দামের বিচারে ছত্রাক দুনিয়ার ‘গুচি’! কারণ, সাধারণ মাশরুম যেখানে ২০০ টাকাতেই এক কেজি পাওয়া যায়, সেখানে এই মাশরুমের দাম কেজি প্রতি ৩৫-৪০ হাজার টাকা হতে পারে। ক্ষেত্র বিশেষে তা ছুঁতে পারে ৫০ হাজারও! সম্প্রতি ওই মাশরুমই পরিবেশন করা হয়েছিল ভারত সফরে আসা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পাতে। দিন দুই এর জন্য ভারত সফরে ছিল পুতিন। রাষ্ট্রপতি ভবনে রুশ প্রেসিডেন্টের সম্মানে বিশেষ আপ্যায়নের বন্দোবস্ত। কূটনৈতিক ‘বন্ধু’ দেশের রাষ্ট্রনেতার জন্য নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মূ। ঢালাও খাওয়াদাওয়ার পুরোটাই অবশ্য নিরমিষ ছিল। নিরামিষ খাবারেও ছিল নানা রকমের চমক! রাষ্ট্রপতি ভবনের মেনু কার্ডে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ‘গুছি দুন সেতিন’!
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিখ্যাত আঞ্চলিক খাবার সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল রুশ প্রেসিডেন্টের জন্য। তাতে যেমন পশ্চিমবঙ্গের নলেন গুড়ের সন্দেশ ছিল, তেমনই ছিল পঞ্জাবের ডাল-তড়কা, দক্ষিণী জলখাবার মুরুক্কু, মহারাষ্ট্রের আচারি বেগুন এমনকি, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালের ঝোল মোমোও সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল পুতিনকে। তেমনই এক আঞ্চলিক খাবার ছিল ‘গুছি দুন সেতিন’! যা কি না জম্মু ও কাশ্মীরে অত্যন্ত জনপ্রিয়। রান্নাটি আসলে আখরোটের চাটনিতে ডোবানো পুরভরা মাশরুম। তবে এই রান্নার বিশেষত্ব শুধু এর রন্ধনপ্রণালীতে নয়, এর উপকরণেও। কারণ গুছি দুন সেতিন যে মাশরুম দিয়ে তৈরি, তা সহজলভ্য নয়। ওই ছত্রাক শুধু হিমালয়ের কোলে কিছু নির্দিষ্ট এলাকাতেই পাওয়া যায়। মূলত জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডে। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই মাশরুম এতটাই বিরল যে এর প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৩৫-৪০ হাজার টাকায়। কখনও সখনও এর দাম ৫০ হাজারও ছুঁতে পারে। এই মাশরুম সহজে চাষ করা যায় না। কারণ এর জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রার দরকার পড়ে। সব মাটিতেও এটি বাড়ে না। হিমালয়ের কোলে বসন্তকালে সাধারণত এর দেখা মেলে। ঠিক তুষারপাত শেষ হওয়ার পরেই। হিমলয়ের পাদদেশে জঙ্গলে দাবানল দেখা দিলেও আগুন নেভার পরে এই ধরনের ছত্রাক জন্ম নিতে পারে। জম্মু-কাশ্মীর, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশের মানুষজন দিনের পর দিন পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে ওই ছত্রাক সংগ্রহ করেন। কারণ, এই ছত্রাক কয়েক সপ্তাহের জন্যই পাওয়া যায়। তা-ও আবার কোনও নির্দিষ্ট