ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন তথা ইসরোর নভোচারী শুভাংশু শুক্লা সহ ৪ নভোচারী অ্যাক্সিওম-৪ মিশনে মহাকাশে পৌঁছেছেন। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ডক করার কথা। প্রায় এক মাস বিলম্ব ও একধিকবার অভিযান স্থগিত হওয়ার পর গত ২৫ জুন স্পেসএক্সের ড্রাগন মহাকাশযানটি সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি দেয়। ২৫ জুন ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১ মিনিটে ফ্লোরিডায় নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল ফ্যালকন-৯ রকেট। তাতে করেই ড্রাগন মহাকাশযানটি পৃথিবী ছাড়ে। এই অভিযানে মনোনীত পাইলট শুভাংশু শুক্লা। তিনি ছাড়াও অ্যাক্সিওম-৪ ক্রুদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডার পেগি হুইটসন, পোল্যান্ডের মিশন স্পেশালিস্ট সাওজ উজনাস্কি-উইনিউস্কি এবং হাঙ্গেরির টিবর কাপু। নাসা, অ্যাক্সিওম স্পেস এবং স্পেসএক্স জানিয়েছে, ড্রাগন মহাকাশযানটি ভারতীয় সময় বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ডক করার চেষ্টা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাসা জানিয়েছে, ‘মহাকাশযানটি ২৬ জুন বৃহস্পতিবার সকাল ৭টার (মার্কিন পূর্ব উপকূলীয় সময়) দিকে স্টেশনের হারমনি মডিউলের মহাকাশমুখী পোর্টে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডক করবে। শুভাংশু শুক্লা আইএসএস-এ ডকিংয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। মিশনের পাইলট হিসাবে, ড্রাগন ক্যাপসুলকে ডক করার প্রস্তুতির সাথে সাথে শুভাংশু শুক্লা স্পেস স্টেশনের গতিপথ, কক্ষপথের পরামিতি এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবেন। একবার ডকিং সফল হলে, অ্যাক্সিওম -৪ ক্রু মাইক্রোগ্র্যাভিটি সম্পর্কিত প্রায় ৬০টি পরীক্ষা চালাবে। এই অভিযান চলাকালীন শুভাংশু শুক্লা নিজেই সাতটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন বলে জানা গিয়েছে।
ভারতীয় সময় অনুযায়ী বুধ বেলা ১২টা ১ মিনিটে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ৩৯এ লঞ্চ কমপ্লেক্স থেকে শুভাংশুদের নিয়ে মহাকাশে পাড়ি দিল স্পেসএক্সের ড্রাগন। উৎক্ষেপণের ঘণ্টাখানেক আগেও আচমকা প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল মহাকাশযানে। কিছু ক্ষণের চেষ্টায় সেই ত্রুটি শুধরে নেন বিজ্ঞানীরা। দীর্ঘ টালবাহানার পর শুভাংশু শুক্ল-সহ চার অভিযাত্রীকে নিয়ে মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দিল স্পেসএক্সের ‘ড্রাগন’। ভারতীয় সময় অনুযায়ী বুধবার বেলা ১২টা ১ মিনিটে আমেরিকার ফ্লরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ফ্ল্যালকন ৯ রকেটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে শুরু হল শুভাংশুদের অভিযান। শুভাংশুদের অভিযানের নাম ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’। প্রথমে নাসা ও ইসরোর যৌথ উদ্যোগে এই অভিযান হওয়ার কথা ছিল গত ২৯ মে। কিন্তু আবহাওয়া, প্রযুক্তিগত ত্রুটি-সহ নানা কারণে বার বারই অভিযান পিছিয়ে যায়। শেষমেশ মঙ্গলবার নাসা জানায়, বুধবার ওই অভিযান হতে চলেছে। সেই মতো শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। শুরু হয় প্রহর গোনার পালা। অরল্যান্ডোর এক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, বুধবার সকালে উৎক্ষেপণের ঘণ্টাখানেক আগেও আচমকা প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল মহাকাশযানে। কোনও কারণে আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য মহাকাশযানে আপলোড হচ্ছিল না।কিছু ক্ষণের চেষ্টায় সেই ত্রুটি সংশোধন করে নেন বিজ্ঞানীরা। তার পর নির্ধারিত সময়ে কেনেডি স্পেস সেন্টারের ৩৯এ লঞ্চ কমপ্লেক্সে মহাকাশযানে গিয়ে ওঠেন শুভাংশু-সহ চার নভশ্চর। ঠিক ১২টা ১ মিনিটে ফ্যালকন ৯-এর উৎক্ষেপণ হয়। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে পাড়ি দেয় ‘ড্রাগন’। নাসার এই অভিযানের জন্য ইসরোর তরফ থেকে প্রাথমিক ভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল দুই গগনযাত্রী শুভাংশু শুক্ল এবং প্রশান্ত বালাকৃষ্ণন নায়ারকে। উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ের ছেলে শুভাংশু ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন। মূল মহাকাশচারী হিসাবে বেছে নেওয়া হয় ৩৯ বছরের শুভাংশুকেই। তাঁর বিকল্প হিসাবে রাখা হয় প্রশান্তকেও। শুভাংশু ‘ড্রাগন’-এর পাইলট হলেও অভিযানের কমান্ডার হিসাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নাসার প্রাক্তন নভশ্চর তথা অ্যাক্সিয়ম স্পেসের মানব মহাকাশযানের ডিরেক্টর রেগি হুইটসন। এ ছাড়াও থাকছেন পোল্যান্ডের স্লায়োস উজ়নানস্কি-উইসনিউস্কি এবং হাঙ্গেরির টিবর কাপু। ১৪ দিনের এই অভিযানের জন্য দীর্ঘ প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল চার নভশ্চরকে। যাতে মহাকাশে যাওয়ার আগে সংক্রমণজনিত কোনও রোগে অসুস্থ না পড়েন, সে জন্য গত এক মাস ধরে চার জনকেই থাকতে হয়েছিল নিভৃতবাস (কোয়ারেন্টাইন)-এ। আগামী ১৪ দিন তাঁরা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন। সেখানে অন্তত ৬০টি পরীক্ষানিরীক্ষা চালাবেন।
গগনযান মিশনের গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা ভারতীয় বায়ুসেনার একজন টেস্ট পাইলট। ইসরোর গগনযান মিশনের জন্য নির্বাচিত চারজন মহাকাশচারীর মধ্যে একজন। গগনযান কর্মসূচির অংশ হিসেবে মহাকাশে পাঠানোর জন্য মনোনীত করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এটি ভারতের প্রথম নিজস্ব ক্রুড মহাকাশ যান। বর্তমানে Axiom Mission 4 (Ax-4)-এর প্রাথমিক মিশন পাইলট হিসাবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে আইএসএস রয়েছেন। ২৫শে জুন এটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। রাকেশ শর্মার পর তিনিই মহাকাশে গেলেন এমন দ্বিতীয় ভারতীয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া প্রথম ভারতীয়। শুভাংশু ১৯৮৫ সালের ১০ই অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের লখনউতে জন্ম। লখনউয়ের সিটি মন্টেসরি স্কুলে তাঁর স্কুলজীবন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের ঘটনা তাকে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদানের জন্য গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। পরিবারের কাউকে না জানিয়েই তিনি সফলভাবে ইউপিএসসি ও এনডিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পুনের ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি এনডিএ থেকে ২০০৫ সালে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলর অফ সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স একাডেমিতে পাইলট প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০০৬ সালের জুন মাসে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আইএএফ ফাইটার উইংয়ে কমিশন লাভ করেন। তিনি বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স থেকে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং-এ এমটেক ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। একজন যুদ্ধবিমানের টেস্ট পাইলট এবং কমব্যাট লিডার। Su-30 