কলকাতায় পদশ্রী দীপা মালিক। ধনধান্য অডিটরিয়ামে এডুকেশন বোর্ড অফ ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পদশ্রী দীপা মালিক বলেন ‘শিক্ষায় খেলাধুলার অন্তর্ভুক্তি জরুরি’। উপস্থিত ছিলেন বাংলার প্যারা সুইমার রিমো সাহা এবং প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার আলভিটো ডি কুনহা। প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে প্যারালিম্পিক গেমসে পদকজয়ী দীপা মালিক বলেন, “শিক্ষায় খেলাধুলার অন্তর্ভুক্তি জরুরি। ছোটবেলা থেকেই আমাদের মতো প্যারা অ্যাথলিটদের পিছিয়ে রাখা হয়। সেটা যাতে না হয় এবং কীভাবে তারা নিজেদের এগিয়ে রেখে ভাবতে পারবে, সে ব্যাপারে এমন অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিক্ষা পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্যারা অ্যাথলিটদের প্রাধ্যান্য দিতে হবে। পাশাপাশি স্পেশাল এডুকেশন তথা ইনক্লুশনের উপরেও স্কুলগুলিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে আমাদের দেশেই বসতে চলেছে বিশ্ব প্যারা অ্যাথলিট চ্যাম্পিয়নশিপের আসর। দেশের সমস্ত ক্রীড়াপ্রেমীর কাছে অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। খেলাধূলা এবং পড়াশোনার মেলবন্ধন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মতো প্যারা-অ্যাথলিটদের ছোট থেকেই পিছিয়ে রাখা হয় বাকিদের থেকে। সেটা যাতে না হয় এবং কী উপায়ে সেটা শেখানো যায়, তার জন্য এমন অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

আকর্ষণের কেন্দ্রে প্রথমবার প্যারা অলিম্পিকে প্রথম ভারতীয় প্যারা অলিম্পিয়ান ডাঃ দীপা মালিক৷ ক্রিকেট খেলতে এবং বাইক চালাতে পছন্দ করেন এই প্যারা অলিম্পিয়ান শৈশবে রোগাক্রান্ত হয়ে চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়েন৷ কিন্তু হার-না-মানা মনোভাবকে পুঁজি করে সেনাবাহিনীর আধিকারিকর ঘরনী ঘুরে দাঁড়িয়েছেন৷ চল্লিশ বছরে জ্যাভলিনে হাতেখড়ি৷ দু’বছরের মধ্যে বিশ্বের দু’নম্বর হিসেবে উঠে এলেও অর্জুন পুরস্কারে সম্মানিত দীপা অলিম্পিক পোডিয়ামে উঠেছিলেন শটপুটে সাফল্যের কারণে৷ কলকাতা তাঁর ছোটবেলার শহর৷ ঝালমুড়ির স্বাদ, ডুয়ার্সের জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা আজও তাজা খেলরত্ন দীপার মনে৷ কলকাতায় দীপার প্রথম স্কুল৷ সল্টলেক কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে স্কুল জীবন শুরু হওয়া যা আরও দীর্ঘায়ত হয়েছিল এই শহরেই৷ সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে প্রথম রকব্যান্ড সঙ্গীত শোনার অভিজ্ঞতা আজও ছবির মতো দীপার চোখে৷

বাঙালি পরিবারের সঙ্গে দীপা মালিকের যোগাযোগ রয়েছে, যা তিনি নিজের মুখেই জানিয়েছেন৷ দীপার দিদির বিয়ে হয়েছে বাঙালি পরিবারে৷ পাঞ্জাবি পরিবারে কন্যার বাঙালি পরিবারের রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হওয়ার গল্পের কথা শোনালেন৷ মাছ খাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতাও বাঙালি পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের কারণেই বলে জানান৷ ছোটবেলা থেকে ঠাকুমার প্রশ্রয় ছিল দীপা মালিকের সব কাজে৷ পরবর্তী জীবনে স্বামী এবং সন্তানদের সমর্থনের হাত বাড়ালেও দীপা ভুলতে পারেন না ঠাকুমার প্রথম সমর্থনের কথা৷ তাই জীবনকৃতী সম্মান দীপা উৎসর্গ করলেন ঠাকুমাকেই৷ তাঁর হাত ধরেই প্যারা স্পোর্টসে সাফল্যের আলো৷ ধীরে ধীরে সেই সাফল্যের গ্রাফ বেড়েছে৷ দীপাও প্রত্যাশার পারদ সম্পর্কে সচেতন৷ কোনও প্রতিযোগিতায় পদক সংখ্যা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে আগ্রহী নই৷ তবে পারফরম্যান্সের গুণগত মান যে ভালো হবে, সে বিষয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী৷”

রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে এই বিশাল কর্মকাণ্ড। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ১০০টি দেশের মোট ১,০০০ হাজার প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করবেন। টুর্নামেন্টটি ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস প্যারালিম্পিকের বাছাই পর্বও। সুতরাং অ্যাথলিটদের কাছে বিশ্ব প্যারা অ্যাথলিট চ্যাম্পিয়নশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট হতে চলেছে। ২০১৬ সালে শটপুটে রুপো জয়ী দীপার পাশাপাশি প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলার আলভিটো ডি কুনহা বলেন, কেরিয়ার হিসেবে স্পোর্টসকে বেছে নিলেও যে ভবিষ্যতে স্বপ্নপূরণ করা যায় সেটা ফুটে উঠল তাঁদের কথায়। খেলাধূলার মধ্যে থাকলে যে মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকা যায়, সেটাও জানালেন তাঁরা। সিলেবাসের মধ্যে খেলাধূলাকেও যে বাধ্যতামূলক ভাবে রাখা উচিত। “খেলাধুলোই পারে একজন মানুষের চরিত্র ও শৃঙ্খলা গঠন করতে। কাজেই পড়াশোনার পাশাপাশি খুলোধুলার বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। খেলার মাধ্যমেই নিয়মানুবর্তিতার অভ্যেস তৈরি হয়। চরিত্র গড়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুযোগও পাওয়া যায়। আমি মনে করি বাংলায় অনেক প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ রয়েছে, যাঁরা ভবিষ্যতের তারকা হয়ে উঠতে পারেন। তবে সঠিক দিক নির্দেশনার অভাবে হারিয়ে যান তাঁরা।”

সাধারণত ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার উপরেই জোর দেওয়া হয় বাচ্চাদের। সে জন্য হয়তো বড় হয়ে ক্রীড়াজগতে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সেটা পূর্ণ হয়ে ওঠে না। ঠিক সেভাবেই অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে সাফল্য পেতে হয় প্যারা-অ্যাথলিটদের। প্যারা সাঁতারু রিমো সাহার গলাতেও শোনা যায় একই সুর। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি আমি। সম্প্রতি রবেন আইল্যান্ড থেকে ব্লোবার্গ পর্যন্ত সাঁতরে গিয়েছি। তবে আমরা এই ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খুঁজছি যারা ভবিষ্যতে জাতীয় দলের হয়ে সাফল্য পাবে।’

প্যারা স্পোর্টসে ভারতের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে সেটাও জানান দীপা। চলতি বছরেই দিল্লিতে আয়োজিত হবে ওয়ার্ল্ড প্যারা অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপ। প্রায় ১০০-এর বেশি দেশ থেকে ১০০০ জনেরও বেশি ক্রীড়াবিদ অংশ নেবেন এই ইভেন্টে। ভারতের জন্য এটা গর্বের মুহূর্ত। তিনজনেই আশাবাদী ভবিষ্যতে প্যারা স্পোর্টসে আরও সাফল্য পাবে ভারত।





