday, July 23, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

নজর রাখতে হবে নিজের ওজনের দিকে!‌ বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস আর লাগামছাড়া মানসিক চাপের ফল

তিরিশের কোঠা পেরোতে না পেরোতেই বহু তরুণ-তরুণী রোগের শিকার। উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন চল্লিশ বা পঞ্চাশোর্ধ্বদের রোগ ছিল। বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস আর লাগামছাড়া মানসিক চাপের কারণে এখন হচ্ছেন। চিকিৎসকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়ে নীরবে বাড়ছে নিঃশব্দ ঘাতক-এর প্রকোপ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ। কেরিয়ার গড়ার চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন সরাসরি রক্তচাপকে প্রভাবিত করে। বেহিসেবি খাদ্যাভ্যাস। বাইরের কেনা খাবার, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, সস, চিপস প্রভৃতি খাবারে প্রচুর লবণ থাকে। সেই লবণের সোডিয়াম রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। শরীরচর্চার অভাব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে কাজ এবং কায়িক পরিশ্রমের অভাব শরীরের বিপাক হার কমিয়ে দেয়, যা ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি রক্তচাপও বাড়িয়ে তোলে। অপর্যাপ্ত ঘুম। নিয়মিত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম না হলে বা ঘুমের গুণমান খারাপ হলে শরীর ‘স্ট্রেস হরমোন’ নিঃসরণ করে, যা রক্তচাপকে ঊর্ধ্বমুখী করে। ধূমপান ও মদ্যপান। এই দু’টি অভ্যাস রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা কমিয়ে দিয়ে তাকে শক্ত করে তোলে, যা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বয়স ৩০ পেরোলেই সতর্ক হতেই হবে? খাদ্যাভ্যাসে রাশ টানা। পাতে কাঁচা নুন খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ। চিপস, চানাচুর, আচার, সস, পিৎজা, বার্গারের মতো খাবারে লাগাম। কলা, কমলালেবু, সবুজ শাকসবজি, ডাবের জল ইত্যাদি বেশি। এগুলিতে পটাশিয়াম থাকে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ঘাম ঝরানো জরুরি। প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ মিনিট শরীরচর্চা করতেই হবে। জিমে না যেতে পারলে দ্রুত পায়ে হাঁটা, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো বা সাঁতার কাটার মতো কাজও। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার। মানসিক চাপ। নৈব নৈব চ: নিয়মিত যোগাভ্যাস, ধ্যান বা প্রাণায়াম এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর। কাজের বাইরে নিজের পছন্দের কোনও কাজ করুন যা মনকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে। ঘুম হোক পর্যাপ্ত। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন। ঘুমের আগে মোবাইল বা ল্যাপটপের ব্যবহার কমান। দৈনিক ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম চাই-ই চাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত রক্তচাপ মাপা। হাইপারটেনশন নিঃশব্দ ঘাতক, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর তেমন কোনও উপসর্গ থাকে না। তাই নিয়ম করে রক্তচাপ মাপা অত্যন্ত জরুরি। বাড়িতে একটি ডিজিটাল রক্তচাপ মাপার যন্ত্র রাখতে পারেন।

ঝরাতে হবে মেদ, ওজন কমিয়ে হয়ে উঠতে হবে ছিপছিপে। ভাত, রুটি বাদ। বদলে থাকছে ওটস, কিনোয়া কিংবা স্যালাড। মাঝেমধ্যে প্রোটিন বারও! ওটস, ডালিয়া কিংবা কিনোয়া খেতে অভ্যস্ত নন। ভাত, রুটির মতো খাবার খেতেই বেশির ভাগ লোকে অভ্যস্ত। পুষ্টিবিদরা বলেন, সুস্থ থাকা, ওজন বশে রাখার উপায় লুকিয়ে দৈনন্দিন খাবারে। যে খাবার ভালবেসে খাওয়া যায় না বা যে খাবারের নাম এত দিন জানাই ছিল না, সেগুলি ডায়েটে জোড়ার দরকার হয় না। ভাত, ডাল, তরকারি খেয়েও যে ওজন ঝরানো যায়, তা বলছেন পুষ্টিবিদেরাই। সম্প্রতি সমাজমাধ্যম প্রভাবী ফিটনেস প্রশিক্ষক অম্বিকা জৈন দাবি করেছেন তিনি প্রতি দিন ভাত খেয়ে ১৮ কেজি ওজন কমিয়েছেন। শুধু মেনে চলেছেন কয়েকটি শর্ত। ভাত খেয়েছেন মাপমতো, খাবার পাতে ছিল যথেষ্ট ফাইবার। সব্জি এবং স্যালাড মিলিয়ে-মিশিয়ে খাওয়া আর থাকে প্রোটিন। পনির, ডাল, ডিম, সয়াবিন এর মধ্যে কোনও একটি নিয়মিত। হজমক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে খেতেন ছাঁস, ঘোল বা চিনি ছাড়া লস্যি। সাদা ভাত খেয়েই ওজন কমানো যায় এবং ডায়াবিটিস থাকলেও তা খাওয়া যেতে পারে। ওজন কমানোর জন্য অনেকগুলি বিষয় জরুরি। শুধু ভাত খাওয়া কমিয়ে ফেললেই হবে, তা কিন্তু নয়। যিনি ওজন কমাতে চাইছেন, তিনি কতটা ওজন কমাবেন, তাঁর কোনও অসুখ আছে কি না, তিনি কী খেতে পছন্দ করেন বা না করেন তার উপর ডায়েটের বিষয়টি নির্ভর করে। ভাত কিন্তু ওজন কমানোর পথে বাধা নয়। বরং ভাতের সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে, কতটা খাওয়া হচ্ছে সেটাই জরুরি। পুষ্টিগুণ সম্পন্ন সঠিক খাবার বেছে নিতে পারলে, ভাত খেয়েই ওজন কমানো যাবে। ব্যক্তি বিশেষের ডায়েট আলাদা হবে। তবে মোটামুটি ওজন কমানোর জন্য যে বিষয়গুলি মাথায় রাখা দরকার, দুপুর হোক বা রাত মোটামুটি ১২০-১৫০ গ্রাম পর্যন্ত ভাত খাওয়া যেতে পারে। খাবারের অর্ধেক থাকতে হবে ফাইবার সমৃদ্ধ টাটকা সব্জি, আর অতি অবশ্যই প্রোটিন। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, পনির, সয়াবিনে প্রচুর প্রোটিন মেলে। শাক এবং সব্জিতে থাকে ফাইবারের পাশাপাশি ভিটামিন এবং খনিজ। ডিম, বাদাম, বীজ জাতীয় খাবারে মেলে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট। স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য এই সব কিছুর প্রয়োজন আছে। টক দই, ঘোলের মতো প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার পেটের স্বাস্থ্য ভাল রাখে। হজমে সহায়তা করে। ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার চট করে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি হতে দেয় না। পুষ্টিবিদেরা বলেন, ওজন কমানোর জন্য ক্যালোরি বুঝে খাওয়া জরুরি। ওজন কমাতে হলে ক্যালোরির ঘাটতি তৈরি করতে হবে। শারীরবৃত্তীয় এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য নির্দিষ্ট ক্যালোরির দরকার হয়। খেয়াল রাখতে হবে সেই ক্যালোরির জোগান যেন থাকে আবার শরীরে অতিরিক্ত ক্যালোরি সঞ্চিত না হয়। বেশি খেয়ে ফেললে শরীরচর্চার মাধ্যমে তা ঝরিয়ে ফেলা দরকার। ক্যালোরির হিসাব ঠিক থাকলে, দৈনন্দিন যত ক্যালোরি প্রয়োজন তার চেয়ে একটু কম ক্যালোরির খাবার খেলে এই ঘাটতি তৈরি করা সম্ভব। ডায়াবিটিস থাকলে পিসিওএস পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিন্ড্রোম হলে ভাত খাওয়ার মাত্রা নির্দিষ্ট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া দরকার। ভাতের বদলে ব্রাউন রাইস তুলনামূলক ভাল হতে পারে।

চুলের যত্নে জিরে। জিরে ভেজানো জল যেমন স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারি। চুলের স্বাস্থ্যরক্ষার্থে জিরে ভীষণ উপকারি। সাদা ও কালো দুই জিরেই কিন্তু চুল ভালো রাখতে সাহায্য করে। চুলের অকালপক্কতা আটকাতে কালো জিরের জুড়ি মেলা ভার। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও থাইমোকুইনোন এক্ষেত্রে সাহায্য করে। এক কাপ নারকেল তেলে ২ চামচ কালোজিরে ভালোভাবে ফুটিয়ে নিয়ে ঠাণ্ডা করে একটি পাত্রে রেখে সপ্তাহে অন্তত ২-৩ দিন চুলে এই তেল মাখতে হবে। ২ ঘণ্টা রেখে ভালো করে শ্যাম্পু করে ধুয়ে রাখা। কয়েক চামচ কালো জিরের তেল ও তার সঙ্গে কিছুটা লেবুর রস মিশিয়ে স্ক্যাল্পে মাখা যায়। এক্ষেত্রে ভালোভাবে মেখে ৩০ মিনিট মতো রেখে ধুয়ে রাখতে হবে। হেয়ার মাস্ক হিসাবেও কালো জিরে ব্যবহার করতে পারেন। কালো জিরে ভালোভাবে গুঁড়ো করে নিয়ে দই, মধু ও অলিভ অয়েল মিশিয়ে হেয়ার মাস্ক হিসাবে বানিয়ে নিয়ে অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন। সাদা জিরে কয়েক চামচ ২-৩ কাপ জলে ফুটিয়ে নিয়ে ঠান্ডা করে নিন। শ্যাম্পুর পর এই জল দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। সপ্তাহে বেশ কয়কবার এই জল ব্যবহার করতে পারেন। স্ক্যাল্প ভালো থাকবে। কমবে খুসকির সমস্যাও। বাড়বে চুলের জেল্লা।

