RK NEWZ জিজে ৩৩৭৮বি রয়েছে ২৫ আলোকবর্ষ দূরে। তার পরেও তাকে কেন নিকটতম বাসযোগ্য গ্রহ বলে ধরা হচ্ছে? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন তার জবাব। পরীক্ষানিরীক্ষা চলছিল অনেক দিন ধরেই। এ বার আমেরিকার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকডোনাল্ড পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে বসে হবি-এবারলি টেলিস্কোপের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ২৫ আলোকবর্ষ দূরে এক পাথুরে গ্রহ হাবেভাবে অনেকটাই পৃথিবীর মতো। সেখানে মানুষের বাস করার উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। আগে যা মনে করা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি বাসযোগ্য সেই পৃথিবী, যার নাম জিজে ৩৩৭৮বি। ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজ়িক্যাল জার্নাল’-এ সেই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। জিজে ৩৩৭৮বি-কে বাসযোগ্য বলে মনে করা হলেও তাতে বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে বিজ্ঞানীদের একাংশের মনে। একটি ছোট লাল বামন নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে গ্রহটি। সেই নক্ষত্র থেকে যে বিকিরণ হয়, তার প্রভাবে জিজে ৩৩৭৮বি-তে বায়ুমণ্ডল থাকা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে নতুন এই আবিষ্কারে বিজ্ঞানীরা খুশি। সবচেয়ে খুশি, পৃথিবী থেকে তার দূরত্বের কারণে। পৃথিবী থেকে ২৫ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে সে। আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে ২,৯৯,৭৯২.৪৫৮ কিলোমিটার পথ (প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার)। আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকেই বলে আলোকবর্ষ। সেই দূরত্ব হল ৯.৫ লক্ষ কোটি কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে সূর্যের যা দূরত্ব, তার চেয়ে ৬৩ হাজার গুণ বেশি। জিজে ৩৩৭৮বি রয়েছে ২৫ আলোকবর্ষ দূরে। তার পরেও তাকে কেন নিকটতম বাসযোগ্য গ্রহ বলে ধরা হচ্ছে? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী পল রবার্টসনের কথায়, ‘‘জিজে ৩৩৭৮বি সত্যিই আমাদের নিকটতম মহাজাগতিক পড়শি। ২৫ আলোকবর্ষ শুনে দূর মনে হলেও মনে রাখতে হবে, আকাশগঙ্গা পৃথিবী থেকে এক লক্ষ আলোকবর্ষ। সেই অনুপাতে এই গ্রহকে কিন্তু আমাদের পড়শি বলা চলে।’’ ২০২৪ সালে প্রথম বার ওই গ্রহের অস্তিত্ব ধরা পড়েছিল বিজ্ঞানীদের কাছে। ক্রমে তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ম্যাকডোনাল্ড পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে জিজে ৩৩৭৮বি-র বিষয়ে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা করে তার নতুন বৈশিষ্ট্যও লক্ষ করেছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেছেন, আগে গ্রহটির ভর যা মনে করা হয়েছিল, তার চেয়ে আদতে অনেকটাই কম। তা থেকেই তাঁদের ধারণা, এই জিজে ৩৩৭৮বি পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহ হতে পারে। কোনও গ্রহ বাসযোগ্য হওয়ার প্রাথমিক মাপকাঠি কী? রবার্টসনের উত্তর হল, জল। গ্রহ বাসযোগ্য কি না জানার জন্য, সেখানে জল রয়েছে কি না প্রথমে খোঁজা হয়। এই গ্রহের ক্ষেত্রেও তার সন্ধান চলছে। জিজে ৩৩৭৮বি যে নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করে, তা সূর্যের তুলনায় আকারে ছোট। উজ্জ্বলও হয় কম। ওই নক্ষত্রকে লালচে দেখায়। পৃথিবী যে ছায়াপথে রয়েছে, সেখানে এ রকম লালচে নক্ষত্রের সংখ্যা অনেক। গবেষক মাইকেল এন্ডল বলছেন, আমাদের ছায়াপথে যত নক্ষত্র রয়েছে, তার ৭০ শতাংশ হয় লালচে। মনে করা হয়, তাদের ঘিরে থাকা পাথুরে গ্রহের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সে সব গ্রহেই প্রাণ খোঁজার চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। নক্ষত্রের চারপাশে সেই গ্রহগুলির প্রদক্ষিণ করার ধরন দেখেই তাদের ভর অনুমান করেন বিজ্ঞানীরা। একই ভাবে জিজে ৩৩৭৮বি-র ভরও অনুমান করা হয়েছে। ২০২৪ সালে যখন জিজে ৩৩৭৮বির অস্তিত্ব প্রথম বার ধরা পড়ে বিজ্ঞানীদের কাছে, তখন তাঁরা মনে করেছিলেন, গ্রহটির ভর পৃথিবীর পাঁচ গুণ। ক্রমে গবেষণা যত এগিয়েছে, বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, ওই গ্রহের ভর পৃথিবীর ২.৩ গুণ। আগে মনে করা হত জিজে ৩৩৭৮বির নিজের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করার সময় ২৪.৭ দিন। পরে বিজ্ঞানীরা আরও গবেষণা করে দেখেন, সেই সময়কাল আসলে ২১ দিন। তাঁরা জিজে ৩৩৭৮বি-কে ‘সুপার আর্থ’-এর তকমা দিয়েছেন। সেই গ্রহের ভর পৃথিবীর চেয়ে বেশি। তবে পৃথিবীর মতোই সে পাথুরে। এন্ডল বলছেন, এ বার তাঁদের লক্ষ্য হল সেই জিজে ৩৩৭৮বি-তে প্রাণের খোঁজ করা। তাঁর কথায়, ‘‘এই মহাজগতে আমরা কি একা, না কি আমাদের মতো আরও কেউ রয়েছে? তার উত্তর খুঁজছি।’’ এন্ডলের মতে, সেই গবেষণার ক্ষেত্রে জিজে ৩৩৭৮বি তাঁদের আরও কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গেল। কারণ, পৃথিবী থেকে খুব দূরে না হওয়ায় সেখানে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজা তুলনামূলক সহজ হবে বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের তৈরি সবচেয়ে দ্রুত যান হল ভয়েজ়ার ১। সেকেন্ডে তার গতি ১৭ কিলোমিটার। সেই মহাকাশযান যদি ২৫ আলোকবর্ষ দূরে জিজে ৩৩৭৮বি গ্রহের অভিমুখে ছোটে, তা হলে সেখানে পৌঁছোতে তার সময় লাগবে প্রায় ৪ লক্ষ ৪১ হাজার বছর। ভয়েজ়ার ১ এখন যে গতিতে চলছে, অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৭ কিলোমিটার, তাতে এক আলোকবর্ষ দূরত্ব অতিক্রম করতে তার ১৭ হাজার বছর সময় লাগবে।

১৯৭৭ থেকে পৃথিবীর টান ছাড়িয়ে ছুটে চলেছে মানুষের তৈরি দ্রুততম যান! ‘রেকর্ড’ ভাঙতে ভাঙতে ছুটে চলেছে ভয়েজার ১ মহাকাশযান। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা-র তৈরি রোবটচালিত এই যান ১৯৭৭ সালে পৃথিবী ছেড়েছিল। অর্থাৎ, আজ থেকে ৪৯ বছর আগে। ভয়েজ়ার ১-এর থেকে দ্রুতগতির কোনও মহাকাশযান এখনও পর্যন্ত মানুষ তৈরি করতে পারেনি। এখনও তার গতি সেকেন্ডে ১৭ কিলোমিটার। রাইফেল বুলেটের থেকেও দ্রুতগতির। বাতাসে শব্দ ছোটে সেকেন্ডে ৩৪৩ মিটার। এত দ্রুতগতির পরেও অর্ধশতকে কতটা পথ পেরোল প্রথম ভয়েজার? এক আলোকবর্ষের ৩০০ ভাগের এক ভাগও (০.০০৩ আলোকবর্ষ) অতিক্রম করতে পারেনি। আবার এটাও সত্যি যে, মানুষের তৈরি কোনও যান তার চেয়ে দূরেও যেতে পারেনি। অথচ, সৌরজগতের বাইরে যে মহাজগৎ, তার একেবারে শুরুর বিন্দুতেই এখনও রয়েছে ভয়েজ়ার ১ মহাকাশযান। যেখান থেকে আরও গভীর রহস্যের শুরু। ১৯৮০ সালে শনি গ্রহের পাশ দিয়ে গিয়েছিল ভয়েজ়ার। পৃথিবী থেকে সূর্যের যে দূরত্ব, এখন সূর্য থেকে তার চেয়ে ১৭০ গুণ দূরে রয়েছে ভয়েজ়ার ১। নাসার বিজ্ঞানীদের হিসাবে ২৫০০ কোটি কিলোমিটারের আশপাশে। ২০১২ সালে হেলিয়োপজ় অতিক্রম করেছে সেই রোবোটচালিত মহাকাশ যান, যেখানে এসে থেমে যায় সূর্যের কণার বুদবুদ। আলো এক সেকেন্ডে অতিক্রম করে ২,৯৯,৭৯২.৪৫৮ কিলোমিটার পথ (প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার)। আলো এক বছরে যত দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকেই বলে আলোকবর্ষ। সেই দূরত্ব হল ৯.৫ লক্ষ কোটি কিলোমিটার। পৃথিবী থেকে সূর্যের যা দূরত্ব, তার চেয়ে ৬৩ হাজার গুণ বেশি। ভয়েজ়ার ১ এখন যে গতিতে চলছে, অর্থাৎ সেকেন্ডে ১৭ কিলোমিটার, তাতে এক আলোকবর্ষ দূরত্ব অতিক্রম করতে তার ১৭ হাজার বছর সময় লাগবে। সূর্যের নিকটতম নক্ষত্র হল প্রক্সিমা সেন্টাওরি। তার দূরত্ব সূর্য থেকে চার আলোকবর্ষ। ভয়েজ়ার ১-এর গন্তব্য সেই নক্ষত্র নয়। আগামী ৪০ হাজার বছরে সেটি ‘গ্লিজ় ৪৪৫’-এর ১.৬ আলোকবর্ষ দূর দিয়ে যাবে। সূর্য ছাড়া সেটিই হবে মহাজগতের দ্বিতীয় নক্ষত্র, যার এত কাছ দিয়ে যাবে ভয়েজ়ার ১। ২০২৬ সালের নভেম্বরে পৃথিবী থেকে এক আলোক দিন দূরত্বে পৌঁছোবে ভয়েজ়ার ১। সেখানে গেলে পৃথিবী থেকে ওই মহাকাশযানে রেডিয়ো সঙ্কেত পৌঁছতে এক দিন সময় লাগবে। তা পৃথিবীতে ফিরে আসতে আবার এক দিন সময় লাগবে। প্লুটোনিয়ামের তাপ থেকে উৎপাদিত শক্তির মাধ্যমে সে চলে। এ বার সেই প্লুটোনিয়ামের শক্তিই ক্রমে ক্ষয় হচ্ছে। প্রতি বছর চার ওয়াট করে শক্তি ক্ষয় হচ্ছে। যখন যাত্রা শুরু করেছিল, তখন তাতে ছিল ৪৭০ ওয়াট। ভয়েজ়ারের অবশিষ্ট শক্তি টিকিয়ে রাখতে তার যন্ত্রগুলি এক এক করে বন্ধ করে দিচ্ছে নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি (জেপিএল)। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ‘কসমিক রে সাবসিস্টেম’ বন্ধ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘লো-এনার্জি চার্জড পার্টিকেল’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে মাত্র দু’টি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র চালু রয়েছে— একটি চৌম্বক ক্ষেত্র পরিমাপ করছে এবং অন্যটি প্লাজমা তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করছে। কুকুরের মতো লম্বা কাঁকড়াবিছে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত একসময়, সদ্য আবিষ্কার করলেন বিজ্ঞানীরা আগামী এক বছরে এর শক্তি আরও কমে যাবে। তখন তার কোনও যন্ত্রই আর সক্রিয় থাকবে না। তবে ভয়েজ়ার ১ থামবে না। সে নির্দিষ্ট গতি ধরেই মহাকাশে ছুটে বেড়াবে। অন্ধকার অবস্থায়। এভাবে চলতে চলতে এক আলোকবর্ষ দূরত্ব পাড়ি দিতে ওই যানে হাজার হাজার বছর সময় লেগে যাবে। আর অন্য কোনও নক্ষত্রের কাছাকাছি পৌঁছোতে লাগবে হাজার হাজার বছর। নভেম্বরে এক আলোক দিন পথ পেরোনোর পরে ভয়েজ়ার ১-এর কতটা শক্তি বাকি থাকবে? কত দিন আর তার যন্ত্রগুলি চালু রাখা যাবে? তার পরে ওই মহাকাশযানে আর নজর রাখা যাবে না। তা নিয়ে শুধুই অঙ্ক কষতে হবে। আর কোনও রেডিয়ো সঙ্কেত দেবে না ভয়েজ়ার ১। শুধু অসীমের উদ্দেশে ছুটে যাবে।



