নেই হাত নেই পা! বিশ্বের প্রথম চতুর্অঙ্গহীন তীরন্দাজ পায়েল নাগ,ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজের মহিলাদের কম্পাউন্ড ইভেন্টে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শীতল দেবীকে হতবাক করে দিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছেন। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়, পায়েল একটি নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে থাকা জীবন্ত তারের সংস্পর্শে আসা এক ডোবায় ভুলবশত পা রাখে। এর ফলে সৃষ্ট বিদ্যুৎস্পৃষ্টে সে গুরুতরভাবে আহত হয় এবং তার জীবন বাঁচাতে ডাক্তাররা তার চারটি অঙ্গই কেটে ফেলতে বাধ্য হন।বিশ্ব তিরন্দাজি প্যারা সিরিজে সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন ওড়িশার পায়েল
চারটি অঙ্গ হারিয়েও থামেনি লড়াই, বিশ্ব আর্চারি প্যারা সিরিজে জোড়া সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন ওড়িশার পায়েল নাগ। সংগ্রাম থেকে সাফল্যের এই কাহিনি এখন অনুপ্রেরণা গোটা দেশের কাছে।
“না খেতে পারবে, না হাঁটতে পারবে… এর চেয়ে বিষ দিয়ে দাও” এক সময় এই নির্মম কথা শুনতে হয়েছিল পরিবারকে। আজ সেই মেয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করলেন। ব্যাংককে ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজে জোড়া সোনা জিতে ইতিহাস গড়লেন বছর আঠারোর পায়েল নাগ।
ওড়িশার বলাঙ্গির মেয়ে পায়েলের জীবন বদলে যায় ২০১৫ সালে। তখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। রায়পুরে নির্মীয়মাণ একটি বাড়ির ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। জলে ভেজা ছাদে তারের সংস্পর্শে আসতেই ঘটে দুর্ঘটনা। প্রাণ বাঁচাতে চিকিৎসকদের তাঁর চারটি অঙ্গ বাদ দিতে হয়। সংসার তখন চরম দারিদ্র্যে। বাবা বিজয় কুমার নাগ পেশায় রাজমিস্ত্রি। মা জনতা-সহ ছ’জনের পরিবারে পায়েলের চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয়নি। শেষমেশ তাকে রাখা হয় পার্বতী গিরি বাল নিকেতন অনাথ আশ্রমে। সেখান থেকে শুরু নতুন লড়াই। ২০২৩ সালে কোচ কুলদীপ ভেদওয়ান সোশ্যাল মিডিয়ায় পায়েলের ছবি দেখে তাকে খুঁজে বের করেন। তিনিই নিয়ে যান কাটরার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। প্রথম দিনেই ভেঙে পড়েছিলেন পায়েল—“আমি কীভাবে পারব?” প্রশ্ন ছিল তাঁর। কোচের একটাই জবাব, “পরিশ্রম করো, বাকিটা আমি দেখছি।”
তারপর শুরু হয় কঠোর অনুশীলন প্রতিদিন প্রায় ৮ ঘণ্টা। বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্র দিয়ে শেখানো হয় তিরন্দাজি। ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠেন পায়েল। ২০২৫ সালে এশিয়ান ইয়ুথ প্যারা গেমসে আন্তর্জাতিক অভিষেক, যেখানে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয় ওয়ার্ল্ড আর্চারি। তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বের প্রথম চার অঙ্গহীন তিরন্দাজ যিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নামেন। এরপর ব্যাংককে এল সেরা সাফল্য। ফাইনালে হারালেন বিশ্বের এক নম্বর শীতল দেবীকে ১৩৯-১৩৬ ব্যবধানে। একই সঙ্গে দলগত বিভাগেও জিতলেন সোনা। ভারত মোট ১৬টি পদক জিতে তালিকায় এখন শীর্ষে।
এই সাফল্যে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন আনন্দ মাহিন্দ্রা। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, “সাহস, দৃঢ়তা আর ইতিবাচক ভাবনার প্রকৃত মানে বুঝতে হলে পায়েলকে দেখুন।” শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কও। এই সাফল্যের যাত্রায় সর্বক্ষণ তাঁর পাশে ছিলেন দিদি বর্ষা বলেন, “মানুষ অনেক কথা বলেছিল, সেগুলোই ওকে আরও শক্ত করেছে।” এক সময় যাকে বোঝা ভাবা হয়েছিল সংসাদরের, আজ তাঁর সাফল্যই হয়ে উঠেছে সব অপমানের জবাব।





