Tuesday, June 23, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

দোষীদের জেল, দুর্নীতিকারীর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে নিলাম করা হবে!‌ যুবরাজের পাথরচুরি! বছরে ১১০০ কোটি ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে দুবাই : শুভেন্দু

RK NEWZ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানার দুর্নীতির কফিন খুলবেন শুভেন্দু। বীরভূমের পাথর খাদান থেকে বেআইনিভাবে পাথর পাচার করে কীভাবে বছরে প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা লুঠ হয়ে ‘ক্যামাক স্ট্রিট’ হয়ে সরাসরি দুবাইয়ে চলে গেছে, এদিন বিধানসভায় তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দেন শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভায় তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় পূর্বতন সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একের পর এক চাঞ্চল্যকর পর্দা ফাঁস করেন তিনি। বাণিজ্য সম্মেলনের নামে ৩২৪ কোটি টাকা একটি বণিকসভাকে দেওয়া থেকে শুরু করে সামাজিক প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠের খতিয়ান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে তাঁর বক্তৃতার সবচেয়ে বড় ‘বোমা’ ছিল তৃণমূলের ‘যুবরাজ’ এবং বীরভূমের পাথর খাদান কেলেঙ্কারি নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন তাঁর বক্তৃতায় সাফ জানান, “যা এখানে বলছি তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র। আপনারা আন্দাজও করতে পারবেন না কীরকম বেপরোয়া ভাবে চুরি ও লুঠ হয়েছে।” নিজের দাবির সপক্ষে তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, বীরভূমের পাথর খাদান থেকে আগের জমানায় বছরে যেখানে মাত্র ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আসত, সেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই তা বেড়ে ৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই রাজস্ব ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ছুঁয়ে ফেলবে। আর এই হিসাব কষেই মুখ্যমন্ত্রী প্রমাণ করতে চান যে, প্রতি বছর বাকি ১১০০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সোজা পৌঁছে যেত ক্যামাক স্ট্রিট ও দুবাইয়ে। এই যুবরাজের নাম কী, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি মুখ্যমন্ত্রী। পাথর কেলেঙ্কারির পাশাপাশি এদিন আই-প্যাক (I-PAC)-এর প্রসঙ্গও টেনে আনেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্বতন সরকারের সব দফতর থেকেই চুরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের এক ঠিকাদার কাকদ্বীপের স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অ্যাকাউন্ট থেকে সরাসরি আই-প্যাকের অ্যাকাউন্টে ১০ কোটি টাকা ট্রান্সফার করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এই সব কিছুরই তদন্ত হবে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বড় প্রমাণ হিসেবে ‘লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের তথ্য সামনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, লক্ষ্ণীর ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, ভুয়ো নামের আড়ালে বছরে ৫৪০০ কোটি টাকা শুধু এই একটি প্রকল্প থেকেই লুঠ করা হয়েছে। নবান্নের চোদ্দ তলা সব জেনেবুঝেই এই বিপুল পরিমাণ গরিবের টাকা ও সাধারণ মানুষের করের টাকা লুঠ হতে দিয়েছে বলে তোপ দাগেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যারা চুরি করেছে তাদের একজনও পার পাবে না। সরকার অত্যন্ত কঠোর আইন আনছে এবং প্রয়োজনে দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে চুরির টাকা আদায় করা হবে।

