টানা আইএসএলে ব্যর্থতা। গভীর সঙ্কটে ইস্টবেঙ্গল। ১০৫ বছরের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে বসেছে। দায়ী কে? কেউ বলছেন নীতুর ‘সরকার-রাজ’ ! দলের সমর্থকের কথায়, ‘‘নীতুদা যত দিন থাকবে, কোনও ইমামি এসে কিছু করতে পারবে না।’’ ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের গভীরতর সমস্যা। সমাধান সম্ভব কবে, কিভাবে? ‘নীতুদা’ অর্থাৎ ক্লাবকর্তা দেবব্রত সরকার। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের একপক্ষের মতে, নীতু দা আছেন বলেই ইস্টবেঙ্গল পরে হলেও আইএসএলে খেলার সুযোগ পেয়েছে। লাল-হলুদ জার্সি পরে ১১ জন ফুটবলার এখনও মাঠে নামতে পারেন। না হলে ক্লাব বিক্রি হয়ে যেত এতোদিনে! অপরপক্ষের মতে, এ ভাবে ক্লাব চলতে পারে না। বিনিয়োগকারী সংস্থা বছরে কোটি কোটি ব্যায় করছে, ফুটবল সংক্রান্ত সব কিছু দায়ভার তাদের উপর বর্তায়। গত তিনটি আইএসএলে ধারাবাহিক ভাবে নবম স্থানে ইস্টবেঙ্গল। গত চার বছর ধরে ইস্টবেঙ্গলের ফুটবল দল ক্লাব বনাম বিনিয়োগকারীর লড়াই। ট্রফি নেই। সমর্থকেরা ক্ষিপ্ত। যুবভারতীতে মোহনবাগানের ম্যাচে গড়ে ২৫-৩০ হাজার দর্শকের বদলে ১০-১২ হাজার।
অথচ, গত দু’বছরের আইএসএল চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান। সমস্যা নেই? সঞ্জীব গোয়েন্কার সঙ্গে ক্লাবকর্তা দেবাশিস দত্তের বিরোধ? ইস্টবেঙ্গলি যুক্তি, মোহনবাগান তো বিকিয়ে গিয়েছে! গোয়েন্কাই তো এখন ফুটবল দলের মালিক। ইস্টবেঙ্গল শতবর্ষের ঐতিহ্যে, ‘কোম্পানির দল’। মোহনবাগান গোয়েন্কার মালিকানায়। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরেও ক্লাবে ট্রফি আনতে বার বার নাকি মালিককে অনুরোধ করতে হয়। ট্রফি শোভা পায় আলিপুরের গোয়েন্কা নিবাস-এ। দাবি, ‘নীতুদা’ আছেন বলেই ক্লাবটা এখনও উঠে যায়নি। অনেকে মনে করেন, নীতু সরে গেলে ক্লাব বাঁচবে। যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের, ‘দড়ি ধরে মারো টান, সরকার-রাজ খান খান।’ ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের একদলের, নীতু সরকার ক্লাবে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। গত দেড় দশক ধরেই ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রশাসন প্রায় বিরোধী-শূন্য। সুপ্রকাশ গড়গড়ি, পার্থ সেনগুপ্তেরা নেই বললেই চলে। সিপিএমের মানস মুখোপাধ্যায়ও ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের রাজনীতি থেকে দূরে। ফাঁকা মাঠে পারিষদবর্গ বসিয়েছেন নীতু। ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে। নীতু র কথায়, ‘‘আমি তো কোনও পদে নেই। আমি ক্লাবের একজন কর্তা মাত্র। তাই আমার থাকা বা সরে যাওয়াটা বিষয় নয়। বাকিদের থেকে আমার পরিচিতি একটু বেশি বলে হয়তো আমায় সামনে আসতে হয়। কিন্তু আমিও তো ক্লাবের অসংখ্য সমর্থকের সঙ্গে সমব্যথী। এটা ভেবে খারাপ লাগে যে, আমরা যখন দল গড়তাম তখন টাকা ছিল না। এখন টাকা আছে, কিন্তু আমাদের দল গড়ার ক্ষমতা নেই!’’
জাতীয় লিগের নাম বদলে ‘আই লিগ’ হয় ২০০৭ সালে। আইএসএলে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল খেলার আগে পর্যন্ত সেটিই ছিল দেশীয় ফুটবলের এক নম্বর লিগ। ‘আই লিগ’ নাম হওয়ার পর সেই ট্রফি কখনও জেতেনি ইস্টবেঙ্গল। ২০০৭ থেকেই ইস্টবেঙ্গলের ক্যাবিনেটে ওজনদার ট্রফি নেই। মাঝে দু’টি ফেডারেশন কাপ জেতা ছাড়া। একটা সুব্রত ভট্টাচার্যের কোচিংয়ে। অন্যটা ট্রেভর জেমস মর্গ্যানের কোচিংয়ে। এক বার এএফসি কাপের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল লাল-হলুদ। দীর্ঘ দিনের ব্যর্থতাকে সাম্প্রতিক ব্যর্থতা বলে নিজেদের ব্যর্থতাকেও আড়াল করতে চাইছেন কর্তারা।
ইস্টবেঙ্গলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের ফুটবল গোয়েন্কাদের হাতে। ঘটি-বাঙাল তত্ব। আইএসএলে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান মিলিয়ে বাঙালি ফুটবলারের সংখ্যা সাত। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল লড়াই হয় না। লড়াই হয় দুটো কোম্পানির। ৮০-৮৫ কোটি টাকার দল গড়া কোম্পানি বনাম ৪০-৪৫ কোটি টাকার কোম্পানি। মোহনবাগান দু’বার ভারতসেরা। ইস্টবেঙ্গলের সদস্য-সমর্থকদের আক্ষেপ। ইস্টবেঙ্গলে অভিযোগ বিস্তর। বিনিয়োগকারী ‘শ্রী সিমেন্ট’-এর সময়ও এই অভিযোগ ক্লাব কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক অসহযোগিতা। প্রভাব আইএসএলে লাল-হলুদের খেলায়। ২০১৮ সালে চুক্তি ‘কোয়েস’ সংস্থার সঙ্গে। কোয়েসের সঙ্গেও ক্লাবকর্তাদের বনিবনা হয়নি। দু’বছর পরেই বিচ্ছেদ। এর পরে শ্রী সিমেন্টই হোক বা ইমামি, ইস্টবেঙ্গলের বিনিয়োগকারী পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক বছরের মধ্যেই সরে যেতে চেয়েছিল শ্রী সিমেন্ট। শ্রী সিমেন্টের দাবি মানা সম্ভব হয়নি ক্লাবের পক্ষএ। ইমামির আগমনও মুখ্যমন্ত্রী মমতার হাত ধরেই।
ইস্টবেঙ্গলের তথ্যচিত্রের উদ্বোধনে মমতা বলেন, ‘‘মোহনবাগানের টাকার সমস্যা নেই। সঞ্জীব গোয়েন্কা দেখছেন। ওঁর টাকার অভাব নেই। ইস্টবেঙ্গলের ইনভেস্টর দরকার ছিল। আমি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। আমার একটা ক্ষোভ আছে। ইমামি ক্লাবকে অনেক সাহায্য করছে। কিন্তু এগোতে গেলে ভাল ফুটবলার লাগে। এখানেই আমি ক্লাবকে বলব, আপনারা সঠিক পরামর্শ না দিলে ওঁরা এগোবেন কী করে? সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন তো সমর্থকেরা। ক্লাবকর্তাদেরও এগোতে হবে। আমার মনে হয় না, ইমামি সাহায্য করছে না। ওরা তো টাকা দিচ্ছে! কিন্তু তার বদলে ওদের ট্রফিটা তো দিতে হবে। অন্তত সেই চেষ্টা করতে হবে। শুধু টাকা ঢাললে হবে না। বুদ্ধি করে দলটা তৈরি করতে হবে। নীতুদাকে বলছিলাম, আপনারা দলটা ভাল করে করছেন না কেন? ডায়মন্ড হারবারকে দেখে শিখুন। ওদের দেখে বুঝুন, কেমন বুদ্ধি খাটিয়ে দল গড়েছে। ইস্টবেঙ্গলের কর্তারাও আগে থেকে ভাবুন, কাদের নেবেন। এক বছর ধরে পরিকল্পনা করুন। কঠোর সিদ্ধান্ত নিন। আগামী বছর যেন আর ব্যর্থতা না আসে।’’ ময়দানে শোনা যাচ্ছে, ফুটবল দল চালানোর জন্য বা মোহনবাগানের জন্য যে অর্থ সঞ্জীব গোয়েন্কা বিনিয়োগ করেন, তার ধারেকাছেও নেই ইমামি। যুক্তি, দল ম্যাচের পর ম্যাচ খারাপ খেলছে, বেশি টাকা ঢেলে কী হবে? ক্লাবের পাল্টা যুক্তি, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ হচ্ছে না বলেই ভাল দল গড়া যাচ্ছে না। দল ডুবছে। নীতু সরকারোর একাধিক বার বৈঠক ইমামির কর্তাদের সঙ্গে। রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে লাল হলুদের নীতু সরকার ও ইমামির আদিত্য আগরওয়াল। ইস্টবেঙ্গলে ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ চালু? ১০৫ বছরের প্রাচীন ক্লাব ‘সরকার-রাজ’ শেষ? অনেক প্রশ্ন।