MKI, MiG-21, MiG-29, Jaguar, Hawk, Dornier এবং এএন-৩২ সহ বিভিন্ন ধরনের বিমান ওড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। ২০০০ ঘণ্টারও বেশি বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তাঁকে ভারতীয় বায়ুসেনার গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত করা হয়। ২০১৯ সালে ইসরো শুভাংশু শুক্লাকে মহাকাশচারী প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচন করে। তাঁকে ইন্ডিয়ান হিউম্যান স্পেসফ্লাইট প্রোগ্রামের জন্য ইনস্টিটিউট অফ অ্যারোস্পেস মেডিসিন আইএএম দ্বারা নির্বাচিত চারজনের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০২০ সালে মস্কোর স্টার সিটিতে অবস্থিত ইউরি গ্যাগারিন কসমোনট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রশিক্ষণ নেন। ২০২১ সালে সম্পন্ন করেন।
৪১ বছর পর মহাকাশে রওনা হলেন দ্বিতীয় ভারতীয় মহাকাশচারী গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা। বুধবার বেলা ১২টার কিছু পর মহাকাশে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন-এর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন৷ ভারতের কাছে এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত৷ আর এই সফরের শুরুতে শুভাংশুকে উদ্বুদ্ধ করেছেন স্বয়ং বলিউড বাদশা শাহরুখ খান৷ স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯ রকেটে ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ অ্যাক্সিয়ম স্পেস উৎক্ষেপণের দিনের প্লে লিস্টের এক ঝলক শেয়ার করেছে৷ যেখানে দেখা গিয়েছে শুভাংশু-সহ বাকিরা এই যাত্রাপথে কোন কোন গান বেছে নিয়েছেন৷ আর মহাকাশ সফরে শুভাংশুর পছন্দের গানের তালিকা দেখে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন দেশবাসী৷ জানা গেছে, মহাকাশচারীরা প্রায়শই রকেটে উৎক্ষেপণের আগে গান শোনেন৷ যাতে মন শান্ত থাকে আর মনোযোগ বাড়ে। কারণ গান মানসিক চাপ কমাতে ভীষণ ভালো কাজ করে৷ এই যাত্রাপথে শুভাংশু বেছে নিয়েছে শাহরুখ খানের ‘স্বদেশ’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘ইউ হি চলাচল…৷’ আশুতোষ গোয়ারিকর পরিচালিত, শাহরুখ খান অভিনীত ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই গান শুভাংশুকে মহাকাশ যাত্রায় অনুপ্রাণিত করেছে৷ কৈলাশ খের এবং হরিহরনের গাওয়া এই গান তাঁর বিশেষ পছন্দের। মিশন কমান্ডার এবং অভিজ্ঞ মহাকাশচারী পেগি হুইটসন মহাকাশ যাত্রায় বেছে নিয়েছেন ইমাজিন ড্রাগনস- এর ‘থান্ডার’ গান৷ অন্যদিকে, পোল্যান্ডের স্লাওজ উজনানস্কি বেছে নিয়েছেন পোলিশ ট্র্যাক সুপ্রিমোস। হাঙ্গেরির টিবোর কাপুস এই সফরে শোনার জন্য বেছে নিয়েছেন হাঙ্গেরীয় গান ‘বুভোহেলি।’ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন -এ ‘অ্যাক্সিয়ম-৪’ মিশনের জন্য শুক্লা ভারতের জন্য প্রথম বার্তা পাঠিয়েছেন৷ মহাকাশে উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপ ক্যাপ্টেন শুভাংশু শুক্লা, যিনি মিশনের পাইলটও, দেশবাসীকে ‘নমস্কার’জানান৷ তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় ভারতবাসী, কী অসাধারণ যাত্রা। ৪০ বছর পর ফের মহাকাশে আমরা। এই মুহূর্তে প্রতি সেকেন্ডে ৭.৫ কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরছি আমরা। আমার কাঁধের তেরঙ্গা জানান দিচ্ছে, আমি পৃথিবীর বাইরে হলেও, আপনাদের মধ্যেই আছি। এটা স্পেস স্টেশনে ভারতের প্রবেশের সূচনা নয়, মহাকাশে ভারতের মানুষ পাঠানোর সূচনা। আপনারা সকলে এই যাত্রায় শামিল হোন। গর্ব বোধ করুন, উৎসাহিত বোধ করুন। মহাকাশে ভারতের মানব অভিযানের নতুন সূচনা হল। জয় হিন্দ, জয় ভারত।’