শুভেন্দু আবার জানিয়ে দেন, তাঁর সরকার দুর্নীতি বরদাস্ত করবে না। তিনি বলেন, ‘‘অনেকেই ভাবছেন, দু’মাস জেলে থাকলাম, তার পর আইনি লড়াই করে জেল থেকে বেরিয়ে এলাম! তাঁদের মনে রাখতে হবে, এ বার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করব। সম্পত্তি নিলাম করব।’’ এখানেই থামেননি তিনি। সুর চড়িয়ে আরও বলেন, ‘‘হরিশ চ্যাটার্জি, হরিশ মুখার্জি রোড-সহ আমতলার প্রাসাদগুলিতে কলকাতায় উড়ালপুলের নীচে থাকা মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করব।’’ অনেকের মতে, তিনি নাম না-করে অভিষেককে খোঁচা দিয়েছেন। ভাষণ দিতে গিয়ে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আগাগোড়া আক্রমণাত্মক। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান, শওকল মোল্লাদের কোনও ভাবে ছাড় দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্তের প্রসঙ্গও। সব্যসাচীর সোনা-কেনা প্রসঙ্গ নিয়ে বলেন, ‘‘সমস্ত সোনা কেনা হয়েছে ২০২১ সালের পরে।’’ প্রসঙ্গত, মঙ্গলবারই আদালতে পুলিশ জানিয়েছে, সব্যসাচীর মামলায় এখনও পর্যন্ত মোট ছ’কেজি সোনা বাজেয়াপ্ত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দেড় কেজি রুপো বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ও আদালতে জানিয়েছে পুলিশ। নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, আগের সরকারের আমলে বাণিজ্য সম্মেলনে ফিকিকে ৩২৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল নিয়ম বহির্ভূত ভাবে। তাঁর কথায়, ‘‘বিজিবিএস দেখবেন? সরকার ৩২৪.৭৩ কোটি টাকা ফিকি (ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডিস্ট্রি)-কে দিয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সই দেখবেন নাকি? ৩২৪ কোটি টাকা। এ তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র!’’ শুভেন্দুর প্রশ্ন, ‘‘আপনি কি এটা করতে পারেন?’’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘একটা কমিশন হয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং মেম্বার সেক্রেটারি, যাঁর নাম শুনলে অনেকেই আপনারা ভয় পান, এডিজি র‍্যাঙ্কের আইপিএস কে জয়রামনকে নিয়ে। যত চুরি করেছেন, মনরেগার চুরি, আবাসের চুরি, জল জীবন মিশনের চুরি, লক্ষ্মীর ভান্ডারের চুরি— যত চুরি করেছেন, এই কমিশনে অভিযোগ পড়বে এবং তাঁদের শ্রীঘরে যেতে হবে।’’ শুভেন্দু স্পষ্ট করেছেন, এ বার থেকে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনও ভাবেই পক্ষপাতদুষ্টতা থাকবে না, স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ করা হবে। কোনও রাজনীতিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। ইউপিএসসি-র মতো নিয়োগ হবে। বাজেটেও সে কথা জানিয়েছে সরকার। তার পরেই বাজেট নিয়ে বিরোধী দলের বিধায়ক কুণাল ঘোষের মন্তব্য নিয়ে পাল্টা কটাক্ষ করেছেন শুভেন্দু। কুণাল জানিয়েছিলেন, বাজেটে সরকারের ব্যয়ের কথা বলা হলেও আয়ের কথা স্পষ্ট করে বলা নেই। কেন্দ্রীয় সরকার-নির্ভর বাজেট হয়েছে।লদুর্নীতির প্রসঙ্গ বলতে গিয়ে শুভেন্দু নাম না-করে একহাত নিয়েছেন কুণালকেও। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘এই বাজেটে যে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে, তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করছেন, টাকা আসবে কোথা থেকে?’’ তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বীরভূমের পাথর খাদান থেকে মাসে আট কোটি করে বছরে প্রায় ১০০ কোটি রাজস্ব আসত আগের সরকারের কাছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম মাসেই ৮৩ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। যা দেখে তিনি মনে করছেন, মাসে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হতে পারে। তার পরেই অভিষেকের নাম না-করে ফের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘বছরে ১২০০ কোটি রাজস্বের মধ্যে ১০০ কোটি জমা পড়ত সরকারের ঘরে (আগের সরকারের আমলে)। বাকি ১১০০ কোটি টাকা ক্যামাক স্ট্রিট হয়ে চলে যেত দুবাই।’’ বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতকেও আক্রমণ করতে ছাড়েননি মুখ্যমন্ত্রী। তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘‘আপনার মস্তিষ্কে ডাল-ভাত, আর হৃদয়ে লেনিন-মাও জে দং।’’ মুখ্যমন্ত্রীর আগে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঋতব্রত সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নাম বদলের বিষয়টি তোলেন। পার্ক সার্কাসের সেভেন পয়েন্ট থেকে ডন বস্কো সার্কেল পর্যন্ত ৫০০ মিটার রাস্তা এত দিন সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ নামে পরিচিত ছিল। কলকাতা পুরসভার তরফে জানানো হয়েছে, এ বার থেকে ওই রাস্তার নাম পাল্টে হচ্ছে গোপাল মুখার্জি রোড। শুভেন্দু বিধানসভায় মঙ্গলবার সেই প্রসঙ্গে জানান, এই নাম কার নির্দেশে পরিবর্তন হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তবে যে সুরাবর্দিই হোন না কেন, সেই নাম থাকবে না। কলকাতায় কোনও মোগল, পঠানের নাম থাকবে না। বিরোধী দলনেতার প্রস্তাব মেনে প্রদীপ্তানন্দ মহারাজের (যিনি কার্তিক মহারাজ নামেই সমধিক পরিচিত) নেতৃত্বে নাম পুনর্বিবেচনার জন্য একটি কমিটি গড়ার কথাও জানান তিনি। তার পরেই ঋতব্রতকে উদ্দেশ্য করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আপনি বলছেন এখানে এই হচ্ছে, সেই হচ্ছে, বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি চিহ্ন মুছে দেওয়া হচ্ছে, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি আক্রান্ত হচ্ছে, সে কথা তো বলছেন না?’’ অনুপ্রবেশ রোধে নিজের সরকারের কড়া অবস্থানের কথা জানান শুভেন্দু। বিএসএফ-কে কত জমি তুলে দেওয়া হয়েছে, সেই খতিয়ান তুলে ধরেন। এখনও পর্যন্ত ১০ হাজার অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে পুশব্যাক করা হয়েছে বা ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে বিধানসভায় জানান শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ‘‘সিএএ-র আওতায় যাঁরা আসেননি, বাকি যাঁরা ঢুকে পড়েছেন, এখনও অবধি আমি ১০ হাজার জনকে বার করেছি। আমার কাছে ১২টা হোল্ডিং সেন্টারে আরও ১৮০০ জন অপেক্ষা করছেন। রোজ ও পারে পাঠাচ্ছি। থাকবে না কেউ।’’ তিনি আরও জানান যে, সীমান্তে বেড়া তৈরির কাজের জন্য ইতিমধ্যেই বিএসএফ-কে ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকার কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ সম্পন্ন হবে। নির্বাচনের প্রচারপর্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে যে স্লোগান শোনা গিয়েছিল যে, মঙ্গলবার শুভেন্দুর মুখেও শোনা গেল সেই কথা, ‘সবকা সাথ, সব কা বিকাশ’। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের বড় অংশ জুড়ে ছিল, বিগত সরকার তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করেছে। ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী হিংসার কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, সেই সময় মৃত্যু হয়েছিল ৫৭ জনের। এফআইআর হয়েছিল ২০০০-এর বেশি। সেখানে এ বছর পুলিশের করা স্বতপ্রবৃত্ত এফআইআর মিলিয়ে অভিযোগের সংখ্যা ২৬২। দিনের পর দিন বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে কত মামলা হয়েছিল, কত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর ভাষণে। পাল্টা ক্ষমতায় এসে সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার ওয়াই চ্যানেলে ধর্নায় বসা নিয়ে তিনি যে কোনও বাধা দেননি, সেই কথাও মনে করিয়ে দেন। কালীগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আলিফা আহমেদ হকার উচ্ছেদ নিয়ে বক্তৃতা করেন। সেই সময় বিজেপি বিধায়কেরা চিৎকার করে বলেন, ‘‘তমন্নার কথা বলুন। আপনি তমন্নার খুনি। চোর।’’ পরে শুভেন্দু নিজের ভাষণে তাঁর উদ্দেশে বলেন, ‘‘আপনি ভোটে জেতার পরে তমন্না খুন হয়েছিল। আপনার থেকে গণতন্ত্রের কথা শুনতে চাই না।’’ মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের শেষ দিকে ঋতব্রতের অনুগামীরা আসন ছেড়ে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তা দেখেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘‘কালীঘাট-তৃণমূল থেকে গেল। আসল তৃণমূল দাবি করা বিধায়কেরা পালিয়ে গেলেন।’’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Popular Articles