Saturday, July 4, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

বৈভবই ক্রিকেটের সম্পদ! মহান অনিশ্চয়তার খেলায় চমকের অপেক্ষায় বালকবীর!

বালকবীর! বীরই বটে। ১৪ বছরের ছেলেটি। কভারের উপর দিয়ে ছয় মারার অদ্ভূত তেজ। ইংরেজ ক্রিকেটবোদ্ধা বিস্ফারিত নেত্রে দেখলেন। প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ঠোঁট-চাপা ব্রিটিশ রসিকতার ছোঁয়া। রসিকতার আড়ালেও ছিল অগাধ বিস্ময়! আইপিএল এক হিরের খনি। পাথরের খাঁজে না-কাটা হিরের কুচি পড়ে থাকে। খনিশ্রমিকদের হেডল্যাম্পের আলোয় উদ্ভাসিত হয়। ২০২৪ এ রিঙ্কু সিং। ২০২৫ আইপিএল হিরে বিস্ময় কিশোর! বিহারের সমস্তিপুর। গ্রামের ছেলে বৈভব সূর্যবংশী। পঁয়ত্রিশ বলে সেঞ্চুরি। বিহ্বল ক্রিকেটবিশ্ব। ক্রিকেটের অলঙ্কার শচীন তেন্ডুলকরের ভাষায়, ‘‘ওর ভয়ডরহীন মনোভাব, ব্যাট স্পিড, দ্রুত বলের লেংথ বুঝে নেওয়ার দক্ষতা আর শটের পিছনে এনার্জি ট্রান্সফার করার ক্ষমতা অবিশ্বাস্য!’’ উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে ভয়াবহ ইনিংসের সাক্ষী জস বাটলারও মুখ খুললেন, ‘‘দ্যাট ওয়াজ় ইনক্রেডিব্‌ল!’’ এক ওভারে ছয় ছক্কার রেকর্ডধারী যুবরাজ সিং, ‘‘১৪ বছর বয়সে কী করছে ছেলেটা! চোখের পলক ফেলার আগে দুনিয়ার সেরা সেরা বোলারদের পিটিয়ে ছাতু করে দিচ্ছে। অবিশ্বাস্য!’’ ৩৬০ ডিগ্রির ব্যাটার সূর্যকুমার যাদব বলেছেন, ‘‘একটা বাচ্চা ছেলে যে এই তাণ্ডব চালাতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।’’ কম কথার মানুষ রোহিত শর্মার কম শব্দে বর্ণনা, ‘‘ক্লাস!’’

ক্রিকেট মহান অনিশ্চয়তার খেলা। আধুনিক ক্রিকেট নির্মম! বর্তমান ক্রিকেটে রোম্যান্সের কোনও জায়গা নেই। চলতি ক্রিকেট নির্দয়। খাঁটি বিহারি টেবো টেবো গালের মধ্যে সলজ্জ ঠোঁটজোড়া। সূর্যবংশী! উপহার ভারতীয় ক্রিকেটের। বিহারের কিশোরকে দেখে বাক্‌রুদ্ধ-উচ্ছ্বসিত সতীর্থ, প্রতিপক্ষ। বৈভব সমস্তিপুরের মোতিপুর নামক এক গ্রামের সন্তান। বাবার সঞ্জীবের সফল ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছা ছিল। পারেননি। ব্যর্থ ক্রিকেটারের জিন দেহে বহন করা পুত্রের চার বছর বয়সে ক্রিকেট শুরু। কোচ বাবা স্বয়ং। ন’বছর বয়স। পুত্রের ক্রিকেট-স্বপ্ন সফল করার জন্য সঞ্জীব নিজের জমি বিক্রি করে দেন। বাড়ি থেকে ১০০ কিলোমিটারের দূরত্বে পাটনার ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে। যাতায়াত মিলিয়ে ২০০ কিলোমিটার। এক দিন অন্তর অন্তর যেতে হত অ্যাকাডেমিতে। কাকভোরে ওঠা। মা তারও আগে উঠে ছেলের খাবারটা তৈরি করে দিতেন। পটনার অ্যাকাডেমিতে কোচ মণীশ ওঝার তত্ত্বাবধানে সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু অনুশীলন। খাটুনি শেষ। সন্ধ্যায় আবার ১০০ কিলোমিটার। সমস্তিপুরের বাড়িতে ফেরা। টানা চার বছর সেই ধকল সহ্য করে ক্রিকেটার হয়েছে বৈভব। ধকল এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমের অংশ তার পরিবার। ম্যাচ খেলতে মাঠে-মাঠে ছেলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন সঞ্জীব।

