চিকিৎসকেরা বার বার বলেন, ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জনই হতে পারে এমন সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি। তবে শুধু খাওয়ার দোষে নয়, ওঠা-হাঁটা, শরীরচর্চার অভাবও এর নেপথ্য কারণ হতে পারে। বর্তমানে কাজের ধরন বদলেছে। বাড়ি থেকে হোক বা অফিসে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা বসে কাজ করতে হয়। চিকিৎসকেরা বলছেন, ওঠা-হাঁটার অভাব, বেগ এলেও জরুরি মিটিং বা কাজের জন্য শৌচালয়ে যেতে না পারা, ডেস্কে বসে ভাজাভুজি খাওয়ার অভ্যাস, জল কম খাওয়া— এই সব কিছুই সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। মোদ্দা কথা হল, লম্বা সময় ধরে এক ভাবে চেয়ার বসে থাকার সামগ্রিক প্রভাব শরীরে পড়ে। যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়ে। শারীরিক পরিশ্রম বা ওঠা-হাঁটা, নড়াচড়া অন্ত্রের পেশিগুলিকে সক্রিয় রাখে, যা অপাচ্য খাবার মলদ্বারের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। দীর্ঘ সময় বসে থাকলে অন্ত্র এবং পেশির কার্যকারিতা কমে যায় এবং হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। দীর্ঘ ক্ষণ বসে থাকার কারণে পরিপাকতন্ত্র সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত সঞ্চালন কমে যেতে পারে। রক্তের প্রবাহ কমে গেলে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে মল কোলনে বেশি সময় ধরে রয়ে যায়। এতে মল শক্ত হয়ে যায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়িয়ে দেয়।
অতীতে একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে মাঝারি থেকে শ্রমসাধ্য শরীরচর্চা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দেয়। পেট পরিষ্কারে সাহায্য করে। কারণ, হাঁটাহাটি বা শরীরচর্চার ফলে পেশি সক্রিয় হয়। খাবার সঠিক ভাবে হজম হয়। আবার এ-ও দেখা গিয়েছে, পেশাগত কারণে যাঁদের দীর্ঘ ক্ষণ বসে কাজ করতে হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে পেটের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কম ঘুম, সঠিক সময় ঘুমোতে না পারা, হজমের সমস্যা বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। যার প্রভাব পেটের উপরেও পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একেবারে ওঠা-হাঁটা না করে বসে বা শুয়ে থাকা। ফাইবার সমৃদ্ধ প্রাতরাশ না খাওয়া। তা ছাড়া সময়ে না খেলে বা দেরিতে খেলেও গ্যাসের সমস্যা বাড়ে। মল বা মূত্র ত্যাগ না করে মিটিং বা ব্যস্ততার জন্য তা চেপে রাখার অভ্যাস ক্ষতিকর। এতে স্বাভাবিক মলত্যাগের প্রবণতাতেও এর প্রভাব পড়ে। শৌচালয়ে বসে মোবাইলে চোখ রাখা।
সমস্যার সামাধান
প্রতি ৪০-৪৫ মিনিট অন্তর এক বার করে উঠুন। ৩-৪ মিনিট হাঁটাহাটি করে নিন। এতে শরীরের প্রতিটি পেশি সচল থাকবে। কোমরে-কাঁধে ব্যথার প্রবণতাও কমবে। ভারী প্রাতরাশ করলে বা দুপুরে খাওয়ার আধ ঘণ্টা পরে শৌচালয়ে যান। বাতকর্মের বেগ এলে সেটি চেপে না রাখাই ভাল। এতে পেট হালকা হয়। জল খাওয়া খুব জরুরি। জল কম খেলেও মল শক্ত হয়ে যেতে পারে, মলত্যাগে সমস্যা হয়। অফিস ডেস্কে বড় বোতল রাখুন। ঘড়ি ধরে জল খান। মাঝে মধ্যে ঈষদুষ্ণ জল খেলেও গ্যাসের সমস্যা কমে। পেট হালকা লাগে। সকাল বা সন্ধ্যায় কিংবা কাজের ফাঁকে একটু জোরে হাঁটাহাটি করলেও লাভ হবে। লিফটের বদলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতে পারেন। প্রাতরাশ হোক বা মধ্যাহ্নভোজ, পাতে প্রোটিনের পাশাপাশি ফাইবার থাকাটাও জরুরি। পেঁপে, কলা, রাঙাআলুর মতো খাবার, চিয়া, তিসিবীজ ভিজিয়ে খেলেও কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে। সে কারণেই সঠিক ডায়েট মানা দরকার। সময়ে ঘুম এবং খাওয়া-দাওয়া, তার সঙ্গে শরীরচর্চা— এগুলি ঠিক থাকলেই পেটের স্বাস্থ্য ভাল থাকবে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা এড়ানো সহজ হবে।
