মহাদেবের প্রতি থাকা ভক্তি থেকে অনেকেই এই দিন তাঁকে নানা জিনিস অর্পণ করেন। কিছু জিনিস রয়েছে যা মহাদেবকে অর্পণ করা অনুচিত। অন্যথায় ব্রত পালনের পূর্ণ সুফল প্রাপ্তি হয় না। হিন্দু ধর্মে উল্লিখিত সকল ব্রতের শ্রেষ্ঠ ব্রত মহাশিবরাত্রি। ফাল্গুন মাসের চতুর্দশী তিথিতে মহাশিবরাত্রি পালন করা হয়। পুরাণমতে, এই তিথিতে মহাদেবের সঙ্গে দেবী পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। তাই শিবরাত্রির দিন মহাদেবের সঙ্গে পার্বতীরও পুজো করলে খুব ভাল ফলপ্রাপ্তি ঘটে। বহু মানুষই শিবরাত্রির ব্রত পালন করেন। দিবারাত্র উপবাস রেখে এই ব্রত পালনের চল রয়েছে। সেটি সম্ভব না হলে কেবল ফলাহার করেও শিবরাত্রির ব্রত পালন করা যায়।
মহাদেবকে কোন জিনিসগুলি দেওয়া নিষেধ?
শিবলিঙ্গে চাল নিবেদনের চল রয়েছে। এর ফলে জীবনে উন্নতি লাভ করা যায়। তবে খেয়াল রাখলে হবে সেই চাল যেন অখণ্ড ও পরিষ্কার হয়। অপরিষ্কার, খণ্ড বা ভাঙা চাল শিবলিঙ্গে অর্পণ করা যাবে না। এর ফলে লাভের বদলে ক্ষতি হবে। শিবপুরাণ অনুসারে, শিবলিঙ্গে কলকে, কেতকী, পদ্মফুল ও তুলসীপাতা নিবেদন করা যায় না। বদলে বেলপাতা, নীল অপরাজিতা বা নীলকণ্ঠ, ধুতরো, আকন্দ প্রভৃতি দেওয়া যেতে পারে। বেলপাতার ক্ষেত্রে দেখে নিতে হবে এর ডাঁটিতে যেন তিনটি পাতা থাকে এবং পাতাগুলির গায়ে কোনও দাগ বা ক্ষত থাকা যাবে না। পরিষ্কার, অক্ষত পাতা শিবলিঙ্গে নিবেদন করতে হবে। শিবপুজোয় শঙ্খ বাজানো উচিত নয়। শঙ্খের জলও শিবের গায়ে দেওয়া উচিত নয়। এই বিষয়টি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। শিবলিঙ্গ পৌরুষের প্রতীক। তাই সেটির মধ্যে হলুদ বা কুমকুম দেওয়া যাবে না। এই ভুলটি অনেকেই করে থাকেন। তবে শিবলিঙ্গে এই দুই জিনিসের কোনওটিই দেওয়া উচিত নয় বলে জানাচ্ছে শাস্ত্র। যদি মহাদেবের সঙ্গে পার্বতীর পুজো করা হয়, সে ক্ষেত্রে পার্বতীকে হলুদ ও কুমকুম অবশ্যই দিতে হবে। সঙ্গে শাঁখা-পলা, টিপের পাতা প্রভৃতি দেওয়া যেতে পারে। মহাশিবরাত্রিতে কালো রঙের পোশাক পরে শিবের মাথায় জল ঢালা যাবে না। বদলে কোনও হালকা রঙের পোশাক, যেমন- সবুজ, আকাশি, সাদা প্রভৃতি রঙের জামা পরে শিবলিঙ্গে জল ঢালতে পারেন। শিবলিঙ্গকে পূর্ণ প্রদক্ষিণ করা যাবে না। অন্যান্য দেব-দেবীর পুজোর ক্ষেত্রে তাঁদের পূর্ণ প্রদক্ষিণ করার নিদান থাকলেও শিবের ক্ষেত্রে সেটি করা যায় না।
শাস্ত্রমতে, সকল ব্রতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্রত মহাশিবরাত্রি। শিবরাত্রির ব্রত পালন করলে পুণ্য লাভ হয়। হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর বিয়ের দিন হল এই শিবরাত্রি। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় মহাশিবরাত্রি।
ব্রত্যের নিয়ম– শিবরাত্রির আগের দিন নিরামিষ আহার গ্রহণ করতে হবে। শিবরাত্রির দিন উপবাস রেখে চার প্রহরে চার বার শিবলিঙ্গকে গঙ্গাজল, দুধ, দই, ঘি এবং মধু সহযোগে স্নান করানোর পর বেলপাতা, ধুতরো, নীলকণ্ঠ (নীল অপারিজতা), আকন্দ ফুল এবং বেল ও অন্যান্য ফল সহযোগে ‘ওম নমো শিবায়’ মহামন্ত্র পাঠে দেবাদিদেব মহাদেবের অভিষেক করতে হবে। পরের দিন পারণ এবং অতিথি ভোজন পালনের মধ্যে দিয়ে শ্রীশ্রী শিবরাত্রির ব্রত সম্পন্ন করতে হবে।
শিবরাত্রি মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর বিয়ের তিথি। অর্থাৎ, এই তিথি হল শিব তথা পুরুষশক্তি এবং আদিশক্তির মিলনতিথি। এই তিথিতে দেবাদিদেব মহাদেব এবং দেবী পার্বতীর আরাধনায় অজ্ঞতা, অন্ধকার দূর হয়। পূরণ হয় মনের সকল বাসনা।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে:
চতুর্দশী তিথি আরম্ভ: ২ ফাল্গুন, রবিবার। ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার।
সময়- বিকেল ৫টা ৬ মিনিট।
শ্রীশ্রী শিবরাত্রি ব্রত। চতুর্দশী তিথি শেষ- ৩ ফাল্গুন, সোমবার। ১৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবার। সময়- বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিট।
গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মতে: চতুর্দশী তিথি আরম্ভ- ২ ফাল্গুন, রবিবার। ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। সময়- বিকেল ৪টে ৪৮ মিনিট ২ সেকেন্ড। শ্রী শ্রী শিবরাত্রি ব্রত। চতুর্দশী তিথি শেষ- ৩ ফাল্গুন, সোমবার। ১৬ ফেব্রুয়ারি, সোমবার। সময়- বিকেল ৫টা ৩২ মিনিট ২৪ সেকেন্ড।
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার মহাশিবরাত্রি। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় মহাশিবরাত্রি। এই বছর সেই তিথি ফাল্গুনের একদম শুরুতেই পড়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, শিবরাত্রিতেই মহাদেবের সঙ্গে পার্বতীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তাই এই দিন ভোলেবাবার সঙ্গে মা পার্বতীর উপাসনা করলে খুব ভাল ফলপ্রাপ্তি ঘটে। শাস্ত্রে শিবের বিভিন্ন মন্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। সব মন্ত্র এক জনের পক্ষে পাঠ করা সম্ভব নয়। তবে জন্মসংখ্যা মেনে যদি নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করা যায় তা হলে দারুণ ফল লাভ ঘটে। শিবরাত্রির আগে জেনে নিন, জন্মসংখ্যা মেনে কোন মন্ত্র পাঠ করবেন।
১: ১ জন্মসংখ্যার ব্যক্তিদের উপর সূর্যের প্রভাব থাকে। এঁদের নিত্যনতুন জিনিস জানা ও শেখার প্রতি ঝোঁক থাকে। জ্ঞানের সঞ্চার বজায় রাখার জন্য ‘ওঁ তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তত্রো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ’ মন্ত্রটি নিয়মিত পাঠ করতে হবে।
২: চাঁদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন ২ জন্মসংখ্যার ব্যক্তিরা। সেই কারণে এঁরা আবেগতাড়িত হয়ে থাকেন। অন্যদের থেকে কষ্ট খানিক বেশিই পান। ‘ওঁ নমো শিবায়’ মন্ত্রটি ২ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকারা যদি নিয়মিত পাঠ করেন, তা হলে জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট, অবসাদ, অশান্তি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
৩: ৩ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকাদের উপর বৃহস্পতির কৃপা থাকে। এঁদের জন্য উপযুক্ত শিবমন্ত্র হল ‘ওঁ সাম্ব সদাশিবায় নমঃ’। এই মন্ত্রপাঠে ৩ জন্মসংখ্যার ব্যক্তিদের জীবন থেকে অর্থ সংক্রান্ত সকল সমস্যা দূর হবে।
৪: রাহুর প্রভাব থাকে ৪ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকাদের উপর। এর ফলে এই জাতক-জাতিকারা অপরের থেকে একটু বেশিই নেগেটিভ শক্তির কবলে পড়েন। ‘ওম নমো ভগবতে রুদ্রায়’ মন্ত্রটি নিয়মিত পাঠে ৪ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকারা অশুভ শক্তির কবল থেকে রেহাই পাবেন।
৫: ৫ জন্মসংখ্যা জাতক-জাতিকাদের নিয়ন্ত্রণ করে বুধ গ্রহ। এঁরা বুদ্ধিদীপ্ত হন। মেধা সংক্রান্ত যে কোনও কাজ এঁরা নিপুণতার সঙ্গে করতে পারেন। এই জন্মসংখ্যার ব্যক্তিরা নিয়মিত ‘ওম নমো পার্বতী পাতায়ে হর হর মহাদেব’ মন্ত্রটি পাঠ করলে জীবনে প্রচুর উন্নতি লাভ করতে পারেন।
৬: শুক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন ৬ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকারা। এঁদের বিলাসবহুল জীবনের প্রতি ঝোঁক থাকে। স্বপ্নপূরণের উদ্দেশ্যে ৬ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকাদের নিয়মিত ‘ওম ওমকারেশ্বরায়ে নমো’ মন্ত্রটি পাঠ করতে হবে।
৭: ৭ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকাদের উপর কেতুর প্রভাব থাকে। কেতুর প্রভাবে এঁদের খারাপ কাজকর্মের প্রতি ঝোঁক খানিক বেশি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এঁরা এমন কিছু কাজ করে বসেন যার ফলে পাপের ভাগীদার হতে হয়। সেগুলির কুফল থেকে রেহাই প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে এঁদের নিয়মিত ‘ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধি পুষ্টিবর্ধনম্। উর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মারমৃতাৎ।।’ মন্ত্রটি পাঠ করতে হবে।
৮: শনি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হল ৮ জন্মসংখ্যার ব্যক্তিরা। শনির সুপ্রভাব এঁদের উপর সর্বদা থাকলেও, নিজের করা ভুলের জন্য এঁরা শনির দোষের ভাগীদার হন। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত ‘ওঁ কালভৈরবায় নমঃ’ মন্ত্র পাঠ করলে রেহাই মিলবে।
৯: ৯ জন্মসংখ্যার জাতক-জাতিকাদের উপর মঙ্গলের প্রভাব থাকে। এঁরা সাহসী হন। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে কখনও ভয় পান না। আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে ৯ জন্মসংখ্যার ব্যক্তিরা নিয়মিত ‘ওঁ বীরভদ্রায় নমঃ’ মন্ত্রটি পাঠ করলে ভাল ফল পাবেন।





