এ বারের একুশে জুলাইয়ে ডিম-ভাতের বদলে দেখা গেল মাংস-ভাত। ডেকার্স লেনেও খিচুড়ির দোকানে লম্বা লাইন। ভিড়ও জমালেন শাসকদলের কর্মী-সমর্থকেরা। এই ভিড়েই লুকিয়ে অন্যান্য দলের সমর্থকরাও। যে চিত্র বরাবরই দেখা যায়। সরকারের বদল হলে একই কালো কালো মাথার ভিড়। লোকজন একই। শুধু পরিবর্তনের হাওয়ায় নিজেকে বদলে নেন। আগে ছিল ডিম্ভাত। এখন মাংসভাত। জগাই-মাধাই-গদাই। সিপিএম, বিজেপি এবং কংগ্রেস। তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় এবার রাম-বাম-শ্যাম। কেন কংগ্রেস ‘শ্যাম’, তা অবশ্য বোঝা গেল না। মমতার অন্ত্যমিল। মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমিত্রাক্ষর ছন্দও মাঝেমধ্যে ভাবিত। এতকাল তৃণমূলের ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির অন্যতম পরিচিতি ছিল ডিম্ভাত। এ বার তা বদলেছে। মধ্য কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় জড়ো হয়ে পাত পেড়ে মাংস-ভাত খেলেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। ইডেন গার্ডেন্সের সামনের চত্বর, মৌলালি থেকে শিয়ালদহ যাওয়ার রাস্তা এবং সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে কলেজ স্ট্রিট। সর্বত্রই সেই দৃশ্য। ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচির জেরে প্রবল ভিড় অফিসপাড়ার ক্যান্টিন ডেকার্স লেনে। তবে সেখানে সব খাবার দোকানেই ভিড় নয়। লম্বা লাইন মূলত খিচুড়ির দোকানে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে খিচুড়ি, আলুর দম আর পাঁপড়ভাজা খেলেন কিছু সংখ্যক তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা। ভিড় সামলাতে হিমশিম খিচুড়ির দোকানের কর্মীদের। মিটিংএ নতুন স্বাদ। এলাকার শীর্ষনেতার পকেট খসা। রাতে আবার ‘ওইটা’ও আছে। তারও ‘স্লিপ’ মিলেছে। এক্কেবারে সইসুবদ সমেত। একুশের শহিদ স্মরণ সেরে রাতে একটু লম্বা ঘুম প্রয়োজন, তাই বাংলার ‘ওইটা’।

ধর্মতলায় তৃণমূলের বিরাট মঞ্চের এক-দেড় কিলোমিটার দূরে সোমবার বসেছিল ‘বকুলতলার মেলা’। প্রতীকী অবশ্য। কী ছিল না সেই মেলায়! জামাকাপড়, চুড়ি, কানের দুল থেকে শুরু করে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত ‘বর্ণপরিচয়’, সবই বিক্রি হতে দেখা গেল ইডেন গার্ডেন্সের সামনের মেলায়। কর্মী-সমর্থকেরা সেই মেলায় গেলেন। ঘুরেঘুরে নানা জিনিস কিনলেন। কেউ ৭৫ টাকায় ছেলের জন্য গেঞ্জি কিনেছেন তো কেউ চুড়ি-কানের দুল। যাঁরা মেলায় দোকান দিয়েছেন, তাঁদের কারও কারও ধর্মতলাতেও দোকান। কেউ মেটিয়াবুরুজের হাটে বসেন। হাওড়ার মঙ্গলাহাট থেকে সটান ধর্মতলায়। বিক্রিবাটা ভাল হবে এই আশায়। বিক্রিও মন্দ হয়নি। এই বছর একুশে জুলাইয়ে উল্টো পূরান। তৃণমূলের শহিদ দিবসের কর্মসূচিতে সাধারণত প্রতি বছর বৃষ্টি হয়। গত বছর এবং তার আগের বছরেও হয়েছিল। কিন্তু সোমবার বৃষ্টি হয়নি। উল্টে গা-জ্বালানো রোদ্দুর! ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে এসে গরমে অসুস্থ হয়ে পড়লেন নেতা-নেত্রীদের অনেকে। মঞ্চের সামনে বসা বর্ধমান-দুর্গাপুরের সাংসদ কীর্তি আজাদ গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি। তৃণমূল বিধায়ক মদন মিত্রও অসুস্থ হয়ে এসএসকেএমে ভর্তি। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় আসানসোলের সাংসদ শত্রুঘ্ন সিন্হাকে মঞ্চ থেকে ধরাধরি করে নামিয়ে নীচের অস্থায়ী ঘরে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়েছিল। অসুস্থ হয়ে পড়েন মালদহের মানিকচকের বিধায়ক সাবিত্রী মিত্রও।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ শহিদ দিবস সমাবেশ তৃণমূলের। গুরুত্ব অন্যান্য বারের চেয়ে বেশিই। ধর্মতলার মঞ্চ থেকে ভাষণ দিলেন মোট ১০ জন। এক জন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্যজন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকি আট নেত্রীর ঘনিষ্ঠ। প্রাধান্য মতুয়া সমাজ, জনজাতি সমাজের প্রতিনিধি অথবা ভিন্রাজ্যের নেতা তথা তৃণমূলের ‘সর্বভারতীয়’ পদচিহ্নের প্রতীক। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত ২১ জুলাই সমাবেশের প্রথম বক্তা। এই তারিখের পটভূমিকা এবং তৃণমূল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে বলার মতো প্রবীণতর আর কেউ সম্ভবত তৃণমূলে এখন নেই। শান্তনু ঠাকুর আর একটু হলে পর্দা ফাঁস করতে চলেছিলেন। ২০০৩ সালে বাজপেয়ী সরকার ‘কালা আইন’ বছরে বাজপেয়ী মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! বেগতিক দেখে তাঁর ভাষণ থামাতে ইন্দ্রনীল সেন কর্ডলেস মাইক টেনে নিয়ে সকলকে হাততালি দিতে বললেন। রাজ্যের বনমন্ত্রী তথা জনজাতি সমাজ থেকে আসা নেত্রী বিরবাহা হাঁসদা সাবলীল সাঁওতালিতে, স্বচ্ছন্দ বাংলাতেও। ঝাড়খন্ড পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নরেন হাঁসদার কন্যা। প্রয়াত সন্তোষমোহন দেবের কন্যা সুস্মিতা দেব। সুস্মিতার বাবা সন্তোষমোহন দেব কেন্দ্রে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন। শিলচরের দাপুটে নেতা ছিলেন। মেঘালয়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বর্তমান বিরোধী দলনেতা মুকুল সাংমার ভাষণ চলাকালীনই সভাস্থলে পৌঁছোন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই জয়ধ্বনিতে আচম্বিতেই সাংমার ভাষণ শেষ।

উত্তরপ্রদেশের নেতা ললিতেশপতি, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কমলাপতি ত্রিপাঠীর পৌত্র। গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের ভদৌহী থেকে তৃণমূলের টিকিটে হারেন। প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর বারাণসীর লাগোয়া লোক বাংলার বিপ্লবী হয়েছেন। শহিদ সমাবেশের নিয়মিত বক্তা ফিরহাদ হাকিম রবীন্দ্রনাথকে তীব্র শ্রদ্ধঞ্জলীতে ভরিয়ে দিতে গিয়ে ‘পুণ্য হউক, পুণ্য হউক’কে বলে বসলেন ‘পূর্ণ-পূর্ণ’। নজরুলকে উদ্ধৃত করতে গিয়েও সামান্য বিচলন। অতুলপ্রসাদকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে ‘নানা পরিধান’কে বললেন ‘নানা অভিধান’। বঙ্গ বিজেপিকে কটাক্ষ করে ‘ছাগলের তৃতীয় সন্তান’ বাংলা প্রবচনের উপমা টেনে ইংরেজিতে বললেন, ‘ছাগলের থার্ড বাচ্চা’! এবার অরূপ বিশ্বাস ভাষণ শুরু করলেই বোঝা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্চে আসার সময় হয়ে গিয়েছে। নিজের নিয়মেই, অরূপ মাঝপথে বক্তৃতা থামিয়ে মমতার নামে জয়ধ্বনি দেওয়ার বদলে একধাপ এগিয়ে মমতাকে ‘ভারতের মূক্তিসূর্য’ বলে আরও একটু চাগিয়ে তুললেন। এমনিতে অরূপ মমতার বক্তৃতার শ্রুতিধর। বিভিন্ন বিষয়ে মমতা সারাবছর যা বলেন, অবিকল তারই প্রতিধ্বনি অরূপের ভাষণে।




