Saturday, July 4, 2026

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ক্রিকেটার গড়ার কারখানার নাম এলআরএস বাংলা স্পোর্টস অ্যাকাডেমি!‌লক্ষ্মীরতন নিজের কাজে মেতে সকাল থেকে, শুধু বলেন কভি আলবিদা না ক্যহেনা.‌.‌.‌

লক্ষ্মীরতন শুক্লা। বাংলা ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র। রবিবাসরীয় সকালে চনমনে মেজাজে। মেতে উঠেছেন কচিকাঁচাদের নিয়েই। রবি সকাল থেকেই নিজের ক্রিকেটার তৈরীর পাঠশালায় ব্যস্ত। কখনও ব্যাট হাতে। কখনও বা বল হাতে। একের পর এক টেকনিক শেখাচ্ছেন খুদে শিক্ষার্থীদের। নিজে হাতে করে গড়ে তুলতে চাইছেন ক্রিকেটারদের। এলআরএস বাংলা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি থেকেই তো উঠে এসেছেন বিশ্বকাপ খেলা ক্রিকেটার। বাংলা তথা ভারতীয় ক্রিকেটের সাপ্লাই লাইন বললে ভুল হবে না। লক্ষ্মীরতন শুক্লা ক্রিকেট অ্যাকাডেমি। হাওড়া ডুমুরজলায় অবস্থিত অ্যাকাডেমিতে গেলেই দেখা যাবে সবুজ গালিচার উপর ফুটেছে হরেক রকমের সাদা ও নীল ফুল। কারণ এখানেই ছুটে বেড়ায় সাদা ও কেউ কেউ নীল জার্সি পরিহিত অনেক অনেক প্রতিভা। ‌‌

অতিমানব বললে ভুল হবে না। নতুন কিছু গড়ার ইচ্ছাতেই মজে থাকতে পছন্দ করেন। শুধুমাত্র ক্রিকেটার নন, একজন ভালো মানুষের বলিষ্ঠ উদাহরণ লক্ষ্মীরতন শুক্লা। বাংলা ক্রিকেটের আইকননি। প্রথমে ক্রিকেটার। তারপর প্রশিক্ষক। জাতীয় দলে খেলার সুযোগ খুব একটা না হলেও বাংলার ক্রিকেটে লক্ষ্মীরতনের অবদান অসামান্য। লক্ষ্মীরতন শুক্লার জন্ম হাওড়ায়। আবির্ভাব ১৯৮১ সালের ৬ই মে। শ্রী হনুমান জুট মিল হিন্দি উচ্চ বিদ্যালয় এবং লিলুয়ার ডন বসকো হাই অ্যান্ড টেকনিক্যাল স্কুলে পড়াশোনা। পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ না থাকলেও ক্রিকেটে মশগুল ছিলেন সেদিনের ছোট্ট লক্ষ্মী।

কাকভোরে ঘুম থেকে উঠেই দৌড়। বাড়ি থেকে বেশ খানিক দূরে। গন্ত্যব্য সালকিয়া জটাধারী পার্কের মাঠ। চলত জোর কদমে অনুশীলন। ১৯৯৭-‌৯৮ সালে লক্ষ্মীর বয়স মাত্র সতেরো। দুর্দান্ত প্রতিভার বিচ্ছুরণ। রঞ্জি ট্রফিতে নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার এমটিএন যুব বিশ্বকাপে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দক্ষতার নিরিখে শীর্ষস্থান অর্জন। জীবনের প্রথম একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ খেলেন শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। ২২ মার্চ ১৯৯৯ সালে লক্ষ্মীরতন শুক্লার ভারতীয় ক্রিকেট দলে অন্তর্ভুক্তি। সেই ম্যাচে চার ওভার বল করে ৩২ রান দেন। কালের অমোঘ বিচারে পরবর্তীকালে মাত্র দুটি একদিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ।

বাংলা দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে উইলস ট্রফির সেমিফাইনালে পৌঁছেছিলেন। দিল্লির বিরুদ্ধে উইলস ট্রফির সেমিফাইনালে বাংলার ওপেনার হিসাবে সেঞ্চুরিও হাঁকিয়েছিলেন। কোকাকোলা সিঙ্গাপুর চ্যালেঞ্জে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ভালো পারফরমেন্স সত্ত্বেও নির্বাচকরা লক্ষ্মীকে উপেক্ষা করেন। সেই বছরে বোলার হিসাবে আর সুযোগ পান নি। কারণ, ভারতীয় সিনিয়র দলে জহির খান ও আশিস নেহরার মতো তরুণ পেস বোলারদের উপস্থিতি। শুক্লা অলরাউন্ডার হিসাবে দক্ষতার চুড়ান্ত পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচকরা সঞ্জয় বাঙ্গার, হৃষিকেশ কণিতকর এবং ইরফান পাঠানের মতো খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিন দলে সুযোগ করে দেন। প্রথমে আইসিএল চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারও হন।

এরপর লক্ষ্মীরতন শুক্লার বাংলার অধিনায়ক হিসাবে যাত্রা শুরু। আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত খেলেন। ২০১২র চ্যাম্পিয়ান কলকাতা দলের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকায় ছিলেন। ২০১৪ সালে দিল্লি ডেয়ারডেভিলসে ও ২০১৫ এ সানরাইজার্স হায়াদ্রাবাদে খেলেছিলেন। লক্ষ্মীরতন শুক্লাকে জুনিয়র কপিল দেব হিসাবে অভিহিত করা হত। জুনিয়র স্তরের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড় লক্ষ্মীরতন শুক্লা আন্তজার্তিক ক্রিকেট জগতে ফিরে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তরুণ ক্রিকেটারের পক্ষে সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। বিজয় হাজারে ট্রফি ২০১২ দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বাংলার ক্রিকেট জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র লক্ষ্মীরতন শুক্লা। বাংলা প্রথম “বিজয় হাজারে ট্রফি’ জেতে ২০১২ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বে এবং লক্ষ্মীরতন শুক্লার দুর্দান্ত অবদানের জন্য। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ঝাড়খণ্ডের বিরুদ্ধে গ্রুপ স্টেজ ম্যাচে ৯৬ বলে ১৫১ রান করেন ১৬টি চার ও ৮ টি ছক্কায়।

যাদবপুর ইউনিভার্সিটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে ৩৭ রানে চারটি উইকেট নিয়েছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে সাঁইত্রিশ রানে দুই উইকেট নেন। সেমিফাইনালে পাঞ্জাবের সর্বোচ্চ স্কোরার মনদীপ সিংয়ের উইকেট নেন লক্ষ্মীরতনই। ফাইনালে অধিনায়ক অজিত আগরকারের মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে ৩৮ রানে চার উইকেট তুলে নিয়ে ২৪৮ রানে মুম্বাইকে অলআউট করেন। ব্যাট হাতে অনুষ্টুপ মজুমদারের সঙ্গে জুটি বেঁধে ৮৩ বলে ১০৭ রানে অপাজিত ছিলেন লক্ষ্মীরতন শুক্লা। তেইশ বল বাকি থাকতেই বিজয় হাজারে ট্রফি জেতে বাংলা। বিজয় হাজারে ট্রফি ২০১২-তে অলরাউন্ডার হিসাবে অনবদ্য সাফল্যের পর ‘বিজয় হাজারে ট্রফি ২০১৩’-র বাংলার অধিনায়ক নির্বাচিত হন। ৩৪ রানে ৫ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু। ওড়িশাকে ১৭৫ রানে থমকে দিয়ে ১১ রানে ম্যাচ জেতে বাংলা।

জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির প্রশিক্ষক হিসাবেও বেছে নেওয়া হয় এল আরকে। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান এবং উত্তর হাওড়া থেকে প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দিতা করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী সন্তোষ কুমার পাঠককে পরাজিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারে রাজ্য ক্রীড়া ও যুবকল্যান দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। ব্যক্তিগত কারণবশত ২০২১ সালের ৫ই জানুয়ারী মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

ক্রিকেট ছাড়া এক মূহুর্তও থাকতে পারেন না। নিজের হাতে তৈরী সম্পূর্ণ নিখরচার অ্যাকাডেমিতে ক্রিকেটার গড়ার কাজে মনোনিবেশ। শহরতলী হাওড়ার বুকে নিখরচায় ক্রিকেট প্রশিক্ষন। সবুজ গালিচায় ঢাকা একদা রুক্ষ বর্গাকার ক্ষেত্রে এখন শিক্ষানবিশদের হাতে ব্যাটবলের ঠকঠকানি শোনা যায়। কারিগর রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ক্রিকেটার কোচ লক্ষীরতন শুক্লা। তাঁরই হাতের স্পর্শে উঠতি তারকা ভারতীয় অনূর্দ্ধ ১৯ বিশ্বচ্যাম্পিয়ান দলের উইকেটরক্ষক হৃষিতা বাসু। জাতীয় দলের রিচা ঘোষ, দীপ্তি শর্মারাও দৌড়ে আসেন লক্ষ্মীর অ্যাকাডেমিতে। তাই তো বাংলা দলের কোচের ব্যাটন তাঁরই হাতে। প্রথম বার কোচের দায়িত্ব পেয়েই দলকে পৌঁছে দেন চ্যাম্পিয়ানের লক্ষ্যে। ফাইনালে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। বাংলা ক্রিকেটে লক্ষ্মীরতনের অবদান কখনও মাপা যাবে না। সর্বক্ষেত্রেই সাফল্যের শীর্ষে তিনি। বাংলার কিংবদন্তি ক্রিকেটার, সুদক্ষ কোচ, স্বচ্ছতায় পরিপূর্ণ রাজনীতিক ও মন্ত্রীও ছিলেন। অসাধারন কন্ঠশিল্পী, সুদক্ষ লেখক সবশেষে তিনি দক্ষ কমেনটেটরও।

জাতীয় ক্রিকেট একাডেমির প্রশিক্ষক হিসাবেও বেছে নেওয়া হয় এল আরকে। রাজনীতিতে আসার পর ক্রীড়া ও যুবকল্যান দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। ব্যক্তিগত কারণবশত ২০২১ সালের ৫ই জানুয়ারী মন্ত্রীত্ব থেকে পদত্যাগ করেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৬ হাজার রান ও আড়াইশো উইকেটের মালিক। তিনি বর্তমান বাংলা ক্রিকেটের হেড স্যর। এককথায় বহুমূল্যবান রত্ন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লক্ষ্মীরতন শুক্লা।
কাজে মেতে থাকতে পছন্দ করেন। ক্রিকেট সম্বলিত কাজে কখন বিলম্বিত থাকা পছন্দ করেন না। কাজকে বিদায় তো দূর অস্ত, তাই লক্ষ্মী বলেন-‌ কভি আলবিদা না ক্যহেনা, কভি আলবিদা না ক্যহেনা.‌.‌.‌

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles