২০০০ সালের ১১ ডিসেম্বর হিরণের সঙ্গে সাত পাকে বাঁধা পড়েন অনিন্দিতা। তাঁদের রয়েছে একটি মেয়েও। যাঁর এখন বয়স ১৯। টিভি নাইন বাংলাকে অনিন্দিতা বলেন, আমাদের বিয়ের বয়স ২৫। ডিভোর্স হয়নি। মেয়ে ও আমার উপর খুব অত্যাচার হয়েছে। কাউকে এটা বলিনি, কারণ মেয়েরও একটা কেরিয়ার রয়েছে। সেটা নষ্ট করতে চাইনি। অনিন্দিতা ও হিরণের রয়েছে একটি মেয়ে নাইসা। যাঁর বয়স এখন ১৯। পড়াশুনো করছে নাইসা। স্ত্রী অনিন্দিতার সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হলেও, মেয়ের সঙ্গে হিরণের সম্পর্ক বরাবরই মধুর। বরং বাবার সঙ্গে হৃতিকার ছবি দেখে এবং সম্পর্কের গুঞ্জন কানে আসার পর থেকেই নাইসা যেন গুটিয়ে গিয়েছিলেন। হিরণের স্ত্রী অনিন্দিতার কথায়, ”হিরণ যদি ১০ বার মেয়েকে ফোন করতেন তো, নাইসা ফোন ধরতেন একবার।

দশবার দেখা করতে চাইলে, হয়তো একবার দেখা করত। ওর মনেও তো একটা দাগ লেগে গিয়েছে। আসলে বাবার এমন রূপ দেখে ফেলেছে যে কী করবে!হয়তো লজ্জায়, অভিমানে ওরকম করত।” অনিন্দিতা বলেন, ”মেয়ের সঙ্গে তবুও কথা বলত, কিন্তু আমাকে নানা জায়গায় ব্লক করে রেখেছে হিরণ। মেয়েকে দেখতে বাড়িতে এলেও আমার সঙ্গে খুব একটা কথা হত না। অনেক আগে থেকেই এই মেয়েটার সঙ্গে হিরণের ছবি দেখতাম। মারাত্মক মানসিক যন্ত্রণায় ছিলাম।” সঙ্গে অবশ্য অনিন্দিতাও এও জানান, বাবা হিসেবে মেয়ের সব দায়িত্বই পালন করেন হিরণ।

হিরণের দ্বিতীয় বিয়ের ছবি দেখে স্ত্রী অনিন্দিতা জানান, ‘‘আমাদের বিয়ের বয়স ২৫। ডিভোর্স হয়নি। মেয়ে ও আমার উপর খুব অত্যাচার হয়েছে। কাউকে এটা বলিনি, কারণ মেয়েরও একটা কেরিয়ার রয়েছে। সেটা নষ্ট করতে চাইনি। এখন আর বলার কিছু নেই। সবাই তো সব কিছু দেখতেই পাচ্ছে। বলার কোনও ভাষা নেই। কতটা অভদ্র একটা লোক হতে পারে, আবার ইনস্টাগ্রাম থেকে বিয়ের ছবি পোস্ট করেছিল। কোনওদিন তো মেয়ের একটাও ছবি পোস্ট করেনি! এর থেকে বোঝা যায়, কতটা খারাপ মানুষ হিরণ।”

হৃতিকা গিরির সঙ্গে হিরণের বিয়ে। বেনারসের ঘাটে জুটিকে দেখা গেল সাত পাকে বাঁধা পড়তে। আর সেই ছবি ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়তেই নেটদুনিয়া জুড় খোঁজ পড়ল, কে এই হৃতিকা গিরি। তিনি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কেউ? নাকি রাজনীতির? মেদিনীপুরের মেয়ে হৃতিকা গিরি। হৃতিকার বয়স ২১। আইনের ছাত্রী ছিলেন। রয়েছে আইনে সাম্মানিক স্নাতক ডিগ্রিও। যোগব্যায়ামে জাতীয় স্তরে গোল্ড মেডেলিস্ট হৃতিকা। হৃতিকার ইনস্টাগ্রামে উঁকি দিলে, ভেসে ওঠে নানান ছবি ও ভিডিয়ো। ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল থেকেই জানা যায়, ২০১৯ এবং ২০২২ সালে দুটি সুন্দরী প্রতিযোগিতাতেও সেরা হয়েছিলেন তিনি। বেশ কিছু মিউজিক ভিডিয়োতে দেখা গিয়েছে। হিরণের স্ত্রী অনিন্দিতা জানিয়ে ছিলেন, তিনি হৃতিকাকে হিরণের পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্ট বলেই জানতেন। টলিপাড়ার গুঞ্জন বলছে, টলিউডের এক হ্যান্ডসাম হিরো যার ছবি গত বছর পুজোতে মুক্তি পেয়েছে, তাঁর সঙ্গে নাকি দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন।

