Monday, July 13, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

জগন্নাথের মুসলিম ভক্ত!‌ সাড়ম্বরে পালন রথযাত্রা!‌ জন্মগত ভাবে মুসলিম, প্রভু জগন্নাথের উপর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা

২৭ জুন। শুক্রবার। শুরু রথযাত্রা উৎসব। পুরী থেকে দিঘা। মাহেশ বা ইসকন। সব জায়গাতেই নামবে লক্ষ লক্ষ ভক্তের ঢল। পুরী মন্দির থেকে মাসির বাড়ি গুচিন্ডা যাবেন জগন্নাথ। ৭ দিন মাসির বাড়িতে থাকার পর আবারও পুরীতে ফিরে আসবেন। রথযাত্রার গোটা দৃশ্যজুড়ে এমন বহু লৌকিক ও অলৌকিক ঘটনা। ভগবানের প্রতি ভক্তের ভক্তি ও শ্রদ্ধা আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ‘আহে নীল সৈল’। এই বিখ্যাত ভজনটির কথা মনে পড়ে? প্রভু জগন্নাথের জন্য ভজন রচনা করেছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর উড়িয়া কবি সালবেগ। জন্মগতভাবে মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও প্রভু জগন্নাথের উপর তাঁর ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। এমনকী প্রভু জগন্নাথের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন নিজের প্রাণ। শোনা যায় তাঁর মৃত্যুর পর রথযাত্রার সময় গুচিন্ডা যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে সালবেগের সামাধির সামনে এসেই থেমে গিয়েছিল জগন্নাথের রথের চাকা। উড়িয়া ভাষার উল্লেখযোগ্য কবি নীলমণি মিশ্রের লেখা থেকে জানা যায়, মুঘল শাসনকালে সালবেগ মুঘল সালাতে কাজ করতেন। তাঁর পিতা ছিলেন মুসলিম। মা ছিলেন হিন্দু। পুত্র সালবেগ অবশ্য ইসলাম ধর্মই পালন করতেন। একবার এক যুদ্ধে অংশ নেন সালবেগ। যুদ্ধে গুরুতর আহত হন। আঘাত লেগে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয় মাথায়। বৈদ্য দেখিয়ে কোনও ভাবেই ক্ষত নিরাময় হল না। এমন সময় মুঘল সেনাবাহিনী থেকে সালবেগকে বহিষ্কার করা হয়। এই ঘটনায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। ঠিক এমন সময় সালবেগের মা প্রভু জগন্নাথের স্মরণ নিতে বললেন। শুরু হল প্রভুর আরাধনা। দিনের পর দিন প্রভুর প্রতি সালবেগের ভক্তি বাড়তে শুরু করল। একদিন স্বয়ং জগন্নাথদেব স্বপ্নে এসে সালবেগের মাথার ক্ষত স্পর্শ করলেন। ঘুম ভেঙে সালবেগ অবাক হয়ে দেখলেন তাঁর মাথাতে আর কোনওই ক্ষত চিহ্ন নেই। সেই মুহূর্তে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের দিকে রওনা দেন। বিধর্মী হওয়ায় তাঁকে মন্দিরে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। সালবেগ মন্দিরের বাইরে বসেই প্রভুর নাম জপ করতে থাকেন। এর কিছুদিন পর সেখানেই দেহ ত্যাগ করেন। আর মৃত্যুর পরই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। রথযাত্রার সময় জগন্নাথদেবের রথ গুচিন্ডা যাওয়ার পথে রাস্তার পাশে সালবেগের সমাধির সামনে এসেই থেমে যায়। অনেক চেষ্টা করেও রথের চাকা সেদিন নড়ানো যায়নি। সাতদিন একভাবে রথ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। মন্দিরের পুরোহিত যখন এ বিষয়ে কোনও বিধান দিতে পারলেন না, ঠিক তখন সমবেত ভক্তেরা সালবেগের নামে জয়জয়কার করতে থাকেন। সেদিন থেকে আজও রথযাত্রার সময় এই সমাধির সামনে জগন্নাথের রথ কিছুক্ষণের জন্য দাঁড় করানো হয়।

রথযাত্রা উপলক্ষ্যে প্রতি বছরই বহু মানুষ ভিড় করেন পুরীতে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন এবং মহৎ উৎসব এবার শুরু হবে জুন মাসের ২৭ তারিখে। এই উৎসবে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা জগন্নাথ মন্দির থেকে গান্ধিচা মন্দিরে রথে চড়ে যাত্রা করেন। কথিত আছে, পুরীর রাজা নিজ হাতে তিনটি রথ ঝাঁট দেন—এই প্রথা ‘ছেরা পাহঁরা’ নামে পরিচিত, যা ঈশ্বরের কাছে সমতার বার্তা বহন করে। পুরীর এই রথ টানেন হাজার হাজার ভক্ত, বিশাল কাঠের রথগুলি সরাসরি টেনে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের রাজপথ ধরে। এই উৎসব শুধু দেব-দেবীর যাত্রা নয়, এটি ভক্তি, ঐক্য, ভালোবাসা ও আত্মিক উৎকর্ষের প্রতীক। উল্লেখ্য, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মজিহি ২২ জুন, রবিবার একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রথযাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করেন। তিনি নির্দেশ দেন, রথযাত্রাকে সম্পূর্ণভাবে ‘ঘটনাবিহীন’ রাখতে হবে। পুরীর গ্র্যান্ড রোড এবং অন্যান্য সংবেদনশীল এলাকায় ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও কোস্ট গার্ডের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। প্রশাসন জানিয়েছে, রথযাত্রার প্রতিটি পর্যায়ে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে যাতে ভক্তরা নির্বিঘ্নে পুরী পৌঁছতে পারেন সে কারণে এই সময় ৩৬৫টি বিশেষ ট্রেন চালানো হবে। এই বিশেষ ট্রেনগুলি চলবে ওড়িশার রাউরকেলা, বিরামিত্রপুর, বঙ্গিরিপোসি, জুনাগড় রোড, বদমপাহাড়, বৌধ, জগদলপুর, বালেশ্বর, অনুগুল, গুনুপুর, রায়গড়া-সহ একাধিক এলাকা থেকে। এছাড়াও, অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম, ছত্তিশগড়ের গণ্ডিয়া ও পশ্চিমবঙ্গের সাঁতরাগাছি থেকে পুরী পর্যন্ত বিশেষ ট্রেন পরিষেবা চালু থাকবে মূল রথযাত্রার দিনগুলিতে।

রথযাত্রা উপলক্ষে দিঘায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সৈকত নগরীতে প্রবেশের আগে কাঁথিতে গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় দু’পাশে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। জনসংযোগের মাঝে মারিশদা থানায় গিয়ে কথা বললেন পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে। শুক্রবার রথযাত্রায় সোনার ঝাঁটা দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে রশি টেনে রথযাত্রার সূচনা করবেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবারই দিঘায় মুখ্যমন্ত্রী। দিঘায় প্রবেশ করার আগে তাঁকে স্বাগত জানাতে রাস্তার দু’ধারে প্রচুর মানুষের সমাগম দেখে কাঁথি ৩ পঞ্চায়েত সমিতির সামনে গাড়ি দাঁড় করান মুখ্যমন্ত্রী। কথা বলেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে। মুখ্যমন্ত্রী গাড়ি থামান কাঁথি বাসস্ট্যান্ডের সামনে। সেখানেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। রামনগরে তৃণমূল বিধায়ক অখিল গিরিকে সঙ্গে নিয়ে মিছিলেও খানিকটা হেঁটেছেন মুখ্যমন্ত্রী। জগন্নাথদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার পরে দিঘায় প্রথম বার অনুষ্ঠিত হতে চলেছে রথযাত্রা উৎসব। সেই কারণে এ বার প্রথম থেকেই বাড়তি গুরুত্ব ও সতর্কতার উপর জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দিঘার নতুন জগন্নাথ মন্দির থেকে পুরনো মন্দির, প্রায় এক কিলোমিটার পথ জুড়ে চলবে রথযাত্রা। অনুমান, এ বছর প্রায় দুই থেকে আড়াই লক্ষ ভক্ত রথযাত্রার সময় উপস্থিত হবেন দিঘায়। বিপুল জনসমাগম সামলাতে প্রশাসন, পুলিশ, দমকল ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কাজ করার নির্দেশ আগেই দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সতর্কতা জারি। ওল্ড দিঘা থেকে নিউ দিঘা স্টেশন পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে কাঠের বড় ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল।

রথ উপলক্ষে ৫ দিন ধরে এরাজ্যেই বিতরণ হবে পুরী থেকে আসা মহাপ্রসাদ। জানালেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। দিঘায় সদ্য উদ্বোধন হওয়া জগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টারের রথযাত্রা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করে একথা জানিয়ে শুভেন্দুবাবু বলেন, দিঘার রথযাত্রা উপলক্ষে সাড়ে ৭ হাজার পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে। লোক তো হবে না। ওদের দিয়েই ভিড় বাড়ানো হবে। আমি ওর থেকে বেশি লোক নিয়ে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউতে রথ টানব। বেলা ১২টার সময়। লোকসংস্কৃতি পরিষদের রথ। তার পর তমলুকের গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দিরে পুরী থেকে মহাপ্রসাদ আসছে। ৫ দিন ধরে প্রসাদ বিতরণ হবে। বিকেল ৩টেয় সেখানে যাব। গজা প্যাঁড়া না, আবদুল চাচার হালাল মিষ্টি না। বিকেল ৪টেয় মেছেদায় ইসকনের রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করব। দিঘার জগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টারের উদ্বোধনের পর রথযাত্রার আয়োজন নিয়ে বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে জোর টক্কর চলছে। শুভেন্দুবাবু অগেই জানিয়েছেন, এবার ধূমধাম করে রথযাত্রা পালন করবেন।

২৭ জুন শুক্রবার, ২০২৫ রথযাত্রার দিন প্রভু জগন্নাথ, প্রভু বলরাম এবং দেবী সুভদ্রা নগর ভ্রমণ করেন। তাঁরা তিন জনে রথে চড়ে মাসির বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। বেশ কয়েক দিন মাসির বাড়ি থাকার পর তাঁরা আবার নিজের বাড়ি ফিরে আসেন। কোথাও সেটি দশ দিন পর পালিত হয়, কোথাও আবার সাত দিন পর পালন করা হয়। জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি থেকে পুনরায় নিজের বাড়ি ফিরে আসার দিনটি উল্টোরথ হিসাবে পালন করা হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, রথযাত্রার দিন বিশেষ কিছু টোটকা করতে পারলে সংসারে দ্বিগুণ উন্নতি হয়। নিয়ম পালনে আর্থিক দিকেও স্বচ্ছলতা বৃদ্ধি পায়।
১) রথের দিন যে কোনও জগন্নাথ মন্দিরে হলুদ রঙের নতুন বস্ত্রের উপর ১১ রকমের ফল, ১১ রকমের মিষ্টি এবং ১১টি কয়েন রেখে অর্পণ করে মনের ইচ্ছা জানান। নিষ্ঠাভরে এই কাজটি করতে পারলে মনস্কামনা পূরণ হয়।
২) রথযাত্রার পরের দিনে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে গঙ্গাস্নান করতে পারলে খুব ভাল হয়।
৩) এই দিন নিরামিষ আহার করতে হবে। বাড়িতে কোনও রকম আমিষ রান্না করা যাবে না।
৪) জগন্নাথদেবকে এই দিন সাদা এবং হলুদ রঙের ফুল দিয়ে সাজান।
৫) জগন্নাথদেবের মন্দিরে ময়ূরের পালক অর্পণ করতে পারলে খুব ভাল হয়।
৬) বাড়ির সামনে দিয়ে বড় রথ না গেলেও, বাচ্চাদের ছোট রথের দড়ি ধরে টানুন কিংবা রথের দড়ি ছুঁলেও হবে। খুব ভাল ফল পাওয়া যায়, জগন্নাথদেবের আশীর্বাদ লাভ হয়।
৭) একটা মাটির প্রদীপে ঘি এবং দুটো লবঙ্গ দিয়ে যে কোনও জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে জ্বালুন।
৮) রথ যে হেতু জয়ের প্রতীক, তাই এই দিন যে কোনও টোটকা নিষ্ঠাভরে পালন করতে পারলে ভাগ্য জয় করা যায়।
৯) রথের দিন বাড়িতে গাছ লাগানো অত্যন্ত শুভ বলে মানা হয়।
১০) রথের দিনটি দান করার জন্য খুবই শুভ। নিজের সাধ্যমতো যে কোনও জিনিস এই দিন দান করা যেতে পারে।

প্রথমবার, দিঘায় মহাধুমধামে পালিত হতে চলেছে রথযাত্রা। স্বাভাবিকাভবেই জমায়েত হবে বহু মানুষের। রথযাত্রাকে সামনে রেখে দিঘা পর্যটন এলাকায় বাড়ছে পর্যটকের ঢল। জগন্নাথ ধাম উদ্বোধনের পর থেকেই দিঘা এমনিতেই নয়া আঙ্গিকে পর্যটনের এক নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। হোটেল মালিকদের মতে, বর্তমানে প্রায় ছোট-বড় ৯০০-র বেশি হোটেল রয়েছে দিঘায়। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রথের সময় বেশ কিছু অসাধু হোটেল ব্যবসায়ী হোটেল ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নন এসি ৭০০ থেকে হাজার টাকার পরিবর্তে ১৫০০ থেকে ২০০০ বৃদ্ধি করেছিল। এসির ক্ষেত্রে দু’ হাজার থেকে আড়াই হাজারের এসি ঘর সাড়ে তিন থেকে চার হাজার করা হয়েছিল। রাতারাতি হোটেল অ্যাসোসিয়েশন ও প্রশাসনের পদক্ষেপে তা সংশোধন হয়েছে। এমনটাই দাবি পর্যটকদের। রথযাত্রার সময় দীঘায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক পর্যটক ইতিমধ্যেই দিঘায় পৌঁছে গেছেন এবং অধিকাংশ হোটেলের বুকিং প্রায় শেষের মুখে। এই পরিস্থিতিতে পর্যটকদের সুরক্ষা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে দীঘা হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কড়া সিদ্ধান্ত। একটি বিশেষ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যদি কোনও হোটেল ভাড়ার অনিয়ম বা অতিরিক্ত মূল্য নেওয়ার ঘটনা প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট হোটেল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এমনকি লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles