RK NEWZ বিকেল ৪টে ২০ নাগাদ কলেজ স্ট্রিট থেকে মিছিল যাত্রা শুরু করে। কোনও ট্রাকে বা হুডখোলা গাড়িতে নয়, কলেজ স্কোয়্যার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত হেঁটেই যাত্রা শুরু করেন নিতিন। এক পাশে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অন্য পাশে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। যন্তর মন্তরের আন্দোলনের দাবি মেনে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দিতে বাধ্য হওয়ার পর থেকেই ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবং বিরোধী শিবির ‘রাস্তার লড়াই’য়ে বেশি করে আস্থা দেখাতে শুরু করেছে। কখনও মুম্বই, কখনও বেঙ্গালুরু, কখনও দিল্লি— দেশের নানা প্রান্তে জমায়েতের ডাক দেওয়া শুরু হয়েছে। তাই গোটা দেশে পাল্টা পথে নামা শুরু করেছে বিজেপি-ও। কর্মসূচির পোশাকি নাম ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’। আসল লক্ষ্য, বিরোধী শিবিরের জমায়েতগুলিকে আকার-আয়তনে পিছনে ফেলে পাল্টা শক্তি প্রদর্শন করা। কলকাতায় সোমবার সেই কর্মসূচিতেই অংশ নিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। বিরাট মিছিলে শক্তিপ্রদর্শনের পরে ধর্মতলার মঞ্চ থেকে রাহুল গাঁধী, গাঁধী পরিবার এবং কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ করলেন। ‘গণতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ কর্মসূচির আওতায় বিজেপি প্রথম দফায় পশ্চিমবঙ্গে পাঁচটি বড় মিছিলের ডাক দিয়েছে। প্রথম মিছিলটি হল কলকাতায়। এর পরে হাওড়া, শিলিগুড়ি, কৃষ্ণনগর, দুর্গাপুরেও মিছিল হবে। তবে সোমবার কলকাতাতেই বিজেপি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিরোধী শিবিরের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে এই কর্মসূচি পাল্টা শক্তি প্রদর্শন। কলকাতার পাশাপাশি শহরতলি এবং দুই ২৪ পরগনার বিজেপি কর্মীদের ডাকা হয়েছিল সোমবারের মিছিলে। কলেজ স্কোয়্যার ছিল জমায়েত স্থল। তার জেরে দুপুর ২টো থেকেই মধ্য কলকাতার বিভিন্ন রাস্তাঘাটে যান চলাচল বন্ধ হতে শুরু করে। কলেজ স্ট্রিট এবং বিধান সরণি জুড়ে বিজেপি কর্মীরা জমা হতে শুরু করেছিলেন। ফলে সে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ তো ছিলই। কলেজ স্ট্রিটের দিকে যাওয়া বিভিন্ন রাস্তার মুখেও পুলিশ ব্যারিকেড লাগিয়ে দিয়েছিল। বাঁশের ব্যারিকেডে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল মিছিলের যাত্রাপথের দু’ধারের ফুটপাথ। আর জেলা থেকে বিজেপি কর্মীদের কলকাতায় নিয়ে আসা বাসগুলির সারিতে ক্রমশ ভরে উঠতে শুরু করেছিল চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের দু’পাশ। বেলা ৩টেয় মিছিল শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিহারের ভাগলপুরে মিছিল সেরে কলকাতায় আসতে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিনের বেশ কিছুটা দেরি হয়। বিকেল ৪টে ২০ মিনিট নাগাদ কলেজ স্ট্রিট থেকে মিছিল যাত্রা শুরু করে। কোনও ট্রাকে বা হুডখোলা গাড়িতে নয়, কলেজ স্কোয়্যার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত হেঁটেই যাত্রা শুরু করেন নিতিন। এক পাশে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, অন্য পাশে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনে কলকাতায় এত বড় জমায়েত এবং মিছিলের জেরে ট্র্যাফিকের হাঁসফাঁস অবস্থা হতে পারে, সে কথা বিজেপি নেতৃত্বের অজানা সম্ভবত ছিল না। কিন্তু বিরোধী শিবিরের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে শক্তি প্রদর্শনই যেহেতু লক্ষ্য, সেহেতু কাজের দিনে জমজমাট কলকাতাকে সাক্ষী রেখেই তা করা হল। তবে ‘শক্তি প্রদর্শন’ তত্ত্ব পুরোপুরি মানতে চাননি বিজেপি নেতৃত্ব। রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক তথা পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিংহ মাহাতোর কথায়, ‘‘কোনও শক্তি প্রদর্শন এটা নয়। গণতন্ত্র বাঁচানোর জন্য সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। আমরা শক্তি প্রদর্শন যে দিন করব, সে দিন ককরোচ, ছারপোকা কাউকে দেখা যাবে না। তারা সে দিন হয়তো বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে বিরিয়ানি খাবে, ভারতে নয়।’’ বিজেপির মিছিল ধর্মতলায় পৌঁছোনোর পরে সংক্ষিপ্ত সভাও হয়। এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের পাঁচ নম্বর প্রবেশপথের সামনে তৈরি হয়েছিল মঞ্চ। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক মাত্র মিনিটখানেকের জন্য বলতে ওঠেন। সর্বভারতীয় সভাপতি বলবেন, তাই তিনি ভাষণ দীর্ঘায়িত করবেন না বলে শমীক জানান। তাঁর পরে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘‘ভাগলপুরের কর্মসূচির কারণে আমাদের সর্বভারতীয় সভাপতি দু’ঘণ্টা দেরিতে এসেছেন। তা সত্ত্বেও রাস্তা জুড়ে বিপুল উৎসাহ দেখা গিয়েছে। প্রত্যেকটা বাড়ি থেকে, দোকান থেকে, গোটা কলকাতা মহানগর আজ সর্বভারতীয় সভাপতিকে স্বাগত জানিয়েছে বন্দে মাতরম স্লোগান দিয়ে।’’ ধর্মতলার মঞ্চ থেকে শুভেন্দুর আক্রমণের লক্ষ্য ছিল ‘দিমাগি নকশাল, জিহাদি, জঙ্গি, মাওবাদী, পরিবারবাদী, আরশোলা, ছোরপোকা’ ইত্যাদি। তবে নিতিনের মূল নিশানা ছিল কংগ্রেসের দিকে। তাঁর ভাষণ জুড়ে সোমবার শোনা গিয়েছে রাহুল গাঁধী এবং গাঁধী পরিবারের বিরুদ্ধে তোপধ্বনি। কংগ্রেসকে আক্রমণ করে নিতিন বলেন, ‘‘ওঁরা পুরো দেশে অরাজকতা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন, দেশের সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে আঘাত করার চেষ্টা করছেন।’’ নিতিনের কথায়, ‘‘জনতা ওদের (কংগ্রেসকে) প্রত্যাখ্যান করেছে। জনতার বিষয় নিয়ে লড়লে জনতা প্রত্যাখ্যান করত না। গত পঞ্চাশ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের জনতা ওঁদের নাম নিচ্ছে না। এই অবস্থা চললে গোটা দেশেও ওদের এই পরিস্থিতি হবে।’’ এতেই থামেননি নিতিন। তিনি বলেন, ‘‘নিজেদের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার বদলে বিদেশি শক্তির টুলকিট হয়ে রাহুল গাঁধী কাজ করছেন।’’ রাহুলকে ‘বিদেশি শক্তির টুলকিট’ আখ্যা তিনি কেন দিলেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি। তিনি বলেন, ‘‘আমি যখন এ কথা বলি, তখন এই কারণে বলি যে, যারা বাংলাদেশকে অস্থির করেছিল, যারা নেপালকে অস্থির করেছিল, এঁদের সহানুভূতি তাদের প্রতি। এই রকম সব শক্তি, যারা অসামাজিক তত্ত্বকে উৎসাহ দেয়, যারা পুরোপুরি নেতিবাচক কাজে এগোয়, তাদের প্রতি রাহুল গাঁধী আর কংগ্রেসের সহানুভূতি থাকে।’’
বিজেপি সভাপতির ভাষণে হুঁশিয়ারির সুরও শোনা গিয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘‘আপনারা যদি ভাবেন, ভারতকে অস্থির করবেন, যদি ভাবেন ইউরোপকে যারা অস্থির করছে, বাংলাদেশকে বা নেপালকে যারা অস্থির করছে, তাদের টুলকিট হয়ে আপনারা কাজ করবেন, তা হলে জেনে নিন, ভারতের গণতন্ত্র অনেক শক্তিশালী, একে ধাক্কা দেওয়ার শক্তি আপনাদের নেই।’’ রাহুলের উদ্দেশে নিতিনের মন্তব্য, ‘‘আমি স্পষ্ট বলছি, আপনাদের পূর্বপুরুষেরা যত বার সে চেষ্টা করেছেন, তত বার দেশের জনতা আপনাদের শিক্ষা দিয়েছে। রাহুল গাঁধী, আপনার না দূরদৃষ্টি রয়েছে, না উন্নয়নের ভাবনা রয়েছে। রাজনীতিতে যে বিবেক, যে শুচিতা থাকা জরুরি, আপনার কথায় তা-ও দেখা যায় না।’’ বিজেপি সভাপতির কটাক্ষ, ‘‘যে ভাবে রাহুল গাঁধী চলছেন, তাতে কংগ্রেসকে পুরোপুরি ধ্বংস করার কৃতিত্বও রাহুলেরই হবে।’’