কিডনির উপর দাপট দেখায় এক বিশেষ ধরনের স্নেহপদার্থ। সেটি শরীরের শক্তি উৎপাদনকারী কোষ মাইটোকনড্রিয়াকে ফালা ফালা করে দেয়। ফলে শক্তি তৈরির প্রক্রিয়া নষ্ট হয়। কোষকে শক্তিহীন করে দিয়ে সেটি সরাসরি আঘাত হানে কিডনির উপরে। একে একে নষ্ট করতে থাকে কিডনির সুস্থ ও সবল কোষগুলিকে। ফলে যে রোগটি দেখা দেয়, তার নাম ‘অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি’। এটি হল সূত্রপাত। কিডনির কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে হতে শেষে কিডনি বিকল হওয়া শুরু হয়। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের সঙ্গে এই গবেষণায় রয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ ইউটা। গবেষকেরা জানিয়েছেন, সেই স্নেহপদার্থটির নাম ‘সেরামাইড’। এটি সকলের শরীরেই থাকে। তবে বাইরের খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার বা জাঙ্ক ফুড বেশি খেলে এর মাত্রা বেড়ে যায়। এই ‘সেরামাইড’ যদি অধিক পরিমাণে রক্তে মেশে, তা হলে সেটি মাইটোকনড্রিয়ার উপর হামলা করবে। মাইটোকনড্রিয়া হল শরীরের শক্তি তৈরির ঘর। সেখানে কোষের জন্য শক্তি (এটিপি) তৈরি হয়। কোষের জন্ম-মৃত্যু, ক্যালশিয়াম সঞ্চয় করে রাখা, সঙ্কেত আদানপ্রদানেও এর বড় ভূমিকা আছে এর। মাইটোকনড্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হলে কোষের শক্তি তৈরির প্রক্রিয়াটিই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কোষগুলির সুরক্ষাকবচ নষ্ট হতে থাকবে। সেই সুযোগেই সেরামাইড আক্রমণ করে কিডনির কোষগুলিকে। এডস নিরাময় কি তবে সম্ভব? নতুন চিকিৎসায় আশা জাগছে, ১৮ মাস ওষুধ না খেয়েও সুস্থ ১০ রোগী। গবেষকেরা জানিয়েছেন, সেরামাইডের আধিক্য ঘটলে কিডনির সমস্ত মাইটোকনড্রিয়া কোষগুলিকে নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে কিডনির সুস্থ কোষগুলি অকেজো হয়ে যেতে থাকে। গবেষকেরা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখেছেন, সেরামাইড বেশি হলে কিডনি ফেলিয়োরের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। আবার সেরামাইডের মাত্রা কমিয়ে ফেললেই, কিডনি সুস্থ হচ্ছে ধীরে ধীরে। সেরামাইডের পরিমাণ যদি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা হলেই কিডনির অসুখ হওয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি কমে যাবে বলেই দাবি করেছেন গবেষকেরা। সে ক্ষেত্রে সেরামাইডের মাত্রা কমাতে হলে বিশেষ কোনও ওষুধ খেতে হবে, না হলে ইঞ্জেকশন নিতে হবে। কী উপায়ে সেরামাইডকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, সে চেষ্টাই শুরু হয়েছে। মানুষের উপর পরীক্ষা করেও দেখা হচ্ছে। গবেষকেরা ‘সেরামাইড কন্ট্রোল থেরাপি’ করে দেখছেন সেটি কতটা কার্যকরী হয়। যত জনের উপর এই থেরাপি করা হয়েছে, তাঁদের কিডনির রোগ নির্মূল হওয়ার পথে বলেও দাবি করা হয়েছে। থেরাপিটি করার পরে কিছু বদল দেখা গিয়েছে রোগীর শরীরে— ১) কিডনির ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলি মেরামত হয়েছে ২) কিডনির ক্রনিক রোগে যাঁরা আক্রান্ত, তাঁদের ডায়ালিসিসের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমেছে ৩) শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। গবেষণাটি আরও বৃহত্তর পর্যায়ে করা উচিত বলেই মনে করছেন গবেষকেরা। রোগীর শারীরিক অবস্থা বিচার করেই থেরাপি করা হবে। সকলের ক্ষেত্রে যদি একই রকম কার্যকরী ফল দেয়, তা হলেই থেরাপিটি কিডনির অসুখ সারাতে প্রয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।