বিয়ের ছবি ও বিয়ে বিষয়টা নিয়ে হিরণ খোদ মুখে কুলুপ আঁটলেও, বিজেপি বিধায়কের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা স্পষ্ট জানালেন, সোশাল মিডিয়ার পোস্ট দেখেই তিনি হিরণের দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা পান এবং রীতিমতো আঁতকে ওঠেন। অনিন্দিতার কথায়, বিচ্ছেদ হয়নি তো আমাদের। হিন্দুমতে তো এরকমটা হয় না। আমরা তো মুসলিম নই। এই বিয়ের তো মূল্য নেই। খুবই যন্ত্রণাদায়ক। অনিন্দিতা আরও বলেন, সবচেয়ে বড় হল ওই হৃতিকা বলে মেয়েটা আমাদের মেয়ের থেকে ২ বছরের বড়। এরপর আর কি বলার থাকে। দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়া কিছুই নেই। তবে হ্যাঁ, অনেকদিন ধরেই শুনছিলাম এই মেয়েটার কথা। হৃতিকা, হিরণের পিএ হিসেবেই কাজ করতেন। মেয়েটা নাকি ব্ল্যাকমেল করত। ছবি দেখে তো মনে হচ্ছে না ব্ল্যাকমেল করছিল!

ছবিতে হিরণের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনেটি, হিরণ ও অনিন্দিতার মেয়ের নাইসার থেকে মাত্র ২ বছরের বড়! অনিন্দিতার কথায়, হিরণের মেয়ের বয়স এখন ১৯। অর্থাৎ সেই হিসেবে হিরণের পাশে দাঁড়ানো কনে হৃতিকা গিরির বয়স ২১! ২০২৪ -এর লোকসভা নির্বাচনে হলফনামায় হিরণ তাঁর বয়স উল্লেখ করেছিলেন ৪৭ বছর। ২০২৬ -এ দাঁড়িয়ে তাঁর বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। অর্থাৎ হিসেব বলছে নতুন বউ হৃতিকার সঙ্গে হিরণের বয়সের ফারাক প্রায় তিরিশ বছর।
অভিনেতা হওয়ার পাশাপাশি নিজেকে গবেষক বলেও পরিচয় দেন হিরণ। আবার তিনি সক্রিয় রাজনীতিকও। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে খড়্গপুরের বিধায়ক হন তিনি। তাঁর পুরো নাম হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়। ২০০৭ সাল থেকে বাংলা সিনেমায় অভিনয় করছেন তিনি। একসময় তৃণমূলেই ছিলেন। পরে একুশের নির্বাচনের আগে বিজেপিতে যোগ দেন হিরণ। লোকসভা নির্বাচনে ঘাটালে দেবের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়লেও জিততে পারেননি। জানেন হিরণের সম্পত্তি কত? ২০২৪-এর নির্বাচনী হলফনামায় হিরণ জানিয়েছেন, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে তাঁর আয় ছিল ৫ লক্ষ ৪২ হাজার ৫৭০ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবর্ষে তাঁর আয় কয়েক লক্ষ টাকা বাড়ে। ওই অর্থবর্ষে মোট ৯ লক্ষ ১ হাজার ৯১০ টাকা আয় করেছিলেন তিনি। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে বিজেপি প্রার্থীর আয় ছিল ৫ লক্ষ ১ হাজার ৬৭০ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে ছিল ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ২৫০ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে হিরণের আয় ছিল ৮ লক্ষ ৬৮ হাজার ১২৩ টাকা। বিজেপি প্রার্থী হিরণ, তাঁর স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়ের আয়ের হিসেবও জানিয়েছেন হলফনামায়। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে অনিন্দিতার আয় ছিল ৫ লক্ষ ৪৭ হাজার ১০০ টাকা। ৪ লক্ষ ৫ হাজার ৫৭০ টাকা আয় ছিল ২০২১-২২ অর্থবর্ষে। ২০২০-২১ অর্থবর্ষে হিরণের স্ত্রীর আয় ছিল ৫ লক্ষ ৫ হাজার ২৭০ টাকা। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষে অনিন্দিতার আয় ছিল ৪ লক্ষ ৮২ হাজার ৯৩০ টাকা। আর ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ৭ লক্ষ ৬৩ হাজার ৪৭৯ টাকা আয় করেছিলেন হিরণের স্ত্রী। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, একাধিক ব্যাঙ্কে টাকা রয়েছে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর। ৪ লক্ষ ৭১ হাজার ৬৯৬ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে তাঁর। আর তাঁর স্ত্রীরও ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে। হিরণের কাছে রয়েছে ১৫ লক্ষ টাকার সোনার গয়না। আর তাঁর স্ত্রীর কাছে রয়েছে ১৮ লক্ষ টাকার সোনার গয়না। সব মিলিয়ে হিরণের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৩ কোটি ১৩ লক্ষ ১৫ হাজার ৮২৮ টাকা। আর তাঁর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ১ কোটি ৯২ লক্ষ ২৪ হাজার ৭৭৯ টাকা। তাঁর পরিবারের এক সদস্যের অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৪২ লক্ষ ৩ হাজার ৩২৬ টাকা। ২০১৫ সালে কসবায় ৩২ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কেনেন হিরণ। ২০২৪ সালে যার বাজারমূল্য ছিল ৯০ লক্ষ টাকা। তাঁর ঋণ ছিল ১ কোটি ৫২ হাজার ৩৭ টাকা। নিজের আয়ের উৎস হিসেবে অভিনয়, বিধায়ক হিসেবে পাওয়া ভাতা ও ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন হিরণ। তাঁর স্ত্রীর আয়ের উৎসও ব্যবসা।
হিরণ কতদূর পড়াশোনা করেছেন জানেন? ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশনে হিরণের জমা দেওয়া হলফনামা বলছে, ১৯৯৮ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজিতে স্নাতক পাশ করেন। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বলছে, সিএমজে বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে গ্রামোন্নয়নের উপর পিএইচডি করেছেন। ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত যে তথ্য তিনি ওই হলফনামায় তুলে ধরেছেন তা বলছে পোস্ট পিএইচডি রিসার্চ ফেলো ছিলেন আইআইটি খড়গপুরেও। করেছেন রিসার্চ। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে চব্বিশের লোকসভা ভোটের সময় বিতর্কও কম হয়নি। নির্বাচনী হলফনামায় যোগ্যতা হিসেবে হিরণ যা উল্লেখ করেছেন, তা ঠিক নয় বলে নির্বাচন কমিশনে জানায় আম আদমি পার্টি। হিরণের প্রার্থীপদ বাতিলের দাবি তোলা হয় আপের তরফে। আপের তরফে বলা হয়, তারা আইটিআই করেছিলেন। তাতেই জানতে পেরেছিলেন হিরণ চট্টোপাধ্যায় ওখানে কোনওভাবেই গবেষণায় যুক্ত নন। এই নামের কোন রিসার্চ ফেলো নেই। যদিও হিরণের দাবি ছিল, “পিএইচডি না করলে তো পোস্ট পিএইচডি করা যায় না। কিছু বলার থাকলে সোজা কোর্টে চলে যান। আইন আইনের পথে চলবে।”
হিরণের মেয়ে নিয়াসা চট্টোপাধ্যায় মা অনিন্দিতা এবং আদরের পোষ্যের সঙ্গে বিশেষ মুহর্ত ভাগ করে নিয়েছেন? হিরণ এবং অনিন্দিতার একমাত্র মেয়ে লেখেন, “যতদূর মনে পড়ছে বহুদিন হল আমরা দু’জনেই আছি। মায়া, ভালবাসা, মমতা দিয়ে প্রতিটা ভূমিকা পালন করছ প্রতিনিয়ত। তুমিই আমার মা, তুমিই বাবা। আমার পথপ্রদর্শক এবং সবচেয়ে বড় সমর্থক। এই সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ। তুমিই আমার হিরো মা।” হিরণের প্রথম স্ত্রী আরও জানান, আর কোনও রাখঢাক নয়। তিনি এ বার নড়েচড়ে বসবেন। আগামী দিনে আইনি বিচ্ছেদের পদক্ষেপ কি করবেন? সেই উত্তর এখনও অধরা। যদিও এই ঘটনার পরে এখনও পর্যন্ত হিরণ মুখ খোলেননি। এমনকি দ্বিতীয় বিয়ের সব ছবি মুছেও দিয়েছেন সমাজমাধ্যম থেকে।





