RK NEWZ নারকীয় স্মৃতি আজও দগদগে। আরজি কর হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের সেই মর্মান্তিক ঘটনা, যা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তা নিয়ে মঙ্গলবার রাজ্য বিধানসভায় দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছাড়লেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দুর্নীতি, অপশাসন এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি স্পষ্ট করে তিনি জানিয়ে দিলেন, আরজি কর কাণ্ডের বিচার হবেই এবং অপরাধের সমস্ত হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হবে। এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর মুখে মেয়ের নাম এবং বিচারের আশ্বাস শুনে গ্যালারিতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন নির্যাতিতার মা তথা বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। বিধানসভায় নিজের জবাবি ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, রাজ্যে নারী নির্যাতন রুখতে এবং অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিতে সরকার নতুন আইন আনার কথা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, “নারীদের ওপর হওয়া সমস্ত অত্যাচারের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচারের স্বার্থে আমরা ইতিমধ্যেই দু’টি বিশেষ কমিশন গঠন করেছি, যা রাজ্য ক্যাবিনেটের অনুমোদনও পেয়েছে।” তৃণমূল জমানার একাধিক বিতর্কিত ঘটনার কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু জোরের সঙ্গে বলেন, “আরজি করের প্রকৃত বিচার হবে। অভয়ার বিচার ছিনিয়ে আনতেই বাংলার মানুষ এই সরকারকে জিতিয়ে এনেছে। ইতিমধ্যেই ৩ জন আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করা হয়েছে, বাকি যতটুকু আবর্জনা রয়েছে তা-ও পুরোপুরি পরিষ্কার করা হবে। শুধু অভয়া নয়, তামান্নার মা-ও বিচার পাবেন, বিচার পাবে রামপুরহাটের আদিবাসী কন্যার পরিবারও। কামদুনি, হাঁসখালি কিংবা কসবা ল’ কলেজের মতো সমস্ত ঘটনায় সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে চলবে।” রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পরই নতুন সরকারের নির্দেশে ধুলো ঝেড়ে নতুন করে খোলা হয়েছে ‘আরজি কর ফাইলস’। এই মামলার তদন্তে এবার নজিরবিহীন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। মাসখানেক আগেই মুখ্যমন্ত্রী কলকাতা পুলিশের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল-সহ ৩ জন শীর্ষ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর জেরার মুখে পড়েছেন আইপিএস ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্ত। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই এই দুই পুলিশ অফিসারের বয়ান রেকর্ড করেছেন। একই সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তৎকালীন সিপি বিনীত গোয়েলকেও তলব করেছিল সিবিআই, যদিও তিনি হাজিরা এড়িয়ে গিয়েছেন। ঘটনার নেপথ্য সূত্র খুঁজতে এবার সরাসরি ঘটনাস্থল ও তার পারিপার্শ্বিক এলাকায় সক্রিয়তা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। সম্প্রতি পানিহাটি শ্মশানে হানা দেন সিবিআই-এর বিশেষ তদন্তকারী দলের ৪ জন সদস্য। আরজি কর কাণ্ডের দিন ঠিক কী ঘটেছিল তা খতিয়ে দেখতে পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ এবং তৃণমূল পরিচালিত পানিহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান সোমনাথ দে-কে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন সিবিআই আধিকারিকেরা।
চলতি বিধানসভা অধিবেশনের শেষ দিনেই তাঁর সরকার একটি অত্যন্ত কঠোর ও নতুন বিল আনতে চলেছে, যার মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা হবে। হরিশ চ্যাটার্জি রোডের ‘রাজপ্রাসাদে’ কলকাতার ফুটপাথ ও উড়ালপুলের নীচে থাকা গরিব মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। একটি অত্যন্ত কঠোর ও নতুন বিল আনতে চলেছে, যার মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্পত্তি সরাসরি বাজেয়াপ্ত করা হবে। শুধু তাই নয়, সুর চড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, হরিশ চ্যাটার্জি রোডের ‘রাজপ্রাসাদে’ কলকাতার ফুটপাথ ও উড়ালপুলের নীচে থাকা গরিব মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে। দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে তাঁর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা ফের একবার স্পষ্ট করে মনে করিয়ে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “রাজ্যে দুর্নীতি রোধ করতে আমাদের সরকার আরও কড়া ও যুগান্তকারী আইন আনছে। এই নতুন আইন একবার কার্যকর হয়ে গেলে দুর্নীতি করে আর পার পাওয়া যাবে না। দোষীদের শুধু জেলেই পচতে হবে না, বরং দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত সমস্ত টাকা এবং দুর্নীতিকারীর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারি স্তরে বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তা জনসমক্ষে নিলাম করা হবে।” নিজের এই বক্তব্যের মাধ্যমে নাম না করে ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানার একাধিক বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কটাক্ষ করে বলেন, “অনেকেই হয়তো ভাবছেন যে বড়সড় দুর্নীতি করে বড়জোর দু’মাস বা চার মাস জেলে থাকবেন, তার পর আইনের ফাঁকফোকর গলে বা আইনি লড়াই করে আবার জেল থেকে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে যাবেন! সেই দিন এবার ফুরিয়েছে। এ বার আমরা শুধু জেলেই পাঠাব না, আইন মেনে সরাসরি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব এবং সেই সম্পত্তি নিলাম করে সাধারণ মানুষের টাকা ফিরিয়ে দেব।” আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “হরিশ চ্যাটার্জি রোড, হরিশ মুখার্জি রোড-সহ আমতলার যে সমস্ত বিশাল বিশাল রাজপ্রাসাদ গড়ে উঠেছে, আইন মেনে সেগুলিকে অধিগ্রহণ করে কলকাতার বিভিন্ন উড়ালপুলের নীচে কিংবা ফুটপাথে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটানো মানুষদের স্থায়ী থাকার বন্দোবস্ত এই সরকার করবে।” রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, হরিশ চ্যাটার্জি রোডের কথা বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি এবং ‘আমতলার প্রাসাদ’ শব্দের মাধ্যমে সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিস ও বাসভবনকেই নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী এদিন তাঁর বক্তৃতায় সাফ জানান, “যা এখানে বলছি তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আপনারা আন্দাজও করতে পারবেন না কীরকম বেপরোয়া ভাবে চুরি ও লুঠ হয়েছে।” নিজের দাবির সপক্ষে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, বীরভূমের পাথর খাদান থেকে আগের জমানায় বছরে যেখানে মাত্র ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই তা বেড়ে ৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই রাজস্ব ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ছুঁয়ে ফেলবে। আর এই হিসাব কষেই মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করতে চান যে, প্রতি বছর বাকি ১১০০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সোজা পৌঁছে যেত ক্যামাক স্ট্রিট ও দুবাইয়ে।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিরোধী শিবিরের এই চরম রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য সরকার কোনওভাবেই দায়ী নয়। “আপনাদের এই দৈন্যদশার জন্য আমরা দায়ী না। আপনারা নিজেরাই দায়ী। আপনাকে আমি বলব, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহা অভিযোগ করেছিলেন এবং পুলিশ সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে। আপনারা যদি এখন ওঁদের বিরুদ্ধে কোনও চুরি, দুর্নীতি, ত্রিপল লুকিয়ে রাখা কিংবা অবৈধ সম্পত্তি বানানোর সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়ে থাকেন, তবে তা লিখিতভাবে দিন। আমরা ব্যবস্থা নেব, কথা দিলাম।” শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা করার পক্ষে একটি অভ্যন্তরীণ প্রস্তাব নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। দলের বিধায়কদের স্বাক্ষর সম্বলিত সেই প্রস্তাব যখন বিধানসভার দফতরে জমা দেওয়া হয়, তখনই ঘটে বিপত্তি। সেখানে কয়েকজন তৃণমূল বিধায়কের সই দেখে বিধানসভার আধিকারিকদের মনে তীব্র সন্দেহ জাগে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বিধানসভার সচিবের তরফে কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি আনুষ্ঠানিক জালিয়াতির অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এই জালিয়াতি মামলার তদন্ত যত এগিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘কালীঘাট-তৃণমূল’-এর সঙ্গে ঋতব্রতদের দূরত্ব ততই চরমে পৌঁছেছে। দলীয় শীর্ষ নেতৃত্ব তড়িঘড়ি ঋতব্রত ও সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কার করলেও ভাঙন আটকানো যায়নি। উল্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে গড়া দল আড়াআড়ি ভেঙে তৈরি হয় ‘নতুন তৃণমূল’। প্রথম পর্বেই তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে সমর্থন জানান এবং দলের ডেপুটি লিডার হন সন্দীপন সাহা। পরবর্তীতে আরও বেশ কয়েকজন বিধায়ক তাঁদের শিবিরে শামিল হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এই ক্ষমতার অলিন্দে ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে কালীঘাট শিবির। কারণ, তৃণমূলের একটা বড় অংশের রাশ এখন সম্পূর্ণ ঋতব্রতদের নিয়ন্ত্রণে। ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাসের মতো একদা মমতার পরম বিশ্বস্ত ও ছায়াসঙ্গী হেভিওয়েট নেতারা ইতিমধ্যেই সরাসরি বিদ্রোহীদের শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। কালীঘাটের এই ক্ষয়িষ্ণু দুর্গে নতুন ধাক্কাটি লেগেছে মঙ্গলবার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক এদিন সরাসরি দেখা করেছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ফলে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, জ্যোতিপ্রিয়র এবার দলবদলের মানসিক প্রস্তুতি সেরে ফেলেছেন।