সময়ে নয়, প্রকৃতির খেয়াল হলে। হয়তো সে কারণেই এই মাশরুমের দাম এত বেশি। দুনিয়ার সবচেয়ে দামি মাশরুমের তালিকায় অন্যতম হিসাবে শিরোপাও অর্জন করেছে এই ছত্রাক। এই মাশরুমে ভিটামিন ডি এবং বিভিন্ন ধরনের বি ভিটামিন রয়েছে ভরপুর। এ ছাড়া রয়েছে খনিজ এবং প্রদাহনাশক উপাদান। হিমালয় সংলগ্ন এলাকার মানুষজন ওই ছত্রাক ঔষধি হিসাবে ব্যবহার করেন। ঠান্ডা লাগা, জ্বর-সর্দি-কাশি, পেটের রোগ এমনকি, শারীরিক কোনও আঘাত লাগলেও তা দ্রুত উপশমের জন্য এই ছত্রাক ওষুধ হিসাবে খাওয়ানো হয়। গবেষণায় গুছি মাশরুমের ডায়াবিটিস এবং ক্যানসার প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ ছাড়া স্থানীয়েরা মনে করেন, শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে, মানসিক চাপ কমাতে এবং ত্বক ভাল রাখতেও সাহায্য করে এই ছত্রাকের জৈবসক্রিয় উপাদান। হাড়ের স্বাস্থ্য ভাল রাখতেও সাহায্য করে এই ছত্রাক। রন্ধনশিল্পীদের কাছে এই ছত্রাকের চাহিদা রয়েছে। তার কারণ এর স্বাদ যে কোনও হালকা স্বাদের স্যুপ, ঝোল, কারির স্বাদ-গন্ধ বাড়িয়ে দিতে পারে। স্বাদে এবং দর্শনে অনেকটাই মাংসের মতো। তাই কাশ্মীরে এ দিয়ে পোলাও, ইয়াখনি, রোগনজোশও বানানো হয়। নিরামিষাশীদের জন্য এটি মাংসের ভাল বিকল্প হতে পারে। হয়তো সে জন্যই রাষ্ট্রপতি ভবনে পুতিনের জন্য আয়োজিত নৈশভোজের পাতে জায়গা করে নিয়েছিল এই মাশরুম।
দুপুরে বা রাতে এক বাটি ঝরঝরে, গরম সাদা ভাত। বেশির ভাগ বঙ্গসন্তানের কাছেই এটি স্বস্তির খাবার, তৃপ্তির খাবার। অথচ সেই ভাতেই রাশ টানতে হয় ডায়াবিটিস হলে। এমনকি, কেউ ওজন কমাতে চাইলে, তাঁকেও দৈনিক ভাত খাওয়ার পরিমাণ বেঁধে দেন পুষ্টিবিদ। এক কাপ কি বড়জোর দেড়কাপ। পেট ভরানোর জন্য তাই অনেকেই ভাতের বিকল্প হিসাবে বেছে নেন কিনোয়া বা ব্রাউনরাইস। তবে এক পুষ্টিবিদ বলছেন, ভাতের বদলে শ্যামা চালের ভাত খেলে উপকার অনেক বেশি। শ্যামাচালের ভাত এ দেশে অতি পরিচিত দানাশস্য। কিনোয়া বা ব্রাউন রাইসের সঙ্গে পরিচয় ঘটার বহু আগে থেকে শ্যামাচালের ভাত খাওয়ার চল ছিল দেশে তো বটেই এ বঙ্গেও। পুণের পুষ্টিবিদ মোহিতা মাসক্যারেনহাস জানাচ্ছেন, শ্যামা চালের ভাত গুণেও কিনোয়া বা ব্রাউন রাইসের চেয়ে কিছু কম নয়। কারণ তাতে শুধু ফাইবারই বেশি আছে, তা নয়। তার পাশাপাশি, প্রোটিন এবং নানা ধরনের উপকারী খনিজও রয়েছে। এ চালের ভাতে প্রায় দ্বিগুণ বেশি প্রোটিন, এক বাটি ভাতে ৩০ গ্রাম পর্যন্ত প্রোটিন পাওয়া যায়। ভাতের থেকে অনেক বেশি ফাইবার, প্রতি বাটিতে ৮ গ্রাম ফাইবার থাকে। পাশাপাশি, সিম্পল কার্বোহাইড্রেটের মাত্রা কম। ক্যালোরিও অনেক কম।
এ ছাড়া শ্যামা চালের ভাতে রয়েছে আয়রন, মেয়েদের জন্য জরুরি ম্যাগনেশিয়াম, ফসফরাস এবং বিভিন্ন ধরনের বি ভিটামিন। ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য তো বটেই পিসিওএসের সমস্যায় এমনকি, ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও সাহায্য করতে পারে শ্যামাচালের ভাত। ওজন কমানোর জন্য অথবা ডায়াবিটিসের রোগীদের জন্য শ্যামাচালের ভাত বানানোর সময় তাতে পনির, সয়াবিন অথবা যেকোনও ধরনের প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন ডিম, মুরগির মাংস দিতে বলছেন পুষ্টিবিদ। সঙ্গে দইয়ের রায়তা থাকলে ওজন কমানোর জন্য আদর্শ খাবার হতে পারে। ফাইবারের মাত্রা বাড়িয়ে নিতে এতে নানা রকম সব্জিও দেওয়া যেতে পারে বলে জানাচ্ছেন।
ভাত খেয়ে পেট ভারী করতে না চাইলে অনেকেই বেছে নেন ইডলি। অফিস পাড়ায় সহজলভ্য এই খাবারে তেল মশলার বালাই নেই। অথচ খেতেও স্বাদু। দক্ষিণী খাবারটি তাই বহু বাঙালি অফিসযাত্রীরই পছন্দের মধ্যহ্নভোজ। প্রশ্ন হল, নিয়মিত ইডলি খেলে কি ওজন বাড়তে পারে? বা যাঁরা ওজন কমাতে চাইছেন, তাঁরা কি নিয়মিত দুপুরে ইডলি খাবেন? মুম্বইয়ের পুষ্টিবিদ লিমা মহাজন এর জবাব দিয়েছেন। পুষ্টিবিদ বলছেন, ইডলি চাল দিয়ে তৈরি বলে অনেকেই মনে করেন এতে শর্করা বেশি। তাই খেলে ওজন বাড়তে পারে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইডলি খেলে ওজন বৃদ্ধির চেয়ে বরং ওজন নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। ইডলি ভাজা নয়। এটি ভাপিয়ে তৈরি করা হয়, তাই এতে ক্যালোরি এবং ফ্যাটের মাত্রা খুব কম থাকে। এটি অত্যন্ত হালকা খাবার। তাই সহজেই হজম হয়। আর যে খাবার সহজে হজম হয় তা বিপাকের হার ভাল রাখতে সাহায্য করে। যা পরোক্ষে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। ইডলি সাধারণত চাল ও ডাল দিয়ে তৈরি হয়। অর্থাৎ এতে আছে ফাইবার এবং প্রোটিন। ফাইবার পেট ভরিয়ে রাখতে সাহায্য করে, প্রোটিন রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় না। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার সম্ভাবনা কমে। এটিও পরোক্ষে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত কোনও কিছুই খাওয়া ভাল নয়। যদি অতিরিক্ত পরিমাণে অর্থাৎ ৫-৬টি ইডলি খান, তবে যেকোনো খাবারের মতোই এ থেকেও ক্যালোরি বাড়তে পারে এবং ওজন বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হবে।কী ভাবে বানানো হচ্ছে: ইদানীং ইডলিকেও ভেজে, মশলা, চিজ়, চাটনি ইত্যাদি দিয়ে সুস্বাদু বানিয়ে পরিবেশন করা হচ্ছে। ওই ধরনের মশলাদার, ভাজা বা চিজ দেওয়া ইডলি স্বাস্থ্যকর নয়। শুধুমাত্র একটি খাবারের উপর ওজন কমবেশী করা নির্ভর করে না। সামগ্রিক ডায়েট এবং নিয়মিত শরীরচর্চা এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।




