কোটি কোটি মানুষ সাক্ষী, সরকারী কাজে বাধা প্রমাণিত হলে ৩ বছরের জেল? আইপ্যাকে তদন্তে বাধা। ফের হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ ইডির, মুখ্যমন্ত্রীকেও মামলায় যুক্ত করা হল। আইপ্যাকের দফতরে তদন্তে বাধার অভিযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবারও হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল কেন্দ্রীয় সংস্থা। কিন্তু তখনও মামলা দায়ের করা হয়নি। শুক্রবার সকালে ফের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। আদালত মামলা দায়ের করার অনুমতি দিয়েছে। দুপুর আড়াইটে নাগাদ এই মামলার শুনানি হবে। ওই একই বেঞ্চে তৃণমূল পাল্টা মামলা দায়ের করেছে। একসঙ্গে জোড়া মামলা শুনবে বিচারপতি ঘোষের বেঞ্চ। ইডির আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী জানান, তাদের মামলার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও যুক্ত করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে বেআইনি কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি মামলার সূত্রে কলকাতায় জোড়া অভিযান চালিয়েছিল ইডি। একটি দল গিয়েছিল সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দফতরে। অন্য দলটি গিয়েছিল লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে। আইপ্যাক রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা। তাদের দফতরে ইডির হানার কথা শুনে মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঘটনাস্থলে যান। ইডির তল্লাশি চলাকালীনই প্রতীকের বাড়িতে ঢুকে নথিপত্র, ফাইল এবং ল্যাপটপ বার করে আনেন তিনি। পরে সল্টলেকে সংস্থার দফতরে গিয়েও একই কাজ করেন।ইডির অভিযানকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন মমতা। দাবি, তাঁর দলের নির্বাচনী কৌশল হরণ করা হয়েছে। গোপনে চুরি করা হয়েছে দলের নথিপত্র। আইপ্যাক দফতরে দাঁড়িয়েই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণ শানান মমতা। পরে তদন্তে বাধা পাওয়ার অভিযোগ তুলে ইডি আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদের তরফে পাল্টা দাবি করা হয়, বেআইনি কয়লা পাচার সংক্রান্ত এই তল্লাশি অভিযান। তার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই। তবে সাংবিধানিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। জোর করে নথি ছিনতাই করে নেওয়া হয়েছে। শুক্রবার ইডির আইনজীবী জানিয়েছেন, ইডির তল্লাশির সময় মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত হন। বিভিন্ন সমাজমাধ্যমে তাঁকে দেখা গিয়েছে। তাই এই মামলার সঙ্গে তাঁকেও যুক্ত করা হবে।
বৃহস্পতিবার ভোর থেকে তল্লাশি শুরু করেছিল ইডি। দুপুর ১২টার কিছু পর হাজির হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমে আইপ্যাক-এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি, পরে আইপ্যাকের দফতর। বাইরে বেরিয়ে আসেন ফাইল হাতে। সেক্টর ফাইভের অফিস থেকে গাড়িতে তোলেন গুচ্ছ গুচ্ছ ফাইল, হার্ডডিস্ক। ভোটের আগে কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে তরজা তুঙ্গে। মামলা গড়িয়েছে হাইকোর্টেও। বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী যখন ইডি অফিসারদের মুখোমুখি হলেন, তখন ঠিক কী ঘটল? সূত্রের খবর, শতাধিক ডেস্কটপের মধ্যে থেকে সবেমাত্র একটি কম্পিউটার চিহ্নিত করে সাইবার ফরেনসিক এক্সপার্ট হ্যাশ ভ্যালু (যা সময়সাপেক্ষ বিষয়) তৈরি করেন। তারপর সবেমাত্র একটি ডেস্কটপ থেকে ব্যাকআপ নেওয়ার