কলকাতা নাইট রাইডার্স: ২০৬ (রাসেল ৫৭, অঙ্গকৃষ ৪৪, পরাগ ১/২১)
রাজস্থান রয়্যালস: ২০৫ (পরাগ ৯৫, যশস্বী ৩৪, বরুণ ২/৩২)
১ রানে জয়ী কেকেআর
কেকেআরেরই জেতা উচিত ছিল, ম্যাচ শেষে বলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। ম্যাচের পর দুই এককালীন সতীর্থের মিলনের সাক্ষী থাকে ইডেন। মাঠে দাঁড়িয়ে রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায় সৌরভকে। নেন বৈভব সূর্যবংশীর ক্লাসও। ১৪ বছরের বালককে দেন ক্রিকেটের পাঠ। দু’জনেই বাঁ হাতি। ব্যাট ধরে বৈভবকে স্ট্যান্স দেখিয়ে দেন সৌরভ। উঠতি তারকাকে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক। ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্সের খেলা দেখে অভিভূত ইংল্যান্ড ফুটবল দলের কোচ গ্যারেথ সাউথগেট। হ্যারি কেনদের প্রাক্তন কোচ সাউথগেট বলেন, ‘ইডেনে খেলা দেখে খুবই ভাল লাগছে। ম্যাচটা উপভোগ করেছি।’ জোড়া জয়ে আইপিএলের প্লে অফের সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছে কেকেআর। শাহরুখ খান না এলেও, ছিলেন জুহি চাওলা। দলের জয় উপভোগ করেন। ইডেনে ছাড়ার সময় জুহি বলেন, ‘ভাগ্যিস জিতেছে। ভাল খেলেছে। মাঝে রাজস্থানও ভাল খেলেছে। শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেছে। ম্যাচটাকে শেষ বল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। দুটো দলই ভাল খেলেছে। আমাদের সমর্থন করার জন্য সাপোর্টারদের ধন্যবাদ। ওরা আমাদের সাহস জোগায়। তার জন্য ধন্যবাদ।’ রান পায়নি ১৪ বছরের ‘বিস্ময় প্রতিভা’ বৈভব সূর্যবংশী। ২ বলে মাত্র ৪ রান করে ডাগআউটে ফিরে যেতে হয়েছিল। সাহসী ব্যাটিং মোহিত করেছে ক্রিকেট মহলকে এমনকি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়েরও। রবিবার ম্যাচের পর বিহারের এই ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করলেন টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক। বৈভবকে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। বৈভবকে সৌরভ বলেন, “তোমার খেলা দেখেছি। যেভাবে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলো, সেভাবেই খেলতে থাকো। খেলা পরিবর্তন করার দরকার নেই।” বৈভবকে স্ট্যান্সও দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। বৈভব প্রসঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেন, “বেশ ভারী ব্যাট নিয়ে খেলে বৈভব। ওর হাতে বেশ ভালো পাওয়ার রয়েছে। কেকেআর ম্যাচে রান না পেলেও বৈভব কিন্তু খুবই ভালো ক্রিকেটার।” আইপিএলে এত কম বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড আর কারওর নেই। ইউসুফ পাঠানকে টপকে আইপিএলে ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম শতরান করেছে বিহারের এই ক্রিকেটার। গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৩৫ বলে সাহসী সেঞ্চুরি তো এখনও চর্চার বিষয়। এহেন বৈভবকে খেলানোর পিছনে রাজস্থান কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের ভূমিকা অনেকটাই। সেই বিস্ময় প্রতিভা এবার প্রশংসা পেলেন সৌরভের কাছ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে তাঁকে ভারতীয় দলে দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ক্রিকেট মাঠে ‘টিফো’। ইডেন গার্ডেন্সে দর্শকাসনে আন্দ্রে রাসেলের টিফো। লেখা, ‘দ্য মাইটি নাইট’। অর্থাৎ পরাক্রমশালী যোদ্ধা। টিফো দেখে রাসেল রবিবার রাজস্থান ম্যাচেই ফর্মে ফিরলেন। রানে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার। রিয়ান পরাগের ধুন্ধুমাপ ব্যাটিং সত্ত্বেও ইডেনে কেকেআর হারাল রাজস্থানকে। কলকাতা জিতল ১ রানে। নাইটদের কাছে ম্যাচটা ছিল মরণবাঁচন। হেরে গেলে এবছরের মতো প্লে অফ স্বপ্ন প্রায় শেষ হয়ে যেত। রাহানে, রাসেলরা রাজস্থানকে ১ রানে হারিয়ে নাইটদের প্লে অফে যাওয়ার স্বপ্ন এখনও জিইয়ে রাখলেন। পয়েন্ট টেবিলের ষষ্ঠস্থানে কেকেআর। কেকেআরের জয়ে রাসেল-রিঙ্কু ঝড়। পাঁচ নম্বরে নেমে ক্যারিবিয়ান তারকা আন্দ্রে রাসেলকে ৪০৬ দিন পর কেকেআর জার্সিতে হাফসেঞ্চুরি করেন। ছ’টা বিশাল ছয়ে অপরাজিত২৫ বলে ৫৭ রান। অঙ্গকৃষ রঘুবংশী ৩১ বলে ৪৪। রিঙ্কু সিং দু’টি ছক্কা হাঁকিয়ে ৬ বলে অপরাজিত ১৯ রানে। শুরুতে রহমানুল্লাহ, রাহানের যুগলবন্দি। রঘুবংশী, হর্ষিত রানার ২ উইকেট নেন। টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অজিঙ্ক রাহানে। দ্বিতীয় ওভারে যুধবীর সিংয়ের বলে ১১ রানে আউট সুনীল নারিন। আফগানি তারকা গুরবাজের সঙ্গে ইনিংসের হাল ধরেন অধিনায়ক রাহানে। গুরবাজ ৩৫ রানের মাথায় মহিশা থিকশানার বলে ফেরেন। নাইট অধিনায়ক রাহানে ফিরলেন ২৬ বলে ৩০ রানে। পাঁচ নম্বরে ক্যারিবিয়ান ক্যারিবিয়ান তারকা আন্দ্রে রাসেল ঝড়। কেকেআর জার্সিতে হাফসেঞ্চুরি।

বৈভব সূর্যবংশী ইতস্তত। ২০৭ রানের পাহাড়প্রমাণ লক্ষ্য। ইডেন বৈভবের মারকাটারি ইনিংসের অপেক্ষায় ছিল। একটা বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দ্বিতীয় বলেই আউট বৈভব আরোরার বলে। পরের ওভারেই অভিষেক করা কুণাল সিং রাঠোর আউট মইন আলির বলে কোনও রান না করে। যশস্বী জয়সওয়াল তালুবন্দি হন রিঙ্কু সিং এর হাতে মইন আলির বলে। গোলাপি বাহিনী ৭৫ রানে ৫ উইকেট হারায়। রাজস্থানের ধ্রুব জুড়েল, ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গারা বরুণ চক্রবর্তীর রহস্য স্পিনে কাবু হয়ে শূন্যে ফেরেন। রাজস্থানকে ম্যাচে ফেরান অধিনায়ক রিয়ান পরাগ। মইন আলির চতুর্থ ওভারে পাঁচ বলে পাঁচটি বিশাল ছক্কা হাঁকান, ওভারে ৩২ রান দিলেন মইন। পরের ওভারে বরুণ চক্রবর্তীর বলে এক রান নেন হেটমায়ার। পরাগ আবার ছক্কা হাঁকান। পরপর ছ’বলে ছ’টি ছয়। রিয়ান টানা পাঁচটি ছয় মারলেন মইন আলিকে। পরের ওভারে বরুণ চক্রবর্তীকে একটি। টানা ছ’টি ছয়ে ৯৫ রান। শুভম দুবে ১৪ বলে ২৫ রান করেন। বৈভবকে চার, ছয়, চার মেরেছিলেন শুভম দুবে। এক বলে দরকার ছিল তিন। বৈভবের ইয়র্কারে এক রানের বেশি নিতে পারেনি রাজস্থান। টানটান উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ জিতে প্লে অফের স্বপ্ন জেগে রইল কেকেআরের।

রিয়ান পরাগের ঝোড়ো ইনিংস ইডেনে। ৪৫ বলে ৯৫ রান করে রাজস্থান অধিনায়ক ট্র্যাজিক হিরো। অসমের ভূমিপুত্র ভয়ানক। মইন আলি, বরুণ চক্রবর্তীদের বিষাক্ত ডেলিভারিগুলিকে নির্বিষ করে বাউন্ডারির বাইরে পাঠান। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন ফুটবল কোচ গ্যারেথ সাউথগেট। রাজস্থান রয়্যালসকে সমর্থন করতে ক্রিকেটের নন্দনকাননে উপস্থিত ছিলেন। রিয়ানের অসাধারণ রেকর্ড। রবিবাসরীয় ইডেনে টানা ছ’বলে ছ’টি ছক্কা। মইন আলির চতুর্থ ওভারে পাঁচ বলে পাঁচটি ছক্কায় ৩২ রান। পরের ওভারে বরুণ চক্রবর্তীর বলে এক রান নেন হেটমায়ার। দ্বিতীয় বলে পরাগ আবারও ছক্কা হাঁকান। টানা ছ’বলে ছ’টি ছয় মারেন। ১২তম ওভারে বৈভব আরোরার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বলে পরপর ২টি চার মারেন রিয়ান এবং চতুর্থ বলে ১ রান নেন। অর্থাৎ, ১১.২ ওভার থেকে ১৩.২ ওভার পর্যন্ত রিয়ান যে ৯টি বল খেলেন, তাতে তিনি সংগ্রহ করেন (৪+৪+১+৬+৬+৬+৬+৬+৬) ৪৫ রান। রিয়ান পরাগ ইডেনে ৫টি চার ও ৩টি ছক্কার সাহায্যে ২৭ বলে ব্যক্তিগত হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন। তিনি শেষমেশ ৬টি চার ও ৮টি ছক্কার সাহায্যে ৪৫ বলে ৯৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে রিয়ান পরাগই প্রথম কোনও ব্যাটার, যিনি টানা ছ’বলে ছয় ছক্কা হাঁকালেন। আইপিএলের ইতিহাসে পাঁচ বলে পাঁচ ছক্কা হাঁকানোর রেকর্ড রয়েছে কেকেআরের রিঙ্কু সিংয়ের। ২০২৩ সালে গুজরাট টাইটান্সের যশ দয়ালের ওভারে টানা পাঁচ ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন। ম্যাচের পর রিয়ান পরাগ বলেন, “কীভাবে রান তাড়া করব, সেই হিসেবটা বুঝতে আমারই হয়তো ভুল হয়েছে। আমারই ম্যাচটা শেষ করে আসা উচিত ছিল।”
রাজস্থান রয়্যালসের বিরুদ্ধে সতীর্থ রাসেলের ফর্মে ফেরা। খুশি বরুণ চক্রবর্তী জানান, ‘আমি রাসেলের সঙ্গে কথা বলেছি। ও আইপিএলের আরও দুটো তিনটে সাইকেল খেলতে চায়। বয়স কোনও ফ্যাক্টর নয়। ও এখনও ফিট আছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে সেটাই যথেষ্ঠ।’ এদিন শুরুটা সতর্কতার সঙ্গে করেন ক্যারিবিয়ান তারকা। বিপক্ষের স্পিনারদের বুঝে খেলেন। উইকেটে থিতু হওয়ার পর হাত খোলেন। সতীর্থের খেলার ধরণ বদলানোর প্রসঙ্গে বরুণ বলেন, ‘সেটা সম্পূর্ণ ওর ব্যাপার। ও স্পিনের বিরুদ্ধেও ভাল খেলতে পারে। বেধড়ক মারতে পারে। যা আমরা অতীতে দেখেছি। এদিন ও আলাদা মনোভাব নিয়ে নেমেছিল। ইডেনের উইকেট নিয়ে কোনও অভিযোগ নেই। আমরা এই উইকেটই পাব। দ্বিতীয় ইনিংসে পিচ একটু ভাল হয়। ইডেনে ব়্যাঙ্ক টার্নার হলেও ২০০ রান উঠবে। আমাদের সবকটা ম্যাচ জিততে হবে। আমাদের এখনও পাঁচটা নক আউট ম্যাচ বাকি। এই জায়গা থেকে প্রত্যেক ম্যাচ নক আউট। আশা করব এই জয় থেকে আমরা মোমেন্টাম ফিরে পাব। নিজেদের ওপর বিশ্বাস বাড়বে। আমরা আগেও সেটা করে দেখিয়েছি। তাই আশাবাদী। জোফ্রা আর্চারকে রান আউট করার সময় হালকা চোট পান রিঙ্কু সিং। চিন্তার কোনও কারণ নেই। পরের ম্যাচের আগে ঠিক হয়ে যাবেন রিঙ্কু।’
এবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ান কোন দল? কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকার মুম্বই ইন্ডিয়ান্সকে ভাবছেন না। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখছেন সুনীল গাভাসকর। ঘরের মাঠে চেন্নাই সুপার কিংসের মুখোমুখি বিরাট কোহলিরা। ১০ ম্যাচের মধ্যে সাতটিতে জিতেছে বেঙ্গালুরু। এখনও পর্যন্ত আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়নি আরসিবি। বেঙ্গালুরুকে ফেভারিট হিসেবে বেছে নিয়ে সুনীল গাভাসকর মনে করেন, ফেভারিট কোহলিরা। গাভাসকর বলেন, ‘আমার ফেভারিট রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। ওরা ব্যাটের পাশাপাশি ভাল ফিল্ডিংও করছে। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সও খুব দূরে নেই। তবে ওরা সবে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, ওরা এটা ধরে রাখতে পারবে কিনা। পরের তিনটে ম্যাচ সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে। মোমেন্টাম ধরে রাখাই আসল বিষয়। তবে অবশ্যই খেতাব জয়ের জন্য ফেভারিট আরসিবি।’
ছবি : অরিন্দম দাস ও সিএবি