হুইলচেয়ারে থাকা দ্রাবিড়কে দাঁড় করিয়ে দিলেন বৈভব। সূর্যবংশীকে দাঁড় করিয়েছেন লক্ষ্মণরা। নিলামে ১ কোটি ১ লক্ষ টাকা দরে বৈভবকে কেনে রাজস্থান রয়্যালস। হাফ সেঞ্চুরি মাঠে ফেলে এসে চোখে জল চলে এসেছিল বালকের। গুজরাত টাইটানসের বিরুদ্ধে ধ্বংসলীলা ১৪ বছরের ব্যাট থেকে! ভাঙা পা ভুলে রাহুল দ্রাবিড় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন ডাগ আউটে। মুষ্টিবদ্ধ দু’হাত মাথার উপর তুলে ঝাঁকাচ্ছেন। কাঁধ, বাহু, কোমর এবং দুই উরুতে কতখানি শক্তি অর্জিত থাকলে ওই রকম সব শটের বিস্ফোরণ হয়! মিস্‌হিটও ছক্কা। অফসাইডটা তুলনায় একটু দুর্বল। তাতেও ৩৫ বলে সেঞ্চুরি! অনসাইডে স্রেফ কব্জির মোচড়ে স্কোয়্যার লেগ থেকে মিড উইকেটের উপর দিয়ে গ্যালারিতে ধারাবাহিক বল ফেলতে থাকে। মহম্মদ সিরাজ়, রশিদ খান এবং ইশান্ত শর্মা। বেধড়ক ঠ্যাঙানি-খাওয়া বোলারদের মিলিত আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ৬৭৪। ক্রিকেটগ্রহে অফসাইডে ঈশ্বর পরামর্শও দেন বৈভবকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বৈভবের অভিষেক ২০২৪ সালে। বিহারের হয়ে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে। বয়স ১২ বছর ২৮৪ দিন। ১৩ বছর ২৪১ দিন বয়সে বিহারের হয়ে টি টোয়েন্টিতে অভিষেক। প্রতিপক্ষ রাজস্থান। ২০২৪ সালের নভেম্বর। সেপ্টেম্বরে অনূর্ধ্ব-১৯ ভারতীয় দলে সুযোগ আসে বালকের। অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিরুদ্ধে ৫৮ বলে সেঞ্চুরি। বিহারের স্থানীয় এক টুর্নামেন্টে অপরাজিত ট্রিপল সেঞ্চুরিও আছে।

ক্রিকেটবিশ্ব জুড়ে শোরগোল। উচ্ছ্বসিত সমস্তিপুর, অভিভূত বিহার, উদ্বেল গোটা দেশ। নাসের হুসেন, মার্কাস ট্রেসকোথিকের মতো নাকউঁচু ইংরেজ ধারাভাষ্যকারেরাও উপযুক্ত বিশেষণ খুঁজে পাচ্ছেন না। গুগ্‌ল সার্চে নামটা টাইপ করলেই এক নম্বরে ভেসে আসছে বৈভব সূর্যবংশী। মাত্র তিন দিনের মধ্যে আকাশ থেকে সেই বালকবীর রুক্ষ মাটিতে আছড়ে পড়ল! মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে পরের ম্যাচে শূন্য! মেয়াদ মাত্র দু’টি বল। দীপক চাহারের গুডলংথ ডেলিভারি তুলে মারতে গিয়ে ব্যাটটা সামান্য চেত্তা খেয়ে গেল। গ্রিপটাও একটু ঘুরে গিয়েছিল। ব্যাটের নীচের দিকে (টো এন্ড) লেগে মিড অনে একটা সহজ ক্যাচে শেষ হয়ে গেল বৈভবের ইনিংস। গোটা মাঠ থমকে গিয়েছে। গ্যালারিতে সার সার ম্লান, মূঢ় এবং মূক মুখ। স্থাণু হয়ে কিছু ক্ষণ ক্রিজ়ে দাঁড়িয়ে থেকে ডাগ আউটের দিকে রওনা দিল ১৪ বছরের বালক। সারা দুনিয়া বৈভব সূর্যবংশীর ক্রিকেট সেঞ্চুরির মিনার থেকে শূন্যের জমিতে ছুড়ে ফেলতে সময় নেয় মাত্র একটা ম্যাচ। চারপাশ থেকে মিলিয়ে যায় সমস্ত রোশনাই। প্রতিভা শুয়ে থাকে মাইক্রোস্কোপের তলায়। উড়ে আসতে থাকে বিবিধ পরামর্শ, সাবধানবাণী।

রবিবার ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্স বনাম রাজস্থানের ম্যাচের আগে টিম বাসে জানলার পাশের সিটে বসা বৈভব। কানে এয়ারপড। দৃষ্টি সামনে নিবদ্ধ। কাচ ভেদ করে আসা শেষ বিকেলের আলোয় একটা চলন্ত সিল্যুয়েট তৈরি হয়েছে। বিহারের সমস্তিপুরের গ্রাম থেকে এসে বিশ্বের ধনীতম ক্রিকেট লিগে মাত্র ১৪ বছর বয়সে দ্রুততম সেঞ্চুরি করে নিজের আবির্ভাবের বার্তা। বাহাত্তর ঘন্টার মধ্যে স্বর্গ থেকে পতন। ইডেন গার্ডেন্সে পরীক্ষায় ফেল। ১৪ বছরের বালক বায়নায় বাবা-মা আর কোচ ইডেনে হাজির। বৈভব হতাশ করল ইডেনকেও। সাংবাদিক দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিলেন বৈভবের মা। বাবা আবশ্য বলে বসলেন ‘‌মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে।’‌ টিম বাসের জানালার ধারে বসা ছায়া-ছায়া সেই অবয়ব ভেদ করে ইডেনেই বালকবীরের অভ্যুত্থান ঘটে যাওয়ার দৃশ্য দেখা হল না ক্রিকেটের মক্কাবাসীর।

কেকেআরেরই জেতা উচিত ছিল, ম্যাচ শেষে বলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। ম্যাচের পর দুই এককালীন সতীর্থের মিলনের সাক্ষী থাকে ইডেন। মাঠে দাঁড়িয়ে রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলতে দেখা যায় সৌরভকে। নেন বৈভব সূর্যবংশীর ক্লাসও। ১৪ বছরের বালককে দেন ক্রিকেটের পাঠ। দু’জনেই বাঁ হাতি। ব্যাট ধরে বৈভবকে স্ট্যান্স দেখিয়ে দেন সৌরভ। উঠতি তারকাকে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক। ইডেনে কলকাতা নাইট রাইডার্সের খেলা দেখে অভিভূত ইংল্যান্ড ফুটবল দলের কোচ গ্যারেথ সাউথগেট। হ্যারি কেনদের প্রাক্তন কোচ সাউথগেট বলেন, ‘‌ইডেনে খেলা দেখে খুবই ভাল লাগছে। ম্যাচটা উপভোগ করেছি।’‌ জোড়া জয়ে আইপিএলের প্লে অফের সম্ভাবনা জিইয়ে রেখেছে কেকেআর। শাহরুখ খান না এলেও, ছিলেন জুহি চাওলা। দলের জয় উপভোগ করেন। ইডেনে ছাড়ার সময় জুহি বলেন, ‘‌ভাগ্যিস জিতেছে। ভাল খেলেছে। মাঝে রাজস্থানও ভাল খেলেছে। শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করেছে। ম্যাচটাকে শেষ বল পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছে। দুটো দলই ভাল খেলেছে। আমাদের সমর্থন করার জন্য সাপোর্টারদের ধন্যবাদ। ওরা আমাদের সাহস জোগায়। তার জন্য ধন্যবাদ।’‌ রান পায়নি ১৪ বছরের ‘বিস্ময় প্রতিভা’ বৈভব সূর্যবংশী। ২ বলে মাত্র ৪ রান করে ডাগআউটে ফিরে যেতে হয়েছিল। সাহসী ব্যাটিং মোহিত করেছে ক্রিকেট মহলকে এমনকি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়েরও। রবিবার ম্যাচের পর বিহারের এই ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা করলেন টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক। বৈভবকে বেশ কিছু পরামর্শ দেন। বৈভবকে সৌরভ বলেন, “তোমার খেলা দেখেছি। যেভাবে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলো, সেভাবেই খেলতে থাকো। খেলা পরিবর্তন করার দরকার নেই।” বৈভবকে স্ট্যান্সও দেখিয়ে দিয়েছেন সৌরভ। বৈভব প্রসঙ্গে সৌরভ গাঙ্গুলি বলেন, “বেশ ভারী ব্যাট নিয়ে খেলে বৈভব। ওর হাতে বেশ ভালো পাওয়ার রয়েছে। কেকেআর ম্যাচে রান না পেলেও বৈভব কিন্তু খুবই ভালো ক্রিকেটার।” আইপিএলে এত কম বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড আর কারওর নেই। ইউসুফ পাঠানকে টপকে আইপিএলে ভারতীয়দের মধ্যে দ্রুততম শতরান করেছে বিহারের এই ক্রিকেটার। গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে ৩৫ বলে সাহসী সেঞ্চুরি তো এখনও চর্চার বিষয়। এহেন বৈভবকে খেলানোর পিছনে রাজস্থান কোচ রাহুল দ্রাবিড়ের ভূমিকা অনেকটাই। সেই বিস্ময় প্রতিভা এবার প্রশংসা পেলেন সৌরভের কাছ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে তাঁকে ভারতীয় দলে দেখা গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles