RK NEWZ বিশ্বকাপে ফের এলএম টেনের রূপকথা। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গোল করে ফুটবলের সর্বশ্রেষ্ঠ মঞ্চে আবারও শ্রেষ্ঠতার প্রমান দিলেন তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন তিনিই। তাঁর নামের পাশে রয়েছে ১৭টি গোল। এতদিন বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটি ছিল জার্মানির মিরাস্লাভ ক্লোজের নামে। কিন্তু অদ্ভুত এক সমাপতনে, সেই জার্মানির চিরশত্রু দেশ অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে গোল করেই মেসি ভাঙলেন ক্লোজের রেকর্ড। ৪০ বছর আগে এই ২২ জুন দিনটিকেই বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে অক্ষয় করে দিয়েছেন আরেক আর্জেন্টাইন। তিনি দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ৪০ বছর আগে তাঁর করা ‘হ্যান্ড অফ গড’ আজও ফুটবল ইতিহাসে অমলিন। সেই ২২ জুনই নয়া ইতিহাস গড়লেন অধুনা বিশ্ব ফুটবলের GOAT। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের ৩৮ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে আসা মাইনাসকে স্বভাবসিদ্ধ নিখুঁত দক্ষতায় জালে জড়ালেন মেসি। গোটা স্টেডিয়াম যেন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। বিশ্বকালের সর্বকালের সেরা গোলস্কোরারদের তালিকায় মেসি এখন সবার উপরে। তাঁর সংগ্রহ ১৭ গোল। সেই ২০০৬ থেকে বিশ্বকাপে খেলছেন লিও। প্রথম বিশ্বকাপে একটি গোল ছিল তাঁর। ২০১০ তাঁর জীবনের সবচেয়ে খারাপ বিশ্বকাপ। সেবার কোনও গোল পাননি। ২০১৪ সালে মেসি ৪ গোল করে আর্জেন্টিনাকে রানার্স আপ করেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে তিনি একটি গোল করেন। ২০২২ বিশ্বকাপে তিনি যখন নিজের দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করলেন, সে বছর গোল ছিল ৭টি। চলতি বিশ্বকাপে ইতিমধ্যেই চার গোল করে ফেলেছেন তিনি। এই তালিকায় দু’নম্বরে মিরাস্লাভ ক্লোজে ১৬ গোল। তৃতীয় স্থানে ব্রাজিলের রোনাল্ডো ডি-লিমা। তাঁর গোলসংখ্যা ১৫। সক্রিয় ফুটবলারদের মধ্যে মেসির কাছাকাছি রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে। তাঁর দখলে ১৪ গোল। অবশ্যে মেসি শুধু গোলের নিরিখে নন, অ্যাসিস্টের নিরিখেও যুগ্মভাবে সবার উপর। নিজেরই দেশের কিংবদন্তি মারাদোনার পাশাপাশি বিশ্বকাপে মেসির নামের পাশে রয়েছে আটটি অ্যাসিস্ট। বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে মাতলেন বিশ্বজুড়ে লিও ভক্তরা।

লিও মেসির বিশ্বরেকর্ড। সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার নজির। আর সেই নজিরের ম্যাচেই অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউটে নিজেদের স্থান নিশ্চিত করে ফেলল নীল-সাদা ব্রিগেড।বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর এই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে প্রত্যাশা একধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। সোমবার অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে শুরুটাও আক্রমণাত্মক মেজাজে, নিজেদের চেনা ছন্দে করেছিলেন লিও মেসি, লউতারো মার্টিনেজরা। ম্যাচের প্রথম মিনিট কয়েকের মধ্যেই গোটা দুই পরিষ্কার সুযোগও তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যার মধ্যে দ্বিতীয়টি পেনাল্টি স্পট থেকে। আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার মার্টিনেজকে একসঙ্গে জোড়া ট্যাকল করেন অস্ট্রিয়ার দুই ডিফেন্ডার। প্রথমে পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি ওই ট্যাকলকে ফাউল বলে চিহ্নিত করেন। পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি স্পটে লিও মেসি যখন বল বসাচ্ছিলেন, গোটা বিশ্ব তখন মাহেন্দ্রক্ষণের প্রতিষ্ঠায়। এই বুঝি জালে বল জড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোলদাতার শিরোপাটি নিজের মাথায় তুলে নেবেন ফুটবল রাজপুত্র। কিন্তু হায়! এ হেন সাজানো মঞ্চে হৃদয়ভঙ্গের আখ্যান। মেসি পেনাল্টি কিকটা নিলেন বিশ্রীভাবে। বল টার্গেটেও রাখতে পারলেন না। সেসময় মনে হয়েছিল, ওই পেনাল্টি মিসই বুঝি ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে। কিন্তু মেসি অন্যরকম পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। ওই পেনাল্টি মিসের আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা ম্যাজিক্যাল মুহূর্তে নিজের নাম ইতিহাসে তুলে ফেললেন তিনি। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে আসা মাইনাসকে যেই না স্বভাবসিদ্ধ নিখুঁত দক্ষতায় জালে জড়ালেন মেসি, অমনি গোটা স্টেডিয়াম যেন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। যেমন বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে মাতলেন বিশ্বজুড়ে লিও ভক্তরা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য খেলার গতি কিছুটা বদলায়। শুধু রক্ষণ আগলে বসে না থেকে পালটা আক্রমণ শানানো শুরু করে অস্ট্রিয়াও। মাঝে মাঝে দু-একটা ভালো সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। যদিও পরিষ্কার সুযোগ অস্ট্রিয়া তৈরি করতে পারেনি।

একটি ফ্রি-কিক থেকে কঠিন একটি সেভ করা ছাড়া আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমি মার্টিনেজকে বিশেষ কিছু করতে হয়নি। উলটে গোটা দুই সুযোগ পায় নীল-সাদা ব্রিগেডই। যদিও তাতে গোল আসেনি। দ্বিতীয় গোলটির জন্য নীল-সাদা ব্রিগেডকে অপেক্ষা করতে হল একেবারে ইনজুরি টাইম পর্যন্ত। শেষদিকে গোটা অস্ট্রিয়া দল যখন গোল শোধের চেষ্টায় আক্রমণভাগে, তখন পালটা আক্রমণে অনবদ্য গোল করে গেলেন সেই মেসিই। বিশ্বকাপে এখনও অবধি এটি তাঁর ১৮তম গোল। লিওর ওই গোলই আর্জেন্টিনার নকআউট নিশ্চিত করে দিল। বস্তুত, প্রথম ম্যাচের মতো দ্বিতীয় ম্যাচেও আর্জেন্টিনা শুধু মেসিময়। তবে লিওর ওই ম্যাজিক মোমেন্টগুলি বাদ দিলে-বাকি দল এদিন আহামরি ফুটবল খেলেনি। নকআউটের আগে সেটাই চিন্তায় রাখবে কোচ স্কালোনিকে। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে দলকে জিতিয়ে মেসি বলেন, “জিততে পেরে খুশি হয়েছি। কিন্তু কতটা কষ্ট করে জয় পেতে হয়েছে সেটা সকলেই দেখেছেন। ছ’পয়েন্ট পাওয়া খুব দরকার ছিল। আমরা জয়ের লক্ষ্যেই মাঠে নেমেছিলাম। তবে এটা জানতাম জয় সহজে আসবে না। এখনকার ফুটবলে কোনও দলই সহজে হাল ছেড়ে দেয় না। প্রতিটা ম্যাচই মনোযোগ দিয়ে খেলতে হয়।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যোগ্যতা অর্জন করা। সব ম্যাচ জেতার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে হবে। দলের প্রত্যেকে খুশি। আসলে আমরা একসঙ্গে হলে খুব মজা করতে ভালবাসি। অনুশীলনেও রোজ হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়েই কেটে যায়। সে কারণেই মাঠে নেমে এত ভাল খেলি। আমরা ইতিমধ্যেই অনেককে আনন্দ দিয়েছি। আরও আনন্দ দিতে চাই। পেনাল্টি নষ্ট করার পর নিজের উপরেই খুব রেগে গিয়েছিলাম। দিনের শেষে সেটা অবশ্য মাথায় নেই। দল জেতায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছি। খুব দরকার ছিল এই জয়টা। কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। দল নকআউটে ওঠায় মানসিক শান্তি পেয়েছি, যা ভবিষ্যতে আমাদের সাহায্যে করবে। এই বিশ্বকাপে সব ম্যাচই টান টান হবে। কঠোর পরিশ্রম করতে হবে ম্যাচ জিততে গেলে। আমি প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছি। সতীর্থদের সঙ্গে আনন্দ করার জন্য তর সইছে না।”

এমবাপে জাদুতে আবহাওয়া ও ইরাককে হারিয়ে নকআউটে ফ্রান্স। ফিলাডেলফিয়ায় ফ্রান্সের সামনে ছিল দুই প্রতিপক্ষ। ইরাক এবং বজ্রগর্ভ বৃষ্টি। কেউই হারাতে পারল না ‘লে ব্লুজ’দের। ফ্রান্সের শক্তিশেলে বিদ্ধ হল ইরাক। প্রথমার্ধেই শুরু হয় ভারী ব্যাপক বৃষ্টি। তার মধ্যেই খেলা চলতে থাকে। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর আবহাওয়া আরও খারাপ হয়ে যাওয়ায় ম্যাচ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয় খেলা। নিয়ম অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ৩০ মিনিট খেলা বন্ধ রাখতে হবে। এই সময়টাতে নিরাপত্তার জন্য স্পেশাল কনকোর্স এলাকায় জড়ো হতে দেখা যায় দর্শকদের। গত বছর ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচও খারাপ আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘক্ষণ বন্ধ ছিল। এর মধ্যে চেলসি বনাম বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের ম্যাচ শেষ হতে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল। এবারের বিশ্বকাপে এর আগে কোনও ম্যাচ আবহাওয়ার কারণে বন্ধ না হলেও, ইংল্যান্ড ও কোস্টারিকার প্রস্তুতি ম্যাচ বজ্রপাতের কারণে এক ঘণ্টা দেরিতে শুরু হয়। এবার বিশ্বকাপের মূলপর্বেও আবহাওয়ার চোখ রাঙানি এড়ানো গেল না। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হল ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পর। বৃষ্টির পর ফ্রান্স যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠে। ৫৪ মিনিটে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মতো গোল ‘উপহার’ পেলেন এমবাপে।

ইরাক ডিফেন্ডার তাহসিন লম্বা গোল কিকের পরিবর্তে পাস বাড়ান গোলকিপার ফাহদিলকে। যা কিছুটা দূরে থাকায় ফাহদিল ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। বল সোজা চলে যায় দেম্বেলের কাছে। দ্রুত পাস বাড়ান ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা এমবাপেকে। সহজেই গোল করেন ২৭ বছরের তারকা। চার ঘণ্টার ম্যারাথন ফুটবল দেখলেন দর্শকরা। ৬৬ মিনিটে ও ঠিকানালেখা পাস থেকে ফ্রান্সের হয়ে তৃতীয় গোল দেম্বেলের। শেষ পর্যন্ত খেলার ফলাফল থাকে ৩-০। দেশের হয়ে শততম ম্যাচে এমবাপে জোড়া গোল করে গার্ড মুলার (১৪ গোল) এবং রোনাল্ডো নাজিরিওর (১৫ গোল) নজির ভেঙে স্পর্শ করলেন মিরাস্লোভ ক্লোজের বিশ্বকাপে করা ১৬ গোলের রেকর্ড। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। তাঁর সামনে এখন কেবল লিওনেল মেসি (১৮)। টানা দ্বিতীয় জয়ের পর ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘আই’ থেকে প্রথম দল হিসাবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিল দিদিয়ের দেশঁর দল।