কাজ শুরু করেন তাঁরা। আর ঠিক তখনই মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের টিম পৌঁছয় সেখানে। মাঝপথেই ব্যাকআপ নেওয়া বন্ধ করতে হয় বলে অভিযোগ ইডি-র। শুধু তাই নয়, তল্লাশি চালিয়ে যে সব ফাইল বাছা হয়েছিল, সব ফাইল ও নথি নিয়ে যায় সাদা পোশাকে থাকা পুলিশ। হুড়মুড়িয়ে ফাইল গাড়িতে তোলার সময়েই হাত ফস্কে পড়ে একটা, ফাইল খুলে যেতেই বেরিয়ে পড়ে সেই কাগজ! সাংবাদিকদের দড়ি দিয়ে আটকেও ফাইল রহস্য উন্মোচন। আইপ্যাক দফতরের ভিতরে যেখানে তল্লাশি চলছিল, একদম সেইখানেই পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ডিজি রাজীব কুমার। মুখ্যমন্ত্রী সেখানে পৌঁছে গেলেও তিনি ইডি অফিসারদের সঙ্গে বিনম্রতা দেখিয়েছেন বলেই দাবি অফিসারদের। তবে ডিজি-র ভূমিকা ঠিক তেমন ছিল না বলেই সূত্রের খবর। প্রতীক জৈনের বাড়িতেও একই অবস্থা হয়। সবেমাত্র শুরু হয়েছিল ব্যাক আপ ও নথি বাছাই পর্ব। সেখানেও হাজির হয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। তার জেরেই পন্ড হয়ে তল্লাশির কাজ। ইডি সূত্রে খবর, IPAC-এর ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বাড়ি ও তাঁর দফতরে তল্লাশি চালিয়ে সম্পূর্ণ খালি হাতেই ফিরেছে ইডি। সাধারণত কোনও ফাইলের বিষয়বস্তু থেকে অ্যালগোরিদম দিয়ে এই হ্যাশ ভ্যালু তৈরি করেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। প্রমাণে কোনও পরিবর্তন করা হলেই ভ্যালু বদলে যায়। তাই যে কোনও তদন্তে হ্যাশ ভ্যালু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের শাসকদলের পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে তল্লাশির গুরুত্ব আঁচ করতে না পেরেই কি খালি হাতে ফিরতে হল? পরিকল্পনার ত্রুটির জন্যই কি হাতছাড়া হল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য? উঠছে প্রশ্ন। ইডি অফিসারদের একাংশ মানছেন, ডিজিটাল ফরেনসিক টিম আরও আগে পৌঁছে দ্রুত ব্যাকআপ নেওয়া শুরু করলে কিছু তথ্য অন্তত হাতে আসত। বৃহস্পতিবার ঠিক কী কী হয়েছে, সে ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রকে রিপোর্ট দিয়েছে ইডি, স্বরাষ্ট্রে মন্ত্রকে রিপোর্ট দিয়েছে সিআরপিএফ। অন্যদিকে, ইডি-র সদর দফতরে এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই একটি ইনসিডেন্স রিপোর্ট জমা করা হয়েছে।
আইপ্যাক অফিসের তল্লাশিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। দুপুরে মামলার শুনানি হওয়ার কথা। তার আগেই বিস্ফোরক অভিযোগ করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। দুর্নীতির ১৬ কোটি টাকা আইপ্যাকের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল বলে দাবি করেছেন। ২০২৪-এর ভোটে ৩৯ শতাংশ ভোট আমরা পেয়েছি । খসড়া তালিকায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদ চলে গিয়েছে। খসড়া তালিকার পর আর তৃণমূলের সঙ্গে কোনও তফাৎ নেই। এবারের নির্বাচন বাংলাকে বাঁচানোর নির্বাচন। আদিবাসীদের উপরও বিভিন্ন ভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে । ১৫ বছরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯ হাজার স্কুল বন্ধ করেছে। ৬৮৮৮ টা শিল্প তাড়িয়েছে। শেষ এসএসসি ২০১৫ সালে। ৫১ টি কর্মবিনিয়োগ কেন্দ্রে তালা লাগানো হয়েছে। আপনারা বিজেপিকে আনুন। ২০২২ সাল পর্যন্ত একশো দিনের কাজে ৫৪ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আপনাদের হাত তুলতে বললে, সবাই আপনারা বলবেন পাইনি। ৩০ হাজার কোটি টাকা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, ৪০ লক্ষ ইউনিট বাড়ি তৈরির জন্য, কোথায় গেল? ২০২২ সালের কয়লা কেলেঙ্কারি । কোটি কোটি টাকা আইপ্যাকের মাধ্যমে গোয়া নির্বাচনে খরচ করা হয়েছে। ইডি-র কাজে বাধা দিয়ে, তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। একমুহুর্ত মুখ্যমন্ত্রী চেয়ারে থাকা উচিত নয় । আইপ্যাক হল কর্পোরেট সংস্থা, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২২ সালে কয়লা কেলেঙ্কারির টাকা তৃণমূলের ফান্ডে ঢুকেছে। হাওয়ালার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। IPAC-র মাধ্যমে গোয়ার নির্বাচনে খরচ করেছে তৃণমূল। কিন্তু সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বার্থ কোথায়? কংগ্রেস ভেঙে যখন তৃণমূল তৈরি হয়েছিল, সেদিন অটল বিহারী বাজপেয়ী আর্শীবাদ করেছিলেন। সেদিন বাংলায় পরিবর্তন আনার জন্য বিজেপির সাহায্য নিয়েছিলেন। কারণ তখন তিনি ছিলেন দিদি, পিসি হয়ে যাননি। আগামীদিনে মানুষের জোট বেঁধে , সনাতনী ও আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে সরাতে হবে। ইডি-কে ধন্যবাদ, তারা হাইকোর্টে গিয়েছেন। বাংলা অ্যাকশন দেখতে চায়। চোরদের নির্মূল করতে হবে। গতকালের ঘটনা নিয়ে বিজেপি এক ইঞ্চিও ছাড়বে না। কোর্টে মামলা চলছে, তৃণমূলের লিগ্যাল সেলের লোকেদের দিয়ে শুনানি করতে দেয়নি। যদি না নন্দীগ্রাম আর নেতাই হতো, তাহলে দিদি দিদিমা হয়ে গেলেও মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতো না।
বৃহস্পতিবার, ভোর তখন ছ’টা। আইপ্যাকের কর্ণধান প্রতীক জৈনের বাড়িতে চলছিল তল্লাশি। অপরদিকে, সল্টলেকেও আইপ্যাকের অফিসে তল্লাশি চলছে ইডির। সেই সময় পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডির অভিযোগ, তদন্তে বাধা দিয়েছেন তিনি। অপরদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, কেন্দ্রীয় এজেন্সি তৃণমূলের যাবতীয় তথ্য চুরি করছিল। এবার এই নিয়েই আজ ফের মুখ খুললেন মমতা। গতকাল কীভাবে খবর পেয়েছিলেন তিনি, ঠিক কী কী হয়েছিল সবটা জানালেন নিজের মুখে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তিনি কিছুই জানতে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একটি মেসেজ পাঠালেও তিনি সেটা দেখেননি। পরে টিভিতে দেখেন যে প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে ইডি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন হয়ত কথা বলতে এসেছেন গোয়েন্দারা। মমতা বলেন, “আমি কিছুই জানতাম না। সকালে খবর পাই কিছু একটা হচ্ছে। আমি আর জানবার চেষ্টা করিনি। মাথায় মারার পর থেকে ভোর চারটের আগে ঘুমোতে পারি না। অভিষেক মেসেজ করেছিল। মিসড করে গিয়েছি। আমি খবর শুনেছিলাম। ভেবেছি কথা বলতে এসেছে। আমি প্রতীককে ফোন করি। তোলেনি। তখনই সন্দেহ হয়। ভাবলাম পার্টিরল সব নিয়ে পালাচ্ছে না তো। মানুষকে ভালবাসি যেমন, জোড়া ফুলে তো দাঁড়াই। পার্টি রক্ষা না হলে মানুষের জন্য লড়ব কীভাবে? অসহায় মানুষ বিপদে পড়লে আমায় জানায়। মোদী যখন ১৪তে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন সেই সময় আইপ্যাক কাজ করেছে ওদের হয়ে। তখন প্রশান্ত কিশোর ছিল। এখন প্রশান্ত নেই। প্রতীক দেখে। আমাদের একটাই আইটি সেল দেখে ওরা। আমাদের একটাই সবে ধন নীল মণি। রণডঙ্গা বাজিয়ে আসছে। আমি তৃণমূলের চেয়ারম্যান হয়ে করেছি। কোনও অন্যায় করিনি। তুমি চোরের মতো কেন এসেছ? তুমি সব ডেটা আমার চুরি করছিল। তোমরা তো ছটা থেকে করছ। আমি সারে এগারোটায় গেছি। পাঁচ ঘণ্টা সব চুরি করেছ।”