আমিষ না নিরামিষ কোন খাবার বেশি ভাল, তাই নিয়ে বিতর্ক লেগেই থাকে। এবার ফের ঘি পড়ল সেই বিতর্কের আগুনে। সম্প্রতি প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য, নিরামিষাশী মানুষের মস্তিষ্কের আয়তন তুলনামূলকভাবে আমিষভোজীদের থেকে কিছুটা কম। যদিও এই তথ্য শতভাগ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবুও গড় প্রবণতা তেমনই ইঙ্গিত করছে। আর এর ভিত্তিতে পুষ্টিবিদ ও নিউরোলজিস্টদের মধ্যে ইতিমধ্যেই আলোচনার ঝড় উঠেছে। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও, গবেষণাগুলির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও তার প্রভাব নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষণাগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ওয়ারক্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফিউডান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি যৌথ গবেষণা। তিন বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই সমীক্ষায় ব্রিটেনের বায়োব্যাংকের এর ১৮০,০০০-এর বেশি ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, যাঁরা দীর্ঘস্থায়ী ভাবে নিরামিষাশী বা সম্পূর্ণ উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মস্তিষ্কের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে গ্রে ম্যাটার বা ধূসর পদার্থের ঘনত্ব তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বিশেষ করে ফ্রন্টাল কর্টেক্স ও হিপোক্যাম্পাসে এই পার্থক্যটি পরিলক্ষিত হয়। প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য এই গ্রে ম্যাটার বা ধূসর বস্তুই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির মূল উৎস। প্রধান কারণ হিসেবে গবেষকরা উল্লেখ করেন ভিটামিন বি ১২, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আয়রন ও জিঙ্ক-এর ঘাটতি। এই সব পুষ্টি উপাদান সাধারণত আমিষ খাদ্য, যেমন- মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদিতে পাওয়া যায়। নিরামিষ খাবারে এসব উপাদান থাকে নামমাত্র। এই সমস্ত উপাদান স্নায়ুর বিকাশ ও কার্যকারিতা বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই উপাদানগুলি ঘাটতি হলে মস্তিষ্কের গঠন ও কর্মক্ষমতার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে। এমডিপিআই-এর বিখ্যাত বিজ্ঞানপত্রীকা নিউত্রিয়েন্টস-এ প্রকাশিত অপর একটি গবেষণাতেও উঠে এসেছে একই তথ্য। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গিয়েছে নিরামিষাশী শিশুদের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির ফলে মস্তিষ্কের বিকাশ কম। ফলে বুদ্ধিবৃত্তির বিলম্বের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে গবেষণায়। এখানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে, খাদ্য থেকে এই বিশেষ ভিটামিন না পেলে নিউরোডেভেলপমেন্ট বা মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব পড়তে পারে। গবেষকরা সতর্ক করে বলেন, মস্তিষ্কের আয়তনে পার্থক্য থাকলেও তা মানেই সব সময় বুদ্ধিমত্তার ঘাটতি হবে এমন নয়। মানুষের বুদ্ধিমত্তা নির্ভর করে বহু জটিল ফ্যাক্টরের উপর। যেমন- নিউরনের সংযোগ, শেখার অভ্যাস, মানসিক উদ্দীপনা, ও বংশগত বৈশিষ্ট্য। মস্তিষ্কের কিছু কাঠামোগত পার্থক্য থাকলেও, তা ব্যক্তির জ্ঞান বা ক্ষমতার সরাসরি পরিমাপক নয়। পুষ্টিবিদদের মতে, নিরামিষাশীদের উচিত একটি সুষম খাদ্য গ্রহণ করা, প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমে ভিটামিন বি ১২, ওমেগা-৩, আয়রন ও জিঙ্ক-এর ঘাটতি পূরণ করা উচিত। জীবনের নানা পর্যায়ে খাদ্যাভ্যাস যেমন শারীরিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে, তেমনই মস্তিষ্কের গঠন ও কর্মক্ষমতাকেও কমবেশি প্রভাবিত করতে পারে। এটা গবেষণার মাধ্যমে আরও একবার প্রকাশ্যে এল এই কথা। বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, প্রতিটি খাদ্যের নিজস্ব ভূমিকা আছে। কেবল নিরামিষ খাদ্য শরীরের সব প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারে না। কাজেই ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি, কিছু স্বঘোষিত পুষ্টিবিদ বা ভণ্ড বাবার উস্কানিতে কান না দিয়ে বিজ্ঞানের কথা শুনুন। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশে বহু শিশু অপুষ্টির শিকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles